Announcement

Collapse
No announcement yet.

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: নেপথ্যের কারণ

Collapse
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: নেপথ্যের কারণ

    চীন প্রতিদিন প্রায় এক কোটি দশ লক্ষ ব্যারেল তেল আমদানি করে। চীনা কারখানা, সেমিকন্ডাক্টর ল্যাব, বন্দর সবকিছু এই প্রবাহমান তেলের ওপর নির্ভরশীল। এই তেলের তিনটি প্রধান উৎস ছিল ইরান, ভেনিজুয়েলা এবং রাশিয়া। চার মাসের কম সময়ের ব্যবধানে ওয়াশিংটন একের পর এক এই তিনটি উৎসকেই বাধাগ্রস্ত করেছে এবং প্রত্যেককে আলাদা আলাদা কৌশল বা হাতিয়ার ব্যবহার করে নিউট্রালাইজ করেছে৷

    ইরান একা চীনের মোট আমদানির প্রায় পনেরো লক্ষ ব্যারেল সরবরাহ করত বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে৷ নিষেধাজ্ঞাবিদ্ধ ইরানের কাছে চীনই ছিল একমাত্র নির্ভরযোগ্য ক্রেতা। এই সম্পর্কটি ছিল পারস্পরিক কৌশলগত নির্ভরতার এক অনন্য উদাহরণ৷ ইরান পেত বাজার, চীন পেত সস্তা জ্বালানি। ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর অনিশ্চয়তা পারস্য উপসাগরের অন্যান্য রপ্তানিকারকদের তেলের পথেও ছায়া ফেলেছে। হরমুজ প্রণালীর সরু গলি অবরুদ্ধ হলে শুধু ইরান নয়, উপসাগরের প্রায় সমগ্র জ্বালানি রপ্তানিই অনিশ্চয়তায় পড়ে।

    ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের কূটকৌশল কাজ করেছে আরেকটু ভিন্ন মাত্রায়। নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সঙ্গে চীনের "ঋণের বিনিময়ে তেল" চুক্তি ছিল এক দশকেরও বেশি সময় ধরে৷ ভেনিজুয়েলা চীনের কাছ থেকে ঋণ নিত, সেই ঋণ শোধ হতো তেল দিয়ে এবং সেই তেলের মূল্য নির্ধারিত হতো বাজারমূল্যের চেয়ে কমে। অর্থাৎ, ভেনিজুয়েলার জন্য এটি ছিল একটি নিশ্চিত বাজার, আর চীনের জন্য একটি সাশ্রয়ী ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি উৎস। মাদুরোকে সরিয়ে ওয়াশিংটন এই সমীকরণটিকে মূল থেকে ভেঙে দিয়েছে। নতুন যুক্তরাষ্ট্রপন্থী কর্তৃপক্ষ চীনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তেল কিনতে পারবে, কিন্তু এখন থেকে বাজারমূল্যে কিনতে হবে এবং সেই মূল্য পরিশোধ হবে ডলারে৷

    রাশিয়ার ক্ষেত্রে কৌশলটি আরও সূক্ষ্ম৷ রুশ ট্যাঙ্কার এবং শোধনাগারে ইউক্রেনীয় হামলার মাধ্যমে রাশিয়া থেকে চীনে আসা তেলের প্রবাহ প্রায় পঁয়তাল্লিশ শতাংশ কমে গিয়েছে। এই হামলাগুলো শুধু ইউক্রেনের যুদ্ধ-প্রচেষ্টার অংশ নয়; এগুলো একটি বৃহৎ স্ট্র্যাটেজি, যা রাশিয়াকে দুর্বল করার পাশাপাশি চীনের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলকেও আঘাত করেছে।

    এই সমগ্র কৌশলকে বুঝতে হলে মালাক্কা প্রণালীর ভূমিকা আলাদাভাবে বোঝা দরকার। চীনের সমুদ্রপথে আসা জ্বালানি আমদানির সিংহভাগ এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে। মালাক্কা প্রণালী প্রস্থে মাত্র আড়াই কিলোমিটারের একটি ভৌগোলিক চোক পয়েন্ট যা এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যকে দশকের পর দশক ধরে সংজ্ঞায়িত করে আসছে। চীনা স্ট্র্যাটেজিস্টরা এই দুর্বলতাকে "মালাক্কা ডিলেমা" বলে অভিহিত করেন৷ অর্থাৎ, চীনের শক্তিসীমা সেখানেই শেষ যেখানে মালাক্কার সংকীর্ণ জলপথের শুরু। ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে স্বাক্ষরি যুক্তরাষ্ট্রের "মেজর ডিফেন্স কো-অপারেশন পার্টনারশিপ" এই ডিলেমাকে একটি স্থায়ী হুমকিতে রূপান্তরিত করেছে। ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমায় যৌথ অপারেশন, মার্কিন নজরদারি সেন্সর মোতায়েন এবং মনিটরিং আর্কিটেকচারের একীভূতকরণ মালাক্কাকে এক অর্থে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রিত ফটকে পরিণত করবে। চীনের জ্বালানি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলবে, কিন্তু ওয়াশিংটন জানবে কখন কোথায় কোন জাহাজ আছে।

    এই সমগ্র চিত্রটিকে পর্যায়ক্রমে সাজালে একটি বৃত্ত সম্পন্ন হয়৷ ক্যারিবিয়ান থেকে পারস্য উপসাগর, পারস্য উপসাগর থেকে মালাক্কা, মালাক্কা থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত একটি বলয়। এই বলয়টি কাকতালীয় নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট ডকট্রিন। ভূগোলের ভাষায় যাকে "অ্যানাকোন্ডা কৌশল" বলা যেতে পারে৷ অ্যানাকোন্ডা যেভাবে তার শিকারকে শ্বাসরোধ করে, ঠিক একইভাবে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলকে ধীরে ধীরে চেপে ধরে চীনের শিল্প-বিপাককে পঙ্গু করে দেয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এটি।

    এই পরিকল্পনার একটি ঐতিহাসিক নজির আছে এবং সেটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ দেয়। ১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, কারণ জাপান চীনে সামরিক অভিযান চালাচ্ছিল। জাপানের মোট জ্বালানির প্রায় আশি শতাংশ আসত মার্কিন উৎস থেকে। নিষেধাজ্ঞার পর জাপানের কাছে দুটি পথ ছিল৷ হয় পিছিয়ে আসা, নয়তো আগ্রাসী সম্প্রসারণ। জাপান বেছে নিয়েছিল দ্বিতীয় পথ অর্থাৎ, পার্ল হার্বার আক্রমণ। এই উপমাটি আজকের প্রেক্ষাপটে অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক। একটি ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রকে যখন জ্বালানির দিক থেকে কোণঠাসা করা হয়, তার প্রতিক্রিয়া সবসময় যুক্তিসিদ্ধ হয় না।

    ওয়াশিংটন যে কৌশলটি চীনের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছে, তার একটি অগ্রজ পরীক্ষা ইউরোপের ওপর করা হয়েছিল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে৷ নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন ধ্বংস হওয়ার পর জার্মানির শিল্পসভ্যতার মেরুদণ্ড প্রায় ভেঙে পড়েছিল। সস্তা রুশ গ্যাস ছিল জার্মান রাসায়নিক শিল্পের, বিশেষত বিএএসএফের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ভিত্তি। জার্মান ইস্পাত, সার ও অটোমোবাইল সবকিছুর মূল্য নির্ধারণে সস্তা শক্তির একটি নির্ধারক ভূমিকা ছিল। নর্ড স্ট্রিম বন্ধ হওয়ার পর জার্মানির বিদ্যুতের মূল্য উন্নত বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, বড় বড় কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে অন্যত্র সরে যায়, এবং দেশটির জিডিপি টানা দুই বছর সংকুচিত হয়। ইউরোপের শিল্পশক্তি এখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত মূল্যে মার্কিন এলএনজির মুখাপেক্ষী। একটি মিত্রকেও জ্বালানি-নির্ভরতায় পরিণত করা যায়, এটাই ওয়াশিংটনের প্রদর্শিত নজির।

    চীনের ক্ষেত্রে এই আঘাতের প্রভাব আরও ব্যাপক। কারণ, চীনের শিল্পভিত্তি জার্মানির চেয়ে বহুগুণে বিস্তৃত এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে আরো গভীরভাবে সংযুক্ত। ওয়াশিংটন যদি চীনের জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে চীনা পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে৷ ফলে রপ্তানিমূল্য বাড়বে, এবং বৈশ্বিক বাজারে চীনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা সংকুচিত হবে। এটি একটি ধীর বি-শিল্পায়ন প্রক্রিয়া, যেখানে শত্রুকে পরাজিত করা হয় তার কারখানাগুলো ধীরে ধীরে অলাভজনক করার মাধ্যমে।

    চীনের "টিপট" রিফাইনারিগুলো এই কৌশলের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু। এই ছোট ও স্বাধীন শোধনাগারগুলো মূলত নিষেধাজ্ঞাবিদ্ধ তেল পরিশোধন করত৷ এগুলো ইরানি, ভেনিজুয়েলান, এবং রুশ অপরিশোধিত তেলকে ডিজেল ও পেট্রোলে রূপান্তরিত করত সস্তায়। এরা ছিল চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি অনানুষ্ঠানিক কিন্তু কার্যকর স্তম্ভ। এখন এই রিফাইনারিগুলোর অস্তিত্ব নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সহনশীলতার ওপর। যে কোম্পানি নিষেধাজ্ঞাবিদ্ধ ট্যাঙ্কার থেকে তেল কিনবে, তার বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসবে৷ আর এই নিষেধাজ্ঞার অর্থ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্নতা, এবং ডলার-ভিত্তিক বাণিজ্য থেকে বহিষ্কার। ডলারের আধিপত্য এখানে একটি অদৃশ্য কিন্তু অপ্রতিরোধ্য হাতিয়ার হিসেবে সক্রিয় রয়েছে।

    প্রশ্ন হলো, চীন কি এর প্রতিক্রিয়ায় নিষ্ক্রিয় থাকবে? ইতিহাস বলে না। বেইজিং বছরের পর বছর ধরে "মালাক্কা ডিলেমা" থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে৷ তারা ইউয়ান পাইপলাইন দিয়ে মিয়ানমার হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করেছে৷ পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর উন্নয়ন করেছে, এবং আরব সাগরে প্রবেশের পথ তৈরি করেছে। কিন্তু এই বিকল্প পথগুলো মালাক্কার সামুদ্রিক সক্ষমতার বিকল্প হতে পারে না৷ অন্তত স্বল্পমেয়াদে তো নয়ই। তাইওয়ানের প্রশ্নটিও এই ভূমিকায় প্রাসঙ্গিক। কেউ কেউ যুক্তি দেন, জ্বালানি অবরোধের ক্রমবর্ধমান চাপ বেইজিংকে তাইওয়ান প্রশ্নে অধিকতর ঝুঁকিপ্রবণ করে তুলতে পারে৷ কারণ, তাইওয়ান দখল করলে দক্ষিণ চীন সাগরে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যাবে এবং মালাক্কার উপর নির্ভরতা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।

    এই সমগ্র ঘটনাপ্রবাহের পেছনে যে মতবাদটি কাজ করছে, তাকে ভূ-রাজনীতির ভাষায় "শক্তির বহুমাত্রিক অবরোধ" বলা যেতে পারে। এটি কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে একটি একক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি একযোগে চারটি ভিন্ন ভৌগোলিক মঞ্চে পরিচালিত একটি সমন্বিত অভিযান, যার প্রতিটি অংশ অন্যগুলোকে শক্তিশালী করে। ইরানে যুদ্ধ হরমুজকে অনিশ্চিত করে, ইন্দোনেশিয়া চুক্তি মালাক্কাকে নজরদারির আওতায় আনে, ভেনিজুয়েলা দখল ক্যারিবিয়ান সরবরাহকে পুনর্বিন্যস্ত করে, এবং রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ইউরেশিয়ার পাইপলাইনকে অনিশ্চয়তায় ফেলে। একসঙ্গে দেখলে এটি একটি জ্যামিতিক নকশা, যেখানে প্রতিটি কোণ অন্যটিকে সমর্থন করছে।

    একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে গভীর সত্য সম্ভবত এটি: যে রাষ্ট্র অন্যের শক্তির উৎস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে অস্ত্র না তুলেও যুদ্ধ জিততে পারে। রোমান সাম্রাজ্য শস্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে প্রদেশগুলোকে বশে রাখত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করে বৈশ্বিক বাণিজ্যকে নিজের শর্তে পরিচালিত করত। আজকের ওয়াশিংটন জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল, ডলার ব্যবস্থা এবং কৌশলগত প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ একযোগে ব্যবহার করছে। এটি একটি পুরাতন কৌশলের নতুন সংস্করণ৷ কিন্তু যে পরিমাণ চাপ তৈরি হচ্ছে, তার ফলাফল অনুমানযোগ্য নয়। ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলো তখনই তৈরি হয় যখন একটি উদীয়মান শক্তিকে পদ্ধতিগতভাবে কোণঠাসা করা হয় এবং সে পিছু হটার পরিবর্তে সংঘাতের পথ বেছে নেয়৷​

    ~~~ফেসবুক থেকে সংগৃহীত~~~
    বছর ফুরিয়ে যাবে এতো রিসোর্স আছে https://gazwah.net সাইটে

  • #2
    ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলো তখনই তৈরি হয়
    যখন
    একটি উদীয়মান শক্তিকে
    পদ্ধতিগতভাবে কোণঠাসা করা হয় এবং সে পিছু হটার পরিবর্তে সংঘাতের পথ বেছে নেয়৷​


    হে আল্লাহ! আমরা তোমার নিকট খিলাফতের ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন চাচ্ছি।
    হে আল্লাহ! মুসলমানদের হিফাজত কর।
    হে আল্লাহ! আফগানকে হিফাজত কর।
    হে আল্লাহ! বিশ্ব সন্ত্রাসীদের দম্ব চুর্ণ বিচূর্ণ করে দাও
    হে আল্লাহ! তুমিই তো বলেছ

    وَمَکَرُوۡا وَمَکَرَ اللّٰہُ ؕ وَاللّٰہُ خَیۡرُ الۡمٰکِرِیۡنَ ٪

    (আলে ইমরান-৫৪)

    এবং কাফেরেরা চক্রান্ত করেছে আর আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেছেন। বস্তুতঃ আল্লাহ হচ্ছেন সর্বোত্তম কুশলী।​

    Comment


    • #3
      মিয়ানমারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র


      সম্প্রতি মিয়ানমার বা বার্মাকে কেন্দ্র করে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে।

      ১. যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেতা ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) এর প্রধান অং সান সুচিকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে জান্তা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

      ২. মিয়ানমারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বহুদিনের ভাটা পড়া সম্পর্ককে নতুনভাবে বিবেচনায় নিতে জান্তা সরকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বন্ধু রজার স্টোনকে লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। রজার স্টোন একজন অত্যন্ত ঝানু লবিস্ট। স্টোন তার লবিং এন্ড কন্সাল্টেন্সি ফার্ম DCI Group AZ LLC এর মাধ্যমে মিয়ানমারের মিনিস্ট্রি অব ইনফরমেশনের রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে কাজ করবেন। এই কাজের বদৌলতে প্রতি মাসে তাকে ৫০ হাজার ডলার করে দেবে জান্তা সরকার।

      ৩. যুক্তরাষ্ট্রে ফিজড থাকা মিয়ানমারের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের অধিক সম্পদ ছেড়ে দিবে যুক্তরাষ্ট্র।


      এখন স্বাভাবিকভাবেই আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হটাৎ কি এমন হলো যার কারণে যুক্তরাষ্ট্র বার্মা অ্যাক্ট ছাপিয়ে মিয়ানমারের প্রতি তার দৃষ্টিকোণ পরিবর্তন করছে বা নমনীয় হবার চেষ্টা করছে.?

      ছোট্ট করে উত্তর হলো: ‘রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়ালস’

      মিয়ানমার হেভিওয়েট রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়ালসের খনি বলে বিবেচিত। বিশেষ করে মিয়ানমারের কাচিন প্রদেশে ডিসপ্রোসিয়াম এবং টারবিয়ামের মত হেভিওয়েট সেমি রিফাইন্ড রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল পাওয়া যায়। এছাড়াও মিয়ানমারের সমগ্র ইরাবতী নদী অববাহিকা রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল সহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, মিয়ানমারের এসব প্রদেশে অবস্থিত রেয়ার আর্থের খনিগুলোর মাইনিং ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইনভেস্ট করতে, যাতে করে খনিগুলো উৎপাদনকে ব্যাপকভাবে বাড়াতে পারে এবং একই সাথে মার্কিন কৌশলগত সরবরাহে সাহায্য করতে পারে।

      কিন্তু সমস্যার দানা বাধছে উক্ত প্রদেশগুলির খনিসমূহের দায়িত্বে থাকা চীনপন্থী বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর জন্য। কাচিনে রয়েছে কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি (KIA), যারা অস্ত্র ও টাকাপয়সা পায় চীন থেকে। ফলশ্রুতিতে কাচিনের রেয়ার আর্থের যতগুলি খনি আছে, সবগুলি থেকে নামমাত্র মূল্যে সম্পদ কিনে নেয় চীন। উদাহরণস্বরূপ: শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই কাচিন থেকে ৪০ হাজার টন রেয়ার আর্থ নিয়েছে চীন।

      গত দুই দশকে মিয়ানমারের প্রতি মার্কিন নীতি মার্কিন বিরোধীদের উপর কোনো প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়নি। এমনকি মিয়ানমারের জাতিগত বৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি সহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সামরিক কর্মকর্তাদের উপরও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। বরং মার্কিন বিরোধী শক্তি মিয়ানমারের কৌশলগত খনিজ সম্পদের উপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। ২০২১ সালে এই কফিনে শেষ শেষ পেরেক ঠুকে দেয় জো বাইডেন এডমিন্সট্রেশন। জো বাইডেন মিয়ানমারের উপর এক্সিকিউটিভ অর্ডার-১৪০১৪ জারি করেন, যাতে করে মিয়ানমারের উপর মার্কিন কঠোরতা আরো বৃদ্ধি পায় এবং সর্বশেষ মার্কিন উপস্থিতি মিয়ানমার ছাড়তে বাধ্য হয়।

      কিন্তু এই মুহূর্তে রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়ালসের খোজে পাগলপ্রায় যুক্তরাষ্ট্র। কারণ ২০২৫ সালে চীন যুক্তরাষ্ট্রে এই সম্পদের রপ্তানির উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র পেন্টাগনের অধীনে নিজ দেশের বিভিন্ন কোম্পানিকে নিজস্ব সক্ষমতায় বিশুদ্ধ রেয়ার আর্থ উৎপাদন করার জন্য ফান্ড দেয়। ইতিমধ্যে ReAlloys এবং MP Materials এর মত কোম্পানি কাজ শুরু করেছে। কিন্তু এর ফল পেতে অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। ততদিন কি একটা দেশের সামরিক, বাণিজ্যিক ইন্ডাস্ট্রির সফিস্টিকেটেড ইক্যুইপমেন্ট তৈরী বন্ধ থাকবে.? অবশ্যই না। এই দীর্ঘ টাইম গ্যাপ পূরণ করার জন্য অনেকগুলি দেশের মাঝে বিশেষভাবে মিয়ানমারকে বেছে নেওয়া হচ্ছে।

      মিয়ানমারকে বিশেষ বিবেচনায় রাখার অন্যতম কারণ মায়ানমারের ভৌগোলিক অবস্থান। দেশটির ভৌগলিক অবস্থানই একে কৌশলগত মনোযোগের দাবিদার করে তোলে।

      মিয়ানমার হলো আসিয়ান (ASEAN)-এর একমাত্র সদস্য রাষ্ট্র, যার বঙ্গোপসাগর এবং আন্দামান সাগর— উভয় দিকেই ডিরেক্ট এক্সেস রয়েছে। একইসাথে মিয়ানমার দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

      মিয়ানমারের উপকূলরেখার নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে নৌ চলাচলের সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে চীন, ভারত, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড এবং লাওসের সাথে এর স্থল সীমান্ত দেশটিকে আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং সামরিক লজিস্টিকসের একটি প্রাকৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

      মিয়ানমারের ন্যাচারাল রিসোর্স (rare earth elements)— এর কৌশলগত মূল্যে আরও একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দুই দশকের আমেরিকান বিচ্ছিন্নতা নীতি এমন এক শূন্যতা তৈরি করেছে যা প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো পূরণ করেছে। উল্লেখযোগ্য মার্কিন উপস্থিতি না থাকায় মিয়ানমার ক্রমশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব, সামরিক সরঞ্জাম এবং উন্নয়নের জন্য অন্য দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। মিয়ানমারের সাথে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপন করা এই প্রভাবগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে এবং একই সাথে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে মার্কিন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সংকেতগুলো এ ধরনের সম্পৃক্ততার প্রতিই ইঙ্গিত দেয়।

      খেয়াল করে দেখা যায়, গত অক্টোবরে আসিয়ান সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন মিয়ানমার সরকারের প্রকাশ্য সমালোচনা থেকে বিরত ছিল— যা আগের অবস্থান থেকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিবর্তন নি:সন্দেহে মিয়ানমারের প্রতি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিরই ইঙ্গিত দেয়।

      তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তা হলো: মিয়ানমারে মার্কিন উপস্থিতি বাড়াতে গেলে চীন অবশ্যই বাধ সাধবে। চীন তখন কাচিন প্রদেশ সহ যেসব প্রদেশ থেকে রেয়ার আর্থ সংগ্রহ করে— সেইসব অঞ্চলের করিডোরগুলোর উপর আরো কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করবে। ভারতের মনিপুর, মিজোরাম হয়েও ঢোকা কঠিন হবে বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলোর কারণে। সেফ প্যাসেজ বলতে তখন বাংলাদেশ ব্যতীত আর কোনো উপায় থাকবে বলে মনে হয়না।

      SO, BIG GAME IS ON.​


      ~~~ফেসবুক থেকে সংগৃহীত~~~
      বছর ফুরিয়ে যাবে এতো রিসোর্স আছে https://gazwah.net সাইটে

      Comment

      Working...
      X