তিন. ইকদামী জিহাদ ফরয হওয়ার শর্ত:
এতক্ষণ আলোচনা করা হলো, ব্যাপকভাবে ময়দানের জিহাদ (হোক তা ইকদামী কিংবা দিফায়ী) ফরয হওয়ার শর্ত। তবে বিশেষভাবে ইকদামী জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য উপর্যুক্ত ছয়টি শর্ত (মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান, পুরুষ ও জিহাদ করতে সক্ষম হওয়া এবং ফরয হওয়ার ইলম থাকা)-এর পাশাপাশি আরো কিছু শর্ত রয়েছে। তা হচ্ছে—
৭. স্বাধীন হওয়া:
ইকদামী জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য একটি শর্ত হচ্ছে, স্বাধীন হওয়া। গোলামের উপর ইকদামী জিহাদ ফরয নয়। -আল-ইকনা: ১/৩৩৫ (আল-ফারূকুল হাদীসিয়্যাহ); শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ৩/৫১ (ইলমিয়্যাহ)
একটি হাদীসে এসেছে,
“হারিস বিন আবদুল্লাহ বিন আবু রাবীয়াহ রহ. থেকে বর্ণিত— রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক যুদ্ধে ছিলেন। পথে তিনি মুযাইনা গোত্রের কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাদের এক মহিলার গোলাম তাঁর অনুসরণ করল। কিছু দূর যাওয়ার পর সে রাসূলকে সালাম দিল। রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি অমুক তো?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ’। তিনি বললেন, ‘তোমার উদ্দেশ্য কী?’ সে বলল, ‘আমি আপনার সাথে জিহাদে অংশ নিতে চাই’। রাসূল বললেন, ‘তোমার মালিকানী কি তোমাকে অনুমতি দিয়েছে?’ সে বলল, ‘না’। তখন রাসূল বললেন, ‘তাহলে তুমি তার কাছে ফিরে যাও এবং তাকে বিষয়টি জানাও। কেননা, যদি তুমি তার কাছে ফিরে যাওয়ার আগে মৃত্যুবরণ করো, তাহলে তোমার অবস্থা বেনামাজি এক গোলামের মত হবে। আর তার কাছে আমার সালাম পৌঁছে দিও।” –মুস্তদরাকে হাকিম: ২৫৫৩; সুনানে বায়হাকী: ১৭৮৭১। হাকিম রহ. সহীহ বলেছেন এবং যাহাবী রহ. তা সমর্থন করেছেন। হাফিজ ইবনে হাজার রহ. মুরসাল হাসান বলেছেন।
তবে মালিক যদি গোলামকে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি দেয়, তাহলে স্বাধীন ব্যক্তির মত গোলামের উপরও ইকদামী জিহাদ ফরযে কেফায়া হয়ে যাবে। -ফাতহুল কাদীর: ৫/৪২৫ (ইলমিয়্যাহ); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৫ (দারুল ফিকর)
৮. মা-বাবার অনুমতি থাকা:
ইকদামী জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য অন্যতম শর্ত হচ্ছে, মা-বাবার অনুমতি থাকা। মা-বাবা অনুমতি না দিলে সন্তানের উপর ইকদামী জিহাদ ফরয নয়। -বিদায়াতুল মুজতাহিদ: ২/১৪৪ (দারুল হাদীস); মাওসূআতুল ইজমা ফিল-ফিকহিল ইসলামী: ৬/৬৩ (দারুল ফযীলত); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৪ (দারুল ফিকর)
এক হাদীসে এসেছে,
আবদুল্লাহ বিন আমর রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিহাদে অংশগ্রহণের অনুমতি চাইল। রাসূল তাকে বললেন, ‘তোমার পিতা-মাতা কি জীবিত আছেন?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ’। রাসূল বললেন, ‘তাহলে তাদের সেবা করার মাধ্যমেই তুমি জিহাদ করো’।” –সহীহ বুখারী: ৩০০৪; সহীহ মুসলিম: ২৫৪৯
আরেক হাদীসে এসেছে,
আবু সাঈদ খুদরী রাদি. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ইয়েমেন থেকে হিজরত করে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমি হিজরত করেছি’। রাসূল তাকে বললেন, ‘তুমি শিরক থেকে হিজরত করেছ, কিন্তু এখন জিহাদ বাকি আছে। তোমার কি ইয়েমেনে কেউ আছে?’ সে বলল, ‘আমার পিতা-মাতা আছেন’। রাসূল বললেন, ‘তারা কি তোমাকে অনুমতি দিয়েছে?’ সে বলল, ‘না’। রাসূল বললেন, ‘তুমি তাদের কাছে ফিরে যাও এবং তাদের অনুমতি নাও। যদি তারা অনুমতি দেয়, তাহলে জিহাদে শরীক হও; আর যদি অনুমতি না দেয়, তাহলে তাদের খেদমত ও সেবা করো।” –মুস্তাদরাকে হাকিম: ২৫০১; সুনানে আবু দাউদ: ২৫৩০; মুসনাদে আহমাদ: ১১৭২১; সহীহ ইবনে হিব্বান: ৪২২
চার. জিহাদ বৈধ হওয়ার শর্ত:
জিহাদ বৈধ হওয়ার শর্ত দুই প্রকার: এক. ইকদামী ও দিফায়ী উভয় প্রকার জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত; দুই. শুধু ইকদামী জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত ।
এক. উভয় প্রকার জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত:
ইকদামী ও দিফায়ী উভয় প্রকার জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য কেবল একটি শর্ত রয়েছে। আর তা হচ্ছে—
১. জিহাদ করার সক্ষমতা থাকা:
আমরা ইতিপূর্বে জিহাদ ফরয হওয়ার শর্তে আলোচনা করেছি যে, উভয় প্রকার জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য সক্ষমতা অন্যতম শর্ত। তদ্রূপ উভয় প্রকার জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্যেও সক্ষমতা শর্ত। -ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/১৮৮ (দারুল ফিকর); এ’লাউস সুনান: ১২/২৭ (এদারাতুল কুরআন); আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ: ৭/১০৮ (ওয়াযারাতুল আওকাফ)
তবে এখানে সক্ষমতা দ্বারা একক সক্ষমতা উদ্দেশ্য নয়; বরং সমষ্টিগত সক্ষমতা উদ্দেশ্য। সমষ্টিগত সক্ষমতা বলতে যে মুজাহিদ দল যুদ্ধ শুরু করতে চাচ্ছে, তাদের সমষ্টিগত সক্ষমতা উদ্দেশ্য; পুরো মুসলিম উম্মাহর সক্ষমতা নয়। কেননা, বাস্তবতা হচ্ছে পুরো মুসলিম উম্মার প্রতিটা সদস্য দীনের জন্য ফেদা হবে না এবং দীন কায়েমের জিহাদের অংশ নিবে না। হ্যাঁ, তারা জিহাদ ফরয হওয়া সত্বেও শরিক না হওয়ার কারণে গুনাহগার হবে। তবে যারা দীনের জন্য ফেদা হয়ে যুদ্ধ করতে চায়, তারা যুদ্ধ শুরু করতে হলে তাদের সমষ্টিগত সক্ষমতা অপরিহার্য। অন্যথায় তারাও কাফেরদের দ্বারা নির্মূল হয়ে এ’লায়ে কালিমাতুল্লাহ’র কাজ বাধাগ্রস্থ হবে।
সক্ষমতার ক্ষেত্রে যদি নিশ্চিত কিংবা প্রবল ধারণার ভিত্তিতে মনে হয় যে, বর্তমান শক্তি নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হলে মুসলিম বাহিনী সমূলে নির্মূল হয়ে যাবে, তাহলে যুদ্ধ শুরু করা জায়েয নয়। বরং এমতাবস্থায় ফরয দায়িত্ব হচ্ছে, যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমে সক্ষমতা অর্জন করা।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের ধরনের ভিত্তিতে সক্ষমতার ধরনও ভিন্ন হবে। সম্মুখসমরের যুদ্ধের সক্ষমতা আর গেরিলা যুদ্ধের সক্ষমতা এক নয়। তদ্রূপ নিজ ভূখণ্ডে যুদ্ধের সক্ষমতা এবং ভিন্ন দেশে গিয়ে যুদ্ধ করার সক্ষমতা এক নয়। সুতরাং মুজাহিদ দলের কতটুকু সক্ষমতা আছে এবং এতটুকু সক্ষমতা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করা বৈধ হবে কি-না—তা যুদ্ধ ও ফিকহ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা সকল দিক বিবেচনা করে ঠিক করবেন। অন্যদের উচিৎ তাদের আনুগত্য করা।
সামর্থ না থাকা অবস্থায় করণীয়:
উপরিউক্ত প্রকার সামর্থ না থাকা অবস্থায় সামর্থ না থাকার বাহানায় বসে থাকার সুযোগ নেই। বরং সম্ভাব্য সকল পদ্ধতিতে সামর্থ অর্জন করা ফরয। কেননা, এমনিতেই জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করা স্বতন্ত্র একটি ফরয।
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,
“তোমরা তাদের (মুকাবিলার) জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ব-ছাউনি প্রস্তুত কর, যা দ্বারা তোমরা আল্লাহর শত্রু ও নিজেদের শত্রুদেরকে সন্ত্রস্ত করে রাখবে এবং তাদের ছাড়া সেই সব শত্রুদেরকেও, যাদেরকে তোমরা এখনও জান না; (কিন্তু) আল্লাহ তাদেরকে জানেন। তোমরা আল্লাহর পথে যা-কিছু ব্যয় করবে, তা তোমাদেরকে পরিপূর্ণরূপে দেওয়া হবে এবং তোমাদের উপর জুলুম করা হবে না।” –সূরা আনফাল: ৬০
উক্ত আয়াতে তিন ধরনের প্রস্তুতির আদেশ করা হয়েছে: ক. শারিরিক প্রস্তুতি; খ. অস্ত্রের প্রস্তুতি এবং গ. অর্থ জোগানের প্রস্তুতি। আর জানা কথা, জিহাদের বাহ্যিক প্রস্তুতির মূল ক্ষেত্র এ তিনটিই। আল্লাহ তাআলা মৌলিক উক্ত তিন ধরনের প্রস্তুতি সামর্থ অনুযায়ী অর্জন করার আদেশ করেছেন। এক্ষেত্রে যুগ ও সময় উপযোগী অস্ত্র ও যুদ্ধসামগ্রী জমা করা আবশ্যক।
ইমাম কুরতুবী রহ. (৬৭১ হি.) বলেন:
“অশ্বচালনা শিক্ষা করা এবং অস্ত্রপাতির ব্যবহার রপ্ত করা ফরযে কিফায়া। তবে কখনো কখনো ফরযে আইন হয়ে যায়।” -তাফসীরে কুরতুবী: ৮/৩৬ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ)
উপরন্তু যখন একটি ফরয বিধান উক্ত সামর্থ অর্জনের উপর নির্ভরশীল হয়ে যাবে, তখন তার ফরযিয়াত আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।
ফিকহের স্বতশিদ্ধ একটি মূলনীতি হচ্ছে,
“যে কাজ ছাড়া ওয়াজিব বিধান পরিপূর্ণ হয় না, উক্ত কাজও ওয়াজিব।” -আল-বাহরুর রায়েক: ১/৬৪ (ইলমিয়্যাহ); আয-যাখীরাহ: ১০/২৩ (দারুল গারবিল ইসলামী); আল-মাজমূ’: ১/১২৪ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ); আল-মুগনী: ২/২২০ (মাকতাবুল কাহেরা)
আগের পর্ব:
ফিকহুল জিহাদ; পর্ব ১৬ ➤ ময়দানের জিহাদ ফরয হওয়ার শর্ত: (২য় অংশ)
- https://dawahilallah.com/forum/%E0%A...A6%82%E0%A6%B6
এতক্ষণ আলোচনা করা হলো, ব্যাপকভাবে ময়দানের জিহাদ (হোক তা ইকদামী কিংবা দিফায়ী) ফরয হওয়ার শর্ত। তবে বিশেষভাবে ইকদামী জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য উপর্যুক্ত ছয়টি শর্ত (মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান, পুরুষ ও জিহাদ করতে সক্ষম হওয়া এবং ফরয হওয়ার ইলম থাকা)-এর পাশাপাশি আরো কিছু শর্ত রয়েছে। তা হচ্ছে—
৭. স্বাধীন হওয়া:
ইকদামী জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য একটি শর্ত হচ্ছে, স্বাধীন হওয়া। গোলামের উপর ইকদামী জিহাদ ফরয নয়। -আল-ইকনা: ১/৩৩৫ (আল-ফারূকুল হাদীসিয়্যাহ); শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ৩/৫১ (ইলমিয়্যাহ)
একটি হাদীসে এসেছে,
عَنِ الْحَارِثِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي رَبِيعَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ فِي بَعْضِ مَغَازِيهِ، فَمَرَّ بِأُنَاسٍ مِنْ مُزَيْنَةَ فَاتَّبَعَهُ عَبْدٌ لِامْرَأَةٍ مِنْهُمْ فَلَمَّا كَانَ فِي بَعْضِ الطَّرِيقِ سَلَّمَ عَلَيْهِ فَقَالَ: «فُلَانٌ؟» قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: «مَا شَأْنُكَ؟» قَالَ: أُجَاهِدُ مَعَكَ قَالَ: «أَذِنَتْ لَكَ سَيِّدَتُكَ؟» قَالَ: لَا. قَالَ: «ارْجِعْ إِلَيْهَا فَأَخْبِرْهَا فَإِنَّ مَثَلَكَ مَثَلُ عَبْدٍ لَا يُصَلِّي إِنْ مُتَّ قَبْلَ أَنْ تَرْجِعَ إِلَيْهَا، وَاقْرَأْ عَلَيْهَا السَّلَامَ» -رواه الحاكم (2553) والبيهقي (17871). وقال الحاكم: هذا حديث صحيح الإسناد.اهـــ ووافقه الذهبي. وقال الحافظ ابن حجر في موافقة الخبر الخبر ط مكتبة الرشد (2/ 37): هذا مرسل حسن الإِسناد.اهــــ
“হারিস বিন আবদুল্লাহ বিন আবু রাবীয়াহ রহ. থেকে বর্ণিত— রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক যুদ্ধে ছিলেন। পথে তিনি মুযাইনা গোত্রের কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাদের এক মহিলার গোলাম তাঁর অনুসরণ করল। কিছু দূর যাওয়ার পর সে রাসূলকে সালাম দিল। রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি অমুক তো?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ’। তিনি বললেন, ‘তোমার উদ্দেশ্য কী?’ সে বলল, ‘আমি আপনার সাথে জিহাদে অংশ নিতে চাই’। রাসূল বললেন, ‘তোমার মালিকানী কি তোমাকে অনুমতি দিয়েছে?’ সে বলল, ‘না’। তখন রাসূল বললেন, ‘তাহলে তুমি তার কাছে ফিরে যাও এবং তাকে বিষয়টি জানাও। কেননা, যদি তুমি তার কাছে ফিরে যাওয়ার আগে মৃত্যুবরণ করো, তাহলে তোমার অবস্থা বেনামাজি এক গোলামের মত হবে। আর তার কাছে আমার সালাম পৌঁছে দিও।” –মুস্তদরাকে হাকিম: ২৫৫৩; সুনানে বায়হাকী: ১৭৮৭১। হাকিম রহ. সহীহ বলেছেন এবং যাহাবী রহ. তা সমর্থন করেছেন। হাফিজ ইবনে হাজার রহ. মুরসাল হাসান বলেছেন।
তবে মালিক যদি গোলামকে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি দেয়, তাহলে স্বাধীন ব্যক্তির মত গোলামের উপরও ইকদামী জিহাদ ফরযে কেফায়া হয়ে যাবে। -ফাতহুল কাদীর: ৫/৪২৫ (ইলমিয়্যাহ); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৫ (দারুল ফিকর)
৮. মা-বাবার অনুমতি থাকা:
ইকদামী জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য অন্যতম শর্ত হচ্ছে, মা-বাবার অনুমতি থাকা। মা-বাবা অনুমতি না দিলে সন্তানের উপর ইকদামী জিহাদ ফরয নয়। -বিদায়াতুল মুজতাহিদ: ২/১৪৪ (দারুল হাদীস); মাওসূআতুল ইজমা ফিল-ফিকহিল ইসলামী: ৬/৬৩ (দারুল ফযীলত); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৪ (দারুল ফিকর)
এক হাদীসে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاسْتَأْذَنَهُ فِي الجِهَادِ، فَقَالَ: «أَحَيٌّ وَالِدَاكَ؟»، قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: «فَفِيهِمَا فَجَاهِدْ» -رواه البخاري (3004) ومسلم (2549)
আবদুল্লাহ বিন আমর রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিহাদে অংশগ্রহণের অনুমতি চাইল। রাসূল তাকে বললেন, ‘তোমার পিতা-মাতা কি জীবিত আছেন?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ’। রাসূল বললেন, ‘তাহলে তাদের সেবা করার মাধ্যমেই তুমি জিহাদ করো’।” –সহীহ বুখারী: ৩০০৪; সহীহ মুসলিম: ২৫৪৯
আরেক হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَجُلًا هَاجَرَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْيَمَنِ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي هَاجَرْتُ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قَدْ هَجَرْتَ مِنَ الشِّرْكِ وَلَكِنَّهُ الْجِهَادُ هَلْ لَكَ أَحَدٌ بِالْيَمَنِ؟» قَالَ: أَبَوَايَ قَالَ: «أَذِنَا لَكَ؟» قَالَ: لَا قَالَ: «فَارْجِعْ فَاسْتَأْذِنْهُمَا، فَإِنْ أَذِنَا لَكَ فَجَاهِدْ، وَإِلَّا فَبِرَّهُمَا» -رواه الحاكم (2501) وأبو داود (2530) وأحمد (11721) وابن حبان (422). وقال الحاكم: هذا حديث صحيح الإسناد.اهــــ ولكن تعقبه الذهبي بأن دراجا الراوي واه. وقال ابن عبد الهادي في حاشية الإلمام ط دار النوادر (1/ 347): وفي إسناده دراج أبو السمح، وقد وثقه بعضهم وضعفه بعضهم، ولم يخرجا له.اهــــ وصححه ابن الحبان، وأقره عليه ابن حجر في فتح الباري ط دار الفكر (6/ 140)
আবু সাঈদ খুদরী রাদি. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ইয়েমেন থেকে হিজরত করে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমি হিজরত করেছি’। রাসূল তাকে বললেন, ‘তুমি শিরক থেকে হিজরত করেছ, কিন্তু এখন জিহাদ বাকি আছে। তোমার কি ইয়েমেনে কেউ আছে?’ সে বলল, ‘আমার পিতা-মাতা আছেন’। রাসূল বললেন, ‘তারা কি তোমাকে অনুমতি দিয়েছে?’ সে বলল, ‘না’। রাসূল বললেন, ‘তুমি তাদের কাছে ফিরে যাও এবং তাদের অনুমতি নাও। যদি তারা অনুমতি দেয়, তাহলে জিহাদে শরীক হও; আর যদি অনুমতি না দেয়, তাহলে তাদের খেদমত ও সেবা করো।” –মুস্তাদরাকে হাকিম: ২৫০১; সুনানে আবু দাউদ: ২৫৩০; মুসনাদে আহমাদ: ১১৭২১; সহীহ ইবনে হিব্বান: ৪২২
চার. জিহাদ বৈধ হওয়ার শর্ত:
জিহাদ বৈধ হওয়ার শর্ত দুই প্রকার: এক. ইকদামী ও দিফায়ী উভয় প্রকার জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত; দুই. শুধু ইকদামী জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত ।
এক. উভয় প্রকার জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত:
ইকদামী ও দিফায়ী উভয় প্রকার জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য কেবল একটি শর্ত রয়েছে। আর তা হচ্ছে—
১. জিহাদ করার সক্ষমতা থাকা:
আমরা ইতিপূর্বে জিহাদ ফরয হওয়ার শর্তে আলোচনা করেছি যে, উভয় প্রকার জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য সক্ষমতা অন্যতম শর্ত। তদ্রূপ উভয় প্রকার জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্যেও সক্ষমতা শর্ত। -ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/১৮৮ (দারুল ফিকর); এ’লাউস সুনান: ১২/২৭ (এদারাতুল কুরআন); আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ: ৭/১০৮ (ওয়াযারাতুল আওকাফ)
তবে এখানে সক্ষমতা দ্বারা একক সক্ষমতা উদ্দেশ্য নয়; বরং সমষ্টিগত সক্ষমতা উদ্দেশ্য। সমষ্টিগত সক্ষমতা বলতে যে মুজাহিদ দল যুদ্ধ শুরু করতে চাচ্ছে, তাদের সমষ্টিগত সক্ষমতা উদ্দেশ্য; পুরো মুসলিম উম্মাহর সক্ষমতা নয়। কেননা, বাস্তবতা হচ্ছে পুরো মুসলিম উম্মার প্রতিটা সদস্য দীনের জন্য ফেদা হবে না এবং দীন কায়েমের জিহাদের অংশ নিবে না। হ্যাঁ, তারা জিহাদ ফরয হওয়া সত্বেও শরিক না হওয়ার কারণে গুনাহগার হবে। তবে যারা দীনের জন্য ফেদা হয়ে যুদ্ধ করতে চায়, তারা যুদ্ধ শুরু করতে হলে তাদের সমষ্টিগত সক্ষমতা অপরিহার্য। অন্যথায় তারাও কাফেরদের দ্বারা নির্মূল হয়ে এ’লায়ে কালিমাতুল্লাহ’র কাজ বাধাগ্রস্থ হবে।
সক্ষমতার ক্ষেত্রে যদি নিশ্চিত কিংবা প্রবল ধারণার ভিত্তিতে মনে হয় যে, বর্তমান শক্তি নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হলে মুসলিম বাহিনী সমূলে নির্মূল হয়ে যাবে, তাহলে যুদ্ধ শুরু করা জায়েয নয়। বরং এমতাবস্থায় ফরয দায়িত্ব হচ্ছে, যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমে সক্ষমতা অর্জন করা।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের ধরনের ভিত্তিতে সক্ষমতার ধরনও ভিন্ন হবে। সম্মুখসমরের যুদ্ধের সক্ষমতা আর গেরিলা যুদ্ধের সক্ষমতা এক নয়। তদ্রূপ নিজ ভূখণ্ডে যুদ্ধের সক্ষমতা এবং ভিন্ন দেশে গিয়ে যুদ্ধ করার সক্ষমতা এক নয়। সুতরাং মুজাহিদ দলের কতটুকু সক্ষমতা আছে এবং এতটুকু সক্ষমতা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করা বৈধ হবে কি-না—তা যুদ্ধ ও ফিকহ বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা সকল দিক বিবেচনা করে ঠিক করবেন। অন্যদের উচিৎ তাদের আনুগত্য করা।
সামর্থ না থাকা অবস্থায় করণীয়:
উপরিউক্ত প্রকার সামর্থ না থাকা অবস্থায় সামর্থ না থাকার বাহানায় বসে থাকার সুযোগ নেই। বরং সম্ভাব্য সকল পদ্ধতিতে সামর্থ অর্জন করা ফরয। কেননা, এমনিতেই জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করা স্বতন্ত্র একটি ফরয।
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,
وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ -سورة الأنفال: 60
“তোমরা তাদের (মুকাবিলার) জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ব-ছাউনি প্রস্তুত কর, যা দ্বারা তোমরা আল্লাহর শত্রু ও নিজেদের শত্রুদেরকে সন্ত্রস্ত করে রাখবে এবং তাদের ছাড়া সেই সব শত্রুদেরকেও, যাদেরকে তোমরা এখনও জান না; (কিন্তু) আল্লাহ তাদেরকে জানেন। তোমরা আল্লাহর পথে যা-কিছু ব্যয় করবে, তা তোমাদেরকে পরিপূর্ণরূপে দেওয়া হবে এবং তোমাদের উপর জুলুম করা হবে না।” –সূরা আনফাল: ৬০
উক্ত আয়াতে তিন ধরনের প্রস্তুতির আদেশ করা হয়েছে: ক. শারিরিক প্রস্তুতি; খ. অস্ত্রের প্রস্তুতি এবং গ. অর্থ জোগানের প্রস্তুতি। আর জানা কথা, জিহাদের বাহ্যিক প্রস্তুতির মূল ক্ষেত্র এ তিনটিই। আল্লাহ তাআলা মৌলিক উক্ত তিন ধরনের প্রস্তুতি সামর্থ অনুযায়ী অর্জন করার আদেশ করেছেন। এক্ষেত্রে যুগ ও সময় উপযোগী অস্ত্র ও যুদ্ধসামগ্রী জমা করা আবশ্যক।
ইমাম কুরতুবী রহ. (৬৭১ হি.) বলেন:
وتعلم الفروسية واستعمال الأسلحة فرض كفاية وقد يتعين.اهـ -تفسير القرطبي: 8/36، ط. دار الكتب المصرية
“অশ্বচালনা শিক্ষা করা এবং অস্ত্রপাতির ব্যবহার রপ্ত করা ফরযে কিফায়া। তবে কখনো কখনো ফরযে আইন হয়ে যায়।” -তাফসীরে কুরতুবী: ৮/৩৬ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ)
উপরন্তু যখন একটি ফরয বিধান উক্ত সামর্থ অর্জনের উপর নির্ভরশীল হয়ে যাবে, তখন তার ফরযিয়াত আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।
ফিকহের স্বতশিদ্ধ একটি মূলনীতি হচ্ছে,
وما لا يتم الواجب إلا به فهو واجب
“যে কাজ ছাড়া ওয়াজিব বিধান পরিপূর্ণ হয় না, উক্ত কাজও ওয়াজিব।” -আল-বাহরুর রায়েক: ১/৬৪ (ইলমিয়্যাহ); আয-যাখীরাহ: ১০/২৩ (দারুল গারবিল ইসলামী); আল-মাজমূ’: ১/১২৪ (মাজমাউল মালিক ফাহাদ); আল-মুগনী: ২/২২০ (মাকতাবুল কাহেরা)
আগের পর্ব:
ফিকহুল জিহাদ; পর্ব ১৬ ➤ ময়দানের জিহাদ ফরয হওয়ার শর্ত: (২য় অংশ)
- https://dawahilallah.com/forum/%E0%A...A6%82%E0%A6%B6
Comment