ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত খসড়া প্রস্তাবের আলোকে মুহাসাবা,
একটি কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ এবং সীরাতের আলোকে প্রতিহতকরণ নীতির বাস্তবতা
Israel’s Knesset তথা ইজরায়েলের জাতীয় সংসদে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। যদিও এই খসড়া প্রস্তাব বিশেষভাবে হামাস নির্মুলের উদ্দেশ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তবে বাস্তবতা হলো ইজরায়েলের টার্গেট মূলত সমস্ত ফিলিস্তিন। চলতি বছর ২ জানুয়ারী প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায় জাতিসংঘ এই প্রস্তাব মানবাধিকারের লঙ্ঘন আখ্যায়িত করে ইজরায়েলকে তা প্রত্যাহার করার আহ্বান জানায়। কিন্তু, ইজরায়েলি আইনসভায় প্রস্তাবটি প্রথম পাঠে অনুমোদিত হয়ে এখনো প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় আছে।
এই একটি সংবাদে পুরো উম্মাহ’র বর্তমান অবস্থা আমাদের সামনে উঠে এসেছে। একই সাথে উম্মাহ’র নিকট ভবিষ্যৎ কী এবং আমাদের করণীয় কী?—এ সম্পর্কে ইঙ্গিত রয়েছে চলমান ঘটনাবলীতে, যেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ফিলিস্তিন পরিস্থিতি।
ভেবে দেখুন! আমাদের প্রথম ক্বিবলা বায়তুল আক্বসার অধীবাসীদের জাতিগত নিধনের ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত করার পথে অভিশপ্ত ইয়াহূদী জাতি। সেই ষড়যন্ত্রে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসী নেতানিয়াহু ও তার বাহিনী। সন্ত্রাসী এই জাতি বহু আগে থেকেই যেটা করে আসছে তা হলো নিখাঁদ Occupation Violence. দখলদার ইজরায়েল তাদের এই সহিংসতাকে পূর্ণতা দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চেষ্টা করছে সন্ত্রাসবাদের ন্যারেটিভকে সামনে রেখে ফিলিস্তিনিদের উপর চাপিয়ে দেয়া গণহত্যায় যতবেশি সম্ভব বিভিন্ন রাষ্ট্রকে নিজেদের পাশে টানতে, দল ভারী করতে।
Occupation Violence বলতে বোঝায়—যখন কোনো দখলদার রাষ্ট্র (occupying power) তার সামরিক, আইনগত ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে দখলকৃত ভূখণ্ডের জনগণের ওপর ধারাবাহিক ও কাঠামোগত সহিংসতা চালায়। সহজ করে বললে, দখল নিজেই সহিংস—আর সেই দখল টিকিয়ে রাখতে যে সব অপরাধ করা হয় সেগুলোর সমষ্টিই Occupation Violence, যা একটি বহুস্তরীয় সহিংসতার নাম।
৭ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই দখলদারিত্বে এমন কোনো অপরাধ বাদ নেই যা অভিশপ্ত ইয়াহূদী জাতি করেনি। আর এখন চূড়ান্তভাবে ফিলিস্তিনীদের ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলতে ষড়যন্ত্রের এক নীল নকশা নিয়ে এগুচ্ছে তারা। যদি কোনো ফিলিস্তিনি-ই না থাকে, তাহলে ফিলিস্তিনের পাশে কারো দাঁড়ানোর ঝুঁকি থাকবে না। কিন্তু এমন রাষ্ট্রীয় জঘন্যতায় বিভিন্নমুখী চাপ থেকে নিজেদের দায়মুক্ত রাখতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থন পাকাপোক্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে ইজরায়েল। বিশ্ব সন্ত্রাসী ইরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত যে খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেছে তা মূলত নিজেদের দায়মুক্তির জন্যই। যদি এটি আইন হিসেবে পাশ হয় তাহলে তা আন্তর্জাতিক সমর্থনের ভিত্তিতে হওয়া জরুরি, সমর্থন আদায় হলে দায়মুক্তির রাস্তা তৈরি হয়ে যাবে। চিন্তা করে দেখুন, ৭০ বছরের অধিক সময় ধরে যারা তাদের দখলদারিত্বে হাজারো মানবাধিকার লঙ্ঘনে কোনো আইনের তোয়াক্কা করেনি, তারা আজ এই আইন করার জন্য এতো মরিয়া কেন? এই একটি প্রশ্নের মধ্যে আমাদের জন্য চিন্তার অনেক খোরাক আছে।
উম্মাহকেন্দ্রিক মুহাসাবা
উম্মাহ’র এই পরিস্থিতিতে নিজেদেরকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি কি আমরা?
- প্রথম ক্বিবলার বাসিন্দারা যে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আমরা কি তার শতকরা হিসাবে ১০ ভাগও ফেইস করেছি?
- তারা অকল্পনীয় যে ত্যাগের নজির স্থাপন করে চলেছেন আমরা সে তুলনায় বিশেষ কিছু করতে পেরেছি কি?
উম্মাহ’র বর্তমান পরিস্থিতির সাথে নিজেদের অবস্থার উপর নিয়মিত মুহাসাবা করা জরুরি। আশা করা যায়, উম্মাহকেন্দ্রিক মুহাসাবা আমাদের যাবতীয় প্রশ্ন এবং অভিযোগের উত্তর দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ হবে ইনশাআল্লাহ্।
একটি কৌশলগত অবস্থান
এবার একটু ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা করা যাক। চলুন ধরে নেই, আমরাই ফিলিস্তিনি মুজাহিদদের সামরিক নীতিনির্ধারক। সেক্ষেত্রে, এই পরিস্থিতিতে আমাদের কৌশলগত অবস্থান কী রকম হওয়া সবচেয়ে বেশি উপযোগী হতে পারে?
প্রথমত, এখন কি ইজরায়েলের বিরুদ্ধে নিজেদের দিক থেকে সহিংসতা বাড়ানো ঠিক হবে নাকি ডিফেন্সিভ মুডে চলে যাওয়া উত্তম হবে? বা প্রশ্নটি এভাবে ভাবা যায় যে, এই মুহূর্তে সহিংসতা বাড়লে কার কৌশলগত অবস্থান শক্ত হয়?
- যদি আক্রমণাত্মক হামলা চলতে থাকে তাহলে আলোচনার ফোকাস “মৃত্যুদণ্ড আইন” তথা State Violence থেকে সরে গিয়ে“ইজরায়েলের নিরাপত্তা” ইস্যুতে চলে যাবে।
- UN ও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তখন আবার Self‑defense narrative গ্রহণ করা শুরু করবে। তখন আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রকে নিজেদের পক্ষে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে ইজরায়েলের জন্য। ফলে ন্যারেটিভ কন্ট্রোল পূর্ণমাত্রায় ইজরায়েলের হাতে চলে যাবে।
- প্রেক্ষিতে ইজরায়েলের ওপর যে নৈতিক ও আইনি চাপ তৈরি হচ্ছে, তা ভেঙে যাবে বা দুর্বল হয়ে পড়বে।
- মৃত্যুদণ্ডের খসড়া প্রস্তাবটিকে তখন “অমানবিক আইন” নয়; বরং “প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা” হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে অমানবিক এই আইন সন্ত্রাসী ইজরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে পাশ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত, যদি ডিফেন্সিভ বা লো‑এসকেলেশন মুডে থাকা হয় তাহলে তা কার জন্য বেশি উপকারী হবে?
- “হামলা কম, তাহলে এত কঠোর আইন কেন?”—এই প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ বলবৎ থাকবে এবং কিছু রাষ্ট্র বা মানবাধিকার সংগঠনের জন্য এই আইনের বিরোধিতা করা সহজ হবে। ফলে আন্তর্জাতিক চাপ সংহত হওয়ার সুযোগ অব্যাহত থাকবে।
- মৃত্যুদণ্ড আইনকে বলপ্রয়োগ এবং জাতিগত বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবে দেখানো যাবে, ফলে ইজরায়েলের নৈতিক বৈধতা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে থাকবে।
- আইন প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় সহিংসতা না বাড়লে ইজরায়েলের “জরুরি পরিস্থিতি” যুক্তি দুর্বল হয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে সময় বাড়তে থাকবে। এই বিলম্ব আইনটিকে বিলম্বিত এবং জটিল করে তুলবে।
এখানে কিন্তু এমন বলা হচ্ছে না যে, হামলা পুরোপুরি বন্ধ করে নিষ্ক্রিয় থাকা। বরং হামলা হবে ডিফেন্সিভ মুডে, এখন মোটেও আগ বাড়িয়ে আক্রমণাত্মক মুডে নয়। আর ইজরায়েলের টেরিটরিতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত হামলা করা থেকে বিরত থাকা এখন সময়ের দাবি। এমনকি বহিরাগত কোনো জিহাদী সংগঠনও যদি ইজরায়েলের টেরিটরিতে এখন হামলা পরিচলানা করে তাহলে কৌশলগত দিক থেকে তা হামাসকে ব্যাপকভাবে কোনঠাসা করে ফেলবে।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, হামাস এবং মুক্তিকামী ফিলিস্তিনীরা বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন কৌশল-ই অবলম্বন করবে যা এই যুদ্ধকে বিলম্বিত এবং দীর্ঘায়িত করতে থাকবে ইনশাআল্লাহ। কারণ, এখন তাদের টিকে থাকাই মূখ্য (সামরিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে)। আর ভবিষ্যতে পূর্ণ মাত্রায় আঘাত হানার জন্য টিকে থাকা এবং শক্তি সঞ্চয়ের জন্য চলমান যুদ্ধকে বিলম্বিত করার দ্বিতীয় কোনো বিকল্প আছে কি না তা আমার জানা নেই।
রাসুল ﷺ এর একটি বিশেষ যুদ্ধনীতি
রাসুল ﷺ যুদ্ধাভিজানের ক্ষেত্রে যে সমস্ত নীতি অবলম্বন করেছেন তন্মধ্যে একটি হলো প্রতিহতকরণনীতি। যখন কুওয়্যাহ (শক্তি) অর্জিত হবে তখন এ নীতির প্রয়োগ কীভাবে হবে তা তো সহজেই অনুমেয়, কিন্তু কুওয়্যাহ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে এ নীতির প্রয়োগ কেমন হবে—তা নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনার আবশ্যকতা আছে বলে মনে করি। এক্ষেত্রে কয়েকটি প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে –
- দুর্বল অবস্থায় এই নীতির বাস্তবতা কেমন হওয়া চাই?
মাক্কী জীবনের বড় একটি শিক্ষা হলো—দুর্বলতা মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়; বরং নিয়ন্ত্রিত অবস্থান। দুর্বলতাকে প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখলে কী কী করণীয় তা স্পষ্ট হয়। মানে কুওয়্যাহ অর্জনের জন্য যা যা প্রয়োজন সেগুলোই মূলত দুর্বলতার কারণ। তাই “দুর্বলতা” শব্দটি “প্রয়োজনীয়তা” দিয়ে পরিবর্তন করে দিলে তা ভবিষ্যৎ করণীয় স্পষ্ট করে তোলে।
এ অবস্থায়ও রাসুল ﷺ যে প্রতিহতকরণ নীতি বজায় রেখেছেন, তা নৈতিক ও মানসিক প্রতিহতকরণ হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। যেমন বাতিলের সাথে আপস করেননি আবার উস্কানিও দেননি। শত প্রতিকূলতা এবং নির্যাতনের মধ্যেও আদর্শে অটল থেকেছেন, কিন্তু আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখাননি। পরিস্থিতি বিবেচনায় এই প্রক্রিয়াটি গেরিলা যোদ্ধাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত চলমান থাকে।
- গোপন অবস্থায় কেমন?
দাওয়াতের প্রথম পর্যায় থেকে পাওয়া যায়, গোপনীয়তা ছিল আত্মরক্ষার কৌশল কিন্তু তা আত্মসমর্পণ নয়। এখানে প্রতিহতকরণ ছিল—নেটওয়ার্ক সুরক্ষা (মানুষ, বিশ্বাস, বার্তা), নেতৃত্বের অদৃশ্যতা কিন্তু উপস্থিতি বজায় রাখা এবং বার্তার ধারাবাহিকতা। ফলে শত্রুরা জানতো, “কোথাও না কোথাও এই শক্তি আছে—তবে পুরোটা ধরা যাচ্ছে না”
খেয়াল করে দেখুন, এই ডায়াগ্রাম যে কোনো গেরিলা ওয়ারফেয়ারের ক্ষেত্রে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গেরিলা মুজাহিদদের প্রতিহতকরণনীতি এভাবেই কার্যকর আছে আলহামদুলিল্লাহ।
- প্রতিহতকরণনীতির ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততার বাস্তবতাঃ
দুর্বলদের প্রতি সহানুভূতি তৈরি, যেমন - হাবশায় হিজরত, যেটাকে বলা যেতে পারে আন্তর্জাতিক নৈতিক আশ্রয়
জুলুমকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করা, যেমন - আবু তালিবের অবস্থান, যা ছিল সামাজিক ঢাল।
নির্যাতনকারীদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল করা, যেমন – উমর রদিয়াল্লাহু আনহু’র ইসলাম গ্রহণ, যা উভয় পক্ষে মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য বদলে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিল।
তাই প্রতিহতকরণনীতির ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। যেমন পশ্চিমা কিংবা ভারতবিরোধী কোনো অবস্থানে আমরা ফায়দা হাসিল করতে চাইলে জনসম্পৃক্ততাকে মূল ভূমিকায় থাকতে হবে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততা জনসমর্থনের আদলে আসবে, যেমন শাতিম হত্যার ক্ষেত্রে জনসমর্থনের স্পষ্টতা। আর গেরিলা যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে অর্থ এবং জনসমর্থনের গুরুত্ব তো আমাদের অজানা নয়।
- প্রতিহতকরণনীতি অবলম্বন করার সামর্থ্যের সীমারেখা বা সীমাবদ্ধতা কেমন?
সীরাতের আলোকে রাসুল ﷺ‑এর নীতি এখানে খুবই স্পষ্টঃ
- প্রথমত, সামর্থ্যের সীমা অতিক্রম না করা (যা করার সক্ষমতা নেই তা করা থেকে বিরত থাকা)
- দ্বিতীয়ত, ফলাফলের দায় বহনের সক্ষমতা (যা করা হবে তার দায় বহনের সক্ষমতা থাকা)
- তৃতীয়ত, বৃহত্তর ক্ষতি এড়ানো (এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকা যা বৃহত্তর ক্ষতির কারণ হতে পারে, যদিও তা করার বৈধতা আছে বা থাকে)
আল্লাহ জাল্লা শানহু আমাদের বোঝার তাউফিক দান করুন, আমাদের গুনাহসমূহ মাফ করুন এবং উম্মাহ’র স্বার্থে একনিষ্ঠভাবে জান-মাল-সময় ব্যয় করার তাউফিক দান করুন। আমীন…
Comment