"মানবাধিকার" বিশ্বে শরীয়াহ ও সুন্নাহ নির্মূলের অন্যতম হাতিয়ার
******
******
মানবাধিকার বা Human Rights একক কোনো শব্দ বা কোন জাতিগোষ্ঠীর অধিকারের ভাষা নয়, বরং বিজাতীয় মদতপুষ্ট সমাজের এলিট শ্রেণী বুদ্ধিজীবীদের "আদর্শের নাম" যা মুসলমানদের উপর বিজাতীয় আদর্শ, সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার এক সুনিপুণ হাতিয়ার। এ 'মানবাধিকার' মুসলমানদের দ্বীন-ধর্ম, ঈমান, আমল, আখলাক ও সামাজিকতা, জাতীয় মর্যাদা, এবং রাষ্ট্রীয় অধিকার' উভয় দিক থেকে ঘুনেধরা পোকার মতো খেয়ে ঝাঁঝড়া করে দিয়েছে। ধ্বংস করছে আমাদের সকল সৎগুণ, সাহস এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের সোপান এবং কেড়ে নিয়েছে সম্মান, সম্ভ্রম, শান্তি, সামাজিক ও জাতীয় মর্যাদা, এবং রাষ্ট্রীয় মৌলিক অধিকার।
মানবাধিকার বা Human Rights এর শেকড় সমগ্র বিশ্বে এমনভাবে প্রোথিত করা হয়েছে যা মানুষের অজান্তেই তার ব্যক্তিক, পারিবারিক, সমাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক ধর্মীয়সহ সকল পর্যায়ে "অধিকার সংরক্ষণের" নামে, মানুষের প্রকৃত অধিকারকে ছিনতাই করে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়েছে। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি যেখানে অসহায়! ধর্ম, সম্মান, সম্ভ্রম, শান্তি, সামাজিক ও জাতীয় মর্যাদা যেখানে উপেক্ষিত। এটি মানুষকে এমন এক "আদর্শের" অন্ধকার কূপে আবদ্ধ করেছে, যার গর্ভে জম্ম নেয় মানুষ নামের পশু ও পন্ডিত-বুদ্ধিজীবী নামের বিকলাঙ্গ জ্ঞান তাপস। যাদের কূটকৌশলে মানুষ নিজের অজান্তেই ডুবে মরছে গভীর অন্ধকার পারাবারের তলদেশে, যেখান থেকে ফিরে আসার কোন দরজা খোলা নেই। তাই আজ সকল চিন্তাশীল ও বিবেকবান মানুষের একনিষ্ঠ কর্তব্য "মানবাধিকার বা Human Rights" স্বরুপ উন্মোচন করে, জাতির সামনে তুলে ধরা। যাতে জাতি অনুধাবন করতে শিখে "মানবাধিকার বা Human Rights","অধিকার সংরক্ষণ" নামের যষ্ঠি, নিজেই "অধিকার হরণের কারিগর!
মানবাধিকার বা Human Rights; এর উৎপত্তি, ইতিহাস বৈশিষ্ট্য এবং; মৌলিক নীতি ও আদর্শ এবং প্রয়োগিক বিষয়গুলো তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারবো এটি কোন "অধিকার সংরক্ষণের" যষ্ঠি নয় বরং "অধিকার হরণের এক মহারাজ পথ।
"ফরাসি বিপ্লবই" মানবাধিকার বা Human Rights, গনতন্ত্র এবং স্যেকুলারিজমের জন্মদাতাঃ
"ফরাসি বিপ্লব" কে মানবাধিকার বা Human Rights এর জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাই ফরাসি বিপ্লবের মৌলিক কারণ, ফলাফল ও প্রভাব বুঝতে পারলেই, বর্তমান মানবাধিকার বা Human Rights যে আমাদের জন্য ধোঁকার বেসাতি তা দিবালোকে ন্যায় স্পষ্ট হবে ইনশাল্লাহ।
১৭৮৯ থেকে ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত ফরাসি বিপ্লব (French Revolution) সংঘটিত হয় যা ছিল জনগণের "রাজতন্ত্র, অভিজাত শ্রেণী এবং চার্চের" জুলুম নির্যাতন শোষণমুক্ত হওয়ার এক অনন্য অবলম্বন। এই ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিলো "স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সংগ্রাম" যা পরবর্তীতে সমগ্র বিশ্বে গণতন্ত্র, স্যেকুলার এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি রচনা করে।
তখনকার ফ্রান্সের জনগণ চেয়েছিল একটি শোষণহীন, সাম্যপূর্ণ এবং যুক্তির ভিত্তিতে গঠিত সমাজ, যার মূলমন্ত্র ছিল স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্বের উপর ভিত্তি করে গঠিত। এই মন্ত্রটি ফ্রান্সের জনগণের মধ্যে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের জন্য একটি অঙ্গীকার হিসেবে পরিচিতি পায়। সুতরাং ফ্রান্সের জনগণের অভিপ্রায় ছিল রাজতন্ত্র, অভিজাত শ্রেণী এবং চার্চের বা গির্জার পাদ্রিদের" জুলুম, নির্যাতন ও শোষণ থেকে মুক্ত একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, কিন্তু ধর্মের বন্ধন বা ধর্মীয় অনুশাসন থেকে মুক্তি নয়।
সমাজের এলিট শ্রেণী বুদ্ধিজীবীদের কুট-চক্রান্তে ফেঁসে যায় ফ্রান্সের জনগণের ধর্মীয় অনুশাসন ও মূল্যবোধ। যাদের সুকৌশল ও অন্ধকার জগতের চক্রান্তে ধর্মের সুতায় রাষ্ট্রের মিলন বন্ধনকে ছিন্ন করে গণতন্ত্র ও স্যেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করা হয়। যেখানে ধর্মকে মৌলিক বিষয় থেকে বিতাড়িত করে ঐচ্ছিক বিষয়ে রূপান্তর করা হয়। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিনত হয় যাবতীয় অন্যায়, পাপাচারের আস্তানায়। যেখানে জম্ম নেয় এক নতুন আদর্শ "মানবাধিকার", যা ইসলামকে চ্যালেঞ্জ করে সর্বদিক থেকে।
পৃথিবী থেকে সকল ধর্ম ও আদর্শকে মুছে ফেলে কিছু মানুষ নামের পশু ও পন্ডিত-বুদ্ধিজীবী এলিটদের মস্তিষ্ক প্রসূত ধ্যান-ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে "স্যেকুলার" নামক মূর্তিকে ধর্ম বা আদর্শের জায়গা স্থানান্তর করা হয়েছে। যাদের একমাত্র প্রচেষ্টা হলো পৃথিবীর সকল মানুষকে ধর্মহীন করা বা ধর্মনিরপেক্ষতার অনুসারী করা। এভাবেই ফরাসি বিপ্লবের চাওয়া রাজতন্ত্র, অভিজাত শ্রেণী এবং চার্চের" জুলুম নির্যাতন শোষণমুক্ত হওয়ার এক অনন্য অবলম্বনকে মর্গে পাঠিয়ে, "রাজতন্ত্র, অভিজাত শ্রেণীর" আদর্শেকেই সুকৌশলে চাপিয়ে দেওয়ার হয়েছে, যার মূল হাতিয়ার হলো মানবাধিকার!!
বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্র, স্যেকুলারিজম এবং মানবাধিকারের উৎপত্তি ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের সময় ঘোষিত মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণাপত্র থেকেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, জাতিসংঘে (UN) ১৯৪৮ সালে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার পর, মানবাধিকার আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃত হতে শুরু করে।
ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্রের বিশ্লেষণ:
ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে বুঝা যায় এ বিপ্লবের মন্ত্রই মানবাধিকার বা Human Rights এবং জাতিসংঘের অনুকরণে নির্মিত করছে বিশ্ব শাসনের এক নতুন "আদর্শ", যা কোরআন ও সুন্নাহর প্রতিটি বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে চলেছে ব্যক্তি-পরিবার, আচার-আচরণে, সমাজ-সামাজিকতা, রাষ্ট্রে ও জাতীয় মর্যাদার সকল অঙ্গনে; যে "আদর্শের" নাম মানবাধিকার বা Human Rights। আজ এই মানবাধিকার আন্তর্জাতিক আইনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং অসংখ্য চুক্তি ও কনভেনশন দ্বারা সুরক্ষিত। যা বিশ্ব শাসন এবং শোষণের পশ্চিমাদের একমাত্র হাতিয়ার এর বাস্তবায়নে মূল কারিগর হলো জাতিসংঘ।
ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব:
“স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব” মন্ত্রটি ফরাসি বিপ্লবে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করে। এটি শুধু একটি স্লোগান ছিল না; এটি ছিল জনগণের জন্য সমতা, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার, যা বর্তমান বিশ্বে "মানবাধিকার বা Human Rights" নামে পরিচিত।
স্বাধীনতা (Liberty):
ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, এবং শোষণ থেকে মুক্তির দাবি। স্বাধীনতা” বলতে ফরাসি বিপ্লবে জনগণের ব্যক্তি স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, এবং সামাজিক নিপীড়ন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বোঝায়। ফরাসি বিপ্লবের সময়ে সাধারণ জনগণ রাজতন্ত্র ও ধনিক শ্রেণীর চাপে জীবনযাপন করত, যেখানে তাদের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হত। তাই স্বাধীনতা ছিল জনগণের অন্যতম প্রধান দাবি।
ব্যক্তিগত স্বাধীনতা: মানুষ তাদের ইচ্ছেমতো চিন্তা করতে এবং সেই চিন্তা প্রকাশ করতে পারবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক স্বাধীনতা: মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের অধীনে কাজ করতে বাধ্য না হওয়ার স্বাধীনতা। বিপ্লবের এই মূলমন্ত্র “স্বাধীনতা” ফরাসি জনগণকে সমাজের অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেয় এবং পরবর্তীতে পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্যও একটি আদর্শ হিসেবে কাজ করে।
সাম্য (Equality):
সাম্য ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান মূলমন্ত্র, যা সমাজে সকলের সমান অধিকারের প্রতীক। বিপ্লবের সময় ফ্রান্সের সমাজে বিভিন্ন শ্রেণী বিভাজন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল। রাজা, অভিজাত শ্রেণী এবং চার্চের বিশেষ প্রভাবের কারণে সাধারণ জনগণ বঞ্চিত ছিল এবং নানা ধরনের শোষণের শিকার হচ্ছিল। বিপ্লবীরা চাইছিলেন এমন একটি সমাজ, যেখানে সবাই সমান এবং কেউ শোষিত হবে না।
সমান অধিকার ও সুযোগ: বিপ্লবীরা বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি নাগরিকের উচিত সমান অধিকার এবং সুযোগ পাওয়া, যাতে সবাই উন্নতি করতে পারে।
আইনের সামনে সমতা: সমাজের প্রত্যেক নাগরিক যেন আইনের সামনে সমান, তা নিশ্চিত করতে একটি ন্যায়বিচারপূর্ণ পরিবেশ তৈরির দাবি জানানো হয়।
সাম্যের এই ধারণা বিপ্লবে বড় ভূমিকা রাখে, কারণ এটি সমাজের প্রত্যেককে একত্রিত করতে সহায়তা করে এবং সবাইকে সমান অধিকারের আওতায় নিয়ে আসে।
ভ্রাতৃত্ব (Fraternity):
ভ্রাতৃত্ব ফরাসি বিপ্লবের এমন একটি মূলমন্ত্র, যা জাতীয় ঐক্য এবং পারস্পরিক সহানুভূতির শক্তিশালী বার্তা দেয়। ফরাসি বিপ্লবের সময় জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহানুভূতির মাধ্যমে সমাজকে শক্তিশালী করা যায়।
জাতীয় ঐক্যের শক্তি: বিপ্লবীরা চাইতেন, ফ্রান্সের প্রতিটি নাগরিক যেন নিজেদের ভাই-বোন মনে করে এবং একসঙ্গে সমাজের জন্য কাজ করে।
জাতীয়তাবাদ ও সম্প্রীতি: ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ এবং সম্প্রীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপিত হয়, যা বিপ্লবের সময় মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং সমাজকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। বিপ্লবের সময়ে ভ্রাতৃত্বের ধারণাটি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং সমাজে শক্তিশালী জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে ফ্রান্সের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
সুতরাং ফরাসি বিপ্লবের মৌলিক কারণ ও ফলাফলগুলো বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে বলা যায় "মানবাধিকার বা Human Rights, স্যেকুলারিজম এবং গনতন্ত্র" যা পশ্চিমাদের বিশ্ব শাসনের একমাত্র অবলম্বন তা ফরাসি বিপ্লবের বীজ থেকে জম্ম লাভ করেছে!
সুতরাং আজ যারা "মানবাধিকার বা Human Rights, স্যেকুলারিজম এবং গনতন্ত্র" এর গান গায় তারাও ফরাসি বিপ্লবের বীজ থেকে জম্ম নেয়া বৃক্ষের বীজ থেকে জম্ম নিয়েছে। সেই ফরাসি বিপ্লবের ডিমে তা দিয়ে "মানবাধিকার বা Human Rights, স্যেকুলারিজম এবং গনতন্ত্র" কে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে এসেছে "জাতিসংঘ", যা বিশ্বে শরীয়াহ ও সুন্নাহ নির্মূলের এবং মুসলিম উম্মাহ জন্য রক্ত পিপাসু এক হিংস্র হায়েনা।
যেই ফরাসি বিপ্লব শুরু হয়েছিল "রাজতন্ত্র, অভিজাত শ্রেণী এবং চার্চের" জুলুম, নির্যাতন, শোষণমুক্ত হওয়ার জন্য, তা আজ "মানবাধিকার বা Human Rights, স্যেকুলারিজম এবং গনতন্ত্র" নামে মুসলিম উম্মাহর দ্বীন-ধর্ম, ঈমান, আমল, আখলাক ও সামাজিকতা, জাতীয় মর্যাদা, এবং রাষ্ট্রীয় অধিকার হরণ, শোষণ এবং ইসলামী মূল্যবোধ ধ্বংসের পশ্চিমাদের অন্যতম হাতিয়ার। এ বিষয়টি বোঝার জন্য বর্তমান জাতিসংঘের "মানবাধিকার বা Human Rights" এর মুলনীতি, ম্যান্ডেট এবং প্রয়োগিক বিষয়গুলো কোরআন ও হাদিসের আলোকে নিরপেক্ষ তুলনামূলক বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবী।