Announcement

Collapse
No announcement yet.

গ্রীষ্মকাল || মুমিনের ভাবনা ও আমল

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • গ্রীষ্মকাল || মুমিনের ভাবনা ও আমল

    আমাদের দেশ ষড়ঋতুর দেশ। প্রতি দুই মাসে ঋতুর পরিবর্তন হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মিলে গ্রীষ্মকাল হলেও গরমের দাপট শুরু হয় আরও কিছুটা আগ থেকে।

    প্রতিটি ঋতুর মতো গ্রীষ্মকালেরও নিজস্ব কিছু রূপ ও বৈশিষ্ট্য আছে। রৌদ্রের তাপে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়। নদী-নালা শুকিয়ে আসে। প্রখর রোদে জনজীবন হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। এদিকে আবার গাছপালা ভরে ওঠে আম, কাঁঠাল, লিচুসহ নানা রসালো ফলে। মাঠে-ঘাটে কৃষকের ব্যস্ততা থাকে অন্যরকম।

    এসবকিছুর মধ্যে মুমিনদের জন্য রয়েছে নিদর্শন। শীত-গ্রীষ্ম প্রতিটি ঋতুরই রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি মৌসুমই আমাদের সামনে উন্মোচন করে চিন্তা ও কর্মের নতুন দিগন্ত। এই চিন্তাশক্তি ও কর্মশক্তিকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই আমরা হতে পারি আরও উপকৃত, আরও সমৃদ্ধ। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ–

    وَهُوَ الَّذِيْ جَعَلَ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ اَرَادَ اَنْ يَّذَّكَّرَ اَوْ اَرَادَ شُكُوْرًا.

    এবং তিনিই সেই সত্তা, যিনি রাত ও দিনকে পরস্পরের অনুগামী করে সৃষ্টি করেছেন—(কিন্তু এসব বিষয় উপকারে আসে কেবল) সেই ব্যক্তির জন্য, যে উপদেশ গ্রহণের ইচ্ছা রাখে কিংবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে চায়। –সূরা ফুরকান (২৫) : ৬২

    এই মৌসুমে আমাদের চিন্তা ও কর্মের কিছু দিক নিম্নে তুলে ধরা হল :

    ১. জাহান্নামের কথা স্মরণ করি

    গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ জাহান্নামের নিশ্বাস থেকে সৃষ্ট। সেই উত্তাপ থেকেই এই গরমের তীব্রতা। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–

    وَاشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا، فَقَالَتْ: يَا رَبِّ أَكَلَ بَعْضِي بَعْضًا، فَأَذِنَ لَهَا بِنَفَسَيْنِ، نَفَسٍ فِي الشِّتَاءِ وَنَفَسٍ فِي الصَّيْفِ، فَهُوَ أَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الْحَرِّ، وَأَشَدُّ مَا تَجِدُونَ مِنَ الزَّمْهَرِيرِ.

    জাহান্নামের আগুন তার প্রতিপালকের কাছে অভিযোগ করে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার এক অংশ আরেক অংশকে গ্রাস করে ফেলছে।

    তখন আল্লাহ তাকে দুইটি নিঃশ্বাসের অনুমতি দিলেন। একটি শীতকালে, অন্যটি গ্রীষ্মকালে।

    সুতরাং গরমের মৌসুমে তোমরা যে প্রচণ্ড গরম এবং শীতের মৌসুমে প্রচণ্ড শীত অনুভব করে থাক তা জাহান্নামের দু’টি নিঃশ্বাসের কারণেই। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৩৭

    অন্য হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–

    فَإِنَّ شِدَّةَ الْحَرِّ مِنْ فَيْحِ جَهَنَّمَ.

    নিশ্চয়ই গরমের তীব্রতা জাহান্নামের উত্তাপ থেকেই সৃষ্ট। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৩৬

    তাই গরমের তীব্রতায় আমরা বেশি বেশি জাহান্নামের কথা স্মরণ করি– জাহান্নামের উত্তাপ থেকে সৃষ্ট গরমের এ তীব্রতাই আমরা সহ্য করতে পারি না, তাহলে জাহান্নামের আগুনের তাপ কীভাবে সইব! সেইসাথে আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে পানাহ চাই; যেভাবে আল্লাহর নেক বান্দাগণ দুআ করেন–

    وَالَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَہَنَّمَ اِنَّ عَذَابَہَا کَانَ غَرَامًا، اِنَّہَا سَآءَتْ مُسْتَقَرًّا وَّمُقَامًا.

    আর যারা (দুআ-মুনাজাতে) বলে, হে আমাদের রব, জাহান্নামের আযাব আমাদের থেকে সরিয়ে দিন। জাহান্নামের আগুন তো স্থায়ী খেসারত! অবস্থানস্থল ও বাসস্থান হিসেবে তা কতই না নিকৃষ্ট! –সূরা ফুরকান (২৫) : ৬৫-৬৬

    ২. গরম থেকে আত্মরক্ষার উপাদানগুলোর শোকর আদায় করি

    বহু মানুষ অসহনীয় গরমের মধ্যেও খোলা আকাশের নিচে জীবনযাপন করে; তাদের মাথার ওপর আরামদায়ক ছায়া নেই। অনেক এলাকায় বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত বিদ্যুতের সরবরাহ নেই। তাদের কত ভোগান্তি!

    আমরা যারা এসব প্রতিকূলতা থেকে মুক্ত আছি, উপরন্তু বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছি—কারও রয়েছে ছায়াঘেরা বাড়ি, কেউ ভোগ করছি জেনারেটর বা আইপিএসের সুবিধা। কারও তো আবার রয়েছে এসির ব্যবস্থা! নিঃসন্দেহে এ সবই আল্লাহর অনেক বড় নিআমত।

    আমাদের উচিত, এই নিআমতসমূহের শোকর আদায় করা এবং আল্লাহর আনুগত্যের জীবন গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন–

    وَاللّٰہُ جَعَلَ لَکُمْ مِّمَّا خَلَقَ ظِلٰلًا وَّجَعَلَ لَکُمْ مِّنَ الْجِبَالِ اَکْنَانًا وَّجَعَلَ لَکُمْ سَرَابِيْلَ تَقِيْکُمُ الْحَرَّ وَسَرَابِيْلَ تَقِيْکُمْ بَاْسَکُمْ کَذٰلِکَ يُتِمُّ نِعْمَتَہٗ عَلَيْکُمْ لَعَلَّکُمْ تُسْلِمُوْنَ.

    আর যা কিছু আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, তা থেকে তোমাদের জন্য ছায়া তৈরি করেছেন, আর পাহাড়-পর্বতে তোমাদের জন্য (প্রাকৃতিক) আশ্রয়স্থল বানিয়েছেন, আর তোমাদের জন্য তৈরি করেছেন পোশাক, যা গরম থেকে তোমাদের রক্ষা করে। আবার এমন পোশাক, যা তোমাদের রক্ষা করে তোমাদের (শত্রুর) পরাক্রম থেকে। এভাবেই তিনি তোমাদের ওপর তাঁর নিআমত পূর্ণ করেছেন, যাতে তোমরা (তাঁর) আনুগত্য বরণ করো। –সূরা নাহল (১৬) : ৮১

    ৩. বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করি

    বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের অভিমত হল, গরমের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ, গাছগাছালির সংখ্যা কমে যাওয়া। যেখানে গাছগাছালি বেশি, সেখানে গরম তুলনামূলক কম অনুভূত হয়। তাই আমাদের উচিত, সাধ্য অনুযায়ী বৃক্ষরোপণ করা।

    হাদীস শরীফে এ বিষয়ে অনেক উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–

    إِنْ قَامَتْ عَلَى أَحَدِكُمُ الْقِيَامَةُ، وَفِي يَدِه فَسِيلَةٌ، فَلْيَغْرِسْهَا.

    যদি তোমাদের ওপর কিয়ামত এসে যায় আর কারও হাতে বৃক্ষের চারা থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়। –মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২৯০২

    বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম হল, ফলের গাছ রোপণ করা। কারণ তাতে পরিবেশের ফায়েদার সাথে সাথে আরও বহু ফায়েদা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–

    مَا مِنْ رَجُلٍ يَغْرِسُ غَرْسًا إِلَّا كَتَبَ اللهُ لَه مِنَ الْأَجْرِ قَدْرَ مَا يَخْرُجُ مِنْ ثَمَرِ ذَلِكَ الْغِرَاس.

    কোনো ব্যক্তি যখন গাছ লাগায়, তো এ গাছে যত ফল (-ফসল) হবে, তার আমলনামায় এ ফল পরিমাণ সওয়াব লেখা হবে। –মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৩৫২০

    আরেক হাদীসে এসেছে–

    مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَغْرِسُ غَرْسًا، أَوْ يَزْرَعُ زَرْعًا، فَيَأْكُلُ مِنْهُ طَيْرٌ أَوْ إِنْسَانٌ أَوْ بَهِيمَةٌ، إِلَّا كَانَ لَهُ بِه صَدَقَةٌ.

    যখন কোনো মুসলিম গাছ লাগায়, অথবা কোনো ফসল বোনে, আর মানুষ, পাখি বা পশু তা থেকে খায়, এটা রোপণকারীর জন্য সদাকা হিসেবে গণ্য হয়। –সহীহ বুখারী, হাদীস ২৩২০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৫৩

    ৪. তৃষ্ণার্তের পিপাসা নিবারণের চেষ্টা করি

    এই মৌসুমের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফযীলতপূর্ণ একটি আমল হতে পারে, পিপাসার্ত মানুষের পিপাসা দূর করা। বিশেষত গ্রীষ্মের দুপুরে প্রখর রোদে পথচারী-কর্মজীবী মানুষ প্রচণ্ড ক্লান্ত-ঘর্মাক্ত ও পিপাসার্ত হয়ে পড়ে। তখন তাদের পানি পান করানো অনেক বড় নেক আমল।

    হাদীস শরীফে এ বিষয়ে অনেক উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে।

    সা‘দ ইবনে উবাদাহ রা. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সর্বোত্তম দান কোনটি?

    তিনি বললেন, পানি পান করানো। –সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩৬৮৪

    অন্য হাদীসে বলা হয়েছে– ‘কোনো মুমিন অন্য মুমিনকে পিপাসার সময় পানি পান করালে আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন ‘রহীকে মাখতুম’ তথা মোহরাঙ্কিত বিশেষ পানীয় পান করাবেন।’ –জামে তিরমিযী, হাদীস ২৬১৭

    শুধু মানুষ নয়, কোনো অবলা পিপাসার্ত প্রাণীকেও যদি পানি পান করানো হয়, তাও অনেক বড় নেক আমল; এমনকি নাজাতের ওসীলা। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–

    بَيْنَمَا كَلْبٌ يُطِيفُ بِرَكِيَّةٍ، كَادَ يَقْتُلُهُ الْعَطَشُ، إِذْ رَأَتْهُ بَغِيٌّ مِنْ بَغَايَا بَنِي إِسْرَائِيلَ، فَنَزَعَتْ مُوقَهَا، فَسَقَتْهُ فَغُفِرَ لَهَابِهِ.

    একটি কুকুর এক কুয়ার পাশে ঘুরঘুর করছিল। পিপাসায় তার প্রাণ বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম। বনী ইসরাইলের এক পতিতা নারী তা দেখে নিজের চামড়ার মোজা খুলে কুয়া থেকে পানি তুলে তাকে পান করায়। এ আমলের কারণে আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৩২১

    গ্রীষ্মে পথচারীকে পানি পান করানো মুসলিমদের ঐতিহ্য

    আমরা তো সেই উম্মাহ, গ্রীষ্মে পিপাসার্তকে পানি পান করানোর জন্য যাদের মাঝে ওয়াক্ফের ধারা চালু ছিল। পথের পাশে ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা রাখা হত। পিপাসার্ত পথিক বিনামূল্যে সেখান থেকে ঠান্ডা পানি পান করে কলিজা শীতল করত। শাওকী আবু খলীল বলেন–

    ووقف لسقيا الماء المثلوج في الصيف لعابري السبيل.

    গ্রীষ্মকালে পথচারী মানুষদের বরফ মেশানো ঠান্ডা পানি পান করানোর জন্যও ছিল ওয়াক্ফের ব্যবস্থা। –আলহাযারাতুল আরাবিয়্যা, শাওকী আবু খলীল, পৃ. ৩৩৬; আলওয়াক্ফু ফিল ফিকরিল ইসলামী, পৃ. ১৩২

    খুবই সামান্য খরচ করার মতো একটি মহান নেক আমল। হতে পারে তা আমার জন্য হাউজে কাউসারের পানির ওসীলা হবে!

    আল্লাহ সবাইকে আমলের তাওফীক দান করুন—আমীন।​
    ————————————————————————
    সূত্র: আল-কাউসার
    Last edited by Rakibul Hassan; 3 weeks ago.
Working...
X