
তখন গ্রীষ্মকালীন ছুটি ছিল। আমি গ্রাজুয়েশন করে অবসর বসে ছিলাম। আমাদের এলাকায় ছাত্রীদের জন্য একটি তাফসীরুল কুরআন প্রশিক্ষণ কোর্সের ঘোষণা হলো। এই প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণের দাওয়াত আমিও পেয়েছিলাম। যদিও আমরা একটি দ্বীনদার ভদ্র পরিবারের সদস্য ছিলাম, তবুও দ্বীনহীন শিক্ষা গ্রহণের ফলে এর প্রভাব আমাদের উপর পূর্ণভাবে ছিল। এর ফলে আমি নামায, রোযার পাবন্দ ছিলাম ঠিক, কিন্তু জীবনকে দ্বীনের উপর পরিচালনা করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম না। দ্বীন জীবনের সর্বক্ষেত্রের জন্য এবং সকল বিষয়ের উপর বিজয়ী হওয়ার জন্যই এসেছে এর কোনো অনুভূতিই আমার ছিল না। অথচ এই দৃষ্টিভঙ্গি-ই সর্বদিকে পথপদর্শনের উৎস। তাই দ্বীনি ইলম অর্জন করার চিন্তা, ব্যাকুলতা ও সেদিকে ধাবিত হওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষা আমার মধ্যে ছিল না।
আমার আম্মাজানকে আল্লাহ তাআলা জান্নাত দান করুন, কেননা আমাদের মাঝে যা ভালো এবং কল্যাণকর রয়েছে তা আল্লাহ তাআলার তাওফীক ও অনুগ্রহের পর আমাদের মায়ের দীক্ষাতেই হয়েছে। দ্বীনের প্রতি তাঁর মুহাব্বত ও আগ্রহের কারণেই নিজ সন্তানদেরকে দ্বীনের উপর আমলকারী ও ভালো মুসলমান হিসাবে তিনি দেখতে চাইতেন। আমাদের নামায, রোযা, পর্দা (প্রচলিত প্রথানুযায়ী হলেও) ইত্যাদি পালনে তাঁরই বেশি অবদান ছিল।
এক্ষেত্রেও আম্মাজানের অসন্তুষ্টির ভয়ে এ প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেখানে যেয়ে আমি আমার ধারণার বিপরীত পরিবেশ পেয়েছি। প্রশিক্ষণের পদ্ধতি আমার এতই পছন্দ হয়েছিল যে, পরবর্তীতে এটাতে আমি খুব আগ্রহের সাথেই অংশগ্রহণ করেছিলাম। এই প্রশিক্ষণ আমাকে এক নতুন জগতের অর্থাৎ কুরআনের জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এরপর আল্লাহ তাআলার তাওফীকে এই পথে জিন্দেগি পরিচালনা শুরু করেছিলাম।
আমাদের সমাজের লোকদের সাধারণ প্রবণতা এমন ছিল যে, যখন তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত এবং কোনো কোর্সের আহ্বান আসত, তখন তারা বলত– “ভাই! দ্বীন সম্পর্কে আমরা যা জানি প্রথমে তার উপর আমল করে নেই।” অনেক সময় এভাবেও বলত যে, “না জানলে আমল করতে হয় না” অথবা “যদি একবার ক্লাসে অংশগ্রহণ করা হয় এবং আল্লাহ তাআলার কথা শুনে আমল না করা হয় তাহলে গুনাহ হবে।”
এসকল কথা সুস্পষ্টভাবে নফসকে সন্তুষ্ট করার জন্য বলা হত। অথচ আল্লাহ তাআলা সকল মুসলমানের জন্য দ্বীনের বুনিয়াদী জ্ঞান ও প্রয়োজন পরিমাণ কুরআনের ইলম অর্জন করা ফরয করেছেন। আল্লাহ তাআলার নিকট অজ্ঞ থাকার কোনো ওজর গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং এটা উল্টো পাকড়াও এর কারণ হবে। সে সময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলবেন– “তোমাদের নিকট দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে ছিল। কিন্তু তোমরা ইলম শিক্ষা করা থেকে অজ্ঞ থাকাকে প্রাধান্য দিয়েছিলে।”
কোর্সের প্রশিক্ষক এবং দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষিকা ও খালাম্মাদের মনোযোগ, কল্যাণকামিতা, চরিত্র এবং ভালোবাসা আমাদের মাঝে এমন বন্ধন সৃষ্টি করেছিল যে, কোর্স শেষ হওয়ার পরও ক্লাসে অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা শেষ হয়নি। এদিকে জাগতিক শিক্ষাও চলছিল। তখনো পর্যন্ত আমি জাগতিক শিক্ষাকে ঐ শিক্ষাই মনে করতাম, যার ফযীলতের ব্যাপারে কুরআনের জায়গায় জায়গায় আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। দাজ্জালী ফিতনা এবং তার প্রকাশকে তখনো পরিপূর্ণ চিনতে পারিনি। একারণে ইচ্ছা ছিল জাগতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে তা পরিপূর্ণ কাজে লাগানো।
পরের বছর আরো বড় আকারে কোর্স সংঘটিত হয় এবং এতে আমাদের শিক্ষিকা ছিলেন আরও জ্ঞানী, উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র ও নম্র। তিনি যুবতীদের মেজাজ অনুযায়ী মাসায়েল বুঝানোর মতো যোগ্য একজন খালাম্মা ছিলেন। এই খালাম্মাকে আমি ‘উস্তাদজি’ বলে সম্বোধন করতাম।
পুরো শহর থেকে আসা ছাত্রীদের বড় একটি অংশ এই কোর্সে অংশগ্রহণ করে উপকৃত হয়েছিল। ততদিনে আল্লাহ তাআলার রহমতে কুরআন আমার সিনায় আসতে শুরু করেছে। লোক দেখানো পর্দার পরিবর্তে খাস পর্দা করা এবং জীবনের মাকসাদ বুঝা আল্লাহ আমার জন্য সহজ করে দিয়েছিলেন। কুরআনের নূর ক্ষণস্থায়ী ও ধ্বংসলীলা দুনিয়ার বাস্তবতা স্পষ্ট করে দিয়েছিল। সে সময় আখিরাত অর্জনের আগ্রহ অন্তরকে আলোকিত করে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের উস্তাদজিকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণসমূহ ও তাঁর স্থায়ী সন্তুষ্টির দ্বারা সৌভাগ্যবান করুন। যিনি তাঁর মূল্যবান সময় এবং মেহনতকে আমাদের মতো বিকৃত মস্তিষ্কের গিট খোলার কাজে ব্যয় করেছেন। তাঁদের সময়, মনোযোগ, ইলম এবং কুরআন পড়ানো ও বুঝানোর প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতি অনেকের অন্তরকেই আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পৃক্ত করে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলার রহমতের পর তাঁদের মেহনতের ফলেই আমাদের দাজ্জালী শিক্ষায় ভরপুর অন্তরসমূহকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করার সৌভাগ্য হয়েছিল।
কুরআন বুঝার প্রাথমিক অবস্থাতেই আল্লাহ তাআলা এই বুঝ দান করেছিলেন যে, মুসলিম জাতিকে আল্লাহ তাআলা বিশেষ এক উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, আর সে উদ্দেশ্য হলো দ্বীন কায়েম করা। আর দ্বীন কায়েমের এই ফরয দায়িত্ব আরামদায়ক গদিতে বসে পালন করা সম্ভব নয়।
ইসলাম ও কুফর-নিফাকের দ্বন্দ্ব, তার পরিণতি, আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতি ও ভীতিপ্রদর্শন, সফলতা ও বিজয়, জান্নাত- জাহান্নাম ও তাতে নিক্ষিপ্ত ব্যক্তি, এগুলো হচ্ছে কুরআনের ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। আল্লাহ তাআলা উভয় পথকে পাশাপাশি দেখিয়েছেন। সত্যপথের অনুসারী এবং তাঁদের পথ, তাঁদের উপর আসা পরীক্ষাসমূহ এবং দৃঢ়তার সাথে ঐ পথে যারা প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবেন তাঁদের উত্তম পরিণাম কুরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা আছে। অন্য দিকে বাতিল ও পথভ্রষ্টদের বাহ্যিক উন্নতি এবং তাদের নিকৃষ্ট পরিণতি সম্পর্কেও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকে অবহিত করেছেন।
যখন এসব কিছু পড়া হয়ে গেছে এবং সে অনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করছিলাম তখন আল্লাহর রাহে জিহাদ ব্যতীত এমন কোনো মুক্তির পথ আমি দেখিনি, যার উপর চলে একজন মুসলমান দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিজের ঈমানের হেফাযত এবং পরকালকে নিরাপদ ও নিশ্চিত করতে পারবে। ফলে আল্লাহ তাআলার সামনে আমার দুর্বলতা, অযোগ্যতা, জ্ঞানের স্বল্পতা ও অনুল্লেখযোগ্য আমল নিয়ে দোয়া করেছি এই বলে-
“হে আমার রব! আপনার সামনে পেশ করার মতো কিছুই তো আমার নেই। আছে শুধু এ প্রাণটা, এটাও আপনারই দেয়া। একে আপনি আপনার রহমত দ্বারা জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিন এবং নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও নেককার বান্দাগণের পথে আমাকে পরিচালিত করুন।
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর দেয়া তাওফীক দ্বারা জিহাদ কামনা করেছি এবং এই রাস্তায় চলার মাধ্যম অর্থাৎ মুজাহিদও চেয়েছি। যেহেতু আমি মহিলা, তাই জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহতে আমার অংশগ্রহণের একটা উত্তম উপায় হলো– কোনো মুজাহিদের (স্ত্রী) সাথি হিসাবে থাকা। যার সংশ্রবে থেকে আমি জান্নাতের দিকে ও আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে চলতে পারবো।
এই পথে চলার ‘পাথেয় কী’ অথবা এই পথের ‘কঠোর বাস্তবতা’ কেমন এ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান আমার ছিল না। শুধু একটা জযবা ছিল যাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর মুহাব্বতের রং ভরে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা সর্বদা এ জযবাকে জারি রাখুন এবং তাঁর এ মুহাব্বতের রং স্থায়ী করুন। আমীন।
দু চার দিন নয় বরং এক বছরেরও অধিক সময় (আল্লাহ তাআলা যতদিন চেয়েছেন) আমি আমার রবের নিকট নীরবে নিভৃতে এই দোয়া করেছিলাম-
“হে আমার রব! আপনার রাস্তায় চলার তাওফীক দান করুন। এ রাস্তায় চলার জন্য কোনো নেককারের সংশ্রব দান করুন। এমন সাথি দান করুন, যে ঈমান, ইলমে নাফী (উপকারী ইলম), নেক আমল ও তাকওয়া-পরহেযগারীতে আমার চেয়ে অগ্রগামী হবে। যার ঈমান আমার ঈমান থেকে অনেক মজবুত ও শক্তিশালী হবে, যাতে করে তাঁর সংশ্রব আমার দুর্বল ঈমানকে শক্তিশালী করা এবং হেদায়াত ও কল্যাণের পথে উন্নতির কারণ হয়ে যায়।”
সেই সাথে এটাও চেয়েছি–
“হে আল্লাহ! আপনি যদি জানেন আমি যা চাচ্ছি তাতে আমার কল্যাণ নেই, তাহলে আমি আপনার কাছেই দোয়া করি এতে আপনি কল্যাণ লিখে দিন, এবং তা আমার জন্য নির্ধারণ করে দিন।” অন্তরে একথা দৃঢ় ছিল যে, আল্লাহ তাআলার দরবার থেকে ততক্ষণ মাথা তুলব না, যতক্ষণ না তিনি নিজ রহমতে আমাকে একজন মুজাহিদের সাথি হিসাবে কবুল করবেন।
অবশেষে আমার রব দোয়া কবুল করেছেন এবং আমার মতো অযোগ্য ও দুর্বল বান্দীর জন্য তাঁর উত্তম বান্দাদের মধ্য থেকে একজন অত্যন্ত প্রিয় বান্দাকে নির্বাচন করেছেন।