দ্যা ডিসেন্টকে ধন্যবাদ !?
আমাদের সন্তান, আমাদের দীন, আমাদের দ্বীনি প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং সর্বোপরি আমাদের সমাজ—এসবের নিরাপত্তা ও সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। যখন কোনো অনৈতিক, বিকৃত বা ক্ষতিকর প্রবণতার অভিযোগ সামনে আসে, তখন সেটিকে অযথা ধামাচাপা দেওয়া বা এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীলভাবে আলোচনায় আনা প্রয়োজন। কারণ, কোনো সমস্যাকে আড়াল করে রাখলে তা দূর হয় না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীরে শিকড় গেড়ে বসতে পারে।
মাদ্রাসা এবং মাদ্রাসাসংশ্লিষ্ট কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনৈতিক ও বিকৃত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই জনপরিসরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে, গত কয়েক দিনে বিভিন্ন উৎসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রকাশিত তথ্য ও প্রতিবেদনগুলো একত্র করে একটি ধারাবাহিক উপস্থাপনার চেষ্টা করেছে দ্যা ডিসেন্ট। অনেক ইসলামপন্থী বলয়ের মানুষ মনে করছেন, বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে এক জায়গায় উপস্থাপন করার ফলে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, জবাবদিহির দাবি আরও জোরালো হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে। সেই কারণেই তাদের অনেকেই দ্যা ডিসেন্ট এর এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করছেন, তাদের পোস্ট শেয়ার করে ধনাত্মক মন্তব্য করছেন।
মূল বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করার খুব বেশি সুযোগ নেই। সমাজে যদি কোনো অনিয়ম, অপরাধ বা নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনা ঘটে, তবে তা আড়াল না করে যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। সচেতনতা সৃষ্টি অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তাই বলে দ্যা ডিসেন্টকে ধন্যবাদ জানানোর বিষয়টি কখনোই গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। কারণ, কোনো একটি ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই একটি গণমাধ্যম বা প্ল্যাটফর্ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নৈতিকতার আদর্শে পরিণত হয় না। একটি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন করতে হলে তার সামগ্রিক সম্পাদকীয় নীতি, তথ্য উপস্থাপনের ধারাবাহিকতা, বাছাইয়ের মানদণ্ড এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হয়। যদি কোনো প্ল্যাটফর্ম অন্য ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতদুষ্ট বা সমাজে বিভাজন তৈরিকারী ভূমিকা পালন করে থাকে, তাহলে শুধু একটি প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য তাকে বিশেষ ধন্যবাদ বা নৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।
তথ্য গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু তথ্যের বাহককে অযাচিত প্রশংসা করা আর তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া এক জিনিস নয়। যে খবর সত্য, তা সত্য বলেই গ্রহণযোগ্য; সেটি কে প্রকাশ করেছে, তার ভিত্তিতে কাউকে নৈতিক উচ্চ আসনে বসিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অতএব, ঘটনার সত্যতা ও প্রয়োজনীয় আলোচনাকে সমর্থন করা এক বিষয়, আর সেই উপলক্ষে দ্যা ডিসেন্টকে ধন্যবাদ জানানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
দ্যা ডিসেন্ট যেই সময়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করে, সেই সময়ে আমি দ্যা ডিসেন্ট সম্পর্কে সচেতন করে লিখেছিলাম, যারা পড়েছিলেন, তাদের মনে থাকার কথা। আমার সে সময়ে মনে হয়েছিলো, দ্যা ডিসেন্ট এভূখন্ডের মুসলিমদের জন্য ক্ষতির কারণ হবে, আমার সেই অনুমান খুব একটা ভুল ছিলনা; কারণ চব্বিশ পরবর্তী সময়ে জঙ্গি ন্যারেটিভ রিলেটেড যা কিছু হয়েছে তার সবগুলোতেই দ্যা ডিসেন্ট সব থেকে বেশি ভুমিকা রেখেছে।
মনে রাখতে হবে, ইসলাম ও পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তার কাঠামো এবং অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যটা মৌলিক। দুই কাঠামোর ভিত্তি, কেন্দ্র এবং উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে আলাদা এবং সাংঘর্ষিক। দ্যা ডিসেন্ট এর কার্যক্রমের ভিত্তি হলো পাশ্চাত্যের সেকুলার-লিবারেল ফ্রেমওয়ার্ক আর আমাদের কার্যক্রমের ভিত্তি হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তারা যেই সমাপ্তির আশা করে আমরা সেই সমাপ্তির অস্তিত্বকেই স্বীকার করিনা, তাদের এবং আমাদের মাঝের ডিফল্ট সম্পর্ক মতভিন্নতার না বরং শত্রুতার।
গত কিছুদিন আগে একটা পডকাস্ট দেখলাম, সেই পডকাস্টে The Premodern Origins of Jihadi Salafism বই নিয়ে আলোচনা করছিলেন বইয়ের লেখক Dr Jann Islam নিজেই। পডকাস্টের হোস্ট বেশ কয়েকবার Dr Jann Islam কে জিজ্ঞেস করলো যে, তিনি আল কায়েদা এবং এধরণের আন্দোলন-সংগঠনের নিন্দা জানাবে কিনা? Dr Jann Islam বেশ সুন্দর একটা উত্তর দিয়েছে, আমার কাছে উত্তরটা বেশ যৌক্তিক, উপযুক্ত এবং গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে।
তিনি যা বলতে চেয়েছেন, সেটিকে যদি আমি নিজের ভাষায় প্রকাশ করি, তাহলে তা অনেকটা এমন দাঁড়ায়—
[
মানুষের প্রতিটি ক্রিয়াকলাপ, সিদ্ধান্ত এবং আবেগের মূলে কাজ করে তার নিজস্ব 'ওয়ার্ল্ডভিউ' (Worldview)। আমরা জগতকে সরাসরি দেখতে পাই না; বরং আমাদের মনের ক্যাটাগরি বা ছাঁচ অনুযায়ী জগতকে দেখি। এই ছাঁচই হলো আমাদের ওয়ার্ল্ডভিউ। অ্যাকাডেমিক পরিভাষায় ওয়ার্ল্ডভিউ হলো এমন একটি 'জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো' (Epistemological Framework) যা দিয়ে মানুষ তার চারপাশের বাস্তবতাকে প্রক্রিয়াজাত করে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে, প্রশ্ন এবং উত্তর শব্দগতভাবে একই হতে পারে; কিন্তু যদি তার পেছনে দুটি ভিন্ন ওয়ার্ল্ডভিউ সক্রিয় থাকে, তবে সেই প্রশ্নের অর্থ, উত্তরের তাৎপর্য এবং উভয়ের অনুভব ও ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে উঠবে।
তাই আমরা যদি কখনো আল কায়েদা বা এ ধরনের কোনো আন্দোলন-সংগঠনের সমালোচনা বা নিন্দা করে থাকি, তবে তার কারণ এই নয় যে তারা সেকুলার-লিবারেল মূল্যবোধ ধারণ করে না। বরং আমাদের আপত্তির মূল কারণ হলো, আমাদের দৃষ্টিতে তারা শরিয়াহ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, আমাদের সমালোচনার ভিত্তি সেকুলার-লিবারেল মানদণ্ড নয়; বরং শরিয়াহর নির্ধারিত নীতিমালা ও সীমারেখা।
এখানেই ওয়ার্ল্ডভিউয়ের পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, ওয়ার্ল্ডভিউ ভিন্ন হলে শুধু সমস্যার ব্যাখ্যাই নয়, কাঙ্ক্ষিত সমাধান বা সমাপ্তিও ভিন্ন হয়। সেকুলার-লিবারেল দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের ঘটনার কাঙ্ক্ষিত সমাপ্তি হতে পারে সংশ্লিষ্ট আন্দোলন বা সংগঠনের বিলুপ্তি, অথবা ধর্মীয় প্রভাবকে জনপরিসর থেকে আরও সীমিত করে ফেলা। অন্যদিকে, শরিয়াহভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আপত্তির কারণ যদি হয় শরিয়াহর সীমালঙ্ঘন, তবে কাঙ্ক্ষিত সমাপ্তি হবে সেই সীমালঙ্ঘনের সংশোধন এবং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনার প্রতি আরও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাবর্তন। অর্থাৎ, সমস্যার সমাধান ধর্মীয় নীতিমালা থেকে সরে যাওয়া নয়; বরং সেগুলোকে আরও যথাযথভাবে ধারণ ও অনুসরণ করা।
তাই যদি আমরা কখনো আল কায়েদা বা এ ধরনের কোনো আন্দোলন-সংগঠনের সমালোচনা বা নিন্দা করে থাকি, তবে সেটাতে সেকুলার-লিবারেলদের খুশি হওয়ার কোনো কারণ নেই, কেননা আমাদের নিন্দা তাদেরকে আরও বিশুদ্ধ করার জন্য।
]
মানুষের প্রতিটি ক্রিয়াকলাপ, সিদ্ধান্ত এবং আবেগের মূলে কাজ করে তার নিজস্ব 'ওয়ার্ল্ডভিউ' (Worldview)। আমরা জগতকে সরাসরি দেখতে পাই না; বরং আমাদের মনের ক্যাটাগরি বা ছাঁচ অনুযায়ী জগতকে দেখি। এই ছাঁচই হলো আমাদের ওয়ার্ল্ডভিউ। অ্যাকাডেমিক পরিভাষায় ওয়ার্ল্ডভিউ হলো এমন একটি 'জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো' (Epistemological Framework) যা দিয়ে মানুষ তার চারপাশের বাস্তবতাকে প্রক্রিয়াজাত করে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে, প্রশ্ন এবং উত্তর শব্দগতভাবে একই হতে পারে; কিন্তু যদি তার পেছনে দুটি ভিন্ন ওয়ার্ল্ডভিউ সক্রিয় থাকে, তবে সেই প্রশ্নের অর্থ, উত্তরের তাৎপর্য এবং উভয়ের অনুভব ও ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে উঠবে।
তাই আমরা যদি কখনো আল কায়েদা বা এ ধরনের কোনো আন্দোলন-সংগঠনের সমালোচনা বা নিন্দা করে থাকি, তবে তার কারণ এই নয় যে তারা সেকুলার-লিবারেল মূল্যবোধ ধারণ করে না। বরং আমাদের আপত্তির মূল কারণ হলো, আমাদের দৃষ্টিতে তারা শরিয়াহ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, আমাদের সমালোচনার ভিত্তি সেকুলার-লিবারেল মানদণ্ড নয়; বরং শরিয়াহর নির্ধারিত নীতিমালা ও সীমারেখা।
এখানেই ওয়ার্ল্ডভিউয়ের পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, ওয়ার্ল্ডভিউ ভিন্ন হলে শুধু সমস্যার ব্যাখ্যাই নয়, কাঙ্ক্ষিত সমাধান বা সমাপ্তিও ভিন্ন হয়। সেকুলার-লিবারেল দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের ঘটনার কাঙ্ক্ষিত সমাপ্তি হতে পারে সংশ্লিষ্ট আন্দোলন বা সংগঠনের বিলুপ্তি, অথবা ধর্মীয় প্রভাবকে জনপরিসর থেকে আরও সীমিত করে ফেলা। অন্যদিকে, শরিয়াহভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আপত্তির কারণ যদি হয় শরিয়াহর সীমালঙ্ঘন, তবে কাঙ্ক্ষিত সমাপ্তি হবে সেই সীমালঙ্ঘনের সংশোধন এবং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনার প্রতি আরও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাবর্তন। অর্থাৎ, সমস্যার সমাধান ধর্মীয় নীতিমালা থেকে সরে যাওয়া নয়; বরং সেগুলোকে আরও যথাযথভাবে ধারণ ও অনুসরণ করা।
তাই যদি আমরা কখনো আল কায়েদা বা এ ধরনের কোনো আন্দোলন-সংগঠনের সমালোচনা বা নিন্দা করে থাকি, তবে সেটাতে সেকুলার-লিবারেলদের খুশি হওয়ার কোনো কারণ নেই, কেননা আমাদের নিন্দা তাদেরকে আরও বিশুদ্ধ করার জন্য।
]
তাই তাদের কাজ সম্পর্কে ধনাত্মক মন্তব্য করা, তাদের পোস্ট শেয়ার করা, এগুলো খুবই দৃষ্টিকটু। আমাদের এগুলো থেকে বিরত থাকা উচিত। আপনার পরিচিত কেউ যদি এমন কাজ করে থাকে তাহলে তাদেরকে উত্তম ভাষায় সচেতন করুন। তবে আপনিও সতর্ক থাকবেন, কখনোই সুশীল, সেলিব্রেটি, সুবিধাবাদী এধরনের জঘন্য ট্যাগ দ্বারা কাউকে সম্বোধন করবেন না।