Announcement

Collapse
No announcement yet.

বিশ্বকাপ উন্মাদনা!! বিবেক ও নৈতিক মানদণ্ডের বিবেচনায় আমাদের এই অবস্থান হিপোক্রেসির কোন লেভেলে পড়ে??

Collapse
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • বিশ্বকাপ উন্মাদনা!! বিবেক ও নৈতিক মানদণ্ডের বিবেচনায় আমাদের এই অবস্থান হিপোক্রেসির কোন লেভেলে পড়ে??

    বিশ্বকাপ উন্মাদনা!! বিবেক ও নৈতিক মানদণ্ডের বিবেচনায় আমাদের এই অবস্থান হিপোক্রেসির কোন লেভেলে পড়ে??
    §


    পুরো বিশ্বের চোখ যখন ফুটবলের জমকালো মাঠে , ঠিক তখনই গাজায় দখদারত্ব ও অবরোধ আরও জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। চালিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নৃশংস সামরিক অভিযান। অথচ বিগত মাসগুলোর তুলনায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কভারেজ এবং বৈশ্বিক চাপ, দুই-ই এখন তলানিতে। বিশ্বের এই চরম উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে গাজার মাটিতে প্রতিদিন নতুন নতুন নারকীয় তাণ্ডব চালাচ্ছে দখলদার ইসরায়েল।

    ১১ জুন রাত ১১টা, পুরো বিশ্বের চোখ যখন মেক্সিকোর এজটেক স্টেডিয়ামে ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানর দিকে, তখন গাজার ‘আল মাগাজি রিফিউজি ক্যাম্পে’ চলছে নীরব বোম্বিং। পুরো বিশ্বের বিবেককে বিনোদনে আটকে রেখে গাজায় চলছে ধারাবাহিক নৃশংস গণহত্যার উৎসব।

    ফুটবল বিশ্বকাপের হাওয়া বইলে আমাদের মুসলিম তরুণ-তরুণীদের ফুটবল উন্মাদনার এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি শুরু হয়। আমরা যারা এক উম্মাহর কথা বলি, যারা ফিলিস্তিন বা আরাকানের রক্তক্ষরণের খবরে চোখের পানি ফেলি, তারাই আবার বিশ্বকাপের মৌসুমে নিজেদের অস্তিত্ব ভুলে ভিনদেশি দলের অন্ধ ভক্তে পরিণত হই। একদিকে রক্তাক্ত গাজা আর অন্যদিকে আমাদের ফুটবল উৎসব, এ যেন একই মুদ্রার দুটি পিঠ। যেখানে এক পিঠে লেপ্টে আছে নিষ্পাপ শিশুদের নিথর দেহ, আর অন্য পিঠে উড়ছে আমাদের অন্ধ আবেগের রঙিন পতাকা।

    বিশ্বকাপ এলেই আমাদের চারপাশ বদলে যায়। ঘরের ছাদে বিশাল সব পতাকা ওড়ে, চায়ের দোকানে ঝড় ওঠে তর্কের, মাঝরাতে গোল উদযাপনে ফেটে পড়ে পুরো এলাকা। আমরা বিভক্ত হয়ে যাই ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনায়, কিংবা ফ্রান্স-জার্মানি-পর্তুগালে। কিন্তু গোলপোস্টের পেছনেও যে কিছু লুকানো সত্য আছে, তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি?

    যে দেশগুলোর জাদুকরী ফুটবলে আমরা বুঁদ হয়ে আছি, সেই দেশগুলোর সরকার কিন্তু গাজার মাটিতে চলা নির্মম গণহত্যার পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের অংশীদার। অথচ মাঠের টানটান উত্তেজনায় এই ভয়ংকর ও রূঢ় সত্য আমরা বেমালুম ভুলে যাই। একদিকে মজলুমের জন্য আমাদের দীর্ঘশ্বাস, অন্যদিকে তাদের হত্যাকারীদের প্রধান মদদদাতাদের ফুটবলীয় জাদুতে আত্মহারা হওয়া, আমাদের এই চরম নৈতিক দ্বিচারিতা সত্যিই সেলুকাসকে স্তব্ধ করে দেয়!

    দিনের আলোয় আমরা চত্বরে দাঁড়িয়ে প্লেকার্ড হাতে চিৎকার করি, ‘Free Palestine’। ফিলিস্তিনের শিশুদের কান্নায় আমাদের চোখ ভিজে ওঠে, আমরা ইসরায়েলি পণ্য বর্জনের ডাক দিই। কিন্তু রাতের অন্ধকার নামলেই সেই আবেগ কর্পূরের মতো উড়ে যায়। গাজায় যে বুলেটের আঘাতে একটা ১০ বছরের শিশুর বুক ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে, সেই বুলেটের জোগানদারদের জার্সি গায়ে চাপিয়ে আমরা মেতে উঠি অসভ্য উল্লাসে। গোল হলে আমরা যখন বাজি ফোটাই, ঠিক তখনই হয়তো গাজার কোনো হাসপাতালে আছড়ে পড়ছে আরেকটি বোমার অগ্নিশিখা।

    আমরা এত নিষ্ঠুর, এত স্মৃতিভ্রম জাতি কীভাবে হলাম! ফিলিস্তিনের সেই রক্তাক্ত কোনো শিশু যদি আজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়াত, তবে কোন মুখে আমরা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা উঁচু করে ধরতাম? ফুটবলের সৌন্দর্য আছে, আর্ট আছে, কিন্তু তা কি হাজার হাজার শিশুর লাশের চেয়েও দামি? যারা পর্দার আড়ালে মুসলিম গণহত্যার ছক কষে, তাদের নিয়েই মুসলিম তরুণ-তরুণীদের মোহের শেষ নেই।

    আমরা এত নিষ্ঠুর, এত স্মৃতিভ্রম জাতি কীভাবে হলাম! ফিলিস্তিনের সেই রক্তাক্ত কোনো শিশু যদি আজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়াত, তবে কোন মুখে আমরা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা উঁচু করে ধরতাম?

    ফুটবলকে আধুনিক বিশ্ব নাম দিয়েছে ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এই খেলাটি মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, প্রচ্ছন্ন বর্ণবাদ এবং নৈতিক দ্বিমুখী আচরণের এক বিশাল রঙ্গমঞ্চ। গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়, গণহত্যাকারী রাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদ থেকে শুরু করে ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসা নীতি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষমতার দম্ভ এবং পশ্চিমা বিশ্বের তথাকথিত ‘উদারবাদী’ মুখোশের আড়ালে থাকা কঠোর বাস্তবতা। সেই ভয়ংকর বাস্তবতা এক ঝলক দেখে আসা যাক।


    গাজা গণহত্যায় আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রাষ্ট্রগুলোর দায়


    ১.ফ্রান্স (অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা):

    গাজা গণহত্যায় ফ্রান্সের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সরব ছিল বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। মানবাধিকার সংগঠন ACAT (Action by Christians for the Abolition of Torture)-এর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির কথা বললেও ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পর্দার আড়ালে কাজ করছে। ইসরায়েলের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহের ক্ষেত্রে ফ্রান্সের আইনি ফাঁকফোকরগুলো Le Monde-এর অনুসন্ধানে বারবার উঠে এসেছে। তারা কেবল অস্ত্রই বিক্রি করছে না, বরং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নজরদারি প্রযুক্তি দিয়েও সহায়তা করছে।

    যদিও ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে তারা ইসরায়েলে ‘মারাত্মক অস্ত্র’ (lethal weapons) পাঠায় না, তবে ACAT (Action by Christians for the Abolition of Torture)-এর মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ফ্রান্স থেকে এমন অনেক সরঞ্জাম বা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হয়।

    এদিকে Human Rights Watch ও Le Monde-এর রিপোর্ট বলছে, ফ্রান্সের একটি আদালত এবং বেশ কিছু মানবাধিকার সংস্থা ফ্রান্স সরকারকে ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল। এর মূল ভিত্তি ছিল ‘আর্মস ট্রেড ট্রিটি’ (Arms Trade Treaty), যা যুদ্ধাপরাধের ঝুঁকি থাকলে অস্ত্র রপ্তানি নিষিদ্ধ করে।


    ২.আর্জেন্টিনা (কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন):

    বর্তমান আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই ইসরায়েলকে তাদের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। Al Jazeera এবং Reuters-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা গাজা সংকটে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানানোর পাশাপাশি হামাস বিরোধী আন্তর্জাতিক জোট গঠনের সক্রিয় সমর্থক।

    আর্জেন্টিনা সরাসরি বড় ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের চেয়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং কূটনৈতিক সুরক্ষা প্রদানের মাধ্যমে ইসরায়েলকে সহায়তা করছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন।


    ৩.ব্রাজিল (দ্বিমুখী পরিবর্তনশীল অবস্থান):

    প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বললেও DW News, Associated Press এবং স্থানীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিলের সামরিক বাহিনীর সাথে ইসরায়েলের ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি বিনিময় চুক্তি এখনো বলবৎ। এই চুক্তিগুলো পুরোপুরি বাতিল করার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জটিলতা দেখিয়ে তারা দায় এড়াতে চাইছে, যা তাদের পররাষ্ট্রনীতির চরম অসামঞ্জস্যতাকে ফুটিয়ে তোলে।


    এছাড়াও আল জাজিরার ২৩ মে ২০২৬ তারিখের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে অবদান রাখা ৫১টি দেশের তালিকা প্রকাশ পেয়েছে। এই তালিকায় আছে জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, মেক্সিকো, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মালেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর সহ বেশকিছু দেশের নাম।

    যদিও আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছে, এই ৫১টি দেশ ইসরায়েলে সরাসরি যুদ্ধাস্ত্র পাঠিয়েছে তা নয়, বরং এই তালিকায় সেই দেশগুলো রয়েছে যাদের কোম্পানিগুলো ইসরায়েলের সামরিক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স এবং সফটওয়্যার সরবরাহ করেছে। তবে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে ড্রোন এবং আর্টিলারি সিস্টেম কার্যকর রাখতে এই দেশগুলোর বাণিজ্যিক সহযোগিতা অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছে।

    এদিকে আমরা গাজা গণহত্যায় যে দেশগুলো গোয়েন্দা তথ্য-অস্ত্র-অর্থ দিয়ে সমর্থন জোগায়, তাদের প্রতি আমাদের মোহ কাজ করে, তাদের রঙিন পতাকা-জার্সি মুড়িয়ে আমরা উৎযাপন করি। গাজাবাসীর সেই অসহায়ত্ব আর দুর্দশাকে আমরা আবেগের টুল হিসেবে ব্যবহার করি। তাদের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা হয়ে গিয়েছে সিলেক্টিভ, দিনের আলোতে মিডিয়ার সামনে আমরা ‘হায় গাজা’-‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বলে রব তুলি, আবার গভীর রাতে গাজার খুনিদের দোসর রাষ্ট্রগুলোর জয়ধ্বনি করি। বিবেক ও নৈতিক মানদণ্ডের বিবেচনায় আমাদের এই অবস্থান হিপোক্রেসির কোন লেভেলে পড়ে, সেটা ভেবে দেখা উচিত।


    সংগৃহীত

    Last edited by Rakibul Hassan; 16 hours ago.


  • #2
    আমরা এত নিষ্ঠুর, এত স্মৃতিভ্রম জাতি কীভাবে হলাম! ফিলিস্তিনের সেই রক্তাক্ত কোনো শিশু যদি আজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়াত, তবে কোন মুখে আমরা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা উঁচু করে ধরতাম?

    কিছু বলার উপযুক্ততা হারিয়ে ফেলেছি!

    আমরা...............
    "আমরা তাওবা করার পূর্বে মরতে চাই না এবং মৃত্যু সামনে আসার পরে তাওবা করতে চাই না"
    আবু হাযেম রহ.

    Comment

    Working...
    X