আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতির আলোকে বৈশ্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা: ১ম পাঠ
মুজাহিদ ভাইদের জন্য এটা খুবই জরুরি বিষয় যে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখা এবং বিশ্লেষণধর্মী দক্ষতা থাকা। তবে মজার বিষয় হলো, বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের ধারণা, পর্যালোচনা কিংবা বিশ্লেষণ কতোটা নিখুঁত হবে তা নির্ভর করে মূলত “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতি” নিয়ে আমরা কেমন জানোশোনা রাখবো তার উপর। একারণে আলোচনার শিরোনাম—“আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতির আলোকে বৈশ্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা”—এভাবে নির্ধারণ করা উত্তম মনে করছি। মূল আলোচনার সাথে প্রয়োজনানুসারে প্রাসঙ্গিক কিছু পার্শ্বীয় আলোচনা পর্যায়ক্রমে যুক্ত হতে থাকবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কী?
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তথা International Relation হলো দুই বা ততোধিক দেশ বা রাষ্ট্রের মধ্যে গঠিত সম্পর্ক—হোক তা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা চুক্তি সংক্রান্ত কিংবা সাংস্কৃতিক। আর এর অন্যতম কাজ হলো রাষ্ট্রগুলোর আচরণ ব্যাখ্যা করা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝার জন্য গভীর মনোযোগ দেয়া দরকার রাষ্ট্রগুলোর বিভিন্ন সময়ে বলা কথা এবং করা কাজের উপর। কে বলেছে বা করেছে, কী বলেছে বা করেছে এবং কার উদ্দেশ্যে বলেছে বা করেছে?—এই তিন প্রশ্নের মধ্যেই মূলত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল চিত্র লুকিয়ে থাকে।
Actor Analysis – কে বলছে? যেমন -
- রাষ্ট্রপ্রধান?
- সামরিক বাহিনী?
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়?
- নাকি মিডিয়া/প্রোপাগান্ডা ইউনিট?
Intent vs Signal – কী বলা হচ্ছে?
- এটি কি বাস্তব হুমকি?
- নাকি কূটনৈতিক বার্তা?
- নাকি অভ্যন্তরীণ জনমত সামলানোর কৌশল?
Audience – কথাটি কাকে উদ্দেশ্য করে বলা?
- শত্রু রাষ্ট্র?
- মিত্র দেশ?
- নাকি নিজ দেশের জনগণ উদ্দেশ্য?
চলুন কিছু উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করা যাক -
দূরপ্রাচ্যের একটি দেশ উত্তর কোরিয়া অ্যামেরিকাকে হুমকি দিচ্ছে এই বলে যে, পিয়ংইয়ং থেকে মিসাইল নিক্ষেপ করে সরাসরি ওয়াশিংটন ডিসিতে হামলা চালাতে তারা সক্ষম। প্রশ্ন হলো –
১. এমন কথা বলার পর আজ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া ওয়াশিংটন ডিসিতে মিসাইল নিক্ষেপ করেছে? এর উত্তর হলো—না, করেনি। তাহলে এখান থেকে আমরা যা বুঝবো তা হলো-
🔹সব হুমকি বাস্তবায়নের জন্য নয়; বরং শোনানো বা প্রচার করাই উদ্দেশ্য
🔹অনেক হুমকি থাকে deterrence বা bargaining tool হিসেবে ব্যবহার করার জন্য, এটা এমন কিছুই
Deterrence হল এমন কৌশল যেখানে কোনো রাষ্ট্র বা পক্ষ তাদের শত্রুকে কোনো নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখে, হুমকি বা সম্ভাব্য পরিণতির কারণে। মূল উদ্দেশ্য শত্রুকে আক্রমণ বা ভুল সিদ্ধান্ত থেকে আটকানো। আর Bargaining Tool হল এমন কৌশল যা রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে সুবিধা আদায় করতে ব্যবহার করা হয়।
২. উত্তর কোরিয়া অ্যামেরিকার সাথে এমন আচরণ কেন করছে?
ক) Deterrence Strategy
প্রথমত এটা উত্তর কোরিয়ার Deterrence Strategy. উত্তর কোরিয়া মূলত বলতে চায়—“আমাকে আক্রমণ করলে মূল্য দিতে হবে।”তবে এমন কথা বলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ লক্ষ্য হলো নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। যেটাকে বলা হয় Survival-based Realism। যতটা না ভয় দেখানোর জন্য বলে, তারচেয়ে বেশি বলে নিজেদের ভীতি থেকে। আরেকটি কারণ হলো, আদতে উত্তর কোরিয়াকে কোনো আন্তর্জাতিক ব্লক থেকে কেউ তেমন দাম দেয় না, যেমনটি কিম জং-উন দাম পেতে চায়। NCP-র হাসনাতের সেভেন সিস্টার্স দখল করার হুমকিকে আবার এর মধ্যে ফেলা যাবে না। এটাকে বড়জোর “ফাঁকা বুলি” (Empty Rhetoric) বা “জনতুষ্টিমূলক রাজনীতি” (Populist Posturing) বলা যেতে পারে।
খ) Regime Security
উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য বাহ্যিক শত্রু দেখানো এবং সামরিক সক্ষমতা দেখানো জরুরি। এটা মূলত কিম জং-উন যে রেজিম তৈরি করেছে সেটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য। গণতান্ত্রিক প্রতিটি রেজিম মূলত বিষয়টি এভাবেই মেইনটেইন করে থাকে। কারণ হুমকি ভীতি তৈরি করে, আর ভীতি অভ্যন্তরীণ ঐক্য তৈরি করে।
যেমন জুলাই অভ্যূত্থানের কথা চিন্তা করেন, যারা আওয়ামী রেজিমের পতনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল তারা সবাই একই দল বা আদর্শের ছিল? ছিল না, তাহলে কী তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল? অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম একটি হলো ভীতি। যদি আমরা না দাঁড়াই তাহলে তো এই রেজিম আমাদেরকে শেষ করে দেবে—এমন ভীতি। এতে করে দেখা গেছে, পারস্পারিক বিরোধীতা বা শত্রুতা থাকার পরও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল।
নোট: এরকম ঐক্যবদ্ধতা থেকে ফায়দা নেয়ার ব্যাপারে আমাদের ফিকির থাকা উপকারী হবে ইনশাআল্লাহ, যেমনটি আমরা ম্যানেজমেন্ট অব সেভেজারি থেকে জেনেছি।
গ) Audience Cost
এই বক্তব্য কেবল অ্যামেরিকার জন্য নয়; বরং চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ এমন সব দেশকে বার্তা দেয়া যাদের ব্যাপারে উত্তর কোরিয়া আশঙ্কাবোধ করে। বার্তাটি কী? একেবারে সহজভাবে যদি বলা হয় তাহলে এরকম, “আমার কাছে এমন মিসাইল আছে, যেটা পিয়ংইয়ং থেকে ওয়াশিংটন ডিসিতে নিক্ষেপ করা সম্ভব, আর ওয়াশিংটনে নিক্ষেপ করা গেলে বেইজিং, সিওল কিংবা টোকিওতেও নিক্ষেপ করা সম্ভব। তো ভাই তোরা আমার সাথে আবার লাগতে আসিস না!
এবার চলুন বাংলাদেশের সাথে সম্পৃক্ত একটি ঘটনার দিকে নজর দেয়া যাক –
প্রথম আরব দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ইরাক। অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অ্যামেরিকা প্রত্যক্ষভাবে বিরোধীতা করেছিল। কিন্তু প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশ সেই অ্যামেরিকার হয়ে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল?
প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী হওয়ার পরও কেন অ্যামেরিকার পক্ষে বাংলাদেশ যুদ্ধ করেছিল?
সহজ ভাষায় মূল কারণ এভাবে বলা যায় যে –
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্ববাজারে অবস্থান শক্তিশালী করা এবং যুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে অ্যামেরিকা তথা আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রাপ্তির প্রত্যাশা। যেখানে ইরাকের পক্ষ নিলে এই সুবিধাগুলো আদায়ের কোনো সুযোগ তো ছিলই না, উল্টো আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ার পূর্ণ আশঙ্কা ছিল। সাথে অ্যামেরিকার শত্রুতার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি হতো বোনাস প্রাপ্তি।
আবার খেয়াল করুন, ড. ইউনুস ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বেশ কিছুদিন ভারতের বিরুদ্ধে গরম গরম কথা বললো, যা এখন নেই বললেই চলে। এমনকি চীন সফরে গিয়ে সেভেন সিস্টার্স ইস্যুতেও ভারতের স্বার্থবিরোধী কথা বলেছিল এই পশ্চিমা এজেন্ট। ড. ইউনুসের এই আচরণ বোঝার জন্য এখানে দুইটি বিষয় সামনে রাখা যায় -
প্রথমতঃ আওয়ামী রেজিমের পতন ঘটানো সদ্য গরম হয়ে থাকা জনগণের কাছে রাতারাতি নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা। কারণ জনগণ তো পুরাদমে তখন ভারতের উপর আগ্রাসী, পারলে সীমান্ত জ্বালিয়ে দেয়। আমরা এমনও দেখছি যে, সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ কাস্তে হাতে যুক্ত হয়েছিল। মানে ড. ইউনুস যাস্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে, যখন নেয়া দরকার ছিল। এটা হলো সো কল্ড ডেমোক্রেসির সবচেয়ে কমন ধোঁকা।
দ্বিতীয়তঃ চীন সর্বদা ভারতের এন্টিটি, আর চিকেন নেক নিয়ন্ত্রণে নেয়া চীনেরও বিশেষ একটি মাকসাদ। তাই চীনে গিয়ে এমন কথা বলা চীনের আস্থা অর্জনেরই নামান্তর। যে কেউ সেভেন সিস্টার্স নিয়ে ভারত বিরোধী কথা বলবে, চীন তাকে বুকে টেনে নেবে। কারণ, এই কথাটুকুর মধ্যেও চীনের স্বার্থ আছে।
এবার একটু ভারত-পাকিস্তানের দিকে নজর দেয়া যাক। সাম্প্রতিক সময়ে পরস্পরকে কী পরিমাণ হুমকি-ধামকি দিয়েছে দুই দেশ তা আমাদের সবারই জানা। কিন্তু বাস্তবে এটার প্রতিফলন খুবই কম ছিল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেই বললেই চলে। অনেক সাধারণ মুসলিম মনে করেন, ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা থেকেই হয়তো প্রতিশ্রুত গাজওয়াতুল হিন্দ কিংবা এই উপমহাদেশের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা হবে। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে খেয়াল হলো,
"এই সংঘাতে হিন্দুত্ববাদী ভারত মূল ভূমিকায় থাকবে এটা সত্য তবে তা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয়। আবার পাকিস্তান সেনাবাহিনীরও সরাসরি ভূমিকা থাকবে যা ভারতের বিরুদ্ধে নয়"
এর একটি ইঙ্গিত হলো, ছাত্র ভাইদের উত্থান নিয়ে ভারত যতটা কনসার্ন, পাকিস্তান তার চেয়ে বহুগুণ। যার প্রমাণ আমরা বর্তমান সময়ে বেশ কয়েকবার পেয়েছি। আর ইসলাম ও মুসলিমদের প্রশ্নে নিজ দেশের সাধারণ মুসলিমদের প্রতি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আচরণ কেমন তা তো আমাদের জানা কথা। আবার সার্বিক দিক বিবেচনায়, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ভবিষ্যৎ জিহাদী উত্থানকে দমাতে ভারত পাকিস্তানও আগামীতে কোয়ালিশন করবে—এমন সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়।
কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী মিত্র বলে কিছু নেই; বরং সবাই শত্রু আবার সবাই মিত্র, এই সম্পর্ক আপেক্ষিক এবং পরিস্থিতি ও স্বার্থনির্ভর।
চলবে ইনশাআল্লাহ...
Comment