দুই. ইকদামী জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত:
ইকদামী জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য উপরিউক্ত শর্ত (সক্ষমতা থাকা) ছাড়া আরো কিছু শর্ত রয়েছে। তা হচ্ছে—
২. কাফেরদের কাছে ইসলাম ও যিম্মাচুক্তি গ্রহণের দাওয়াত পৌঁছা:
যে কাফেরদের কাছে আগে থেকে দাওয়াত পৌঁছেনি, এমন কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে, তাদেরকে ইসলাম ও যিম্মাচুক্তি গ্রহণের দাওয়াত দেওয়া। -মাবসূতে সারাখসী: ১০/৬ (দারুল মা’রেফা); বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৪৬ (দারুল হাদীস); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৯ (দারুল ফিকর)
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,
সহীহ মুসলিমের এক হাদীসে এসেছে,
পক্ষান্তরে যদি তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে থাকে, তাহলে আর নতুন করে দাওয়াত দেওয়া আবশ্যক নয়। -মাবসূতে সারাখসী: ১০/৬ (দারুল মা’রেফা); বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৪৬ (দারুল হাদীস); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৯ (দারুল ফিকর)
বিশিষ্ট তাবেয়ী ইবনে আ’উন রহ. থেকে বর্ণিত,
অবশ্য আগে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে থাকলেও জিহাদের পূর্বমূহুর্তে নতুন করে পুনরায় দাওয়াত দেওয়া মুস্তাহাব।
খায়বারবাসীদের কাছে আগে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছা সত্বেও যুদ্ধের পূর্বমূহুর্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুনভাবে দাওয়াত দেওয়ার আদেশ করেছেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
তবে ফুকাহায়ে কেরাম জিহাদের পূর্বমূহুর্তে নতুন করে দাওয়াত দেওয়া মুস্তাহাব হওয়ার জন্য দুই শর্ত আরোপ করেছেন। উক্ত শর্ত দুটি পাওয়া গেলে মুস্তাহাব হবে; অন্যথায় মুস্তাহাব নয়। শর্ত দুটি হচ্ছে—
এক. দাওয়াতের মাধ্যমে তাদের ইসলাম বা যিম্মাচুক্তি গ্রহণ করার ব্যাপারে আশা থাকা।
দুই. দাওয়াত দেওয়ার কারণে অগ্রীম এমন কোনো কৌশল অবলম্বনের আশঙ্কা না থাকা, যদ্দরুণ যুদ্ধ আরো কঠিন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৪৬ (দারুল হাদীস); ফাতহুল কাদীর: ৫/৪২৯ (ইলমিয়্যাহ); রদ্দুল মুহতার: ৬/২০৬ (দারুল ফিকর)
যদি এমন হয় যে, কোনো সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছিল, তবে যিম্মাচুক্তির দাওয়াত পৌঁছেনি এবং তাদের সাথে যিম্মাচুক্তি বৈধ,[1] তাহলে যিম্মাচুক্তির দাওয়াত না দিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ শুরু করা বৈধ হবে না। -ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া: ৭/১৫ (যাকারিয়া); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৯ (দারুল ফিকর)
উল্লেখ্য, উক্ত শর্ত ইকদামী জিহাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পক্ষান্তরে কোনো কাফের গোষ্ঠি মুসলিম ভূখণ্ডে আক্রমণ করলে, তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত না পৌঁছলেও তাদেরকে প্রতিহত করা ফরয এবং এর জন্য তাদেরকে দাওয়াত দেওয়া আবশ্যক নয়। হ্যাঁ, তাদেরকে মুসলিম ভূখণ্ড থেকে প্রতিহত করার পরে তাদের এলাকায় ঢুকে জিহাদ করতে হলে আগে দাওয়াত দিতে হবে। অন্যথায় তা জায়েয হবে না। -আল-কাওকাবুদ দুররী: ২/৪০৪
৩. নিরাপত্তা বা যুদ্ধবিরতি চুক্তি না থাকা:
ইকদামী জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য আরেকটি শর্ত হচ্ছে, শত্রুর সাথে নিরাপত্তা বা যুদ্ধবিরতি চুক্তি না থাকা। শত্রু বাহীনিকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরে কিংবা তাদের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা জায়েয নয়। -ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/১৮৮ (দারুল ফিকর)
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে,
অন্য এক হাদীসে এসেছে,
সুতরাং এক্ষেত্রে চুক্তির মেয়াদ উত্তির্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর যদি মেয়াদ উত্তির্ণ হওয়ার আগে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য উপকারী মনে হয়, তাহলে স্পষ্টভাবে তাদের সাথে কৃত চুক্তি বিচ্ছন্ন হওয়ার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ করতে পারবে। এটা অঙ্গীকার ভঙ্গ নয়; বরং অঙ্গীকার বিলুপ্ত করা। আর এটা জায়েয। -মাবসূতে সারাখসী: ১০/৮৬ (দারুল মা’রেফা); বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৭১ (দারুল হাদীস); রদ্দুল মুহতার: ৪/১৩৩ (দারুল ফিকর)
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,
কাফেরদের স্বভাবই এমন যে, তারা সুযোগ পেলেই মুসলিমদের সাতে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। তা সত্বেও মুসলিমদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে সাময়িক সময়ের জন্য চুক্তি করা বৈধ করা হয়েছে। কিন্তু যখন প্রয়োজন আর থাকবে না, তখন তাদের মূল স্বভাবের ভিত্তিতে চুক্তি বিলুপ্ত ঘোষণা করে যুদ্ধ শুরু করা হবে। -ফাতহুল কাদীর: ৫/৪৪২ (ইলমিয়্যাহ)
৪. মা-বাবার অনুমতি থাকা:
ইকদামী জিহাদে অংশগ্রহণ বৈধ হওয়ার জন্য আরেকটি শর্ত হচ্ছে, মা-বাবার অনুমতি থাকা। মা-বাবার অনুমতি ছাড়া সন্তানের জন্য ইকদামী জিহাদে অংশগ্রহণ করা বৈধ নয়; হোক সে বালেগ কিংবা নাবালেগ।
এক হাদীসে এসেছে,
আরেক হাদীসে এসেছে,
সুতরাং মা-বাবার উভয় জীবিত থাকলে উভয়ের অনুমতি শর্ত; একজনের অনুমতি যথেষ্ট নয়। তদ্রূপ তারা জীবিত থাকলে শুধু তাঁদের অনুমতি যথেষ্ট; অন্য কারো অনুমতি লাগবে না। মা-বাবা উভয় কিংবা তাদের কোনো একজন জীবিত না থাকাবস্থায় মায়ের স্থলে নানি এবং বাবার স্থলে দাদার অনুমতি শর্ত। উক্ত চারজন ছাড়া আর কারো অনুমতি শর্ত নয়। তবে অন্য কারো ‘নাফাকা’র দায়িত্ব যদি তার উপর বর্তায় এবং সে জিহাদে বের হওয়ার কারণে উক্ত ব্যক্তির ক্ষতির আশঙ্কা হয়, তাহলে এক্ষেত্রে তার নাফাকার ব্যবস্থা করে বের হবে। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ১/১৩৪ (ইলমিয়্যাহ); ফাতাওয়ায়ে কাযীখান: ৩/৪১৪ (ইলমিয়্যাহ) ; রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৪, ১২৫ (দারুল ফিকর)
মা-বাবার অনুমতির শর্তটি ইকদামী জিহাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দিফায়ী জিহাদের ক্ষেত্রে এ শর্ত নয়। বরং মা-বাবা জিহাদ করতে বাধা দিলে সন্তানের জন্য তাদের নিষেধ অমান্য করে জিহাদে শরিক হওয়া ফরয। এবং মা-বাবাও ফরয আদায়ে নিষেধ করার কারণে গুনাহগার হবেন। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ১/১৩৪ (ইলমিয়্যাহ); বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৪১ (দারুল হাদীস); আদ্দুররুল মুখতার: ৪/১২৭ (দারুল ফিকর)
উল্লেখ্য, মা-বাবার অনুমতি ছাড়া সন্তান সরাসরি জিহাদ শরীক হতে না পারলেও জিহাদ-সংশ্লিষ্ট এমন কাজে শরীক হতে পারবে, যাতে তার ক্ষতির আশঙ্কা নেই। -বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৪১ (দারুল হাদীস); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৫ (দারুল ফিকর)
৫. ঋণদাতার অনুমতি থাকা:
ইকদামী জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য আরেকটি শর্ত হচ্ছে, ঋণদাতার অনুমতি থাকা। নিজের উপর কারো ত্বরিৎ ঋণ থাকলে, সম্ভব হলে তা পরিশোধ করে জিহাদে বের হবে। আর অসচ্ছলতার কারণে যদি ঋণ আদায় সম্ভব না হয়, তাহলে জিহাদে বের হতে হলে ঋণদাতার অনুমতি লাগবে। ঋণদাতার অনুমতি ছাড়া ইকদামী জিহাদ করা বৈধ হবে না। -ফাতাওয়ায়ে কাযীখান: ৩/৪১৪ (ইলমিয়্যাহ); আল-বাহরুর রায়েক: ৫/৭৭ (দারুল কিতাবিল ইসলামী); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৪ (দারুল ফিকর)
দিফায়ী জিহাদের ক্ষেত্রে ঋণদাতার অনুমতি শর্ত নয়। তবে ঋণ আদায় করা সম্ভব হলে ঋণ আদায় করে জিহাদে বের হতে হবে। কেননা, ঋণ আদায় করা এবং আগ্রাসী শত্রু প্রতিহত করা—উভয়টি স্বতন্ত্র ফরয; উভয়টি আদায় করা সম্ভব হলে উভয়টিই আদায় করতে হবে। হ্যাঁ, পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে, আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে ঋণ আদায় সম্ভব নয়; কিন্তু শত্রু প্রতিহত করার জন্য এ মূহুর্তে জিহাদে বের হতে হবে, তাহলে ঋণ থাকা সত্বেও জিহাদে বের হতে ঋণদাতার অনুমতি লাগবে না। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ৪/২১২ (ইলমিয়্যাহ); ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/১৯০ (দারুল ফিকর)
বর্তমানে যেহেতু জিহাদের কার্যকারী পদ্ধতি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধ; আর তা ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধক নয়, তাই জিহাদের বাহানায় ঋণ আদায় না করা কিংবা আদায় করা জরুরী মনে না করার কোনো সুযোগ নেই।
৬. ইমামের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা না থাকা:
ইকদামী জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য আরেকটি শর্ত হচ্ছে, ইমামের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা না থাকা। ইমাম যদি কোনো মাসলাহাত ও কল্যাণ বিবেচনা করে জিহাদ করতে বারণ করেন, তাহলে জিহাদ করা বৈধ হবে না। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ১/১২৬; ৪/২১৫ (ইলমিয়্যাহ); ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/১৯২ (দারুল ফিকর)
তবে ইমাম যদি কাপুরুষতা বা অবহেলাবশত জিহাদ করতে নিষেধ করে থাকে কিংবা কাফেরদের স্বার্থে জিহাদ করতে বারণ করে থাকে এবং এ বিষয়টি সবার কাছে বা অধিকাংশের কাছে একেবারে স্পষ্ট, তাহলে তার নিষেধ মান্যযোগ্য থাকবে না। বরং তার নিষেধ উপেক্ষা করে জিহাদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সাধারণ মুসলিমদের উপর ফরয। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ১/১১৭ (ইলমিয়্যাহ); ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/১৯২ (দারুল ফিকর); তুহফাতুল মুহতাজ: ৯/২৩৭ (দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরবী); আল-মুহাল্লা: ৫/৪২১ (দারুল ফিকর); আহকামুল মুজাহিদ বিন-নাফস: ৩১৬ (মাকতাবাতুল উলূমি ওয়াল হিকাম)
উক্ত শর্ত ইকদামী জিহাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্যথায় দিফায়ী জিহাদের ক্ষেত্রে কারো অনুমতি ধর্তব্য। ইমামের দায়িত্ব হচ্ছে, সবাইকে নিয়ে শত্রু প্রতিহত করা। যদি তাতে অবহেলা কিংবা নিষেধ করে, তাহলে ফরয তরকের কারণে সে গুনাহগার হবে। তখন সাধারণ মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে তার নিষেধ অমান্য করে জিহাদের ফরয দায়িত্ব আদায় করা। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ৪/২১৫ (ইলমিয়্যাহ); ফাতহুল আলিয়্যিল মালিক: ১/৩৯২ (দারুল মা’রেফা)
উপরিউক্ত আলোচনা হচ্ছে, ইমাম জিহাদ করতে নিষেধ করলে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জিহাদ করার বিধান। কিন্তু ইমাম যদি জিহাদ করতে নিষেধ না করেন, তাহলে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো মুজাহিদ দলের জন্য জিহাদ করা জায়েয হবে কি-না?
যদি মুজাহিদ দল এতটুকু শক্তিশালী হয় যে, তারা কাফেরদের সাথে জিহাদ করার সামর্থ রাখে, তাহলে ইমামের অনুমতি ছাড়া জিহাদ করা বৈধ হবে। পক্ষান্তরে যদি এতটুকু শক্তিশালী না হয়, তাহলে তাদের জন্য ইমামের অনুমতি ছাড়া জিহাদ করা জায়েয হবে না। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ৪/১২৩ (ইলমিয়্যাহ); আহকামুল মুজাহিদ বিন-নাফস: ৩১৫ (মাকতাবাতুল উলূমি ওয়াল হিকাম)
[1] কাদের সাথে যিম্মাচুক্তি বৈধ আর কাদের সাথে বৈধ নয়—উক্ত আলোচনা পঞ্চম অধ্যায়ে আসছে ইনশাআল্লাহ।
আগের পর্ব:
ফিকহুল জিহাদ; পর্ব ১৭ ➤ ইকদামী জিহাদ ফরয হওয়ার শর্ত এবং জিহাদ বৈধ হওয়ার শর্ত (১ম অংশ):
- https://dawahilallah.com/forum/%E0%A...A6%82%E0%A6%B6
ইকদামী জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য উপরিউক্ত শর্ত (সক্ষমতা থাকা) ছাড়া আরো কিছু শর্ত রয়েছে। তা হচ্ছে—
২. কাফেরদের কাছে ইসলাম ও যিম্মাচুক্তি গ্রহণের দাওয়াত পৌঁছা:
যে কাফেরদের কাছে আগে থেকে দাওয়াত পৌঁছেনি, এমন কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে, তাদেরকে ইসলাম ও যিম্মাচুক্তি গ্রহণের দাওয়াত দেওয়া। -মাবসূতে সারাখসী: ১০/৬ (দারুল মা’রেফা); বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৪৬ (দারুল হাদীস); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৯ (দারুল ফিকর)
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,
وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا -سورة الإسراء: 15
“কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দেই না।” –সূরা বানী ইসরাঈল: ১৫সহীহ মুসলিমের এক হাদীসে এসেছে,
عَنْ بُرَيْدَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: وَإِذَا لَقِيتَ عَدُوَّكَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ فَادْعُهُمْ إِلَى ثَلَاثِ خِصَالٍ -أَوْ خِلَالٍ-، فَأَيَّتُهُنَّ مَا أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ وَكُفَّ عَنْهُمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ، فَإِنْ أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ وَكُفَّ عَنْهُمْ، ... فَإِنْ هُمْ أَبَوْا فَسَلْهُمُ الْجِزْيَةَ، فَإِنْ هُمْ أَجَابُوكَ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ وَكُفَّ عَنْهُمْ، فَإِنْ هُمْ أَبَوْا فَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَقَاتِلْهُمْ. –رواه مسلم (1731)
“বুরাইদা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— যখন তুমি মুশরিক শত্রুর সম্মুখীন হবে, (প্রথমে) তাদেরকে তিনটি বিষয়ের প্রতি দাওয়াত দেও। এর যেকোনো একটি তারা গ্রহণ করলে তা মেনে নেও এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকো। প্রথমে তাদেরকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত দেও। যদি তারা তা গ্রহণ করে, তবে তা গ্রহণ করে তাদের সাথে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকো। যদি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, তাহলে তাদেরকে জিযয়অ প্রদানের প্রস্তাব দেও। যদি তারা এতে সম্মত হয়, তবে তা গ্রহণ করে তাদের সাথে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকো। কিন্তু যদি তাও গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, তাহলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো।” –সহীহ মুসলিম: ১৭৩১পক্ষান্তরে যদি তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে থাকে, তাহলে আর নতুন করে দাওয়াত দেওয়া আবশ্যক নয়। -মাবসূতে সারাখসী: ১০/৬ (দারুল মা’রেফা); বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৪৬ (দারুল হাদীস); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৯ (দারুল ফিকর)
বিশিষ্ট তাবেয়ী ইবনে আ’উন রহ. থেকে বর্ণিত,
عَنِ ابْنِ عَوْنٍ، قَالَ: كَتَبْتُ إِلَى نَافِعٍ أَسْأَلُهُ عَنِ الدُّعَاءِ قَبْلَ الْقِتَالِ، قَالَ: فَكَتَبَ إِلَيَّ: "إِنَّمَا كَانَ ذَلِكَ فِي أَوَّلِ الْإِسْلَامِ، قَدْ أَغَارَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى بَنِي الْمُصْطَلِقِ وَهُمْ غَارُّونَ، وَأَنْعَامُهُمْ تُسْقَى عَلَى الْمَاءِ، فَقَتَلَ مُقَاتِلَتَهُمْ، وَسَبَى سَبْيَهُمْ، وَأَصَابَ يَوْمَئِذٍ -قَالَ يَحْيَى: أَحْسِبُهُ قَالَ جُوَيْرِيَةَ أَو قَالَ الْبَتَّةَ- ابْنَةَ الْحَارِثِ"، وَحَدَّثَنِي هَذَا الْحَدِيثَ عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ، وَكَانَ فِي ذَاكَ الْجَيْشِ. –رواه مسلم (1730) والبخاري (2541)
“ইবনে আউন রহ. বলেন, আমি নাফে’ রহ. এর কাছে চিঠি মারফত যুদ্ধের আগে দাওয়াত দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলাম। তিনি উত্তরে লিখলেন— ‘এটি (দাওয়াত) ইসলামের শুরুর দিকে ছিল। (কেননা শেষের দিকে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু মুস্তালিক গোত্রের ওপর আকস্মিক আক্রমণ করেন; যখন তারা ছিল সম্পূর্ণ অসচেতন এবং তাদের গবাদিপশুকে পানি পান করানো হচ্ছিল। রাসূল তাদের যোদ্ধাদের হত্যা করেন এবং তাদের নারী-শিশুদের বন্দী করেন। সেদিন রাসূল জুয়াইরিয়া বিনতে হারিসকে বন্দি করেন। বর্ণনাকারী ইয়াহয়া বলেন, আমার শায়খ জুয়াইরিয়া বলেছেন, এটা আমার ধারণা অথবা আমি নিশ্চিত। (অর্থাৎ, উনার শায়খ জুয়াইরিয়ার নাম যে নিয়েছেন, এ ব্যাপারে উনি নিশ্চিত না শুধু ধারণা—এটা ঠিক করতে পারছেন না।) (নাফে’ রহ. বলেন,) এই হাদিসটি আমাকে আবদুল্লাহ বিন উমর রাদি. বর্ণনা করেছেন এবং তিনি সেই যোদ্ধাদলে ছিলেন।” –সহীহ মুসলিম: ১৭৩০; সহীহ বুখারী: ২৫৪১অবশ্য আগে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে থাকলেও জিহাদের পূর্বমূহুর্তে নতুন করে পুনরায় দাওয়াত দেওয়া মুস্তাহাব।
খায়বারবাসীদের কাছে আগে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছা সত্বেও যুদ্ধের পূর্বমূহুর্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুনভাবে দাওয়াত দেওয়ার আদেশ করেছেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: يَوْمَ خَيْبَرَ: «لَأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ رَجُلًا يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَى يَدَيْهِ»، فَقَامُوا يَرْجُونَ لِذَلِكَ أَيُّهُمْ يُعْطَى، فَغَدَوْا وَكُلُّهُمْ يَرْجُو أَنْ يُعْطَى، فَقَالَ: «أَيْنَ عَلِيٌّ؟»، فَقِيلَ: يَشْتَكِي عَيْنَيْهِ، فَأَمَرَ، فَدُعِيَ لَهُ، فَبَصَقَ فِي عَيْنَيْهِ، فَبَرَأَ مَكَانَهُ حَتَّى كَأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ بِهِ شَيْءٌ، فَقَالَ: نُقَاتِلُهُمْ حَتَّى يَكُونُوا مِثْلَنَا؟ فَقَالَ: «عَلَى رِسْلِكَ، حَتَّى تَنْزِلَ بِسَاحَتِهِمْ، ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الإِسْلاَمِ، وَأَخْبِرْهُمْ بِمَا يَجِبُ عَلَيْهِمْ، فَوَاللَّهِ لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ» -رواه البخاري (2942) ومسلم (2406)
“সাহল বিন সা’দ রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি খায়বারের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, ‘আমি অবশ্যই এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা তুলে দিব, যার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন।’ সাহাবায়ে কেরাম রাতভর এ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন যে, কার হাতে তুলে দেওয়া হবে। সকালে সবাই নিজের হাতে পতাকা পাওয়ার আকাঙ্কায় ছিল। রাসূল বললেন, ‘আলী কোথায়?’ কেউ একজন বলল, তাঁর চোখব্যথা করছে। রাসূল ডাকতে বললেন। তাঁকে ডাকা হলো। রাসূল তাঁর চোখে থুথু দিলেন এবং সাথে সাথে তিনি এমনভাবে সুস্থ হয়ে গেলেন যেন তাঁর চোখে কখনো কোনো সমস্যা ছিল না। (এরপর রাসূল তাঁর হাতে পতাকা তুলে দিলেন) আলী রাদি. জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের মতো (মুসলিম) হওয়া পর্যন্ত কি তাদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাব?’ রাসূল বললেন, “আস্তে! তাদের এলাকায় পৌঁছে প্রথমে তাদেরকে ইসলামের দেও এবং তাদের ওপর কী কী ওয়াজিব, তা জানিয়ে দাও। আল্লাহর কসম, তোমার মাধ্যমে যদি একজন মানুষও হেদায়েত পায়, তবে তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম।” –সহীহ বুখারী: ২৯৪২; সহীহ মুসলিম: ২৪০৬তবে ফুকাহায়ে কেরাম জিহাদের পূর্বমূহুর্তে নতুন করে দাওয়াত দেওয়া মুস্তাহাব হওয়ার জন্য দুই শর্ত আরোপ করেছেন। উক্ত শর্ত দুটি পাওয়া গেলে মুস্তাহাব হবে; অন্যথায় মুস্তাহাব নয়। শর্ত দুটি হচ্ছে—
এক. দাওয়াতের মাধ্যমে তাদের ইসলাম বা যিম্মাচুক্তি গ্রহণ করার ব্যাপারে আশা থাকা।
দুই. দাওয়াত দেওয়ার কারণে অগ্রীম এমন কোনো কৌশল অবলম্বনের আশঙ্কা না থাকা, যদ্দরুণ যুদ্ধ আরো কঠিন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৪৬ (দারুল হাদীস); ফাতহুল কাদীর: ৫/৪২৯ (ইলমিয়্যাহ); রদ্দুল মুহতার: ৬/২০৬ (দারুল ফিকর)
যদি এমন হয় যে, কোনো সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছিল, তবে যিম্মাচুক্তির দাওয়াত পৌঁছেনি এবং তাদের সাথে যিম্মাচুক্তি বৈধ,[1] তাহলে যিম্মাচুক্তির দাওয়াত না দিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ শুরু করা বৈধ হবে না। -ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া: ৭/১৫ (যাকারিয়া); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৯ (দারুল ফিকর)
উল্লেখ্য, উক্ত শর্ত ইকদামী জিহাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পক্ষান্তরে কোনো কাফের গোষ্ঠি মুসলিম ভূখণ্ডে আক্রমণ করলে, তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত না পৌঁছলেও তাদেরকে প্রতিহত করা ফরয এবং এর জন্য তাদেরকে দাওয়াত দেওয়া আবশ্যক নয়। হ্যাঁ, তাদেরকে মুসলিম ভূখণ্ড থেকে প্রতিহত করার পরে তাদের এলাকায় ঢুকে জিহাদ করতে হলে আগে দাওয়াত দিতে হবে। অন্যথায় তা জায়েয হবে না। -আল-কাওকাবুদ দুররী: ২/৪০৪
৩. নিরাপত্তা বা যুদ্ধবিরতি চুক্তি না থাকা:
ইকদামী জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য আরেকটি শর্ত হচ্ছে, শত্রুর সাথে নিরাপত্তা বা যুদ্ধবিরতি চুক্তি না থাকা। শত্রু বাহীনিকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরে কিংবা তাদের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা জায়েয নয়। -ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/১৮৮ (দারুল ফিকর)
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ بُرَيْدَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: «اغْزُوا بِاسْمِ اللهِ فِي سَبِيلِ اللهِ، قَاتِلُوا مَنْ كَفَرَ بِاللهِ، اغْزُوا وَلَا تَغُلُّوا، وَلَا تَغْدِرُوا، وَلَا تَمْثُلُوا، وَلَا تَقْتُلُوا وَلِيدًا». –رواه مسلم (1731)
“বুরাইদা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর নামে, আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করো। তোমরা আল্লাহকে অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। যুদ্ধ করো, তবে বিশ্বাসঘাতকতা করো না, আত্মসাৎ করো না, অঙ্গবিকৃতি করো না এবং শিশু হত্যা করো না।” –সহীহ মুসলিম: ১৭৩১অন্য এক হাদীসে এসেছে,
عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "ذِمَّةُ المُسْلِمِينَ وَاحِدَةٌ، فَمَنْ أَخْفَرَ مُسْلِمًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لاَ يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ، وَلاَ عَدْلٌ ". –رواه البخاري (1870) ومسلم (1370)
“আলী রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন— মুসলমানদের অঙ্গীকার এক-অভিন্ন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম প্রদত্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা এবং সকল মানুষের লানত। তার কোনো নফল বা ফরয ইবাদত গ্রহণ হবে না।” –সহীহ বুখারী: ১৮৭০; সহীহ মুসলিম: ১৩৭০সুতরাং এক্ষেত্রে চুক্তির মেয়াদ উত্তির্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর যদি মেয়াদ উত্তির্ণ হওয়ার আগে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য উপকারী মনে হয়, তাহলে স্পষ্টভাবে তাদের সাথে কৃত চুক্তি বিচ্ছন্ন হওয়ার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ করতে পারবে। এটা অঙ্গীকার ভঙ্গ নয়; বরং অঙ্গীকার বিলুপ্ত করা। আর এটা জায়েয। -মাবসূতে সারাখসী: ১০/৮৬ (দারুল মা’রেফা); বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৭১ (দারুল হাদীস); রদ্দুল মুহতার: ৪/১৩৩ (দারুল ফিকর)
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,
وَإِمَّا تَخَافَنَّ مِنْ قَوْمٍ خِيَانَةً فَانْبِذْ إِلَيْهِمْ عَلَى سَوَاءٍ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْخَائِنِينَ -سورة الأنفال: 58
“আর যদি তুমি কোনো সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা করো, তাহলে (তাদের সঙ্গে কৃত চুক্তি) স্পষ্টভাবে ছুঁড়ে ফেলো। নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের পছন্দ করেন না।” –সূরা আনফাল: ৫৮কাফেরদের স্বভাবই এমন যে, তারা সুযোগ পেলেই মুসলিমদের সাতে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। তা সত্বেও মুসলিমদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে সাময়িক সময়ের জন্য চুক্তি করা বৈধ করা হয়েছে। কিন্তু যখন প্রয়োজন আর থাকবে না, তখন তাদের মূল স্বভাবের ভিত্তিতে চুক্তি বিলুপ্ত ঘোষণা করে যুদ্ধ শুরু করা হবে। -ফাতহুল কাদীর: ৫/৪৪২ (ইলমিয়্যাহ)
৪. মা-বাবার অনুমতি থাকা:
ইকদামী জিহাদে অংশগ্রহণ বৈধ হওয়ার জন্য আরেকটি শর্ত হচ্ছে, মা-বাবার অনুমতি থাকা। মা-বাবার অনুমতি ছাড়া সন্তানের জন্য ইকদামী জিহাদে অংশগ্রহণ করা বৈধ নয়; হোক সে বালেগ কিংবা নাবালেগ।
এক হাদীসে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاسْتَأْذَنَهُ فِي الجِهَادِ، فَقَالَ: «أَحَيٌّ وَالِدَاكَ؟»، قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: «فَفِيهِمَا فَجَاهِدْ» -رواه البخاري (3004) ومسلم (2549)
আবদুল্লাহ বিন আমর রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিহাদে অংশগ্রহণের অনুমতি চাইল। রাসূল তাকে বললেন, ‘তোমার পিতা-মাতা কি জীবিত আছেন?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ’। রাসূল বললেন, ‘তাহলে তাদের সেবা করার মাধ্যমেই তুমি জিহাদ করো’।” –সহীহ বুখারী: ৩০০৪; সহীহ মুসলিম: ২৫৪৯আরেক হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَجُلًا هَاجَرَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْيَمَنِ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي هَاجَرْتُ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «قَدْ هَجَرْتَ مِنَ الشِّرْكِ وَلَكِنَّهُ الْجِهَادُ هَلْ لَكَ أَحَدٌ بِالْيَمَنِ؟» قَالَ: أَبَوَايَ قَالَ: «أَذِنَا لَكَ؟» قَالَ: لَا قَالَ: «فَارْجِعْ فَاسْتَأْذِنْهُمَا، فَإِنْ أَذِنَا لَكَ فَجَاهِدْ، وَإِلَّا فَبِرَّهُمَا» -رواه الحاكم (2501) وأبو داود (2530) وأحمد (11721) وابن حبان (422). وقال الحاكم: هذا حديث صحيح الإسناد.اهــــ ولكن تعقبه الذهبي بأن دراجا الراوي واه. وقال ابن عبد الهادي في حاشية الإلمام ط دار النوادر (1/ 347): وفي إسناده دراج أبو السمح، وقد وثقه بعضهم وضعفه بعضهم، ولم يخرجا له.اهــــ وصححه ابن الحبان، وأقره عليه ابن حجر في فتح الباري ط دار الفكر (6/ 140)
আবু সাঈদ খুদরী রাদি. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ইয়েমেন থেকে হিজরত করে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমি হিজরত করেছি’। রাসূল তাকে বললেন, ‘তুমি শিরক থেকে হিজরত করেছ, কিন্তু এখন জিহাদ বাকি আছে। তোমার কি ইয়েমেনে কেউ আছে?’ সে বলল, ‘আমার পিতা-মাতা আছেন’। রাসূল বললেন, ‘তারা কি তোমাকে অনুমতি দিয়েছে?’ সে বলল, ‘না’। রাসূল বললেন, ‘তুমি তাদের কাছে ফিরে যাও এবং তাদের অনুমতি নাও। যদি তারা অনুমতি দেয়, তাহলে জিহাদে শরীক হও; আর যদি অনুমতি না দেয়, তাহলে তাদের খেদমত ও সেবা করো।” –মুস্তাদরাকে হাকিম: ২৫০১; সুনানে আবু দাউদ: ২৫৩০; মুসনাদে আহমাদ: ১১৭২১; সহীহ ইবনে হিব্বান: ৪২২সুতরাং মা-বাবার উভয় জীবিত থাকলে উভয়ের অনুমতি শর্ত; একজনের অনুমতি যথেষ্ট নয়। তদ্রূপ তারা জীবিত থাকলে শুধু তাঁদের অনুমতি যথেষ্ট; অন্য কারো অনুমতি লাগবে না। মা-বাবা উভয় কিংবা তাদের কোনো একজন জীবিত না থাকাবস্থায় মায়ের স্থলে নানি এবং বাবার স্থলে দাদার অনুমতি শর্ত। উক্ত চারজন ছাড়া আর কারো অনুমতি শর্ত নয়। তবে অন্য কারো ‘নাফাকা’র দায়িত্ব যদি তার উপর বর্তায় এবং সে জিহাদে বের হওয়ার কারণে উক্ত ব্যক্তির ক্ষতির আশঙ্কা হয়, তাহলে এক্ষেত্রে তার নাফাকার ব্যবস্থা করে বের হবে। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ১/১৩৪ (ইলমিয়্যাহ); ফাতাওয়ায়ে কাযীখান: ৩/৪১৪ (ইলমিয়্যাহ) ; রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৪, ১২৫ (দারুল ফিকর)
মা-বাবার অনুমতির শর্তটি ইকদামী জিহাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দিফায়ী জিহাদের ক্ষেত্রে এ শর্ত নয়। বরং মা-বাবা জিহাদ করতে বাধা দিলে সন্তানের জন্য তাদের নিষেধ অমান্য করে জিহাদে শরিক হওয়া ফরয। এবং মা-বাবাও ফরয আদায়ে নিষেধ করার কারণে গুনাহগার হবেন। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ১/১৩৪ (ইলমিয়্যাহ); বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৪১ (দারুল হাদীস); আদ্দুররুল মুখতার: ৪/১২৭ (দারুল ফিকর)
উল্লেখ্য, মা-বাবার অনুমতি ছাড়া সন্তান সরাসরি জিহাদ শরীক হতে না পারলেও জিহাদ-সংশ্লিষ্ট এমন কাজে শরীক হতে পারবে, যাতে তার ক্ষতির আশঙ্কা নেই। -বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৩৪১ (দারুল হাদীস); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৫ (দারুল ফিকর)
৫. ঋণদাতার অনুমতি থাকা:
ইকদামী জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য আরেকটি শর্ত হচ্ছে, ঋণদাতার অনুমতি থাকা। নিজের উপর কারো ত্বরিৎ ঋণ থাকলে, সম্ভব হলে তা পরিশোধ করে জিহাদে বের হবে। আর অসচ্ছলতার কারণে যদি ঋণ আদায় সম্ভব না হয়, তাহলে জিহাদে বের হতে হলে ঋণদাতার অনুমতি লাগবে। ঋণদাতার অনুমতি ছাড়া ইকদামী জিহাদ করা বৈধ হবে না। -ফাতাওয়ায়ে কাযীখান: ৩/৪১৪ (ইলমিয়্যাহ); আল-বাহরুর রায়েক: ৫/৭৭ (দারুল কিতাবিল ইসলামী); রদ্দুল মুহতার: ৪/১২৪ (দারুল ফিকর)
দিফায়ী জিহাদের ক্ষেত্রে ঋণদাতার অনুমতি শর্ত নয়। তবে ঋণ আদায় করা সম্ভব হলে ঋণ আদায় করে জিহাদে বের হতে হবে। কেননা, ঋণ আদায় করা এবং আগ্রাসী শত্রু প্রতিহত করা—উভয়টি স্বতন্ত্র ফরয; উভয়টি আদায় করা সম্ভব হলে উভয়টিই আদায় করতে হবে। হ্যাঁ, পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে, আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে ঋণ আদায় সম্ভব নয়; কিন্তু শত্রু প্রতিহত করার জন্য এ মূহুর্তে জিহাদে বের হতে হবে, তাহলে ঋণ থাকা সত্বেও জিহাদে বের হতে ঋণদাতার অনুমতি লাগবে না। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ৪/২১২ (ইলমিয়্যাহ); ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/১৯০ (দারুল ফিকর)
বর্তমানে যেহেতু জিহাদের কার্যকারী পদ্ধতি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধ; আর তা ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধক নয়, তাই জিহাদের বাহানায় ঋণ আদায় না করা কিংবা আদায় করা জরুরী মনে না করার কোনো সুযোগ নেই।
৬. ইমামের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা না থাকা:
ইকদামী জিহাদ বৈধ হওয়ার জন্য আরেকটি শর্ত হচ্ছে, ইমামের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা না থাকা। ইমাম যদি কোনো মাসলাহাত ও কল্যাণ বিবেচনা করে জিহাদ করতে বারণ করেন, তাহলে জিহাদ করা বৈধ হবে না। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ১/১২৬; ৪/২১৫ (ইলমিয়্যাহ); ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/১৯২ (দারুল ফিকর)
তবে ইমাম যদি কাপুরুষতা বা অবহেলাবশত জিহাদ করতে নিষেধ করে থাকে কিংবা কাফেরদের স্বার্থে জিহাদ করতে বারণ করে থাকে এবং এ বিষয়টি সবার কাছে বা অধিকাংশের কাছে একেবারে স্পষ্ট, তাহলে তার নিষেধ মান্যযোগ্য থাকবে না। বরং তার নিষেধ উপেক্ষা করে জিহাদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সাধারণ মুসলিমদের উপর ফরয। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ১/১১৭ (ইলমিয়্যাহ); ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ২/১৯২ (দারুল ফিকর); তুহফাতুল মুহতাজ: ৯/২৩৭ (দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরবী); আল-মুহাল্লা: ৫/৪২১ (দারুল ফিকর); আহকামুল মুজাহিদ বিন-নাফস: ৩১৬ (মাকতাবাতুল উলূমি ওয়াল হিকাম)
উক্ত শর্ত ইকদামী জিহাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্যথায় দিফায়ী জিহাদের ক্ষেত্রে কারো অনুমতি ধর্তব্য। ইমামের দায়িত্ব হচ্ছে, সবাইকে নিয়ে শত্রু প্রতিহত করা। যদি তাতে অবহেলা কিংবা নিষেধ করে, তাহলে ফরয তরকের কারণে সে গুনাহগার হবে। তখন সাধারণ মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে তার নিষেধ অমান্য করে জিহাদের ফরয দায়িত্ব আদায় করা। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ৪/২১৫ (ইলমিয়্যাহ); ফাতহুল আলিয়্যিল মালিক: ১/৩৯২ (দারুল মা’রেফা)
উপরিউক্ত আলোচনা হচ্ছে, ইমাম জিহাদ করতে নিষেধ করলে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জিহাদ করার বিধান। কিন্তু ইমাম যদি জিহাদ করতে নিষেধ না করেন, তাহলে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো মুজাহিদ দলের জন্য জিহাদ করা জায়েয হবে কি-না?
যদি মুজাহিদ দল এতটুকু শক্তিশালী হয় যে, তারা কাফেরদের সাথে জিহাদ করার সামর্থ রাখে, তাহলে ইমামের অনুমতি ছাড়া জিহাদ করা বৈধ হবে। পক্ষান্তরে যদি এতটুকু শক্তিশালী না হয়, তাহলে তাদের জন্য ইমামের অনুমতি ছাড়া জিহাদ করা জায়েয হবে না। -শরহুস সিয়ারিল কাবীর: ৪/১২৩ (ইলমিয়্যাহ); আহকামুল মুজাহিদ বিন-নাফস: ৩১৫ (মাকতাবাতুল উলূমি ওয়াল হিকাম)
[1] কাদের সাথে যিম্মাচুক্তি বৈধ আর কাদের সাথে বৈধ নয়—উক্ত আলোচনা পঞ্চম অধ্যায়ে আসছে ইনশাআল্লাহ।
আগের পর্ব:
ফিকহুল জিহাদ; পর্ব ১৭ ➤ ইকদামী জিহাদ ফরয হওয়ার শর্ত এবং জিহাদ বৈধ হওয়ার শর্ত (১ম অংশ):
- https://dawahilallah.com/forum/%E0%A...A6%82%E0%A6%B6
Comment