বামাকোর সীমানায় আল-কায়েদা... অমীমাংসিত কিছু প্রশ্নের উত্তর
ক্যালেব ওয়েইস | ২৬ এপ্রিল ২০২৬
ক্যালেব ওয়েইস | ২৬ এপ্রিল ২০২৬
শনিবার থেকে আল-কায়েদার শাখা সংগঠন ‘জামাআত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন’ (JNIM) এবং তাদের মিত্র ‘আজওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্ট’ (FLA)—যা মূলত তুয়ারেগ ও আরব বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট—মালির রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং তাদের রুশ মিত্রদের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি শহর পুরোপুরি বা আংশিকভাবে দখল করে নিয়েছে। ২০১২ সালের পর মালিতে এটিই সবচেয়ে বড় ও সমন্বিত সামরিক অভিযান। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে আল-কায়েদা ও তাদের বিদ্রোহী মিত্ররা উত্তর মালির পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ফলে ফরাসি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সামরিক হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল।
শনিবার ভোরবেলা মালির প্রায় সব প্রান্তে একযোগে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ বেজে ওঠে। দক্ষিণের রাজধানী বামাকোর ঠিক বাইরে থেকে শুরু করে একেবারে উত্তরের তুয়ারেগ অধ্যুষিত শহর কিদাল পর্যন্ত এই হামলার পরিধি বিস্তৃত ছিল। বিদ্রোহীরা প্রথাগত সামরিক অভিযানের পাশাপাশি আত্মঘাতী গাড়িবোমা এবং কামিকাজে ড্রোন (বিস্ফোরকবাহী একমুখী ড্রোন)-এর মতো সমরাস্ত্র ব্যবহার করে তাদের আক্রমণের তীব্রতা বহু গুণে বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে তাদের এই অভিযানের ব্যাপকতা আরও বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়।
উত্তর মালিতে জেএনআইএম এবং এফএলএ যৌথভাবে কিদাল ও গাও শহরকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। খুব দ্রুতই তারা কিদাল শহরের ওপর নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। তবে রোববারও কিদালের কিছু অংশে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। শহরের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত জাতিসংঘের প্রাক্তন অবস্থানগুলোতে এখনও মালির কিছু সেনাসদস্য নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে গাও শহরটি এখনও জেএনআইএম ও এফএলএ-র যৌথ বাহিনীর আংশিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মালির সেনাবাহিনী এবং রুশ ভাড়াটে যোদ্ধারা শহরের ভেতরে থাকা জাতিসংঘের সাবেক শিবিরগুলোতে অবরুদ্ধ হয়ে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে রুশ বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে একটি সমঝোতা আলোচনার অসমর্থিত খবর ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত ওই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
মালির দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে জেএনআইএম এককভাবেই এই অভিযান পরিচালনা করে। মালিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস নিশ্চিত করেছে যে, বামাকো শহরের উপকণ্ঠ ‘কাতি’-কে লক্ষ্য করে জিহাদিরা হামলা চালিয়েছে। এই অঞ্চলে মালির বিভিন্ন মন্ত্রী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাসভবন অবস্থিত। একইসঙ্গে বামাকো বিমানবন্দরেও হামলা চালানো হয়েছে। কাতি অঞ্চলে মালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদিও কামারার বাসভবন লক্ষ্য করে চালানো অন্তত একটি আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন। দেশের সামরিক শাসনে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই ব্যক্তি রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন এবং তা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
মালির রাজধানী ও সর্ববৃহৎ শহর বামাকোর ভেতরের বিভিন্ন স্থান এবং তল্লাশি চৌকিগুলোতেও জিহাদিরা আঘাত হেনেছে। জানা গেছে, জেএনআইএম বামাকোর দক্ষিণে কৌলিকোরো অঞ্চলের সেনু-তে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটিতেও আক্রমণ করেছে। এছাড়া, জেএনআইএম-এর আরোপিত অবরোধের কারণে বামাকো-সিকাসো সড়কটিও বন্ধ হয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
মালির মধ্যাঞ্চলে মোপতি ও সেভারে শহর দুটিও হামলার শিকার হয়েছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত শহর দুটির নিয়ন্ত্রণ জিহাদি এবং সরকারি বাহিনীর মধ্যে বিভক্ত অবস্থায় ছিল।
তুয়ারেগ অধ্যুষিত শহর কিদাল মূলত ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত আলজিয়ার্স চুক্তির পর থেকে তুয়ারেগ গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণেই ছিল। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল বামাকো সরকার এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যকার সংঘাতের অবসান ঘটানো। কিন্তু গত বছরের শুরুর দিকে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর, ২০২৩ সালের নভেম্বরে মালির সেনাবাহিনী এবং তাদের মিত্র রাশিয়ার ‘ওয়াগনার গ্রুপ’ (যা আফ্রিকা কর্পস নামেও পরিচিত)-এর ভাড়াটে যোদ্ধারা জোরপূর্বক কিদাল পুনর্দখল করে নেয়। এরপর মালির উত্তরাঞ্চলের এই এলাকাগুলো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পুনর্দখলে চলে যাওয়ার প্রেক্ষাপটেই মূলত এফএলএ গঠিত হয়।
এর বিপরীতে, গাও শহরটি ২০১৩ সালে ফরাসি ও মালি বাহিনীর পুনর্দখলের পর থেকেই বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। অন্যদিকে, মোপতি এবং সেভারে শহর দুটি তাত্ত্বিকভাবে কখনোই বামাকো সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে না গেলেও, জেএনআইএম সেখানে নিজেদের জোরালো প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। তারা বৃহত্তর মোপতি অঞ্চল এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোতে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ, কর আদায় এবং শরিয়া আইন কার্যকর করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।
জেএনআইএম এবং এফএলএ তাদের এই যৌথ অভিযানের সাফল্য উদযাপন করে এবং একে অপরকে অভিনন্দন জানিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে, যা তাদের এই অংশীদারিত্বকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে। জেএনআইএম তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা কাতি এবং বামাকোর ভেতরে সফলভাবে হামলা চালিয়েছে এবং মোপতি, সেভারে, গাও ও কিদাল শহর আংশিক বা পুরোপুরিভাবে দখল করে নিয়েছে। এদিকে এফএলএ ঘোষণা করেছে যে, তাদের যৌথ বাহিনী কিদালের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং গাওয়ের ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। পাশাপাশি, তারা জেএনআইএম-এর সাথে তাদের মিত্রতার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে।
এই দুই গোষ্ঠীই রাশিয়ার সাথে মালির রাষ্ট্রীয় জোটের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবে জেএনআইএম রাশিয়ান ভাড়াটে যোদ্ধাদের এই সংঘাত থেকে দূরে থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।
অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন
মালিজুড়ে জেএনআইএম এবং এফএলএ-র এই নজিরবিহীন অভিযান দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথম এবং প্রধান প্রশ্ন হলো, মালি কি এমন একটি জোটের কাছে পতন হতে চলেছে, যার অন্যতম অংশীদার হলো পশ্চিম আফ্রিকায় আল-কায়েদার একটি আনুষ্ঠানিক শাখা? উপরন্তু, আল-কায়েদার একটি শাখা এবং জিহাদি নয় এমন কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত একটি জোটের যৌথ শাসনে মালির রূপরেখা কেমন হবে? এফএলএ কি শরিয়া আইনের সাথে একমত পোষণ করবে? অথবা সারা দেশের সাধারণ মানুষ কি তা মেনে নেবে? উত্তর মালিতে অবস্থিত ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর উপস্থিতি এবং রুশ বাহিনীর ভাগ্যে কী ঘটবে?
এই প্রশ্নগুলোর তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এটি একেবারে স্পষ্ট যে, বামাকোর অ্যাসিম গোইতা নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করাই ছিল এই বিশাল অভিযানের মূল লক্ষ্য। এই অভিযান প্রমাণ করে যে, জেএনআইএম এবং কিছুটা হলেও এফএলএ তাদের ইচ্ছেমতো যেকোনো স্থানে, যেকোনো সময় আঘাত হানতে সক্ষম; এমনকি দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থানগুলোতেও।
মালির রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কাছ থেকে নিজেদের ভূখণ্ড পুনর্দখলের সামরিক ও কৌশলগত সুবিধার পাশাপাশি এই অভিযানের এক বিশাল প্রতীকী তাৎপর্যও রয়েছে। এই অভিযানের আকার ও ব্যাপ্তি সুস্পষ্টভাবেই গোইতা সরকারের বৈধতাকে ক্ষুণ্ন করার একটি শক্তিশালী প্রয়াস হিসেবে কাজ করছে।
জেএনআইএম দীর্ঘকাল ধরেই মধ্য ও দক্ষিণ মালির বিভিন্ন অঞ্চলে অবরোধ আরোপ, কর আদায় এবং শরিয়া আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করেছে। এর ফলে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব হয় হ্রাস পেয়েছে, নয়তো সম্পূর্ণভাবে জেএনআইএম-এর হস্তগত হয়েছে। তারা মালির বিশাল অংশে কঠোর জ্বালানি অবরোধও আরোপ করেছিল। এর জের ধরে বামাকোতে একাধিকবার জ্বালানি পৌঁছানোর পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এর পাশাপাশি, বামাকোর ওপর চাপ বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে গত কয়েক বছরে জেএনআইএম দক্ষিণ মালিতে তাদের আক্রমণের মাত্রা ও তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মালিতে সপ্তাহান্তের এই ঝটিকা অভিযানের লক্ষ্য কি বামাকোর শাসনব্যবস্থার সম্পূর্ণ পতন ঘটানো, গোইতার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান উসকে দেওয়া, নাকি জেএনআইএম এবং বামাকোর মধ্যে কোনো সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করা—তা সময়ই বলে দেবে। তবে কারণ যাই হোক না কেন, এটি স্পষ্ট যে মালির রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বর্তমানে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে রাশিয়ার ‘ওয়াগনার গ্রুপ/আফ্রিকা কর্পস’-এর ভাড়াটে যোদ্ধাদের সাথে গোইতার সামরিক জান্তা যে জুয়া খেলেছিল, তা এখন দৃশ্যত মুখ থুবড়ে পড়ছে।
তাছাড়া, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, মালিতে জিহাদিদের চেয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতেই বেশি সাধারণ নাগরিকের প্রাণহানি ঘটে। এমন বাস্তবতায় সাধারণ জনগণ হয়তো ধীরে ধীরে জেএনআইএম এবং তাদের মিত্রদেরকেই প্রশাসন ও নিরাপত্তার জন্য অধিক কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করবে। আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে আল-কায়েদার নেতৃত্বাধীন এই বিদ্রোহী জোটের বিরুদ্ধে মালির রাষ্ট্রীয় বাহিনীর লড়াই একটি অত্যন্ত সংকটময় সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি হতে চলেছে।
লেখক পরিচিতি: ক্যালেব ওয়েইস এফডিডি (FDD)-এর ‘লং ওয়ার জার্নাল’-এর একজন সম্পাদক এবং ‘ব্রিজওয়ে ফাউন্ডেশন’-এর একজন জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক। সেখানে তিনি মূলত মধ্য আফ্রিকায় ইসলামিক স্টেটের সম্প্রসারণ নিয়ে কাজ করেন।
বিশেষ নোট: এটা পশ্চিমা কোর চিন্তাবিদদের আলাপ। তাই এটাকেই ইসলামিক বা বাস্তব অবস্থা ধরে নেয়ার সুযোগ নেই। ইনফরমেশন জানা থাকার জন্যে পড়ে নেয়া ভালো, যাতে জানা যায় তারা কোন সময় কেমন চিন্তা করে। - অনুবাদক