Announcement

Collapse
No announcement yet.

যুদ্ধের অধিবিদ্যা-২

Collapse
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • যুদ্ধের অধিবিদ্যা-২

    জুলিয়াস ইভোলা-র Metaphysics of War বইয়ের ধারাবাহিক আলোচনা
    প্রথম পর্ব: https://dawahilallah.com/forum/মূল-ফোরাম/আল-জিহাদ/214823



    এতটুকু আলোচনা-ই কথিত মানবতাবাদী শান্তিবাদীদের চুপ করাতে যথেষ্ট। এখন যুদ্ধের এই অতিপ্রাকৃত দিক উপলব্ধি করতে হলে বীরের জীবনের নানা স্তর 'যোদ্ধার অভিজ্ঞতার অবভাসবাদ' নিয়ে কিছু আলোচনা প্রয়োজন আছে।


    সামাজিক স্তরবিন্যাস

    মূল আলোচনায় যাবার আগে কিছু প্রাথমিক বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, তা হল- সামাজিক স্তরবিন্যাস। বার্নার্ড লুইসের মতে, ইসলাম সাম্যবাদী এবং কোন সামাজিক স্তর স্বীকার করে না। Ernest Gellner অন্যদিকে বলেছেন যে, শহুরে উলামা এবং গ্রাম্য উলামা-র মাঝে একটি স্তরবিন্যাস আছে। মানে, গেলনারের দৃষ্টিতে ইসলামী সমাজে শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে সামাজিক স্তর সৃষ্টি হয়। শরীয়তের দিকে তাকালে, সমাজে শ্রেণীর কথা পাওয়া যায়- মুমিন, মুনাফিক যিম্মী (কাফির) যেহেতু যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা চলছে, সুতরাং যুদ্ধকে মানদণ্ড স্থির করে শ্রেণিকরণ করা প্রয়োজন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজ ৪টি শ্রেণীতে অবশ্যম্ভাবীভাবে বিন্যস্ত হয়ে যায়- জাহে, দুনিয়ামুখী, মুজাহিদ ও উলামা। এই শ্রেণিগুলো যুদ্ধের ফলে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়। আর যেহেতু রাষ্ট্র কোন না কোন মতাদর্শের অনুগামী হতে বাধ্য এবং সকল রাজনৈতিক আদর্শ যুদ্ধকে স্বীকার করে, সেহেতু যেকোন রাষ্ট্র, যা তার পূর্ণ মাত্রায় পরিচালিত হচ্ছে, এই ৪টি শ্রেণী তৈরি করতে বাধ্য এবং ঐতিহাসিকভাবে এটাই প্রমাণিত।


    মূলনীতির গুরুত্ব

    এই স্তরগুলো অনুক্রমিক, অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতর শ্রেণী নগণ্যের উপর অবস্থান করে। বিষয়টি মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সাথে তুলনীয়। রাষ্ট্র যদি একটি দেহের মত হয়, তাহলে এই শ্রেণিগুলোও তেমন এবং সুস্থ রাষ্ট্রের জন্য এই শ্রেণিগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা জরুরি। যদি নফস তার রূহের উপর বিজয়ী হয়ে যায়, তাহলে দেহ যেমন আলোকহীন হয়ে যায়; তেমনি দুনিয়ামুখী বা মুজাহিদ শ্রেণী যদি উলামা-র অগ্রগামী হয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্র অধ:পতনের দিকে যায়।
    তাই প্রকৃতির দাবি এটাই যে, রূহকে কেন্দ্র করে যেমন দেহের আবর্তিত হওয়া উচিত তেমনি মূলনীতিকে কেন্দ্রে রেখে বাকি শ্রেণিগুলোর আবর্তিত হওয়া উচিত। তাই মুজাহিদদের অবশ্যই আধ্যাত্মিক মূলনীতির ধারক-বাহক উলামাকে অনুসরণ করতে হবে। যদি মুজাহিদরাই নিজেদের মূলনীতির ধারক-বাহক ভাবা শুরু করে তাহলে রাষ্ট্র মূলনীতি থেকে সরে যায়। এই ৪টি সামাজিক শ্রেণীর প্রত্যেকটির ভেতরে আবার পৃথক পৃথক শ্রেণীবিন্যাস রয়েছে।
    মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস ইউরোপের ইতিহাসে এর নজির পাওয়া যায়। উলামাকেন্দ্রিক দেশ থেকে মুজাহিদ তথা রাজতন্ত্র এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে একসময় মুজাহিদদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্তর এসেছে, যা এখন দুনিয়ামুখী হয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে যেতে শুরু করেছে। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অংশ ইতিমধ্যেই ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে গেছে এবং ইউরোপের পথে হাটছে। আর ইউরোপ এখন যাচ্ছে নয়া বিশ্বব্যবস্থার দিকে, যা সম্পূর্ণ কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রিত; এর কিছু ছোয়া আরব বিশ্বেও এসেছে; এসব নগ্নপদ বেদুঈন এখন উচু অট্টালিকা নির্মাণে প্রতিযোগিতা করছে। (উল্লেখ্য রাষ্ট্রের অনিবার্য পরিণতি আমাদের আলোচ্য ব্যাপার না, যুদ্ধের প্রকৃতি অনুসন্ধান করাই মুখ্য।)


    যুদ্ধের পরিবর্তনশীল প্রকৃতি

    যখন ভিন্ন কোন শ্রেণী ক্ষমতায় আসে, তখন যুদ্ধের অর্থও ভিন্ন হয়ে যায়। মুজাহিদ বংশ থেকে রাজতন্ত্রের আবির্ভাব হলে, যুদ্ধ শুধু রাজার সম্মান রক্ষায় সংগঠিত হয়। এক্ষেত্রে, আখিরাতমুখী না হলেও মানুষের কাছে সম্মানের মত অবস্তুগত বিষয়ের গুরুত্ব থাকে। দুনিয়ামুখীরা ক্ষমতায় এলে সমাজ আরও বৈষয়িক হয়ে যায়, জাতীয়তাবাদী ধারণায় উজ্জীবিত হয় বস্তুগত ভূখণ্ডের সীমানা রক্ষা মূল উদ্দেশ্য হয়ে যায়; ফলে রাষ্ট্রে মানুষের সম্মানও নিরাপত্তা পায় না এবং বাক-স্বাধীনতার দোহাই থেকে জীবিত থেকে মৃত, পাপী থেকে বুযুর্গদের সবার সম্মান নষ্ট করা যায়। জাহেলদের রাজত্বে, সমাজ শুধু কামনা-বাসনার অর্থই উপলব্ধি করতে পারে, এমনকি দেহের ভেতরে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়; শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রেণী। কখনও উলামা জনগণ বিরোধী মুজাহিদ (আইএস), কখনও বাংলাদেশের মত উলামা বিচ্ছিন্ন জনগণ; কিছু ক্ষেত্রে তিউনিসিয়ার মত উলামা বিরোধী জনগণ, মুজাহিদ বিরোধী জনগণ ইত্যাদি। আবার প্রত্যেক শ্রেণিতে আন্ত:কোন্দল শুরু হয়; পুরুষের বিরুদ্ধে নারী, পিতামাতার বিরুদ্ধে সন্তান। আলোচিত মেহেরীন আহমেদের কথা মনে আছে? কিংবা ইয়াবাখোর ঐশী?


    বীরের সংজ্ঞা

    যুদ্ধের মত বীরের সংজ্ঞাও তাই অবস্থাভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই ব্যবহারিক ও সামষ্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা বা জীবন উৎসর্গ করা বীর হওয়ার অন্যতম শর্ত হলেও, সমকালীন ভাবনায় বীরকে নির্দয়ভাবে 'কামানের খোরাক' বা cannon fodder বলা হয়এমন বলা-ই স্বাভাবিক, কারণ আধুনিকতা মানবতাবাদের স্লোগান তুললেও মানুষকে মানুষের মর্যাদা দেয় না এই ব্যাপারে অনুবাদকের 'সম্মানের মর্যাদাহানি' বা শাতিম বিষয়ক পোস্ট দেখা যেতে পারে।


    সম্মানের মর্যাদা হনন: https://dawahilallah.com/forum/মূল-ফোরাম/আল-জিহাদ/204583
    শাতিমের জন্য মব জাস্টিস: https://dawahilallah.com/forum/মূল-ফোরাম/আল-জিহাদ/203228



    এখন যুদ্ধের এক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যক্তি হচ্ছে বস্তুবাদী লক্ষ্য অর্জনের উপকরণ; অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে, যুদ্ধ হল একজন ব্যক্তির বীরের অনুভূতি লাভের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সিদ্ধিলাভের রাস্তা
    যুদ্ধের ধরন নির্ভর করে সেই সময়ের সমাজের চরিত্রের উপর। যেমন:

    1. ব্যবসায়ী ও জাহেলদের যুগ (যেমন প্রাচীন যুগে ব্যবসা-বাণিজ্যের সময়):
    - এ সময় মানুষের শারীরিক শক্তি, প্রবৃত্তি ও জীবনীশক্তি বেশি গুরুত্ব পেত।
    - যুদ্ধেও তখন শারীরিক শক্তি ও সহজাত প্রবৃত্তি বেশি কাজ করত।

    2. যোদ্ধা ও আধ্যাত্মিক নেতাদের যুগ (যেমন মধ্যযুগ বা ধর্মযুদ্ধের সময়):
    - এ সময় মানুষের চরিত্র, ইচ্ছাশক্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তি বেশি গুরুত্ব পেত।
    - যুদ্ধেও তখন সাহস, নেতৃত্ব ও ধর্মীয় আদর্শ বেশি প্রভাব ফেলত।


    যুদ্ধের প্রভাব

    যুদ্ধ মানুষকে জাগ্রত করে। এই জাগরণ নির্ভর করে যুদ্ধের কারণের উপর। যেমন:
    - যদি যুদ্ধ হয় শারীরিক শক্তির জন্য, তাহলে মানুষের মধ্যে সহজাত প্রবৃত্তি/নফস জাগ্রত হয়।
    - যদি যুদ্ধ হয় ধর্ম বা আদর্শের জন্য, তাহলে মানুষের আধ্যাত্মিক শক্তি জাগ্রত হয়।

    ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তিন ধরনের হতে পারে:
    1. শারীরিক শক্তির জাগরণ (যেমন সাহস, শক্তি, সহনশীলতা বৃদ্ধি)।
    2. চরিত্রের জাগরণ (যেমন নেতৃত্ব, ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধি)।
    3. আধ্যাত্মিক জাগরণ (যেমন ধর্মীয় বা অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা)।
    এই ব্যাখ্যাটা অনেকটা মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের মতো—যেমন শৈশবে শারীরিক শক্তি বেশি থাকে, যৌবনে চরিত্র গঠন হয়, আর পরিণতিতে আধ্যাত্মিক বিকাশ ঘটে। যুদ্ধও তেমনি সেই সময়ের সমাজের চরিত্র অনুযায়ী মানুষকে প্রভাবিত করে।


    যোদ্ধার ৩ অবস্থা

    ১. স্বাভাবিক অবস্থা (Normal State)
    • যোদ্ধা কোন আধ্যাত্মিক নীতির অধীন থাকে।
    • এ অবস্থায় তাদের সাহসিকতা মানুষকে কিয়ের্কেগার্ড বা হাইডেগারের মহান জীবনের দিকে নিয়ে যায়।
    • তারা নিজেদেরকে অতিক্রম করে, নিজেদের ব্যক্তিত্বকে উন্নত করে।
    • এ ধরনের যোদ্ধারা আলোকিত, মহান ও উদ্দীপ্ত হয়।
    ২. বিদ্রোহী অবস্থা (Rebellious State)
    • যোদ্ধা নিজেকে সবকিছুর উপরে স্থান দেয়।
    • তারা কোনো উচ্চতর পবিত্র নীতি মানতে রাজি নয়।
    • তাদের সাহসিকতা তখন "বিয়োগান্তক" হয়ে ওঠে—অহংকারী, নির্মম, কিন্তু আলোকহীন।
    • ব্যক্তিত্ব শক্তিশালী হয়, কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা রয়ে যায়।
    • এ ধরনের যোদ্ধারা মহান হলেও, তাদের মধ্যে নূর থাকে না
    • সাধারণ মানুষের জন্য (যেমন ব্যবসায়ী বা জাহেল শ্রেণী), এ ধরনের যুদ্ধ ও সাহসিকতা ব্যবসায়ীদের উন্নতির প্রতীক। সামুরাইরা যখন মারা পড়ছিল, মিতসুই পরিবার তখন ধনী হচ্ছিল
    ৩. অবনমিত অবস্থা (Degraded State)
    • যোদ্ধা নিজের নীতি হারিয়ে ফেলে।
    • তারা নিচু শ্রেণীর (যেমন ব্যবসায়ী বা জাহেলদের) অধীন হয়ে যায়।
    • তাদের সাহসিকতা তখন আদিম প্রবৃত্তি, অযৌক্তিক শক্তি ও সামষ্টিক আবেগের সাথে যুক্ত হয়ে যায়।
    • ব্যক্তিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মানু নিষ্ক্রিয়ভাবে বাঁচে।
    • তারা যুদ্ধে চালিত হয় প্রয়োজন বা আবেগের দ্বারা, নূরের অভাব থাকে।
    • এ ধরনের যুদ্ধের উদাহরণ হলো Erich Maria Remarque-এর লেখা উপন্যাসগুলো, যেখানে যুদ্ধের ভয়াবহতা মানুষকে বাস্তবতার মুখোমুখি করে দেয়। কিন্তু সাহিত্যে যেভাবে যুদ্ধকে উপস্থাপন করা হয়, সাহাবীদের জীবনে আমরা এমনটা খুব দেখি। যেটুকু হৃদয়বিদারক ঘটনা পাওয়া যায়, সেগুলো তারা হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন। কারণ তাদের মাঝে রূহানিয়াত মুখ্য ছিল। তাই আমরাও তুলনামূলক সহজে ব্যথাগুলো মেনে নিতে পেরেছি। যেমনঃ উহুদের নির্মমতা, কিংবা পানি খেতে না পেরে তিন সাহাবীর ইন্তিকাল ইত্যাদি।


    ইসলামের প্রাসঙ্গিকতা

    যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য শুধু বস্তুগত নয়, আধ্যাত্মিক প্রস্তুতিও প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন পরিষ্কার এবং নির্দ্বিধ চিন্তা। যাতে আমরা মানুষের মনোবল এবং শক্তিকে উচ্চতর লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করতে পারি। এই চিন্তার সরবরাহের জন্য ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসাবে কাজ করেপাশাপাশি ইসলাম একটি পুনর্গঠনমূলক আন্দোলনকারণ ইসলাম-
    • উম্মাহ-র ধারণা আধ্যাত্মিক আন্তর্জাতিকতাবাদ প্রচার করে
    • ইনসাফের কথা বলে
    • যুদ্ধের সাথে রূহানিয়াতকে সম্পৃক্ত করে
    • যুদ্ধ পরিচালনায় অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক এবং পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা সরবরাহ করে
    • গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করে
    • অর্থনৈতিক পৌরাণিক কাহিনীকে অবজ্ঞা করে।
    • জাতিকে 'যোদ্ধা জাতি' হিসেবে উন্নীত করে। আর এটা পুনর্গঠনের প্রথম স্তর। উম্মাহ যুদ্ধকে ধারণ না করলে সৃষ্টি ও সৃজনশীল হতে পারে না
    [প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত]
    Last edited by Rakibul Hassan; 3 weeks ago.
Working...
X