ষাট সেকেন্ডে এক মিনিট, ষাট মিনিটে এক ঘন্টা, চব্বিশ ঘন্টায় এক দিন, ত্রিশ দিনে এক মাস, বারো মাসে এক বছর, দশ বছরে এক দশক, দশ দশকে এক শতক বা এক শতাব্দী। দেখতে দেখতে এই শতাব্দীর চার ভাগের একভাগ শেষ হয়ে গেল, সুবহানাল্লাহ, সময় কত দ্রুত যাচ্ছে। এই শতাব্দী উম্মাহর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গুলোর একটি হবে, আজ থেকে পাঁচশ বছর পর, তালিবুল ইলমরা আমাদের এই সময়ের কথা বইয়ের পাতায় পড়বে, ইনশাআল্লাহ। প্রায় প্রতিটা মুসলিম ভূখন্ডেই গত পঁচিশ বছরে বেশ গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনা ঘটেছে, আমাদের এই ভূখন্ডও এর ব্যাতিক্রম না। বর্তমান বাংলাদেশের অবস্থা বেশ দোদুল্যমান, সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশ কোন পথে হাটবে তা অনুমান করা বেশ কঠিন, আরও পঁচিশ বছর পর বাংলাদেশকে দেখতে কেমন হবে?
গত ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫—বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ওনার মৃত্যুর পর অনেক মহলে, অনেক ধরনের আলোচনা হয়েছে, আমি সব মহলের আলোচনায় শুনেছি, তবে নির্দিষ্ট একটা বিষয়ে আলোচনার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করেছি। সেই বিষয়ে আলোচনা করলে ইসলামপন্থী (বৃহৎ অর্থে, গণতান্ত্রিকসহ) বলয়ের সমালোচনা করার সুযোগ এসে যায়, আমরা আত্মসমালোচনা করতে রাজি না, এজন্যই কী ঐ নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনো আলোচনা নেই?
সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে একটু ইতিহাস পর্যালোচনা করি আসুন। প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা থাকলে, সেই আলোচনার যৌক্তিকতা বুঝতে সুবিধা হবে ইনশাআল্লাহ। সাতচল্লিশ এর দেশভাগ, একাত্তর এর যুদ্ধ, মুজিবের বাকশাল অতঃপর ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, একটি সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন এবং তার একদলীয় বাকশাল সরকারের পতন ঘটে।
সেসময় বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হন আওয়ামী লীগেরই নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং জিয়াউর রহমান ২৫ আগস্ট ১৯৭৫ সেনাবাহিনী প্রধান হন। একই বছর ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে গিয়ে দেশে এক অরাজক অবস্থার সৃষ্টি করেন। বলা হয়ে থাকে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ভারতপন্থী ছিলেন। তারই ইন্ধনে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে সেনানিবাসের বাসভবনে বন্দি করা হয়। কয়েক দিন বলা যায়, দেশ চলে সরকারবিহীন অবস্থায়।
গৃহবন্দী হিসেবে অন্তরীণ থাকাকালীন জিয়াউর রহমান তাঁর বন্ধু কর্নেল আবু তাহেরকে মুক্তির ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানান। কর্নেল তাহের ইতোমধ্যেই খালেদ মোশাররফের ভারতপন্থী সরকারকে উৎখাতের জন্য সেনা বাহিনীর জওয়ানদের মধ্যে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং সেনা বাহিনীর জওয়ানরাও খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের জন্য ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করে।
৬ নভেম্বর, ১৯৭৫—মাঝরাত নাগাদ অভ্যুত্থানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে আকাশে হালকা আগ্নেয়াস্ত্রের গুলী বর্ষণের মধ্য দিয়ে অভ্যুত্থানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমেই সৈন্যদের একটি গ্রুপ জিয়াকে বন্দীদশা হতে মুক্তি দানের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তারা জিয়াকে মুক্ত করে বিপুলভাবে মাল্যভূষিত করে ও তাঁর পক্ষে শ্লোগান দিতে শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকেই জিয়া ছিলেন সৈনিকদের মধ্যে দারুণভাবে জনপ্রিয়।
সাতই নভেম্বরের প্রত্যূষ নাগাদ জওয়ানরা কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই জিয়াকে চীফ অব স্টাফ এবং দেশের নতুন নেতা হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই সেনাদলের সঙ্গে যোগ দেয় এবং খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শুরু করে। স্লোগানে খালেদ মোশাররফকে ভারতীয় চর এবং জিয়া ও মুশতাককে দেশপ্রেমিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই ঘটনাকেই ৭ নভেম্বরের সিপাহি জনতার বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করা হয়।
তার ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে। এরপর ৩ জুন ১৯৭৮ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন। এই তিন বছরে (১৯৭৫-১৯৭৮) জিয়াউর রহমান চাইলে শরীয়াহ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে পারতেন, সেই সক্ষমতা, সমর্থন এবং প্রস্তাব—সবকিছুই ওনার নাগালে ছিল কিন্তু তিনি গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজের সবটুকু উজার করে দিলেন।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমদ তার লেখা "গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পক্ষে চ্যালেঞ্জ" বইতে বলেছেন, গোটা সিপাহী অভ্যুত্থানের দার্শনিক ভিত্তি ভারতবিরোধী এবং ইসলামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলো।
সে যায় হোক।
১৯৮১ সালের ৩০ মে, চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে সেনাবাহিনীর এক অংশের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হয়। অতঃপর, জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলীয় নির্বাচনে হন পার্টির প্রথম নির্বাচিত চেয়ারপারসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনিও নিজের সবটুকু উজার করে দেন।
লেখার প্রথমে বলেছিলাম একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না, সেটা কী?
নেত্র নিউজ "বেগম খালেদা জিয়া: বৈপরীত্যে যাপিত এক জীবন" শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে তারা লিখেছে—
"ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী হিসেবে কোনো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এমন একটি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যেটি নিজেকে চিনিয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের বিপরীতে মধ্য-ডানপন্থী প্রতিষেধক হিসেবে। ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় যখন এসেছিলেন, তার অবয়ব ছিল দ্ব্যর্থহীনভাবে আধুনিক। উজ্জ্বল জর্জেট শাড়ির প্রতি তার ঝোঁক ছিল স্পষ্ট। যত্ন করে ফোলানো বুফোঁ স্টাইলে চুল সাজাতেন। মেজাজ-মর্জি সায় দিলে গাঢ় লিপস্টিকও পরতেন। আর ছিল পাতলা ও তীক্ষ্ণ খাঁজকাটা ভ্রু। রক্ষণশীলরা তাকে দেখে কিছুটা ভিরমি নিশ্চয়ই খেতো। অথচ, তার দল বিএনপি ঠিকই আবার রক্ষণশীল ভোটের উপর নির্ভর করতে পারতো। তার সময়েই জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য কট্টর ইসলাম-আশ্রয়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট গড়ে তোলে বিএনপি। অর্থাৎ, যেই আলেমরা নারী নেতৃত্বকে অনৈসলামিক বলে মনে করতেন, তাদেরকেও তিনি নিজের নেতৃত্ব মানিয়ে নিতে পেরেছিলেন।"
এই যে "তাদেরকেও তিনি নিজের নেতৃত্ব মানিয়ে নিতে পেরেছিলেন"—এটা নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না, কিন্তু এটা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন, কীভাবে এটা সম্ভব হলো?
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশসমূহের ইতিহাসে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী শাসকদের মধ্যে প্রথম হলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো (১৯৮৮–১৯৯০ এবং ১৯৯৩–১৯৯৬)। তিনি ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী শাসক হন। দ্বিতীয় হলেন খালেদা জিয়া (১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬)। আচ্ছা এই ঘটনা গুলো কী ইতিহাসের পাতায় উম্মাহর গৌরবের অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ হবে নাকি কলঙ্কের?
কীভাবে একজন বেপর্দা গণতান্ত্রিক নারীর নেতৃত্ব মেনে নেওয়া ইসলামি গণতান্ত্রিক দলসমূহের পক্ষে সম্ভব হলো? এর উত্তর আমরা পাবো, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর খুবই প্রসিদ্ধ একটা বাণীতে—আমরা এমন এক জাতি, যাকে আল্লাহ ইসলাম দ্বারা সম্মানিত করেছেন। সুতরাং আমরা যদি ইসলামের বাইরে অন্য কিছুর মাধ্যমে সম্মান খুঁজতে চাই, আল্লাহ আমাদের অপমানিত করবেন।
হ্যা, এক বেপর্দা নারীর নেতৃত্বের অধীনস্থ করার দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আমাদের অপমান করেছেন, কেননা আমরা ইসলাম বাদ দিয়ে কুফরি গণতন্ত্রের মাধ্যমে সম্মান পুনরুদ্ধার করতে গিয়েছি। আমরা যদি এখনও শিক্ষা না নিই তাহলে, এই অপমানিত হওয়ার সিলসিলা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতেই থাকবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কী সেটা চায়?
লেখার শুরুতে একটা প্রশ্ন রেখেছিলাম, আরও পঁচিশ বছর পর বাংলাদেশকে দেখতে কেমন হবে?—ইনশাআল্লাহ, যদি আমরা ভুল থেকে শিক্ষা নিই, সচেতন হয়, সতর্ক হয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ, আগামী পঁচিশ বছর পর এই ভূখন্ডে আমরা সম্মানিত হব। আমাদের সচেতন ও সতর্ক হওয়ার মাত্রা যত বাড়বে, সম্মানিত হওয়ার সময় তত দ্রুত আমাদের নিকটে আসবে ইনশাআল্লাহ।
একটু চিন্তা করে দেখুন ভাইয়েরা, গণতন্ত্রের মন্দের ভালো হওয়ার যোগ্যতাটাও নেই, তাহলে সেই গণতন্ত্রকে আমরা কীভাবে গ্রহণ করতে পারি? গণতন্ত্রের সেটের ভিতরের বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই তো বোঝা যায়, সংসদের থেকে সংসদের বাইরে বেশি ক্ষমতা থাকে। যদি ফ্যাসিবাদকে গণতন্ত্র ধর্মের তাগুত ধরা হয়, তাহলেও দেখবেন, গণতন্ত্র ব্যাবহার করে সেই গণতন্ত্র ধর্মের তাগুত ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো যায়নি, সংসদের অংশ থেকে ফ্যাসিবাদকে নির্মুল করা যায়নি, না এরশাদের ক্ষেত্রে, না হাসিনার ক্ষেত্রে, বরং সংসদ, নির্বাচন ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমেই তাদের পতন ঘটেছে। তাহলে আমরা কীভাবে আশা করতে পারি, প্রকৃত তাগুতকে আমরা সংসদে যেয়ে হারিয়ে দিব?
সুবহানাল্লাহ!
২০২৬ সাল শুরু হয়ে গেল, আগামী দশ বছর পর, অর্থাৎ ২০৩৫ সালে দাড়িয়ে যখন হিসেব করার জন্য আমরা পিছনের দিকে তাকাবো, তখন যেন, আমাদের আফসোস করতে না হয়, সেজন্য দেরি না করে আমাদের পুরোদমে কাজে লেগে পড়তে হবে। তৌহিদী জনতাকে আরও ডানে টেনে নিয়ে যেতে হবে, তাওহীদের বিরোধীদের আরও বামে ঠেলে দিতে হবে, হক ও বাতিলের তাবুকে আলাদা করে ফেলতে হবে, সমাজের মধ্যে হক-বাতিলের দন্দকে স্পষ্ট করতে হবে, কুফর বিত তাগুতের আওয়াজকে আওয়ামদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
২০৩৫ সালে যারা যুবক হবে, অর্থাৎ যাদের বয়স ১৫-৩০ বছর এর মধ্যে হবে, হিসেব মতে তাদের জন্মসাল ২০০৫-২০২০ এর মধ্যে, অর্থৎ বর্তমানে যাদের বয়স ২০ থেকে ৫ বছর—আমাদের দাওয়াতের মৌলিক টার্গেট বানাতে হবে তাদেরকে, কেননা আমাদের সামর্থ্য সীমিত, আর সেই সীমিত সামর্থ্যকে এমনভাবে ব্যাবহার করতে হবে, যেন আমরা সর্বোচ্চ লাভ পেতে পারি।
সেজন্য প্রয়োজন নিখুত পরিকল্পনা, যেই পরিকল্পনা করতে হবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে সামনে রেখে এবং অযুহাত ত্যাগ করা শিখতে হবে, ময়দান প্রস্তুত হওয়ার পর কাজ শুরু করতে হয়না বরং কাজ করতে করতেই ময়দান প্রস্তুত হয়ে যায়, তাই ধৈর্যের সাথে কাজ করে যেতে হবে, বাকি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লার ইচ্ছাধীন।
গত ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫—বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ওনার মৃত্যুর পর অনেক মহলে, অনেক ধরনের আলোচনা হয়েছে, আমি সব মহলের আলোচনায় শুনেছি, তবে নির্দিষ্ট একটা বিষয়ে আলোচনার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করেছি। সেই বিষয়ে আলোচনা করলে ইসলামপন্থী (বৃহৎ অর্থে, গণতান্ত্রিকসহ) বলয়ের সমালোচনা করার সুযোগ এসে যায়, আমরা আত্মসমালোচনা করতে রাজি না, এজন্যই কী ঐ নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনো আলোচনা নেই?
সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে একটু ইতিহাস পর্যালোচনা করি আসুন। প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা থাকলে, সেই আলোচনার যৌক্তিকতা বুঝতে সুবিধা হবে ইনশাআল্লাহ। সাতচল্লিশ এর দেশভাগ, একাত্তর এর যুদ্ধ, মুজিবের বাকশাল অতঃপর ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, একটি সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন এবং তার একদলীয় বাকশাল সরকারের পতন ঘটে।
সেসময় বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হন আওয়ামী লীগেরই নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং জিয়াউর রহমান ২৫ আগস্ট ১৯৭৫ সেনাবাহিনী প্রধান হন। একই বছর ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে গিয়ে দেশে এক অরাজক অবস্থার সৃষ্টি করেন। বলা হয়ে থাকে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ভারতপন্থী ছিলেন। তারই ইন্ধনে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে সেনানিবাসের বাসভবনে বন্দি করা হয়। কয়েক দিন বলা যায়, দেশ চলে সরকারবিহীন অবস্থায়।
গৃহবন্দী হিসেবে অন্তরীণ থাকাকালীন জিয়াউর রহমান তাঁর বন্ধু কর্নেল আবু তাহেরকে মুক্তির ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানান। কর্নেল তাহের ইতোমধ্যেই খালেদ মোশাররফের ভারতপন্থী সরকারকে উৎখাতের জন্য সেনা বাহিনীর জওয়ানদের মধ্যে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং সেনা বাহিনীর জওয়ানরাও খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের জন্য ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করে।
৬ নভেম্বর, ১৯৭৫—মাঝরাত নাগাদ অভ্যুত্থানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে আকাশে হালকা আগ্নেয়াস্ত্রের গুলী বর্ষণের মধ্য দিয়ে অভ্যুত্থানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমেই সৈন্যদের একটি গ্রুপ জিয়াকে বন্দীদশা হতে মুক্তি দানের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তারা জিয়াকে মুক্ত করে বিপুলভাবে মাল্যভূষিত করে ও তাঁর পক্ষে শ্লোগান দিতে শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকেই জিয়া ছিলেন সৈনিকদের মধ্যে দারুণভাবে জনপ্রিয়।
সাতই নভেম্বরের প্রত্যূষ নাগাদ জওয়ানরা কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই জিয়াকে চীফ অব স্টাফ এবং দেশের নতুন নেতা হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই সেনাদলের সঙ্গে যোগ দেয় এবং খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শুরু করে। স্লোগানে খালেদ মোশাররফকে ভারতীয় চর এবং জিয়া ও মুশতাককে দেশপ্রেমিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই ঘটনাকেই ৭ নভেম্বরের সিপাহি জনতার বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করা হয়।
তার ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে। এরপর ৩ জুন ১৯৭৮ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন। এই তিন বছরে (১৯৭৫-১৯৭৮) জিয়াউর রহমান চাইলে শরীয়াহ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে পারতেন, সেই সক্ষমতা, সমর্থন এবং প্রস্তাব—সবকিছুই ওনার নাগালে ছিল কিন্তু তিনি গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজের সবটুকু উজার করে দিলেন।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমদ তার লেখা "গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পক্ষে চ্যালেঞ্জ" বইতে বলেছেন, গোটা সিপাহী অভ্যুত্থানের দার্শনিক ভিত্তি ভারতবিরোধী এবং ইসলামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলো।
সে যায় হোক।
১৯৮১ সালের ৩০ মে, চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে সেনাবাহিনীর এক অংশের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হয়। অতঃপর, জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলীয় নির্বাচনে হন পার্টির প্রথম নির্বাচিত চেয়ারপারসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনিও নিজের সবটুকু উজার করে দেন।
লেখার প্রথমে বলেছিলাম একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না, সেটা কী?
নেত্র নিউজ "বেগম খালেদা জিয়া: বৈপরীত্যে যাপিত এক জীবন" শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে তারা লিখেছে—
"ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী হিসেবে কোনো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এমন একটি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যেটি নিজেকে চিনিয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের বিপরীতে মধ্য-ডানপন্থী প্রতিষেধক হিসেবে। ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় যখন এসেছিলেন, তার অবয়ব ছিল দ্ব্যর্থহীনভাবে আধুনিক। উজ্জ্বল জর্জেট শাড়ির প্রতি তার ঝোঁক ছিল স্পষ্ট। যত্ন করে ফোলানো বুফোঁ স্টাইলে চুল সাজাতেন। মেজাজ-মর্জি সায় দিলে গাঢ় লিপস্টিকও পরতেন। আর ছিল পাতলা ও তীক্ষ্ণ খাঁজকাটা ভ্রু। রক্ষণশীলরা তাকে দেখে কিছুটা ভিরমি নিশ্চয়ই খেতো। অথচ, তার দল বিএনপি ঠিকই আবার রক্ষণশীল ভোটের উপর নির্ভর করতে পারতো। তার সময়েই জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য কট্টর ইসলাম-আশ্রয়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট গড়ে তোলে বিএনপি। অর্থাৎ, যেই আলেমরা নারী নেতৃত্বকে অনৈসলামিক বলে মনে করতেন, তাদেরকেও তিনি নিজের নেতৃত্ব মানিয়ে নিতে পেরেছিলেন।"
এই যে "তাদেরকেও তিনি নিজের নেতৃত্ব মানিয়ে নিতে পেরেছিলেন"—এটা নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না, কিন্তু এটা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন, কীভাবে এটা সম্ভব হলো?
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশসমূহের ইতিহাসে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী শাসকদের মধ্যে প্রথম হলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো (১৯৮৮–১৯৯০ এবং ১৯৯৩–১৯৯৬)। তিনি ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী শাসক হন। দ্বিতীয় হলেন খালেদা জিয়া (১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬)। আচ্ছা এই ঘটনা গুলো কী ইতিহাসের পাতায় উম্মাহর গৌরবের অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ হবে নাকি কলঙ্কের?
কীভাবে একজন বেপর্দা গণতান্ত্রিক নারীর নেতৃত্ব মেনে নেওয়া ইসলামি গণতান্ত্রিক দলসমূহের পক্ষে সম্ভব হলো? এর উত্তর আমরা পাবো, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর খুবই প্রসিদ্ধ একটা বাণীতে—আমরা এমন এক জাতি, যাকে আল্লাহ ইসলাম দ্বারা সম্মানিত করেছেন। সুতরাং আমরা যদি ইসলামের বাইরে অন্য কিছুর মাধ্যমে সম্মান খুঁজতে চাই, আল্লাহ আমাদের অপমানিত করবেন।
হ্যা, এক বেপর্দা নারীর নেতৃত্বের অধীনস্থ করার দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আমাদের অপমান করেছেন, কেননা আমরা ইসলাম বাদ দিয়ে কুফরি গণতন্ত্রের মাধ্যমে সম্মান পুনরুদ্ধার করতে গিয়েছি। আমরা যদি এখনও শিক্ষা না নিই তাহলে, এই অপমানিত হওয়ার সিলসিলা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতেই থাকবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কী সেটা চায়?
লেখার শুরুতে একটা প্রশ্ন রেখেছিলাম, আরও পঁচিশ বছর পর বাংলাদেশকে দেখতে কেমন হবে?—ইনশাআল্লাহ, যদি আমরা ভুল থেকে শিক্ষা নিই, সচেতন হয়, সতর্ক হয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ, আগামী পঁচিশ বছর পর এই ভূখন্ডে আমরা সম্মানিত হব। আমাদের সচেতন ও সতর্ক হওয়ার মাত্রা যত বাড়বে, সম্মানিত হওয়ার সময় তত দ্রুত আমাদের নিকটে আসবে ইনশাআল্লাহ।
একটু চিন্তা করে দেখুন ভাইয়েরা, গণতন্ত্রের মন্দের ভালো হওয়ার যোগ্যতাটাও নেই, তাহলে সেই গণতন্ত্রকে আমরা কীভাবে গ্রহণ করতে পারি? গণতন্ত্রের সেটের ভিতরের বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই তো বোঝা যায়, সংসদের থেকে সংসদের বাইরে বেশি ক্ষমতা থাকে। যদি ফ্যাসিবাদকে গণতন্ত্র ধর্মের তাগুত ধরা হয়, তাহলেও দেখবেন, গণতন্ত্র ব্যাবহার করে সেই গণতন্ত্র ধর্মের তাগুত ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো যায়নি, সংসদের অংশ থেকে ফ্যাসিবাদকে নির্মুল করা যায়নি, না এরশাদের ক্ষেত্রে, না হাসিনার ক্ষেত্রে, বরং সংসদ, নির্বাচন ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমেই তাদের পতন ঘটেছে। তাহলে আমরা কীভাবে আশা করতে পারি, প্রকৃত তাগুতকে আমরা সংসদে যেয়ে হারিয়ে দিব?
সুবহানাল্লাহ!
২০২৬ সাল শুরু হয়ে গেল, আগামী দশ বছর পর, অর্থাৎ ২০৩৫ সালে দাড়িয়ে যখন হিসেব করার জন্য আমরা পিছনের দিকে তাকাবো, তখন যেন, আমাদের আফসোস করতে না হয়, সেজন্য দেরি না করে আমাদের পুরোদমে কাজে লেগে পড়তে হবে। তৌহিদী জনতাকে আরও ডানে টেনে নিয়ে যেতে হবে, তাওহীদের বিরোধীদের আরও বামে ঠেলে দিতে হবে, হক ও বাতিলের তাবুকে আলাদা করে ফেলতে হবে, সমাজের মধ্যে হক-বাতিলের দন্দকে স্পষ্ট করতে হবে, কুফর বিত তাগুতের আওয়াজকে আওয়ামদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
২০৩৫ সালে যারা যুবক হবে, অর্থাৎ যাদের বয়স ১৫-৩০ বছর এর মধ্যে হবে, হিসেব মতে তাদের জন্মসাল ২০০৫-২০২০ এর মধ্যে, অর্থৎ বর্তমানে যাদের বয়স ২০ থেকে ৫ বছর—আমাদের দাওয়াতের মৌলিক টার্গেট বানাতে হবে তাদেরকে, কেননা আমাদের সামর্থ্য সীমিত, আর সেই সীমিত সামর্থ্যকে এমনভাবে ব্যাবহার করতে হবে, যেন আমরা সর্বোচ্চ লাভ পেতে পারি।
সেজন্য প্রয়োজন নিখুত পরিকল্পনা, যেই পরিকল্পনা করতে হবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে সামনে রেখে এবং অযুহাত ত্যাগ করা শিখতে হবে, ময়দান প্রস্তুত হওয়ার পর কাজ শুরু করতে হয়না বরং কাজ করতে করতেই ময়দান প্রস্তুত হয়ে যায়, তাই ধৈর্যের সাথে কাজ করে যেতে হবে, বাকি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লার ইচ্ছাধীন।
Comment