Announcement

Collapse
No announcement yet.

"সাইক্স-পিকো", উসমানীয় সাম্রাজ্য' নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার পশ্চিমাদের গোপন চুক্তি; যা ছিল মুসলিমদের ভূমি দখল ও বিভাজনের মূল চাবিকাঠি।।

Collapse
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • "সাইক্স-পিকো", উসমানীয় সাম্রাজ্য' নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার পশ্চিমাদের গোপন চুক্তি; যা ছিল মুসলিমদের ভূমি দখল ও বিভাজনের মূল চাবিকাঠি।।

    "সাইক্স-পিকো", উসমানীয় সাম্রাজ্য' নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার পশ্চিমাদের গোপন চুক্তি; যা ছিল মুসলিমদের ভূমি দখল ও বিভাজনের মূল চাবিকাঠি।
    §



    সাইকস-পিকো চুক্তি:
    সিরিয়া ও ইরাক সম্পর্কে ১৯১৬ সালে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যবর্তী গোপন চুক্তি যা সরকারিভাবে এশিয়া মাইনর চুক্তি বলে পরিচিত ছিল। এতে রাশিয়ারও সম্মতি ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আতাতের উদ্দেশ্য এতে বিবৃত হয়। ১৯১৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯১৬ সালের মার্চের মধ্যে এই চুক্তির আলোচনা চলে। ১৯১৬ সালের ১৬ মে এটির উপসংহারে পৌছায়।

    ১৯১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে অটোমান সাম্রাজ্যের আরব ভূখণ্ড নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার চুক্তি করে। মার্ক সাইক্স ও ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকো নামক দুই কূটনীতিকের তৈরি এই গোপন চুক্তিই আজকের ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান ও ফিলিস্তিনের সীমান্ত নির্ধারণ করেছিল। আরবদের সাথে করা স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলমান সংঘাত, অস্থিরতা ও রাজনৈতিক বিভাজনের বীজ বপন করেছিল।

    সাইক্স-পিকো চুক্তি কী?
    আজ যদি আমরা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র খুলি, দেখবো ইরাক আর সিরিয়ার সীমান্ত প্রায় সোজা একটি রেখা। জর্ডান আর সৌদি আরবের সীমান্তও অদ্ভুতভাবে সরলরেখায় টানা। কোনো নদী অনুসরণ করে না, কোনো পাহাড় ধরে যায় না, কোনো জাতিগত বা ভাষাগত বিভাজন অনুসরণ করে না। কারণটা সহজ — এই সীমান্তগুলো মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ টানেনি। হাজার মাইল দূরে বসে দুজন ইউরোপীয় কূটনীতিক একটি মানচিত্রের উপর রুলার দিয়ে লাইন টেনে এই সীমান্ত ঠিক করেছিলেন।

    সেই দুজন হলেন ব্রিটেনের স্যার মার্ক সাইক্স এবং ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকো। ১৯১৬ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক মাঝখানে, তারা গোপনে একটি চুক্তি করেছিলেন — যেটা উসমানীয় সাম্রাজ্যের আরব ভূখণ্ড ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিল। এই চুক্তির নাম সাইক্স-পিকো চুক্তি (Sykes-Picot Agreement)। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি পরিচিত "Asia Minor Agreement" নামে। এই একটি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতা চিরতরে বদলে দিয়েছে — এর প্রভাব আজ, একশো বছর পরেও, প্রতিদিনের সংবাদে দেখা যায়।

    চুক্তির প্রেক্ষাপট — কেন এই গোপন ভাগাভাগি উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের প্রারম্ভ: ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে উসমানীয় সাম্রাজ্য জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়। এটা ব্রিটেন ও ফ্রান্সের জন্য সুযোগ তৈরি করে। কারণ উসমানীয় সাম্রাজ্য তখন আরব উপদ্বীপ, মেসোপটেমিয়া (আজকের ইরাক), সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও আনাতোলিয়া শাসন করত।

    উসমানীয় সাম্রাজ্য তখন প্রায় ৬০০ বছর ধরে এই অঞ্চল শাসন করছিল। কিন্তু ১৯ শতকের শেষ দিক থেকে সাম্রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করে। একে তখন ইউরোপে বলা হতো "ইউরোপের অসুস্থ মানুষ" (Sick Man of Europe)। ব্রিটেন ও ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা করছিল। সুয়েজ খাল (১৮৬৯ সালে চালু) ব্রিটেনের জন্য ভারত যাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল। ফ্রান্সের লেভান্ট অঞ্চলে (সিরিয়া ও লেবানন) দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল। যুদ্ধ সেই সুযোগ এনে দিল।

    আরব বিদ্রোহ এবং ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতি:
    ১৯১৫ সালে ব্রিটেন মক্কার শরিফ হুসেইন ইবনে আলির সাথে গোপনে পত্রবিনিময় করে — যা ইতিহাসে পরিচিত "হুসেইন-ম্যাকমাহন পত্রবিনিময়" নামে। ব্রিটেনের মিশর হাইকমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমাহন হুসেইনকে প্রতিশ্রুতি দেন: "যদি আরবরা উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তাহলে যুদ্ধ শেষে আরবদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাওয়ার ব্যাপারে ব্রিটেন সমর্থন দেবে।" এই প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হয়ে শরিফ হুসেইন ১৯১৬ সালের জুনে উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ শুরু করে।
    ব্রিটিশ গোয়েন্দা অফিসার টি. ই. লরেন্স ("লরেন্স অব আরাবিয়া") আরব বিদ্রোহীদের সাথে মরুভূমিতে যুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু ঠিক যখন আরবরা ব্রিটেনের হয়ে রক্ত দিচ্ছে, সেই একই সময়ে — ১৯১৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসে — ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে সেই আরব ভূখণ্ড নিজেদের মধ্যে ভাগ করার চুক্তি করছে। এটাই সাইক্স-পিকো চুক্তির সবচেয়ে নৈতিক ভয়াবহতা।

    গোপন আলোচনা— সাইক্স ও পিকো:
    ব্রিটিশ পক্ষে আলোচনা করেন স্যার মার্ক সাইক্স — ইয়র্কশায়ারের একজন সংসদ সদস্য ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ। ফরাসি পক্ষে ছিলেন ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকো — বৈরুতে ফরাসি কনসাল জেনারেল। দুজনে কয়েক মাস ধরে গোপনে আলোচনা করেন। রাশিয়াকেও (তখন জারের শাসনে) এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় — একটি অংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ১৯১৬ সালের ১৬ মে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়।

    চুক্তির মূল বিষয়বস্তু: কে কী পেল:
    সাইক্স-পিকো চুক্তিতে উসমানীয় সাম্রাজ্যের আরব ভূখণ্ডকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়:
    প্রথম অঞ্চল: বাগদাদ থেকে দক্ষিণে কুয়েত পর্যন্ত। এই অংশটি সরাসরি ব্রিটিশদের অধীনে থাকবে।
    দ্বিতীয় অঞ্চল: থাকবে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে। যা বর্তমান উত্তর ইরাক, জর্দান ও বর্তমান ইসরাইলের নেগেভ মরুভূমি থেকে মিসরের সিনাই উপত্যকা পর্যন্ত এই অংশের বিস্তৃতি।
    তৃতীয় অঞ্চল: যা দক্ষিণ লেবানন থেকে তুরস্কের কয়েকটি অঞ্চল নিয়ে গঠিত থাকবে সরাসরি ফ্রান্সের অধীনে। এবং সিরিয়া মরুভূমির অংশটি যাবে ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে।
    চতুর্থ অঞ্চল:
    সাইকস-পিকো চুক্তিতে রাশিয়ার জারকে দেয়া হয় ইস্তাম্বুল, বসফরাস প্রণালীসহ বর্তমান তুরস্কের অংশ।
    আন্তর্জাতিক অঞ্চল: ফিলিস্তিন — জেরুজালেমসহ এই অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা ছিল, কারণ এখানে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম তিন ধর্মের পবিত্র স্থান রয়েছে।

    ইতিহাসবিদ James Barr তাঁর 'A Line in the Sand' গ্রন্থে লিখেছেন — সাইক্স একটি মানচিত্রের উপর আঙুল রেখে বলেছিলেন, "আমি চাই 'e' অক্ষরটি (Acre থেকে) থেকে শেষ 'k' (Kirkuk পর্যন্ত) পর্যন্ত একটি লাইন।" এই একটি রেখাই মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল।

    চুক্তি ফাঁস — বলশেভিক বিপ্লব ও বিশ্বাসঘাতকতার উন্মোচন:
    ১৯১৭ সালের নভেম্বরে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব হলো। জারের সরকার উৎখাত হলো। নতুন বলশেভিক সরকার জারের সময়ের সব গোপন চুক্তি প্রকাশ করে দিল — সাইক্স-পিকো চুক্তি সহ। তুর্কি ভাষায় অনুবাদ করে অটোমান সরকারকে পাঠানো হলো। আরব বিশ্বে এটা ছড়িয়ে পড়ল। শরিফ হুসেইন এবং তাঁর অনুসারীরা বুঝতে পারলেন — ব্রিটেন একদিকে তাদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, অন্যদিকে গোপনে সেই ভূমি ফ্রান্সের সাথে ভাগ করে নিচ্ছিল। এই বিশ্বাসঘাতকতা আরব বিশ্বে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল — যা আজও শুকায়নি। মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তির প্রতি যে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে, তার মূল এখানেই প্রোথিত।

    বেলফোর ঘোষণা: ঠিক একই বছর — ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর — ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর আরেকটি ঘোষণা দিলেন: "মহামান্য সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছে।" — বেলফোর ঘোষণা, ১৯১৭।

    একই ভূমির জন্য তিনটি পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতি —
    1. আরবদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি (হুসেইন-ম্যাকমাহন)
    2. ব্রিটেন-ফ্রান্সের মধ্যে ভাগাভাগি (সাইক্স-পিকো)
    3. ইহুদিদের জন্য আবাসভূমি (বেলফোর)।
    এই তিন প্রতিশ্রুতির সংঘাত আজও মধ্যপ্রাচ্যকে জ্বালিয়ে রাখছে। ১৯১৭ সালে যেখানে ফিলিস্তিনের মূল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইহুদির সংখ্যা ছিল মাত্র ৬ শতাংশ; সেখানে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার বছরে ফিলিস্তিনের ইহুদি জনসংখ্যা ৬ লাখে উন্নীত হয়। ততদিনে এই ভূখণ্ড থেকে গণহত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন ও জবরদস্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ৮ লাখ মূল অধিবাসীকে বিতাড়িত করা হয়।


    চুক্তির বাস্তবায়ন: ম্যান্ডেট ব্যবস্থা ও কৃত্রিম রাষ্ট্র:
    প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯২০ সালে লীগ অব নেশনস গঠিত হলো। সাইক্স-পিকো চুক্তির সরাসরি বাস্তবায়ন না হলেও, এর মূল নকশা অনুযায়ী "ম্যান্ডেট" ব্যবস্থা চালু হলো — যেখানে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে এই অঞ্চলগুলোর "অভিভাবক" মনোনীত করা হলো।

    ইরাক — তিন জাতিকে এক দেশে আটকানো
    1. মসুল (কুর্দি ও সুন্নি আরব অধ্যুষিত),
    2. বাগদাদ (মিশ্র)
    3. বসরা (শিয়া আরব অধ্যুষিত)
    — তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় অঞ্চলকে একত্রিত করে "ইরাক" নামক একটি রাষ্ট্র তৈরি করল ব্রিটেন। এই তিন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার আলাদা। তাদের কোনো সাধারণ জাতীয় পরিচয় ছিল না। ব্রিটেন হাশেমি রাজবংশ থেকে ফয়সালকে এনে ইরাকের রাজা বানাল — যিনি ছিলেন আসলে হেজাজের (আজকের সৌদিআরব) মানুষ।

    এই কৃত্রিম রাষ্ট্র কাঠামোর ফলাফল?
    দশকের পর দশক সাম্প্রদায়িক সংঘাত, সাদ্দাম হোসেনের স্বৈরশাসন, ২০০৩ সালে আমেরিকার আক্রমণ, এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধ।


    সিরিয়া ও লেবানন — ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণ:
    ফ্রান্স সিরিয়া অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে নিল। তারপর একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিল — লেবাননকে সিরিয়া থেকে আলাদা করে একটি পৃথক রাষ্ট্র তৈরি করল। কারণ লেবাননে ছিল বৃহৎ খ্রিস্টান মেরোনাইট জনগোষ্ঠী —ফ্রান্সের মিত্র। কিন্তু লেবাননে শুধু খ্রিস্টান ছিল না — সুন্নি মুসলিম, শিয়া মুসলিম, দ্রুজ এবং আরও অনেক সম্প্রদায় ছিল। এই জটিল সাম্প্রদায়িক গঠনই পরবর্তীতে লেবাননের ১৯৭৫-৯০ সালের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের বীজ বপন করেছিল।

    ফিলিস্তিন ও ট্রান্স-জর্ডান:
    ব্রিটেন ফিলিস্তিনের ম্যান্ডেট পেল। একদিকে আরবদের কাছে প্রতিশ্রুতি ছিল এটা আরব রাষ্ট্রের অংশ হবে। অন্যদিকে বেলফোর ঘোষণায় ইহুদিদের কাছে প্রতিশ্রুতি ছিল এখানে ইহুদি আবাসভূমি হবে।

    ব্রিটেন ফিলিস্তিন থেকে জর্ডান নদীর পূর্ব অংশ আলাদা করে "ট্রান্সজর্ডান" তৈরি করল — শরিফ হুসেইনের ছেলে আবদুল্লাহকে সেখানে আমির বানিয়ে দিল। এটাই আজকের জর্ডান। আর জর্ডান নদীর পশ্চিম পাড়ে — ফিলিস্তিনে — ইহুদি অভিবাসন বাড়তে থাকল। আরব ও ইহুদিদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হলো। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলো এবং শুরু হলো ফিলিস্তিনি নাকবা (বিপর্যয়) — যা আজও চলমান।


    দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব:এক শতাব্দীর অস্থিরতা:
    সাইক্স-পিকো চুক্তির প্রভাব শুধু মানচিত্রের রেখায় সীমাবদ্ধ নয়। এটা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।

    ১. জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত: কৃত্রিম সীমান্ত একই জাতিকে বিভিন্ন দেশে ভাগ করেছে (কুর্দিরা তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া ও ইরানে বিভক্ত) এবং বিভিন্ন জাতিকে এক দেশে আটকেছে (ইরাকে সুন্নি, শিয়া ও কুর্দি)।

    ২.গণতান্ত্রিক
    স্বৈরশাসনের উত্থান: কৃত্রিম রাষ্ট্রে জনগণের আনুগত্য ও পরাশক্তির সমর্থন পেতে গণতন্ত্র ও সামরিক শাসনের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। সিরিয়ায় আসাদ পরিবার, ইরাকে সাদ্দাম — এদের উত্থান এই কৃত্রিম রাষ্ট্র কাঠামোর পরিণতি।

    ৩. তেল রাজনীতি: সাইক্স-পিকো চুক্তিতে মসুলের তেল সম্পদ নিয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে তীব্র দরকষাকষি হয়েছিল। David Fromkin তাঁর 'A Peace to End All Peace' গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগাভাগিতে তেলের ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক।

    ৪. ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত: একই ভূমির জন্য আরব ও ইহুদিদের কাছে পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতি — এই সংঘাতের বীজ সরাসরি সাইক্স-পিকো যুগেই বপন করা হয়েছিল।

    ৫. পশ্চিমা শক্তির প্রতি অবিশ্বাস: মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইউরোপের প্রতি যে গভীর অবিশ্বাস, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি সাইক্স-পিকো এবং ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। এই অবিশ্বাস আজও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকে প্রভাবিত করে। কিন্তু আজ মধ্যপ্রাচ্যের শাসকগণের হৃদয় থেকে পশ্চিমা শক্তির প্রতি অবিশ্বাস মিটে গিয়েছে।


    সাইক্স-পিকো আজও কেন প্রাসঙ্গিক?
    ২০১৪ সালে (খাওয়ারেজ) ISIS যখন ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে বিশাল অঞ্চল দখল করল, তারা ঘোষণা করেছিল — "আমরা সাইক্স-পিকো সীমান্ত মুছে ফেলছি।" এই ঘোষণা দেখায় যে একশো বছর পরেও এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কতটা প্রাসঙ্গিক।

    কুর্দিরা উত্তর সিরিয়ায় স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তৈরি করেছে। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চল কার্যত স্বাধীনভাবে চলে।

    লিবিয়া, ইয়েমেন, সুদান — এই দেশগুলোর সংকটেও ঔপনিবেশিক যুগের কৃত্রিম সীমান্তের ভূমিকা আছে। সাইক্স-পিকো মধ্যপ্রাচ্যের কথা বললেও, এই একই নীতি আফ্রিকাতেও প্রয়োগ করা হয়েছিল— বার্লিন সম্মেলনে (১৮৮৪-৮৫) আফ্রিকাকে ভাগ করা হয়েছিল একইভাবে।


    মুসলিম বিশ্বকে তিনটি প্রধান ‘কৌশলগত করিডোর’ বা ‘সিল্ক রোড’-এ ভাগ:
    যখন ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো উসমানীয় সাম্রাজ্য দখল করল, তারা পুরো মুসলিম বিশ্বকে তিনটি প্রধান ‘কৌশলগত করিডোর’ বা ‘সিল্ক রোড’-এ ভাগ করে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিল:

    ১. উত্তর করিডোর (Northern Corridor): আফগানিস্তান থেকে ভারত পর্যন্ত এই প্রাচীন রেশম পথটি রাশিয়া এবং তাদের মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হলো।

    ২. সামুদ্রিক করিডোর (Marine Corridor): আটলান্টিক থেকে সুয়েজ খাল ও আরব সাগর হয়ে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত এই নৌপথটি দখল করল ব্রিটেন, যা বর্তমানে উত্তরাধিকার সূত্রে আমেরিকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এটি বিশ্ব অর্থনীতির মূল ধমনী।

    ৩. দক্ষিণ করিডোর (Southern Corridor): এটি হলো সাহেল আফ্রিকা বা মহাদেশের অভ্যন্তরীণ পথ, যার নিয়ন্ত্রক ছিল ফ্রান্স। যা ছিল সাইকস-পিকো চুক্তির বিষয়বস্তু অন্তর্ভূক্ত।


    Eugene Rogan তাঁর 'The Fall of the Ottomans' গ্রন্থে দেখিয়েছেন — সাইক্স-পিকো শুধু একটি চুক্তি নয়, এটি একটি মানসিকতার প্রতিফলন। ইউরোপীয় শক্তিগুলো বিশ্বাস করত তারা অন্য জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করার অধিকার রাখে। এই মানসিকতাই আজকের অনেক সংঘাতের মূলে। যা আজ সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকাও একই মানসিক রোগে আক্রান্ত।


    সাইক্স-পিকো চুক্তির সারসংক্ষেপ:
    ১. ১৯১৬ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে উসমানীয় সাম্রাজ্যের আরব ভূখণ্ড নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার চুক্তি করে।
    ২. এই চুক্তি আরবদের দেওয়া স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি (হুসেইন-ম্যাকমাহন পত্রবিনিময়) সরাসরি লঙ্ঘন ছিল।
    ৩. ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর বলশেভিকরা এই গোপন চুক্তি প্রকাশ করে দেয় — বিশ্বব্যাপী ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
    ৪. আজকের ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও জর্ডানের সীমান্ত মূলত এই চুক্তির ভিত্তিতে টানা হয়েছিল।
    ৫. একই বছরে বেলফোর ঘোষণায় ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় — যা ইহুদি রাষ্ট্র গঠন ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের বীজ।
    ৬. সাইকস-পিকো চুক্তিভিত্তিতে রাশিয়ার জারকে দেয়া হয় ইস্তাম্বুল, বসফরাস প্রণালীসহ বর্তমান তুরস্কের অংশ।
    ৭. সাইকস-পিকো চুক্তিই মধ্যেপ্রাচ্যে সকল সংঘাত ও আফ্রিকার মুসলমানদের দারিদ্রতার মূল কারণ।


    সাইক্স-পিকো চুক্তি মাত্র কয়েক পাতার একটি কাগজ ছিল। কিন্তু এই কাগজ কোটি কোটি মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। রুলার দিয়ে টানা সরল রেখাগুলো জাতিকে ভাগ করেছে, পরিবার বিচ্ছিন্ন করেছে, এবং এমন রাষ্ট্র তৈরি করেছে যেগুলো প্রথম দিন থেকেই অকার্যকর। আরবদের সাথে করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, গোপন ভাগাভাগি এবং বেলফোর ঘোষণা — এই তিনটি মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এমন একটি মধ্যপ্রাচ্য যেখানে সংঘাত ছিল অনিবার্য। আজ একশো বছরেরও বেশি সময় পরে, সিরিয়ার ধ্বংসস্তূপে, ইরাকের সাম্প্রদায়িক বিভাজনে, ফিলিস্তিনের দখলদারিত্বে এবং লেবাননের অর্থনৈতিক পতনে — সাইক্স-পিকো চুক্তির ছায়া এখনো স্পষ্ট দেখা যায়।


    ইতিহাস আমাদের শেখায় — যখন বাইরের শক্তি কোনো জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে, সেই ব্যবস্থা কখনো দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। যেদিন মুসলিমরা নিজেদের সীমান্ত নিজেরা নির্ধারণ করবে — সেদিনই সাইক্স-পিকোর চুক্তির অভিশাপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্ব মুক্তি পাবে।

    অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পাড়ি দিয়ে মুসলিম উম্মাহর সন্তানেরা আজ বুঝতে শুরু করেছে, যার প্রতিফলন সোমালিয়া, মালি, নাইজার, বুরকিনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রদর্শিত হচ্ছে। সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন হিন্দের সন্তানেরা নিজেদের সীমান্ত নিজেরা নির্ধারণ করবে এবং বুঝে নিবে নিজেদের ভূমির হিস্যা-ইনশাআল্লাহ

    সংগৃহীত ও পরিমার্জিত:
    Last edited by Rakibul Hassan; 12 hours ago.


  • #2
    ইসলামের ইতিহাস অজানা থাকা এটা মুসলমানদের জন্য বিপর্যয়ের বড় কারণ।
    আমাদের জন্য উচিত ইতিহাস জেনে এর থেকে পরিত্রানের পথ খোঁজা।

    হে আল্লাহ! ইয়াহুদী, খৃষ্টানদের ফাঁদ আমাদেরকে বুঝার তৌফিক দাও।
    হে আল্লাহ ! ইয়াহুদী, খৃষ্টানদের ফাঁদ থেকে আমাদেরকে বের কর।
    হে আল্লাহ! তাদের শাস্তির জন্য আমাদের হাত ব্যবহারের সুযোগ করে দাও। আমীন।

    কারণ তুমিই তো বলেছ

    আত তাওবাহ্, আয়াতঃ ১৪

    قَاتِلُوۡہُمۡ یُعَذِّبۡہُمُ اللّٰہُ بِاَیۡدِیۡکُمۡ وَیُخۡزِہِمۡ وَیَنۡصُرۡکُمۡ عَلَیۡہِمۡ وَیَشۡفِ صُدُوۡرَ قَوۡمٍ مُّؤۡمِنِیۡنَ ۙ

    অর্থঃ
    অর্থঃ যুদ্ধ কর ওদের সাথে, আল্লাহ তোমাদের হস্তে তাদের শাস্তি দেবেন। তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন এবং মুসলমানদের অন্তরসমূহ শান্ত করবেন।

    ---------------------

    Last edited by Rakibul Hassan; 10 hours ago.

    Comment

    Working...
    X