Announcement

Collapse
No announcement yet.

দাওয়াতুল মুকাওয়ামাতিল ইসলামিয়্যাতিল আলামিয়্যাহ থেকে অনুবাদ | পর্ব: ৭ | প্রারম্ভিকা

Collapse
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • দাওয়াতুল মুকাওয়ামাতিল ইসলামিয়্যাতিল আলামিয়্যাহ থেকে অনুবাদ | পর্ব: ৭ | প্রারম্ভিকা

    ভূমিকা

    সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য—যিনি প্রশংসা ও মহিমার একমাত্র অধিকারী। সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য—যিনি পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলীর প্রতিপালক। হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা তোমারই, সমস্ত রাজত্ব তোমারই, আর সকল বিষয়ের পরিণতি একমাত্র তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়। হে পবিত্র ও উত্তমদের রব, হে নেককার বান্দাদের অভিভাবক—তোমারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। হে সেই সত্তা! যাঁরই একচ্ছত্র অধিকার সৃষ্টি ও বিধানের উপর—একমাত্র তুমিই তার অধিকারী।

    সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্যই। তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্যে পরিণত করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন, তাঁর সৈন্যদলকে সম্মান ও বিজয় দান করেছেন এবং একাই সমস্ত দল-গোষ্ঠীকে পরাজিত করেছেন। তাঁর আগে কিছুই ছিল না এবং তাঁর পরে কিছুই থাকবে না। আমরা একনিষ্ঠভাবে কেবল তাঁরই জন্য দীনকে খাঁটি রাখি—যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।

    আমাদের সরদার, আমাদের প্রিয়, আমাদের চোখের শীতলতা, আমাদের রবের কাছে আমাদের সুপারিশকারী—আমাদের নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর ওপর সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক; এবং তাঁর পরিবার ও সকল সাহাবির ওপরও। হে আল্লাহ! তাঁর ওপর সলাত, সালাম, বরকত ও অনুগ্রহ নাযিল করুন এবং তাঁকে তাঁর উম্মতের পক্ষ থেকে সেই সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন, যা আপনি কোনো নবীকে তাঁর উম্মতের পক্ষ থেকে দিয়ে থাকেন। নিশ্চয়ই তিনি আমানত আদায় করেছেন, রিসালাত পৌঁছে দিয়েছেন, উম্মতকে আন্তরিকভাবে উপদেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহর পথে যথার্থভাবে জিহাদ করেছেন—মৃত্যু পর্যন্ত।

    হে আল্লাহ! তাঁর উপর দয়া ও বরকত নাযিল করুন, এবং তাঁর পবিত্র ও পরিশুদ্ধ পরিবারবর্গ ও স্ত্রীগণের উপর, আর তাঁর সাহাবীগণ ও কিয়ামত পর্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁদের অনুসারীদের উপর। এমন এক দরূদ আমাদের উপরও অন্তর্ভুক্ত করুন, যার মাধ্যমে আপনি আমাদের আপনার রহমত, অনুগ্রহ, ক্ষমা ও আচ্ছাদনে আবৃত করবেন এবং আমাদেরকে আপনার পথে শহীদ হওয়ার তাওফিক দান করবেন। হে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু!

    আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত সমসাময়িক ইহুদি–ক্রুসেডী অভিযানগুলো আরব ও ইসলামি বিশ্বের বিরুদ্ধে তাদের লক্ষ্যসমূহ সম্পূর্ণভাবে ঘোষণা করেছে। এসব লক্ষ্য মুসলমানদের সভ্যতাগত, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের সব মৌলিক ভিত্তিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। আর বুশ প্রশাসন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিল যে, আগামী দশ বছরের মধ্যে তাদের লক্ষ্যসমূহ এর মধ্যেই বাস্তবায়িত হবে।

    ১. মধ্যপ্রাচ্য ও আরব–ইসলামি বিশ্বে রাজনৈতিক ধারণা/চিন্তাধারার পরিবর্তন—অর্থাৎ শাসনব্যবস্থাগুলোকে পরিবর্তন করা, পুনর্গঠন করা, প্রতিস্থাপন করা বা নতুনভাবে রূপায়ণ করা।

    ২. কিছু দেশের ভৌগোলিক ধারণা/সীমার পরিবর্তন—যার ফলে আরও বেশি বিভাজন, এবং স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয়, জাতিগত ও রাজনৈতিক সংঘাত সৃষ্টি হয়।

    ৩. অঞ্চলের জনগণের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সামাজিক কাঠামোর মৌলিক উপাদানগুলোতে পরিবর্তন আনা—ধর্মীয়, চিন্তাগত ও নৈতিক ভিত্তিকে সরিয়ে দিয়ে পশ্চিমা মতাদর্শের আলোকে, বিশেষত আমেরিকান ও জায়নিস্ট চিন্তাধারার ভিত্তিতে, সেগুলোকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করা।

    ৪. অঞ্চলের সম্পদসমূহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা—বিশেষ করে তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ, পাশাপাশি অন্যান্য কৃষিজ ও প্রাণিসম্পদ—এবং সেগুলোকে সমুদ্রের ওপার থেকে আগত দখলদার আগ্রাসী শক্তির শিরায় ও অঞ্চলের হৃদয়ে রোপিত ইহুদিবাদী সত্তার শিরায় প্রবাহিত করা। একই সঙ্গে, তথাকথিত মধ্যপ্রাচ্য অংশীদারিত্ব ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে অঞ্চলটিকে ঔপনিবেশিক পণ্যসমূহ বিপণনের বাজারে রূপান্তর করা।

    বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ব্রিটেন—যাদের পেছনে রয়েছে ইসরায়েল এবং স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাদের প্রভাববলয়ে ঘুরপাক খাওয়া ন্যাটো ও ইউরোপের সব দেশ—এই লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সামরিক, গোয়েন্দা, অর্থনৈতিক, গণমাধ্যমসহ সব ধরনের উপায়কে অবাধে ব্যবহার করেছে।

    সংক্ষেপে বলা যায়, বিশ্ব তার ইতিহাসে দেখা সবচেয়ে অন্ধকার ও সবচেয়ে হিংস্র বর্বর ঔপনিবেশিক আক্রমণের সাক্ষী হচ্ছে—যা সংঘটিত হচ্ছে পশ্চিমা সভ্যতার হাতে, যার নেতৃত্ব গিয়ে পড়েছে মার্কিন ইচ্ছাশক্তির ভেতরে থাকা কিছু চরমপন্থী, ক্রুসেডার-মানসিকতা ও ইহুদিবাদপন্থী গোষ্ঠীর।

    এ কথা বলা যায় যে—রূপক অর্থে যদি বলা হয়—এই (তৃতীয় ক্রুসেডি অভিযান) পূর্বে সংঘটিত দুইটি অভিযানেরই অত্যন্ত সহিংস ও সুসংগঠিত ধারাবাহিকতা। এর মধ্যে প্রথম অভিযানটি সংঘটিত হয়েছিল খ্রিষ্টীয় একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে, আর দ্বিতীয় অভিযানটি সংঘটিত হয়েছিল সপ্তদশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত।

    আমরা এমন এক সশস্ত্র সামরিক আগ্রাসনের মুখোমুখি, যা সর্বাধুনিক সামরিক যন্ত্রপাতি ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত, এবং সবচেয়ে ভয়ংকর গোয়েন্দা, নিরাপত্তা ও পুলিশি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থায় প্রস্তুত। তাদের ট্যাংকগুলো আমাদের দিকে বয়ে আনে সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কর্মসূচি, এতে ইসলামী ধর্মের মৌলিক ধারণাগুলো পরিবর্তনের পাঠক্রম, আরব ও মুসলমানদের জাতীয় উপাদান ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা, সমাজ পুনর্গঠন ও চিন্তাধারা-সংস্কৃতির উপাদানগুলোর নতুন করে রূপায়ণ, শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রম এবং গণমাধ্যমের কর্মসূচিসমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তারা সবকিছুই নতুন করে রূপ দিতে চায়—এমনকি মুসলমানদের মসজিদের মিম্বর থেকে প্রদত্ত জুমার খুতবাগুলো পর্যন্ত। এর আওতায় রয়েছে ধর্মীয় ও চিন্তাগত প্রভাবের সর্ববৃহৎ কেন্দ্রসমূহ—মক্কার মসজিদুল হারাম, মদিনার মসজিদে নববী, কায়রোর আল-আজহার মসজিদ—এবং প্রভাবের দিক থেকে সমতুল্য প্রতিটি দেশ, শহর, গ্রাম ও মুসলিম ভূমির প্রতিটি কোণায় অবস্থিত মসজিদও ।

    সংক্ষেপে বলতে গেলে, ক্ষতটি এতটাই বিস্তৃত হয়ে গেছে যে তাতে আর সাধারণ তালি লাগিয়ে কাজ হবে না। এখন আমাদের ওপর দায়িত্ব এসেছে এই অবনতি থামানোর। সেজন্য শূন্য, উপরিতলের আবেগ কিংবা হঠকারী ও উত্তেজিত প্রতিক্রিয়ার বাইরে গিয়ে, এই অভিযানের মোকাবিলায় কার্যকর ও সুপরিকল্পিত কৌশল নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।

    এই সর্বগ্রাসী বিপর্যয় তার সবচেয়ে করুণ ও ভয়াবহ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যখন আমরা উপলব্ধি করি যে—মুসলমানদের ইতিহাসে, এমনকি সম্ভবত উপনিবেশিত ও বহিরাক্রমণের শিকার অন্যান্য জাতিসমূহের ইতিহাসেও—এই প্রথমবারের মতো আক্রমণকারী উপনিবেশবাদী শক্তি এত প্রবল শক্তি ও সর্বপ্রকার হাতিয়ার নিয়ে নির্ভর করছে এক বিশাল পঞ্চম বাহিনীর উপর, যা আরব ও ইসলামি সমাজের নানা স্তর ও উপাদানের ভেতরে সুপরিকল্পিতভাবে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে।

    সুতরাং আজকের আমেরিকান আগ্রাসন বাস্তবতার নিরিখে—এই সত্য যতই মর্মান্তিক ও ভয়াবহ হোক না কেন—আরব ও মুসলিম বিশ্বের বর্তমান প্রায় সবকটি, অন্তত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি শাসনব্যবস্থার পূর্ণ সহযোগিতার উপরই দাঁড়িয়ে আছে। এই শাসনব্যবস্থাগুলো—যেগুলো নিজেদের টিকে থাকার কারণ, স্বার্থের সুরক্ষা এবং ফেরাউনসুলভ সিংহাসনের নিরাপত্তা খুঁজে পেয়েছে মার্কিন উপনিবেশবাদী ও তার সহযোগীদের পরিকল্পনার সঙ্গে—সেগুলো শব্দটির পূর্ণ অর্থেই আগ্রাসী সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের অধীনে নিজেদের সঁপে দিয়েছে। তারা সেই বাহিনীর চিন্তা-ভাবনা বাস্তবায়ন করছে এবং নিজেদের জনগণের ধর্ম, তাদের অস্তিত্বের ভিত্তি ও সকল স্বার্থের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে। এর ফলে এসব শাসনব্যবস্থা এই আগ্রাসন দমন করতে তাদের সমস্ত নিরাপত্তা, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যন্ত্রপাতিকে কাজে লাগিয়েছে। তারা যেকোনো ধরনের প্রতিরোধের বীজ চূর্ণ করতে তৎপর হয়েছে—শুরু হয়েছে পরিবর্তনের দাবি, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও অহিংস প্রত্যাখ্যানের প্রতিটি রূপকে দমন করার মাধ্যমে; আর শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে সেই সব মানুষকে হত্যা, কারাবন্দি ও বাস্তুচ্যুত করার পর্যায়ে, যারা সামান্যতম কোনো প্রতিরোধের চিন্তাও করে—বিশেষ করে সশস্ত্র প্রতিরোধ ও বৈধ জিহাদের বীজসমূহকে।

    এরপর এই বিপর্যয় তার চরম মর্মান্তিক রূপ ধারণ করে, যখন দেখা যায়—মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ আলেম সুলতানদের দরবার, তাদের তলোয়ার ও স্বর্ণের আশ্রয়ে চলে গেছেন। তারা উপনিবেশবাদী আগ্রাসী শক্তির পক্ষে সবচেয়ে জঘন্য ভূমিকা পালন করছেন—তার ওপর শরিয়তের বৈধতার প্রলেপ দিচ্ছেন এবং প্রতিরোধের পথ থেকে সেই বৈধতা কেড়ে নিচ্ছেন।

    তারা আগ্রাসীদের সৈন্য ও সেনাবাহিনীকে ‘মু‘আহিদ’ ও ‘মুস্তা’মিন’ (চুক্তিবদ্ধ ও নিরাপত্তাপ্রাপ্ত) হিসেবে গণ্য করে তাদের রক্ত, সম্পদ ও যুদ্ধসরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার হুকুম দিচ্ছেন। আর যারা তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছে ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে—তাদেরকে ‘পৃথিবীতে ফিতনা ও ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী’ আখ্যা দিয়ে তাদের শাস্তি হিসেবে হত্যা, শূলবিদ্ধ করা, বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে দেওয়া কিংবা দেশ থেকে নির্বাসনের বিধান ঘোষণা করছেন।

    হায়! যদি এই মহাবিপর্যয় কেবল শাসকগোষ্ঠী ও তাদের ধর্মীয়, প্রচারমাধ্যমিক এবং নিরাপত্তা কাঠামোর আগ্রাসী দখলদার শক্তির সঙ্গে প্রকাশ্য জোটবদ্ধতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত, তবে সেটিই হতো সর্বোচ্চ দুর্যোগ। কিন্তু বাস্তবে বিপর্যয় তার চেয়েও বহুগুণ ভয়াবহ—কারণ আরব ও মুসলিম সমাজের ভেতর থেকে একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে চিন্তাগত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে এমনভাবে বিকৃত ও পুনর্গঠিত করা হয়েছে যে তারা সরাসরি দখলদারদের কাতারেই অবস্থান করছে; এমনকি তাদের কেউ কেউ বাহ্যত বিচ্যুত ও অবৈধ শাসনব্যবস্থার বিরোধী শিবিরে অবস্থান করলেও কার্যত তারা আগ্রাসনেরই সহচর। বস্তুত এই তথাকথিত বিরোধী শক্তিগুলো নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন তারা আগ্রাসী দখলদার শক্তির সেবায় আরও বেশি প্রস্তুত ও সক্ষম। এমনকি তাদের অনেকেই সেই শাসনব্যবস্থাগুলোকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে শত্রুর সঙ্গে সরাসরি জোট বেঁধেছে—এই কারণে নয় যে তারা ওই শাসনগুলোকে দখলদারের দালাল ও জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতক মনে করে, বরং এই জন্য যে তারা নিজেরাই দখলদার শক্তির কাছে তাদের আনুগত্যপূর্ণ সেবা ও দক্ষতার প্রস্তাব পেশ করতে চায়; যেন তারা প্রমাণ করতে পারে যে তারা বহু দশক ধরে আমেরিকার উপাসনা করা সেই ‘ফিরাউনদের’ চেয়েও বেশি বিশ্বস্তভাবে তাদের সেবা করতে পারবে—যে ফিরাউনরা কেবল নিজেদের নয়, বরং তাদের জনগণকেও আমেরিকা ও নিজেদের এবং শয়তানের দাসে পরিণত করেছিল। ফলে আফগানিস্তান ও ইরাকের দালাল বিরোধী শক্তির মডেল আজ একটি সফল দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে, যা অনুসরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

    এভাবেই আমাদের ঘরের ভেতরেই আমেরিকার সামনে একের পর এক সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় নানা ধরনের দালাল বিকল্প ও মুখোশধারী শক্তি—আমাদেরই রক্ত-মাংসের মানুষ, যারা আমাদের নাম বহন করে, আমাদের পোশাক পরে, আমাদের ভাষায় কথা বলে; অথচ উপনিবেশবাদীর দরবারে নিজেদের আনুগত্য ও দক্ষতা পেশ করে নিজেদের উম্মাহকে হত্যা করতে, নিজেদের দ্বীনকে পরাজিত করতে, নিজেদের সন্তানদের রক্ত ঝরাতে এবং আমাদের সভ্যতার সব ভিত্তি সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলতে।

    এই দালাল শ্রেণি কোনো একক চিন্তাধারা, নির্দিষ্ট জাতিগত পরিচয় কিংবা বিশেষ কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এই ঘৃণ্য পঞ্চম বাহিনীতে এমন লোকও আছে যারা নানান স্লোগান ও পরিচয়ের পতাকা বহন করে—মিথ্যা ও ভণ্ডামিপূর্ণ ইসলামী পরিচয়ধারী দল থেকে শুরু করে আমাদের দেশগুলোর রাজনৈতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিসরের সমগ্র বর্ণালি জুড়ে, আরব জাতিসমূহ হোক কিংবা অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠী—সকলের মধ্যেই তাদের উপস্থিতি বিদ্যমান।

    আর এই বিপর্যয়ের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—ইসলামী আলেম, দাঈ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, দল ও বিভিন্ন সংগঠনের অনেক সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষকে প্রচণ্ড মিডিয়া আগ্রাসন সম্পূর্ণভাবে চূর্ণ করে দিয়েছে। এর ফলস্বরূপ তারা মাথানত করা ও প্রতিরোধের অসম্ভবতার ধারণা প্রচার করতে শুরু করেছে। তারা এমন সব পথে হাঁটছে, যেগুলো স্বয়ং শত্রুই নির্ধারণ করে দিয়েছে—যেমন তথাকথিত শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সাংস্কৃতিক বিনিময়, শান্ত ও নরম সংলাপ, এবং সেই দখলদার শত্রুর সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক সমঝোতা; যে শত্রু আমাদের উপর প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা তার বোমা ও ‘স্মার্ট’ ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করছে, তার সৈন্যদের হাতে এবং আমাদেরই জাতির কিছু নির্বোধ দাসে পরিণত সন্তানের মাধ্যমে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে।

    এসব কিছুই করা হচ্ছে কখনো ‘মধ্যপন্থা’র নামে, কখনো ‘সংযম’-এর অজুহাতে, কখনো ‘প্রজ্ঞা’র দোহাই দিয়ে, আবার কখনো বলা হচ্ছে—এ ধরনের প্রতিরোধ নাকি অকার্যকর আত্মহনন ও অযথা ঝুঁকি মাত্র।

    এভাবেই আল্লাহ তাআলার দ্বীন পরিত্যক্ত হয়ে যায়, অথচ তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে যে নির্দেশ দিয়েছেন—এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, আল্লাহর শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করা যতটুকু সম্ভব, তাদের মোকাবিলার জন্য আমাদের সাধ্যানুযায়ী সর্বশক্তি প্রস্তুত করা এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া—সেসব আদেশ উপেক্ষিত থাকে।

    এভাবেই আরব ও ইসলামী সমাজের বিভিন্ন স্তরের সৎ ও সম্মানিত মানুষদের পক্ষ থেকে এখানে-ওখানে যে আন্তরিক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর উঠেছিল, তা দমন করে দেওয়া হয়। মুসলমানদের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের আওয়াজ নিস্তেজ হয়ে যায় তথাকথিত “শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী”-এর লাঠিচার্জ ও অশ্রু গ্যাসের আঘাতে, আর একই সঙ্গে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া প্রচারযন্ত্রের চাপে—যার অগ্রভাগে ছিল শাসকপন্থী আলেমদের নিকৃষ্ট ফতোয়া ও মতামত, নিষ্ক্রিয় ফকিহদের বক্তব্য এবং আত্মসমর্পণ, লাঞ্ছনা ও অপমানের দিকে আহ্বানকারী প্রচারকদের বয়ান।

    ময়দানে আর অবশিষ্ট নেই কিছু পবিত্র হৃদয়, কিছু মুজাহিদ বাহু ও ঈমানদার দৃঢ় সংকল্প ছাড়া—যারা এখানে-সেখানে উপনিবেশবাদীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। তারা দুর্বল ও ছিন্নভিন্ন কিছু ক্ষুদ্র দল; অধিকাংশ সময় তাদের শহীদদের পতন ঘটে কোনো দৃশ্যমান ফল বা বাস্তব সাফল্য ছাড়াই। তবে ব্যতিক্রম শুধু এটুকুই—একটি ব্যক্তিগত সাফল্য, একান্ত আত্মিক বিজয়; যা তার অধিকারীকে এই পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা দুর্গন্ধ ও পচন, জুলুম-নির্যাতনের ঘন অন্ধকারের মধ্য থেকে তুলে নিয়ে যায় চিরস্থায়ী জান্নাত ও রব্বুল আলামিন আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে।

    নিশ্চয়ই, পরিস্থিতি যদি এভাবেই চলতে থাকে, তবে আমরা হুমকির মুখে রয়েছি।

    আমি বলছি না যে আমরা সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার হুমকিতে আছি—কারণ আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল ﷺ এই উম্মতকে টিকে থাকা, বিজয় ও নুসরতের সুসংবাদ দিয়েছেন।

    বরং আমরা হুমকির মুখে আছি আরও বেশি নিপীড়ন, কষ্ট, যন্ত্রণা, ক্ষুধা ও ভয়ের আবরণ, হত্যা, অপমান ও লাঞ্ছনার।

    অতএব, এই উম্মতের মুজাহিদ শ্রেণি এবং সৎ, নিষ্ঠাবান ও মর্যাদাবান শিক্ষিত অভিজাতদের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে—প্রতিরোধকে কীভাবে জাগ্রত করা যায় এবং তার পরিসর কীভাবে বিস্তৃত করা যায়, সে বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা; যাতে উম্মত জাগ্রত হয়, আল্লাহর শত্রুদের মোকাবিলায় অংশগ্রহণ করে এবং নিজের অস্তিত্বের উপাদানসমূহ, দ্বীন ও সভ্যতাকে সংরক্ষণ করতে পারে।








Working...
X