শাহাদাতের ফযীলতের ব্যাপারে একটি সংশয়ের উত্তর (একটি হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা)
(একভাই নিম্মোক্ত হাদিসটির ব্যাখ্যা এবং হাদিসের উপর যে ইশকাল হয় তার উত্তর জানতে চেয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণে আমি এর উত্তর নতুন থ্রেডে দিচ্ছি।)
عَنْ عُبَيْدِ بْنِ خَالِدٍ السُّلَمِيِّ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آخَى بَيْنَ رَجُلَيْنِ، فَقُتِلَ أَحَدُهُموَمَاتَ الْآخَرُ بَعْدَهُ، فَصَلَّيْنَا عَلَيْهِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا قُلْتُمْ؟» قَالُوا: دَعَوْنَا لَهُ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ، اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ، اللَّهُمَّ أَلْحِقْهُ بِصَاحِبِهِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فَأَيْنَ صَلَاتُهُ بَعْدَ صَلَاتِهِ؟ وَأَيْنَ عَمَلُهُ بَعْدَ عَمَلِهِ؟ فَلَمَا بَيْنَهُمَا كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ». رواه النسائي (1985) وأبو داود (2523) وأحمد (17921) وابن أبي شيبة (35566) وقال الإمام ابن الملقن في البدر المنير (9/ 232) : هذا الحديث صحيح. وقال الشيخ عوامة في تعليقه على مصنف ابن أبي شيبة (19/127) : هو حديث صحيح. وقال الشيخ شعيب: إسناده صحيح.
অর্থ: উবাইদ বিন খালিদ আসসুলামী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই ব্যক্তির মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দিলেন। তাদের একজন (যুদ্ধে) নিহত হন এবং অন্যজন তার পরে কোন এক জুম’আর দিন কিংবা তার কাছাকাছি কোন দিনে মারা যান। আমরা তার জানাযা আদায় করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা (দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য) কি দু’আ করেছো? আমরা বললাম, আমরা তার জন্য দু’আ করেছি এবং বলেছি, “হে আল্লাহ্! তাঁকে ক্ষমা করুন এবং তাঁকে তার সঙ্গীর সাথে মিলিত করুন”। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে প্রথম ব্যক্তির সালাতের পর দ্বিতীয় ব্যক্তির সালাত, প্রথম ব্যক্তির সওমের পর দ্বিতীয় ব্যক্তির সওম ও অন্যান্য আমল কোথায় যাবে? এ দুই ব্যক্তির (মর্যাদার) মধ্যে আসমান-যমীনের ব্যবধান।’ –সুনানে নাসায়ী: ১৯৮৫; সুনানে আবু দাউদ: ২৫২৩; মুসনাদে আহমদ: ১৭৯২১; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ৩৫৫৬৬
হাদিসের মান:- ইমাম ইবনুল মুলাক্কিন, শায়েখ আওয়ামা, শায়েখ শুয়াইব রহ. হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। (দেখুন, আলবদরুল মুনির: ৯/২৩২; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, তাহকীক: শায়েখ আওয়ামা: ১৯/১২৭; সুনানে আবু দাউদ, তাহকীক: শায়েখ শুয়াইব: ৪/১৭৯)
ইশকালঃ- এখান থেকে বুঝে আসে শহীদি মৃত্যুর চেয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুর ফজিলত বেশী।অনেকে এটার মাধ্যমে দলিলও পেশ করে।
উত্তর: হাদিস থেকে যে ইশকাল সৃষ্টি হয় এটা বুঝার পূর্বে আমরা শরিয়তের একটি মূলনীতি বুঝে নিলে ভালো হবে। মূলনীতিটি হলো:-
কুরআন-সুন্নাহর কোন বক্তব্য বাহ্যিকভাবে অপর বক্তব্যের বিরোধী হয়ে গেলে যেটা ‘মুহকাম’ বা দ্ব্যর্থহীন সেটা অনুযায়ী আমল করা হবে, আর যে বক্তব্য ‘মুতাশাবিহ’ বা দ্ব্যর্থবোধক সেটাকে মুহকামের সাথে মিলিয়ে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হবে যেন দুই বক্তব্যের মাঝে কোন বিরোধ না থাকে, পরিভাষায় একে رَدُّ المُتَشابِه إلى المُحْكَم (মুতাশাবিহকে মুহকামের দিকে ফিরানো, মুহকাম অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা) বলা হয়। -(এ মূলনীতির জন্য দেখুন, সুরা আলে ইমরান, আয়াত, ৭; আহকামুল কুরআন, ইমাম জাসসাস, 2/282 দারু ইহইয়াউত তুরাস 1405 হি.; তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২/৩৬৫ দারু তাইয়েবাহ, 1419 হি.; বাদায়েউস সানায়ে’ ১/২১ দারুল কুতুব, ১৪০৬ হি.; বাহরুল রায়েক, ১/২৫৯ দারুল কিতাবিল ইসলামী; ই’লামুল মুওয়াক্কিয়ীন, ৪/৫৮ দারু ইবনুল জাওযী, ১৪২৩ হি.; ফাতহুল বারী, ইবনে রজব, 7/240 মাকতাবাতুল গুরাবা আলআছারিয়্যাহ, ১৪১৭ হি.)
এবার উপরোক্ত মূলনীতির আলোকে আমরা হাদিসটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো। তো আমরা জানি ইসলামে শাহাদাতের মর্যাদা অনেক অনেক বেশি। কুরআন-সুন্নাহয় শাহাদাতের ফযীলতের ব্যাপারে অসংখ্য আয়াত-হাদিস এসেছে। এমনকি আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হওয়া স্বত্বেও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছেন। সুতরাং শহিদি মৃত্যুর ফযীলত যে স্বাভাবিক মৃত্যুর চেয়ে বেশি- এটা শরীয়তের একটি মুহকাম বিধান যাতে কোন ধরণের তাওয়ীল বা ব্যাখ্যার সুযোগ নেই। পক্ষান্তরে আমাদের আলোচ্য হাদিসটি মুতাশাবিহ বা দ্ব্যর্থবোধক। একে তো এ ব্যাপারে হাদিস শুধু একটিই, অধিকন্তু হাদিসটি স্বাভাবিক মৃত্যু শহিদি মৃত্যুর চেয়ে উত্তম- এ ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ নয়, এতে ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে। তাই উপরোক্ত মূলনীতির আলোকে হাদিসটির ব্যাখ্যা এমনভাবে করতে হবে যেন তা শরীয়তের মুহকাম বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়। তো হাদিসটির ব্যাখ্যা কি? আল্লামা খলিল আহমদ সাহারানপুরী রহ. হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেন,
وقد يستشكل فضيلة درجة الآخر بالصلاة والصوم والأعمال غير الصلاة والصوم على القتل في سبيل الله.قلت: لا إشكال فيه، فإن بعضهم يبلغ درجة بالصلاة والصوم لا يبلغها الشهداء، ألا ترى أن أبا بكر الصديق - رضي الله عنه - بلغ درجة من الفضل لم يبلغها الشهداء وغيرهم بكمال إخلاصه وصدقه مع الله - تعالى -، فلعل هذا الرجل الآخر بلغ درجة بإخلاصه وصدقه في أعماله لم يبلغها الأول مع شهادته في سبيل الله. (بذل المجهود في حل سنن أبي داود 9/ 86(
‘হাদিসের উপর আপত্তি উত্থাপিত হয়, কারণ হাদিস থেকে বুঝে আসে, দ্বিতীয় ব্যক্তি নামায রোযা দ্বারা শাহাদাতের শাহাদাতের চেয়েও বেশি ফযিলত অর্জন করেছেন। আমি বলবো, হাদিসে কোন আপত্তি নেই। কেননা, কেউ কেউ নামায-রোযার দ্বারা সেই স্তরে পৌঁছে যায় যে স্তরে শহিদরাও পৌছতে পারেন না। যেমন আবু বকর রাযি. নিজের ইখলাস ও আল্লাহর সাথে সততা দ্বারা (শহিদ না হয়েও) সে স্তরে পৌঁছেছেন যে স্তরে শহিদরাও পৌঁছতে পারেনি। তো হতে পারে এই দ্বিতীয় ব্যক্তি তার নামায-রোযায় ইখলাস ও সিদকের দ্বারা সেই স্তরে পৌঁছেছেন যে স্তরে প্রথম ব্যক্তি শহিদ হয়েও পৌঁছতে পারেননি।’ –বাযলুল মাজহুদ: ৯/৮৬
তো যারা এ হাদিস দিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুকে শহিদি মৃত্যুর চেয়ে উত্তম বলে দলিল পেশ করেন তারা কি বলতে পারবেন, আমাদের নামায-রোযায় সিদক ও ইখলাস এত উচ্চ স্তরের যার দ্বারা আমরা সেই সাহাবীর মতো শাহাদাতের চেয়েও বেশি মর্যাদা লাভ করতে পারবো?! অথচ আমাদের নামাযের কি দুরবস্থা তা তো আমরা সকলেই জানি। লাখো মুসল্লির মাঝে কতজন খুশু-খুযুর সাথে নামায পড়েন?
তাছাড়া এই যে দ্বিতীয় সাহাবী যিনি পরে মারা গেলেন তিনি কি আমাদের মতই জিহাদ ও শাহাদাতের প্রতি অনাগ্রহী ছিলেন? না কি তিনি শাহাদাতের সন্ধানে জিহাদের ময়দানে ছুটে বেড়িয়েছেন? তাই হাদিসের সুসংবাদ অনুযায়ী তিনি তো শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করতে পারেন। কিন্তু আমরা জিহাদের জন্য কোন ধরণের প্রস্তুতি না নিয়ে ঘরে বসে থেকে বরং জিহাদ ও শাহাদাতের প্রতি মানুষকে অনুৎসাহিত করে কিভাবে স্বাভাবিক মৃত্যু দ্বারা তার মতো শহীদের চেয়েও উত্তম মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা করতে পারি? আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী কারী রহ. বলেন,
وذلك لأنه أيضا كان مرابطا في سبيل الله، فله المشاركة في الشهادة حكما وطريقة، وله الزيادة في الطاعة والعبادة شريعة وحقيقة، وإلا فمن المعلوم أن لا عمل أزيد ثوابا على الشهادة جهادا في سبيل الله، وإظهارا لدينه، لا سيما في مبادئ الدعوة مع قلة أعوانه من أهل الملة. مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح (8/3307)
‘(দ্বিতীয় ব্যক্তি মর্যাদায় শহিদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ হলো) সেও আল্লাহর পথে মুরাবিত ছিল। তাই সেও হুকমী শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছে। পাশাপাশি সে ইবাদত ও আনুগত্যও বেশি করেছে। নতুবা এটা তো সর্বজনবিদিত যে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য জিহাদে শহিদ হওয়ার তুলনায় কোনো আমলের সওয়াব বেশি হতে পারে না। বিশেষকরে দাওয়াতের সূচনালগ্নে যখন দ্বীনের সাহায্যকারী কম থাকে।’ –মেরকাতুল মাফাতিহ: ৮/৩৩০৭
সারকথা হলো, হাদিসটি যেহেতু বাহ্যিকভাবে ইসলামের সর্বস্বীকৃত মুহকাম বিষয়ের বিপরীত, তাই ইলমের মূলনীতি অনুযায়ী হাদিসটির ব্যাখ্যা করতে হবে। ব্যাখ্যা একাধিক হতেই পারে, যার নিকট যে ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য মনে হয় তিনি তা গ্রহণ করবেন। কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর অসংখ্য নুসুস দ্বারা প্রমাণিত শরিয়তের সর্বস্বীকৃত একটি বিষয়কে এ ধরণের একটি মাত্র দ্ব্যর্থবোধক হাদিস দিয়ে পাল্টে ফেলার চেষ্টা করা অন্তরের বক্রতারই প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ
‘(হে রাসূল!) তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন, যার কিছু আয়াত মুহকাম, যার উপর কিতাবের মূল ভিত্তি এবং অপর কিছু আয়াত মুতাশাবিহ। যাদের অন্তরে বক্রতা আছে, তারা সেই মুতাশাবিহ আয়াতের পেছনে পড়ে থাকে, উদ্দেশ্যে ফিতনা সৃষ্টি করা এবং সেসব আয়াতের তাবীল খোঁজা। -সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭
হায়! এধরণের মুতাশাবিহ ও দ্ব্যর্থবোধক হাদিস পেশ করে উম্মাহকে জিহাদ বিমুখ করা কি কোন আলেমের শান হতে পারে? অথচ আলেমগণ তো সেই নবীর ওয়ারিশ যাকে আদেশ করা হয়েছে মুমিনদের জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার। পক্ষান্তরে জিহাদ থেকে বিমুখ করা, জিহাদে অনুৎসাহিত করা তো মুনাফিকদের অভ্যাস। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الْمُعَوِّقِينَ مِنْكُمْ وَالْقَائِلِينَ لِإِخْوَانِهِمْ هَلُمَّ إِلَيْنَا وَلَا يَأْتُونَ الْبَأْسَ إِلَّا قَلِيلًا (18) أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ
‘আল্লাহ তাদেরকে ভালো করেই জানেন, তোমাদের মধ্যে যারা (জিহাদে) বাধা সৃষ্টি করে এবং নিজ ভাইদেরকে বলে, আমাদের কাছে চলে এসো। আর তারা নিজেরা তো যুদ্ধে আসেই না; আসলেও তা অতি সামান্য।(এবং তাও তোমাদের গনিমতের) প্রতি লালায়িত হয়ে।’ -সূরা আহযাব: ১৮-১৯
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিকভাবে কুরআন-সুন্নাহ বুঝার ও মানার তাওফিক দান করুন।
Comment