আন-নাসর মিডিয়া পরিবেশিত
বিপ্লবের রূপরেখা
।। মুহাম্মাদ সালাহুদ্দীন যায়দান–
(বিপ্লবী বক্তৃতা পর্ব - ০১)।। থেকে- শেষ পর্ব
বিপ্লবের রূপরেখা
।। মুহাম্মাদ সালাহুদ্দীন যায়দান–
(বিপ্লবী বক্তৃতা পর্ব - ০১)।। থেকে- শেষ পর্ব
মিসর বিপ্লবের পর্যালোচনা :
বিপ্লব জনগণের কাছে পরিবর্তনের মাধ্যম, সেনাবাহিনীর কাছে নয়। সেনা অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীর কাছে পরিবর্তনের মধ্যম, জনগণের কাছে নয়। সেনাবাহিনী যখন ক্ষমতা দখলের দিকে অগ্রসর হয়, তখন তারা যুদ্ধাবস্থায় চলে যায়, বিপ্লবের অবস্থায় নয়। এমনিভাবে তারা যখন জনগণের দিকে বন্দুকের নল ঘুরায়, তখন ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা হারানোর অবস্থায় চলে যায় এবং মানসিক ও সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িয়ে যায়। বিপ্লব স্বভাবত জনগণের দাবী-দাওয়া, চাহিদা ও আশা-আকাঙ্খা পূরণ করে। আর সেনা অভ্যুত্থান জনগণকে দমন-পীড়ন করে ও তাদের স্বপ্ন ধ্বংস করে দেয়। বিপ্লবের দর্শন হচ্ছে, জনগণের মৌলিক বিশ্বাস ও চাহিদানুযায়ী তাদেরকে ইসলামী শরীয়াহ ও স্বাভাবিক উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আর সেনা অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দ স্বৈরাচারী আবেশ এবং বৌদ্ধিক অসঙ্গতি অনুসারে এই অভ্যুত্থান ঘটানোর মাধ্যমে দেশকে পিছিয়ে নিয়ে যায়। স্বভাবতই বিপ্লবের সহিংসতার চেয়ে সেনা অভ্যুত্থানের সহিংসতা বেশী ও জঘন্য হয়ে থাকে। সেনা অভ্যুত্থানের পরে তাদের সহিংসতা সাধ্যের বাহিরে চলে যায় এবং এতটাই জঘন্য হয় যে, সারা দেশে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। জনগণের ইচ্ছাশক্তিকে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য তারা মন্দ উপায় গ্রহণ করে। বিপ্লবগুলোতে অপরাধীদের বিচারের জন্য তাদের আদালত ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠত থাকে। আর সেনা অভ্যুত্থানগুলোতে তাদের আদালত ভুল অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার করে থাকে। যেখানে কোন সমতা, যুক্তি-প্রমাণ ও সঠিক সাক্ষী থাকে না। বরং শুধু কঠোরতা ও সহিংসতা থাকে। সেনাবাহিনীর পক্ষে কখনো জনগণকে আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব না। জনগণকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা সেনাবাহিনীর নেই। তাদের ধ্বংসের পরিসংখ্যান করলে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, তাদের দ্বারা জনগণের উন্নতি সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে ইসলামী বিপ্লবের নেতৃবৃন্দ জনগণের রাজনৈতিক, শিক্ষামূলক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মৌলিক প্রয়োজন ও দাবীগুলো পূরণ করতে সক্ষম এবং দেশের উন্নয়নে সচেষ্ট রয়েছে। যখন সেনা অভ্যুত্থানের মাঝে প্রতিবিপ্লবের কিছু কারণ বিদ্যমান থাকে, তখন সেই অভ্যুত্থান দেশের মধ্যে রক্ত নদী বয়ে আনে এবং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ নিঃস্বঙ্গতা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিপর্যয় নিয়ে অবতীর্ণ হয়। সামাজিক বন্ধন ও দেশের মৌলিক কাঠামোকে ভেঙ্গে এক ঐতিহাসিক বিপর্যয় নিয়ে আসে। কখনো তা বিবাদমান একাধিক ছোট ছোট রাষ্ট্রের রূপ নেয়। একপর্যায়ে তাদের বিচ্ছিন্নতা সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং বিশাল জোট এবং ইউনিয়নে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, মিশরে ২৫ জানুয়ারীর আগে ও পরে কী ঘটেছে? এ প্রশ্ন আমাদেরকে আরেকটি প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। তা হচ্ছে, সেখানে কি বিপ্লবের দিগন্তে সকল ভূমিকা বিদ্যমান ছিল? যদি না থাকে, তবে দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক নেতৃবর্গ সে বিপ্লবকে পরিপক্ক হওয়ার আগেই ব্যর্থ করে দিবে। যেমনটা হুবহু ঘটেছিল গত শতাব্দীর ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাইয়ের সেনা অভ্যুত্থানে। নাকি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বই তিউনিসিয়ার বিপ্লবের সংক্রামনের পরিবেশ থেকে সূচিত বিপ্লবের ভূমিকা দ্বারা উপকৃত হতে চেয়েছিল? যার ফলে তারা তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বিপ্লব করে বসে। অতঃপর সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব বিপ্লবী রেখায় প্রবেশ এবং তার উপর অভিভাবকত্ব চাপানোর পর যা ঘটে ছিল, তা হলো: বিষয়টি তাদের সকলের উপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে যায়। তারপর বিপ্লব ও তার কর্মীদের নিয়ে তামাশা করা, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলিকে ধ্বংস করা থেকে রক্ষা করা, বিপ্লব ময়দান থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া, তারা তালমূদ(ইহুদী আইনের সংগ্রহ) থেকে যা উদ্ভাবন করেছিল, তা নিয়ে তামাশা করা, যাকে তারা ‘সংবিধান’ হিসাবে নামকরণ করেছিল। নির্বাচন ও গণভোটে জনগণের সাথে প্রতারণা করা, দুর্নীতিবাজদের ক্ষমা করে দেওয়া ও সৎ মানুষদের সাথে শয়তানী আচরণ করা। এসব কিছু বিষয় আমাদেরকে এটা জানার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে যে, রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে ২৫ জানুয়ারীর আগে এবং পরে কী হয়েছিল?!!
মিসর বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার প্রধান দু’টি কারণ হলো:
১. মুসলিম জনতার মাঝে চিন্তাগত ঐক্য না থাকা এবং এমন কোন নীতিমালা না থাকা; যেগুলো মতানৈক্যের সময় সবাই অনুসরণ করবে। ফলে বিপ্লবীদের ভিতর থেকে অনৈক্য বাড়তে থাকে। ফলে বাস্তবতা এমন কঠিন হয়েছে যে, সকলেই চেতনাগত গোলকধাঁধাঁয় পড়ে যায়, যার গলিতে বিপ্লবীরা হারিয়ে যায়।
২. বিপ্লবকে সংগঠিত এবং আন্দোলিতকারী নেতৃবৃন্দের উদ্যমতা হারিয়ে যাওয়া। অথচ বিপ্লবের প্রধান যুক্তিই ছিল প্রকৃত নেতৃত্ব তৈরি করা। আবু ইসমাইল প্রতীকের ন্যায় সবার শীর্ষে অবস্থান পায়। সে অনেক বিতর্ক উসকে দেয়। বিপ্লবীদেরকে অনেক অনুপ্রেরণা দেয় এবং অনেক অপেক্ষমান জনতাকে অস্থিরতায় ফেলে দেয়। ইখওয়ানুল মুসলিমীন সাময়িক গ্রহণযোগ্যতার সম্ভাবনা নিয়ে সংগঠনের রুপ নেয়। অপরদিকে একজন প্রকৃত নেতার কাছে আন্দোলনকে সোপর্দ করার লক্ষ্যে বিপ্লবী যুবকদের মধ্য থেকে দৃঢ়প্রত্যয়ী হাজেম আবু ইসমাইলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে তিনি এমন একটি পরিচয়ে সকলের কাছে প্রসিদ্ধ ছিলেন, যা আন্দোলনে তার অংশীদার মুসলিম বন্ধুদেরকে এবং ধর্মনিরপেক্ষ মিত্রদেরকে সমন্বয়ে বাধ্য করে। সুতরাং বন্ধু শত্রু সকলেই তার মিত্রতায় অংশগ্রহণ করে। ফলে বহির্শক্তি ও রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মাঝে এবং অন্যান্য ইসলামিক ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদি দলগুলোর কাছে সংগঠিত হওয়া মৈত্রিচুক্তি ধ্বংস হয়ে যায়। আজ আবার নতুন করে বিপ্লবের পরিবেশ ফিরে এসেছে। তাই তাদেরকে খুবই সতর্ক হতে হবে এবং এই বিশাল গ্যাপগুলো বন্ধ করতে হবে।
প্রধান কারণগুলোর মাঝে আরো একটি কারণ হলো: রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা না থাকা। সাধারণ জনগণ চলমান রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে একটি স্বাধীন ও ন্যায়পরায়ন সমাজ গড়ে সুখে-শান্তিতে জীবন যাপন করতে চায়। সেটা কিভাবে হবে? ইসলামী কর্মশালার মাধ্যমে নাকি ধর্মনিরপেক্ষ বা উদারনীতির কর্মশালার মাধ্যমে? এখানে এসে তাদের আন্দোলন গোলকধাঁধাঁয় পড়ে যায় এবং আন্দোলনের আগে ও পরের বিষয়গুলোর মাঝে যাচাই বাছাইয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। উদারপন্থী, গণতন্ত্রবাদী, সমাজতন্ত্রবাদী ও জামাল নাসের-বাদীরা আন্দোলনের কোলে জায়গা করে নেয়। যার কারণে আল্লাহ ছাড়া জনগণের কোন সহায় থাকে না। আল্লাহ ছাড়া তাদের কোন আশ্রয়স্থল এবং ভরসাস্থল থাকে না। তাই তারা আল্লাহ তা‘আলার দিকেই প্রত্যাবর্তন করে এবং তাঁর উপরই ভরসা করে। অবশেষে তারা ইসলামী জাগরণের মাঝে ফিরে আসে।
কিন্তু আন্দোলনকে নিরাপত্তা দেওয়ার সে সময় ততক্ষণে গড়িয়ে গেছে। উপযুক্ত পরিবেশ চলে যাওয়ার পর তা আর ফিরে আসেনি। জনগণকে একটি বা দুইটির বেশি শহরে জমায়েত করা যায়নি। এ অবস্থায় একমাত্র সমাধান ছিল দেশের সর্বত্র ধর্মঘট অবস্থা ছড়িয়ে দেওয়া। দেশব্যাপী সকল জনতাকে বিদ্রোহের ডাক দেওয়া। কিন্তু একটি চতুর্থ প্লাটফর্ম আন্দোলনের অনেক চিন্তা চেতনাকেই শিথিল করে দেয়। তাই এর বাস্তবায়নেও ধীরগতি চলে আসে। ফলে আন্দোলনকে সফল করতে তারা ঈমানী মেহনত এবং বিভিন্ন আলোচনা উৎসবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে: দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবজ্ঞা করা। যার শীর্ষে রয়েছে দূর্নীতিবাজ বিচার বিভাগ। যা বিপ্লবীদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎখাত করার মধ্য দিয়ে তার আইনি তামাশার প্রয়োগ করে বিপ্লবী অভিজ্ঞতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের তামাশার চেয়েও আরো মন্দ ব্যাপার হল, বিপ্লবের নেতৃবৃন্দ তাদের সেসব সিদ্ধান্তগুলোকে প্রত্যাখ্যান ও ধ্বংসসাধন করার পরিবর্তে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গুন্ডাদের থেকে প্রত্যেক দুষ্ট ও কুখ্যাত লোকদেরকে নির্মূল করার পরিবর্তে গা ঢাকা দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে বিচার বিভাগ অপরাধীদেরকে ছেড়ে দিয়েছে এবং নিরাপরাধ লোকদেরকে বন্দি করেছে। এর চাইতে আরো মন্দ ও জঘন্য ব্যাপার হলো: বিপ্লবীরা তাদের নেতাদের এসব নিকৃষ্ট ও লাঞ্ছনাকর সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছে।
সর্বপ্রথম যখন বিচার বিভাগের আসল রূপ প্রকাশিত হলো, তখন এই ভারী ক্ষতি পূরণের লক্ষ্যে বিপ্লবীদের জন্য আবশ্যক ছিলো, তাদের ইসলামী উত্তরাধিকার থেকে আবির্ভূত শরয়ী বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করা এবং বর্তমান বিচার বিভাগকে পুড়িয়ে ফেলা ও তার সংবিধানকে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করা।
আরেকটি প্রধান কারণ হলো: বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবহেলা করা এবং ইহুদী গোষ্ঠি, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে মৈত্রী চুক্তি পরিহার করা। যারা মুসলমানদের সম্পদ দিয়ে পুরাতন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সহায়তা করার প্রতিযোগিতা করে আসছিল এবং অভ্যুত্থানকে উস্কে দেওয়ার জন্য ধর্ম ও নৈতিকতা বিবর্জিত দুর্নীতিগ্রস্ত মিডিয়া চ্যানেল খুলেছিল। আর চলচ্চিত্র নির্মাতারা, যারা তাদের প্রতারণা, ছলনা এবং মিষ্টি কথার মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টিকে মুগ্ধ করে রেখেছিল।
ইহুদি জোট, রিয়াদের সরকার এবং তাদের উপরসাগরীয় বন্ধু রাষ্ট্রগুলো মিলে মাজলুমদের যেই রক্ত বন্যা প্রবাহিত করেছে, সেই রক্ত বন্যাই এসব অপরাধীদের পতন ঘটানোর জন্য, জনগণকে এদের গোলামী থেকে মুক্ত করার জন্য এবং মুসলিমদের পবিত্র রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য বিপ্লবীদের উৎসাহ যোগায়।
শপথ করে বলা যায়, ইহুদিদের পতনের সময় ঘনিয়ে আসছে, ইনশাআল্লাহ। এমনিভাবে তাদের মুখপাত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরকেও প্রচণ্ড ও কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া হবে। কেননা, এদের হাতগুলো নিরীহ মুসলিমদের পবিত্র রক্তে রঞ্জিত, তাদের পকেটগুলো অবৈধ সম্পদে পরিপূর্ণ। এসব নাপাক পাপিষ্টগুলির শাস্তি এবং যারা সিসি সরকারকে যেকোন উপায়ে (হোক তা সামান্য একটি মাত্র কথার মাধ্যমে) সহায়তা করেছে, তাদের সকলের শাস্তি একই রকম হবে। সিসির বিধান যা, এদের বিধানও তা-ই হবে। তাদের মাঝে কোন পার্থক্য করা হবে না। চাই সে মিসরের, জাজিরাতুল আরবের বা অন্য কোন অঞ্চলের অথবা কোন দল, সংগঠন বা জামাতের লোক বা একক কোন ব্যক্তি হোক।
আরো একটি মৌলিক কারণ হলো: বিপ্লবের পরে সেনাবাহিনীর মধ্যে কিছু বড় বড় অফিসারের স্বপদে অটল থাকা। এরা এমন এক শ্রেণী যাদের কাছে জনগণের কোন পাত্তাই নেই, জনতাকে নিয়ে তাদের কোন ভাবনা ও চিন্তার লেশ মাত্র নেই। তাদের চিন্তা- ভাবনায় জনসাধারণের কোন অনুভূতিই থাকে না। এরা হলো সেনাবাহিনীর মধ্যে রেখে যাওয়া পশ্চিমাদের নির্বাচিত এজেন্ট। অথচ তাদেরকে কেবল জনসাধারণের সেবা করার জন্য এবং তাদের ভালো-মন্দ দিক বিবেচনার জন্য লালন-পালন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ তার উল্টো। তাদের হাত আজ জনসাধারণের রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে। তাদের হাতে নিহত জনগণের রক্ত শ্রোতের বন্যায় নদীর প্রবাহ তৈরী হয়েছে। এতগুলো ন্যাক্কারজনক কাজ করার পরেও গণতন্ত্রবাদীদের চোখে সামান্যতম পানি নেই এবং তাদের এসব জঘন্য কাজের কারণে লজ্জাশীলতা বলতেও কিছুই নেই। তাই বিপ্লবীদের জন্য আবশ্যক হলো: তারা যেন তাদের শরয়ী বিচারালয়ে এসব জঘন্য মানবতা ও মানব হত্যাকারীদের বিচার করে এবং কোন আবেদন ও প্রত্যাহার ছাড়াই যথাপোযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করে। কারণ জনগণ কখনো তাদের কাছ থেকে ধ্বংসযজ্ঞ, দুঃখ-দুর্দশা, ধোঁকা, খেয়ানত ও নিকৃষ্ট চরিত্র ছাড়া আর কিছুই পায়নি।
আমি আশা করি অভ্যুত্থানের বিপক্ষে বর্তমান বিপ্লবের প্রজ্বলন এই পাঠ থেকে শিক্ষাগ্রহন করবে। পাশাপাশি একটি বিশ্বস্ত নেতৃত্বের চারপাশে সমবেত হবে। অনর্থক খেল-তামাশাগুলির ব্যাপারে সচেতন থাকবে; যেগুলো ধর্মনিরপেক্ষতা ও উদারতাবাদের আহ্বানকারী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গদের দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছিল। যেমন এলবারাদেই, হুসনি মোবারকের আমদানিকৃত গণতান্ত্রিক বিভিন্ন বিষয়াদি ও তার কার্টুন পার্টি এবং হামদাইন ও মুসার গানগুলো। সেসব মিডিয়া মুখপাত্রদের জিভ কেটে ফেলতে হবে, যারা তাদের ঐক্য নষ্ট করেছে। আর সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো: রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অফিস-আদালতগুলো অচল-ধ্বংস করে দিতে হবে এবং সেনাবাহিনীর মাঝে থাকা সেসব উচ্চপদস্ত অফিসাররা আছে, তাদেরকে সঠিক বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, এরা পুরো উম্মাহর শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছে।
২৫ জানুয়ারী ছিলো বিভিন্ন বিশ্বাস ও ভুল ধারণা থেকে জনগণের মুক্তির সূচনা দিবস। এমন সকল বিধি-নিষেধ ও নিষেধাজ্ঞা জনগণ ভেঙ্গে দিয়েছে, যেগুলো এতদিন তাদের বিবেকের মধ্যে আড়াল হয়েছিল এবং তারা সেটি অতিক্রম করতে পারছিল না। সেদিন তারা তাদের মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের ভয়-ভীতি ও প্রভাব। মিশরীদের এবং অন্যান্যদের মন থেকে সব ভয় ও শঙ্কা দূর হয়ে তাদের মনের গভীরে অনুভূত হয়েছিলো প্রকৃত স্বভাবজাত চিন্তার। ইসলামিক গতিধারা তাদেরকে এমন এক বাস্তবতার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেই বাস্তবতা তাদের মাঝে না থাকার কারণে এতদিন তারা মুজাহিদদেরকে সাহায্য করা থেকে বিরত ছিল এবং সেসব তাগুত গোষ্ঠীর সম্মুখে প্রতিরোধ গড়তে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল, যারা তাদেরকে শুধুমাত্র দাওয়াতের উপকারিতার কথা বলে বলে ফেতনার গোলকধাঁধার মাঝে বন্দি করে রেখেছিল। আর তারাও সেখান থেকে বের হয়নি!! আমি আশা করছি- হয়তো এখান থেকেই একটি নতুন প্রজন্মের উদয় হবে।
জুলাইর ৩ তারিখ থেকে এখন পর্যন্ত চলমান এতসব উত্থান-পতন ও প্রস্থানের মধ্য দিয়েও জনগণ সফলতার পথ ও ব্যর্থতার কারণ সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছে। আগামীর দিনগুলো তাদেরই হবে, ইনশাআল্লাহ। শত্রুরা যত বড়ই বিপদাপদ আর ট্রাজেডি ঘটাক না কেন, জনগণ যদি দৃঢ়পদে প্রতিরোধ করে, জীবনের কুরবানীতে ধৈর্য্য ধারণ করে, মু’মিনদের পথ অনুসরণ করে, তাহলে অবশ্যই তারা পশ্চিমার অনুসারী ও পূজারীদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে, অভ্যুত্থানের পতন ঘটিয়ে এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে মহান রাব্বুল আলামীনের নির্দেশিত পন্থায় একটি সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের মধ্য দিয়ে তাদের আশা ও আকাঙ্খাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে। তখন যেকোন পুঁজিবাদীব্যবস্থা সত্যিকারের ইসলামী শাসনব্যবস্থার সাথে নমনীয় হয়ে থাকবে।
৩রা জুলাইয়ের উত্থান ইসলামী বিপ্লব এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে ছড়ানো কিছু অপবাদের হাকিকত স্পষ্ট করে দিয়েছে। যারা এমনটি করেছে, তারা মূলত: সিসি’র ছত্রছায়ায় আশ্রিত ছিলো। তারা ইসলামের বিরোধিতা করার জন্য ওদের সাথে জোটবদ্ধ ছিল। ওরা আমাদের প্রকৃত শত্রু। তাই তাদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে। তারা হলো: تيار سلفية তথা সালাফি ধারা। তাদের অন্যতম হলো ইয়াসির বুরহামি নামের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। আরো আছে وتيار المداخلة তথা অনুপ্রবেশ ধারা। আল্লাহ তা‘আলা তাদের সকলকে ধ্বংস করুন। তারা দুনিয়াতে সিসি’র কাছ থেকে ভালো কোন কিছু পায়নি। ইনশাআল্লাহ, আখেরাতেও আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে উপযুক্ত পাওনা বুঝিয়ে দিবেন।
৩রা জুলাইয়ের উত্থান কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল রেখে গেছে। সাধারণ জনগণ সেনাবাহিনীর প্রকৃত রূপ সম্পর্কে জানতে পেরেছে। যারা দীর্ঘ ৬০ বছর যাবৎ তাদেরকে শোষণ, তাদের সম্পদ লুন্ঠন এবং তাদেরকে বশীভূত করে রেখেছে। এসবের মধ্য দিয়ে জনগণ অনুধাবন করেছে যে, কার বিরুদ্ধে তাদের পরবর্তী বিদ্রোহ হবে? তারা ২৫ জানুয়ারীর নিজেদের ভুলগুলো বুঝতে পারে এবং সতর্ক হয়। ইনশাআল্লাহ, এর পুনরাবৃত্তি দ্বিতীয়বার হবে না। জনগণ উত্থানকারীদের পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হয়েছে যে, তারা কিভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে প্রভাব বিস্তার করে। এগুলো এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পাঠ, যেগুলো অভিজ্ঞতা অর্জন করার আগ পর্যন্ত কাউকে বলে বুঝানো সম্ভব না। বিশেষ করে তারা এই বিষয়টি বুঝতে পেরেছে যে, এসব সেনাবাহিনী তাদের রক্ত নিয়ে কতটা সময় ধরে খেয়ানত করে আসছে।
প্রেসিডেন্ট মুরসিকে অপহরণের পর ইসলামী বিপ্লবীদের ও জনসাধারণের মাঝে একটি শক্তিশালী জোট তৈরী হয়েছিল। যেমনিভাবে এই আগ্রাসনের মোকাবিলা করার জন্য ইসলামী বিপ্লবকামী দলগুলোর পরস্পরের মাঝে এক ধরণের সম্প্রীতি তৈরী হয়েছিল। যা তাদের কেউ কখনো ছেড়ে দেয়নি।
তাদের পারস্পরিক এই প্রতিক্রিয়া ও মিলিত হওয়ার মাধ্যমে যদি সকলের মাঝে সমন্বয়সাধন করা সম্ভব হয়, তাহলে আমি আশাবাদি যে, ইসলামী বিপ্লবকামী দলগুলোর মাঝেও অচিরেই সামঞ্জস্যতা তৈরী হয়ে যাবে। যার ফলে তাদের মাঝে বিদ্যমান সকল মতানৈক্য ও পরিবর্তনের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দূর হয়ে যাবে। তাই জিহাদী বিপ্লবের পরিবেশ জেল ও বন্দিত্বের জীবন থেকেও অধিক ভালো ও গতিময়। আল্লাহ তা‘আলাই তাওফিকদাতা।
আলোচনা শেষ করার পূর্বক্ষণে আমি ইঙ্গিত করবো মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের সাথে বিশ্বশক্তির চলমান লড়াইয়ের প্রতি। তারা ইসলাম এবং মুসলিমদেরকে একটি দেহের মত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত মনে করে।
সুতরাং আমাদের বিরুদ্ধে আমেরিকা, ইসরাইল ও ন্যাটো জোটের চলমান যুদ্ধসমুহের মাধ্যমে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। আর যেসব যুদ্ধ অতি শীঘ্রই সংঘটিত হবে, সেগুলোর কারণে মুসলিম উম্মাহ সত্যিকারার্থেই এক বিনাশী হামলার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে, বিভিন্ন জায়গায় এবং বিভিন্ন সময়ে তারা তাদের আক্রমণ চালিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও চালাবে। তারা অনেক আগে থেকে অদ্যবদি পর্যন্ত আপনরুপে পূর্ণ শক্তির সাথে হামলা করে আসছে। আর মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে এসব আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব স্বয়ং মুসলিম উম্মাহকে এবং উম্মাহর সিংহ সন্তানদেরকে নিতে হবে। কারণ বর্তমানে আমাদের দেশের শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্র কাঠামো এবং বিচারব্যবস্থা এই সব কিছুই আমাদের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের যুদ্ধের অগ্রবর্তী বাহিনী। সবগুলো মুসলিম শাসকের অবস্থা এমনই। পশ্চিমারা আমাদের শাসকদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে এমনভাবে কাজে লাগাচ্ছে যে, পশ্চিমাদের আক্রমণের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা এসব শাসকশ্রেণী ভেঙ্গে দিচ্ছে। এরা মূলত: আমাদের বিরুদ্ধে প্রসারিত পশ্চিমাদের কালো হাত। পশ্চিমাদের উদ্দেশ্য হলো, এদের মাধ্যমেই তারা আমাদের পরাজয় ও আত্মসমর্পণ অবধারিত করে তুলবে।
সম্ভাব্য যে কোন উপায়ে এসব ব্যবস্থাকে অপসারণ করতে হবে এবং প্রথমে আমাদের দ্বীন নিয়ে তাদের অপরাধের পাওনা কড়া গন্ডায় উসুল করতে হবে। কেননা, তা এমন একটি তথ্যসূত্র, যা তারা কেবল মানুষের হৃদয় থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই প্ররোচিত হয়ে করেছিল। দ্বিতীয়ত: তারা দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, নীতি-নৈতিকতা ও অর্থনীতিতে ক্ষতি, স্বদেশ, দ্বীন ও জাতির সাথে গাদ্দারী, ভিনদেশী দুশমনকে সহযোগিতা এবং হত্যা, চুরি ও বিশৃঙ্খলার মত অপরাধ করে মুসলিম উম্মাহর যে রক্ত চোষণ করেছে, তারও পাওনা চুকিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর প্রতিরক্ষা ও আত্মরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এই গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিষয় আজ আমাদের বাহিরের শত্রুর অধীনে চলে গেছে। যার দরুন স্বদেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অনিশ্চিত হয়ে গেছে।
মিশরকে স্বাধীন করার জন্য, শাসনব্যবস্থাকে পরিপূর্ণরূপে পরিবর্তন করার জন্য এবং মিশরের স্থায়ী ও যোগ্য নেতৃত্য গঠন করার জন্য মিশরের করণীয় হলো: তিন ক্ষেত্রবিশিষ্ট একটি বিপ্লবের মাঠ প্রস্তুত করা। প্রথম ক্ষেত্র হচ্ছে: দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং সেগুলোর পরিবর্তন সংক্রান্ত। দ্বিতীয় ক্ষেত্র হচ্ছে: আঞ্চলিক হস্তক্ষেপ। তৃতীয় ক্ষেত্র হচ্ছে: আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ। যখন এই বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়ে যাবে, তখন আবশ্যিকভাবে দু’টি পথ সামনে চলে আসবে। এক: হয়তো বিপ্লবকে পূর্ণাঙ্গতা দান করা। দুই: না হয় বিপ্লবকে এভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। প্রথমটি হবে আঞ্চলিক হস্তক্ষেপের মোকাবেলায়, আর দ্বিতীয়টি আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ বা বিপ্লবের ধরণ, পদ্ধতি, উপকরণ সম্পর্কে আমি কোন কথা বলবো না। কারণ, এর ধরণ যেকোন বিপ্লব বা যুদ্ধের ধরণ, সময় ও শত্রুর আক্রমণের ধরণই বলে দেয়। যুদ্ধ বা বিপ্লব আলাদা একটি শাস্ত্র, শিল্প, জ্ঞান। এগুলো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি অনেক কারণেই হয়ে থাকে। আর এই যুদ্ধ বা বিপ্লব কিভাবে, কোথায়, কখন এবং কার বিরুদ্ধে করা হবে? এ বিষয়ে পরবর্তী প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
আমি আমার এই আলোচনার সারকথা তিন বাক্যে সীমাবদ্ধ রাখছি। যথা-
এক. সশস্ত্র বিপ্লব ছাড়া কোন শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন বা ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
দুই. সশস্ত্র মোকাবেলা ছাড়া কোন শক্তি বা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আত্মসমর্পন করানো আদৌ সম্ভব নয়।
তিন. যেমনিভাবে বিপ্লবের জন্য প্রতিরোধ যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া ছাড়া শাসনব্যবস্থাটি পরাজিত হওয়ার আদৌ সম্ভাবনাও থাকে না।
নোট: হুসনি মোবারক কারাগার থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পূর্বে আমি এই আলোচনা শেষ করলাম। আগামীতে আমাদের আলোচনা হবে জাতীয় জাগরণ সম্পর্কে। এরপর প্রতিরোধ আন্দোলন সম্পর্কে। সবশেষে গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কে, ইনশাআল্লাহ।
১৪ শাউয়াল, ১৪৩৪ হিজরী
২২ আগস্ট, ২০১৩ ইংরেজী
২২ আগস্ট, ২০১৩ ইংরেজী