সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে অবস্থারও পরিবর্তন হতে লাগল। কখনো পরিস্থিতি ভালো, কখনো খারাপ। অবস্থা বেশি খারাপ হলে মুজাহিদ পরিবারগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হতো। অবস্থা ভালো হলে আবার তাঁদেরকে ফিরিয়ে আনা হতো। এমতাবস্থায় প্রত্যেক মুহাজির মহিলাদের মনের অবস্থা এই ছিল যে, আমরা এখানে থেকে শহীদ হয়ে যাব, তারপরও অন্য কোথাও যাব না।
কিছু কারণে ২০১৪ সালে একবার আমার পাকিস্তান আসতে হয়েছিল। নিরাপত্তার দিক খেয়াল করে আমার স্বামী আমাকে যেতে দিতে চাচ্ছিলেন না। তারপর জুন মাসে দশদিনের জন্য পাঠালেন। আমি পাকিস্তানেই থাকাকালীন সময়েই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ওয়াজিরিস্তানে হামলা শুরু করে দিল। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম এই ভেবে যে, এখন কিভাবে ফিরে যাব?
দশদিনের স্থানে বিশদিন পর আমার ডাক আসলো। আমি সেখান থেকে ওয়ানা চলে আসলাম। কিছুদিন ওয়ানায় অবস্থান করে শাবিলে চলে আসি। আমার স্বামীর কোনো খোঁজ-খবর পাচ্ছিলাম না। কিছুদিন পর একটি চিঠি আসলো- তাতে তিনি আমার ফিরে আসায় খুশি প্রকাশ করেছেন। সাথে এটাও লিখেছেন যে, এই মুহূর্তে দেখা করাটা কঠিন মনে হচ্ছে।
এদিকে রমযান মাস শুরু হয়ে গিয়েছিল। দিনটি সম্ভবত সাত তারিখ ছিল। আমরা অনেক মহিলা মুহাজির বাচ্চাদেরসহ এক ঘরের মধ্যে ছিলাম। এসময় হঠাৎ আমার প্রিয় দুইজন বোন প্রতিযোগিতার সাথে দৌঁড়ে আমার দিকে আসলো। তারপর বলতে লাগল, আপা! ভাইজান তো এসেছেন। আলহামদুলিল্লাহ। মুজাহিদগণ একজনের খুশিতে সবাই খুশি হন, একজনের দুঃখে সবাই দুঃখী হন। ঈমানের সম্পর্ক অনেক সময় রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর হয়। তিনি এসে বললেন, আগামী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত আমি এখানেই থাকব।
যেদিন তিনি আসলেন, সেদিন রাতে সেহরীতে উঠার জন্য আমি ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। হঠাৎ বোম্বিংয়ের আওয়াজে প্রথমে তাঁর তারপর আমার ঘুম ভাঙলো। তারপরই এলার্ম বেজে উঠলো। অর্থাৎ ঠিক দুইটার সময় হামলা হয়েছে। তিনি বললেন- পাকিস্তানি জেট বিমান বোম্বিং করছে। সাথে সাথে মহিলাদেরকে বাচ্চাসহ আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে বললেন। ভাইদের বললেন ঘর থেকে বের হয়ে গাছগাছালির নিচে আশ্রয় নিতে। নিচের দুইটি কামরাতে সমস্ত মহিলা ও বাচ্চাদের জায়গা হয়ে গিয়েছিল। আর একটি গর্তের মতো জায়গা ছিল, সেখানে আমরা দুইজন জায়গা করে নিলাম।
তিনি সবাইকে কিছু জরুরি নির্দেশনা দিলেন। তিনি বললেন, “আমরা সবাই আজ থেকে সেহরী নিচে খাবো (প্রয়োজনে রাতেই খাবার তৈরি করে সকালে ঠাণ্ডা খাবে)। তারপর ফজর পড়ে উপড়ে যাব। আবার ইফতার শেষ করেই নিচে এসে মাগরিব ও ইশা আদায় করব।” কিছু বয়স্ক মহিলা ও বাচ্চাদের জন্য এই নিয়ম অনুযায়ী চলা খুবই কষ্টকর হয়ে গেলো। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ সবাই এই উসূল অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গরূপে আমল করেছেন। আল্লাহ সবাইকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন।
সকালে জানতে পারলাম যে, পাক-বাহিনী সাত জায়গায় বোম্বিং করেছে। শহীদ ও আহতদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ছিল কম, নারী ও শিশুদের সংখ্যা ছিল বেশি। ধংসস্তূপ সরানোর দায়িত্বে থাকা ভাইয়েরা ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করছিলেন। এসময় একজায়গা থেকে খুব সুঘ্রাণ আসতে লাগলো। ভাইয়েরা সেখান থেকে তাড়াতাড়ি ধংসস্তূপ সরানো শুরু করলেন। এই সুঘ্রাণ তো শহীদদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছাড়া আর কিছুই না! তাঁরা সেখানে একজন মহিলার লাশ পেলেন। যিনি পোল্যান্ডের অধিবাসী নওমুসলিম ছিলেন। তিনি কুরআন শরীফ মুখস্ত করছিলেন, মাত্র কয়েক পৃষ্ঠা বাকি ছিল। আল্লাহ তাআলা তাঁকে শাহাদাতের মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। (نحسبها كذالك অর্থ:এমনটাই আমাদের বিশ্বাস)
এমনিভাবে আমাদের আরেকজন প্রিয় ভাই স্ত্রী ও দুই ছোট মেয়েসহ শহীদ হন। এক মেয়ের বয়স ছিল সাত বছর, আরেকজনের প্রায় নয় বছর। ছোট মেয়েটিকে তাঁর পিতা কুরআনের শেষ তিন পারা মুখস্ত করিয়েছিলেন এবং লেখাও শিখিয়েছিলেন। মেয়েটি পড়া লেখায় এত মজবুত ছিল যে, লেখা কিংবা পড়াতে কোনো ভুল হত না। এছাড়া আরো কিছু মুজাহিদও শহীদ এবং আহত হয়েছেন।
এই হামলায় আল্লাহর রহমতের কিছুটা বহিঃপ্রকাশ এভাবে হয়েছে যে, হামলায় ধ্বসে যাওয়া ঘরগুলোর একটি ঘরে মোটা অংকের বাইতুল মালের আমানত রাখা ছিল। দায়িত্বশীল ভাইয়েরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ যাদের কাছে আমানত ছিল তাঁরা তো শহীদ হয়ে গেছেন। এখন এই ধ্বংসস্তূপ থেকে বাইতুল মাল কিভাবে বের করবে? কোথায় তালাশ করবে? আমানতের মাল তালাশের জিম্মাদার মুজাহিদ ভাই সামান-পত্র বের করছিলেন, আর প্রত্যেকটি জিনিস ভালোভাবে দেখছিলেন। কয়েক ঘণ্টা চেষ্টার পর ক্লান্ত হয়ে ঐ জায়গায়ই বসে পড়লেন।
অপরদিকে উদ্ধারকর্মী ভাইয়েরা তাঁর থেকে কিছু দূরে মাটিসহ আটার একটি বস্তা এবং আরো কিছু সামানা বের করে রাখলেন। জিম্মাদার ভাই নিরাশ হয়ে সেই সামান-পত্রের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এর মাঝে আমানতের মাল পাওয়া যাবে না। এরপর তিনি ঐ সামান খুলতে গেলেন। যেই প্রথম থলে খুললেন, তাতেই ঐ আমানত পেয়ে গেলেন। এটা আল্লাহর এক খাস রহমত ছিল, নতুবা এই মাল বের করা মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
বাইতুল মালের ব্যাপারে একভাই একবার বলছিলেন, নিজের মালের তুলনায় আমানতের মালের প্রতি বেশি খেয়াল রাখতে হয়। কারণ এটা গোটা উম্মতের আমানত। সুতরাং তা হেফাযতের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা ও দোয়া করে আল্লাহর উপর ন্যস্ত করা। আর বেশি বেশি এই দোয়া করা, ‘হে আল্লাহ! এই মাল আপনার, আপনিই তা হেফাযত করুন। আল্লাহ থেকে বড় হেফাযতকারী আর কেউ নেই।
Comment