সমন্বিত হামলায় প্রকম্পিত বামাকো
হামিদ আল-কৌসি
অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান
হামিদ আল-কৌসি
অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান

চলতি এপ্রিল মাসের ২৫ তারিখ, শনিবার ভোরে মালিতে বড় ধরনের সমন্বিত হামলা ও অভিযান পরিচালনা করা হয়। গত কয়েক বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে তীব্র আক্রমণ। 'জামাআত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন' (JNIM) এবং 'আজওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্ট' (FLA)-এর পারস্পরিক সমন্বয়ে পরিচালিত এই সুপরিকল্পিত ও জটিল সামরিক অভিযানটি খোদ রাজধানী বামাকোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়; যার রেশ ছড়িয়ে পড়ে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শহরগুলোতেও। এই সামরিক উত্তেজনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ ঘটনা ছিল না। বরং, এই আক্রমণ মালির সামরিক জান্তার ভঙ্গুরতাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে দিয়েছে এবং ২০১২ সালে দেশটির শাসনব্যবস্থায় যে ভয়াবহ পতনের দৃশ্যপট তৈরি হয়েছিল, ঠিক সেই পরিস্থিতিকেই নতুন করে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলায় মালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদিও কামারা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন জেনারেল মোদিবো কোনেসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় সামরিক ব্যক্তিত্ব। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই চরম সংকটের মুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেসিডেন্ট অ্যাসিম গোইতাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। গুঞ্জন রয়েছে, স্পেশাল ফোর্সের কড়া পাহারায় তাকে একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা শাসনকাঠামোর ভেতরে বিরাজমান চরম বিশৃঙ্খলা ও ভীতিকেই স্পষ্ট করে তোলে।
'ল্য মঁদ' (Le Monde) এবং 'ল্য ফিগারো' (Le Figaro)-এর মতো প্রভাবশালী ফরাসি সংবাদপত্রগুলো এই আঘাতকে 'নজিরবিহীন' বলে আখ্যায়িত করেছে। কারণ, এই হামলায় সরাসরি আঘাত হানা হয়েছে শাসকগোষ্ঠীর একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নীতিনির্ধারণী কেন্দ্রগুলোর ওপর। অন্যদিকে ফরাসি সাময়িকী 'জুন আফ্রিক' (Jeune Afrique) এক বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করে জানিয়েছে যে, একটি গাড়িবোমা (VBIED বা ভেহিকেল-বর্ন ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বিস্ফোরণে প্রতিরক্ষামন্ত্রী কামারা প্রাণ হারিয়েছেন। 'জামাআত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন' (JNIM) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। মূলত এই আক্রমণটি গোষ্ঠীটির যুদ্ধকৌশলে এক নতুন ও গুণগত উত্থানেরই সুস্পষ্ট প্রমাণ।
সংবাদমাধ্যমগুলোর এই ধারাবাহিক মূল্যায়নে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে, তা হলো—'জামাআত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন' (JNIM) এবং 'আজওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্ট' (FLA)-এর মধ্যকার প্রকাশ্য সমন্বয়। ফরাসি পত্রিকা 'ল্য নুভেল অবসারভেতর' (L'Nouvel Obs) এই জোটবদ্ধতাকে 'বাধ্যবাধকতার জোট' (Alliance of Necessity) বলে অভিহিত করেছে; কারণ শাসকগোষ্ঠীর প্রতি অভিন্ন ক্ষোভ ও শত্রুতাই তাদের এই ঐক্য গড়ে তুলতে বাধ্য করেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, এই অভিযানে 'কাতি' শহরের সামরিক স্থাপনা এবং শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তাদের বাসভবনগুলোতে অত্যন্ত নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট আঘাত হানা হয়েছে। এই হামলার পরপরই রাজধানী বামাকোর চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সশস্ত্র যোদ্ধাদের ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি শহরের নিয়ন্ত্রণও তারা নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
উত্তরাঞ্চলের পরিস্থিতিও বদলে গেছে। আবারও 'কিদাল' শহরের পতন ঘটেছে। সামরিক কাউন্সিলের জন্য এটি এক নিদারুণ মানসিক আঘাত, যা তাদের মনোবলকে চরমভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। একইসঙ্গে এটি এমন এক কৌশলগত বাঁক, যা সামরিক শক্তির বর্তমান ভারসাম্যকে নতুন করে সাজাতে পারে; বিশেষ করে নিকট ভবিষ্যতে সরকারের দিক থেকে কোনো কার্যকর পাল্টা আক্রমণের সম্ভাবনা যখন প্রায় ক্ষীণ।
প্রতিবেদনগুলোতে মালিতে রুশ বাহিনীর ক্রমহ্রাসমান ভূমিকার ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে। বেশ কিছু সামরিক অবস্থান থেকে রুশ বাহিনীর পিছু হটার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই ঘটনা মালির নিরাপত্তা মিত্র হিসেবে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঘোলাটে ও জটিল করে তুলেছে।
পরিশেষে এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যা ঘটেছে তা নিছক কোনো বৃহৎ পরিসরের সামরিক আক্রমণ নয়। বরং এটি এমন একটি সন্ধিক্ষণ, যা মালির ভবিষ্যৎ রূপরেখাকে নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্র ও রাজনীতির ময়দানে যাকে 'অসম্ভব জোট' বলে মনে করা হতো, সেই জোটের উত্থান আজ এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তবে এই ঐক্য কতদিন টিকবে, নাকি ২০১২ সালের মতো আবারও জোট ভাঙনের সেই পুরোনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে—সেই প্রশ্নগুলো এখনও উত্তরহীন।
*****
সতর্কবার্তা: এই লেখাটি মূলত আপনাদের তথ্যগত অবগতির উদ্দেশ্যে অনুবাদ করা হলো। সুতরাং, এখানে প্রদত্ত বিষয়গুলোকে চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে ধরে না নেওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। উল্লেখ্য, রচনায় উপস্থাপিত যাবতীয় চিন্তাধারা ও বক্তব্যের দায়ভার একান্তই মূল লেখকের নিজস্ব। তাঁর সকল মতাদর্শ বা বিশ্লেষণের সাথে আমাদের পুরোপুরি মতৈক্য থাকতে হবে—এমনটি কোনোভাবেই অপরিহার্য নয়। তাদের চিন্তাধারা আমাদের জানা দরকার, আর মূলত এ কারণেই আমাদের এই আর্টিকেল অনুবাদ করা হয়েছে। -অনুবাদক
Comment