সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরের অবস্থা
- "কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এটা ছিল যে,যখনই ইসলাম বাস্তবায়নের আওয়াজ উঠলো আপনজন কি আর পরজন কি সকলে আমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ল। আমরা পেরেশান হয়ে গেলাম।ইয়া আল্লাহ,এক শরয়ী,আইনি,উসুলি দাবি কেন এতবড় অপরাধ হয়ে গেল! যে এত হাহাকার বিস্তার হয়ে গেল।ঐ রাষ্ট্র যা আমাদের কোন প্রতিবাদকে বিবেচনায় আনতে ছিল না এই সামান্য প্রচেষ্টার কারণে তাদের প্রাসাদ সমূহে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল।ঐ প্রচার মাধ্যম যা নির্লজ্জতার চাকচিক্যেকে নিজেদের লক্ষ্যবস্তু মনে করতেছিল তারাও শরীয়ত বাস্তবায়নের দাবিসমূহকে প্রকাশ্যভাবে জায়গা দিতে অপারগ হয়ে যায়।শরীয়ত বাস্তবায়নের এই দাবি সমূহ এবং মেহনতের কারণে সারা দেশের মানুষের মধ্যে এক আশার প্রদীপ জ্বলে উঠলো।নওজোয়ানদের কাফেলা গুলো মাথায় পাগড়ি বেঁধে লাল মসজিদ অভিমুখি হতে থাকে। সম্ভ্রান্ত মহিলাগন এবং মাদ্রাসা, স্কুল এবং কলেজের ছাত্রীরা জামিয়া সাইয়েদা হাফসার ছাত্রীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এরপর আর কি ছিল? আমাদের কঠিন ফলাফলের ধুমকি দেয়া শুরু হয়ে যায়। আমাদের মসজিদ মাদ্রাসাকে বারবার অবরুদ্ধ করতে শুরু করলো। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ প্রত্যেকবার আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে পরাজিত হতে হতো। কেননা ওলামা তলাবা এবং জনসাধারণ মসজিদ সংরক্ষণ কল্পে নিজেদের জান উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত করে রেখেছিল।
লাল মসজিদ যা সর্বদা দ্বীনি আন্দোলন সমূহের কেন্দ্র ছিল।শরীয়ত অথবা শাহাদাতের আওয়াজ উঠানোর পর সারা দেশের জুলুম অত্যাচারের যাঁতাকলে পিষ্ট জন সাধারণের আশার প্রদীপ ও কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। লোকেরা নিজেদের মাসআলা সমূহ হল করার জন্য লাল মসজিদের দিকে ফেরা শুরু করে দিল। আলহামদুলিল্লাহ মাওঃ আব্দুল আজিজ সাহেব এবং আল্লামা আব্দুর রশীদ গাজি শহীদ রহঃ অনেক বিপদগ্রস্ত ভাইদের দুঃখ ভাগ করে নিল। অনেক অত্যাচারিত বোনদের ক্ষতে প্রতিষেধক লাগালো।(অর্থাৎ তাদের অত্যাচারের প্রতিকার করলো=আবু বাসির)। ন্যায়ের তালাশে তিরস্কৃত হয়ে অপমানিত হওয়া লোকদের ন্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে সাহায্য করলো। যখন জানতে পারলো যে, লাল মসজিদ থেকে আশার প্রদীপের আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তখন জীবনের বিভিন্ন সেক্টর বা ক্ষেত্রের সাথে সম্পৃক্ত লোকদের কাফেলা গুলো লাল মসজিদের দিকে আসতে শুরু করে দিল।অগনিত যুবকেরা এসে লাল মসজিদে নিজেদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে নেয়। এবং নিজেদের জীবন গুলো প্রিয় দেশের মধ্যে ইসলাম বাস্তবায়নের মেহনতের জন্য ওয়াকফ করে দেয়।"
(হাম পর কিয়া গুজরে পৃষ্ঠা নং:১৩-১৪)শরীয়ত বাস্তবায়নের আওয়াজ ও যামানার গাদ্দারদের অবস্থা
- "সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট এবং বাতিলপন্থীরা অত্যন্ত সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে এই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিল। তারা সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিল যে, পাকিস্তানের আদালত ব্যবস্থার উপর অনাস্থা প্রকাশকারী লোকেরা লাল মসজিদকে নিজেদের ব্যাথার উপশম মনে করে নেয়, তাহলে তো এরপর আমাদের জন্য আর কোনো আশ্রয়স্থল বাকি থাকবে না। সুস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল যে, আমাদের বর্তমান সিস্টেম যা বিগত ৬০ বছর যাবত জনগনের রক্ত চুষতেছিল এবং দুর্বল অবস্থায় লোকদের পিঠের উপর জুলুম অত্যাচারের স্টীমরুলার চালাচ্ছিল। লাল মসজিদ থেকে যে ইনসাফপূর্ণ নেযাম বাস্তবায়নের আওয়াজ উঠানো হয়েছে এই আওয়াজ ঐ সিস্টেমের ভিত নাড়িয়ে দেবে। এবং এই লোকদের যদি এই বিশ্বাস এবং অনুভূতি হয়ে যায় যে, ইসলামের ন্যায় এবং ইনসাফের ব্যবস্থাপনার মধ্যেই রয়েছে মুক্তি এবং সফলতা তাহলে তো এই সিস্টেম তার রক্ষক ও সুবিধাভোগীদের জন্য পাকিস্তানের ভূমি সংকীর্ণ হয়ে যাবে।"
শরীয়ার আওয়াজ দমাতে গাদ্দারদের পদক্ষেপ
- " এজন্য ঐসব লোকেরা নিজেদের সমস্ত মাধ্যমকে লাগিয়ে দিয়ে ইসলাম বাস্তবায়নের আওয়াজকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে, এবং আমাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডায় লিপ্ত হয়ে যায়। তুচ্ছ জিনিস পাহাড়সম করে উপস্থাপন করতে থাকে। ছোট ছোট জিনিসকে প্রসিদ্ধ করে দিতে লাগলো। কখনো মাদ্রাসার জমি নিয়মবহির্ভূত হওয়ার আলোচনা করতে লাগলো। কখনো কখনো রেড অফ গভর্নমেন্টের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কথা ছেড়ে দেয়া হতো। কখনো অন্যকোন ভেল্কিবাজির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হতো। আমাদের ওসব কোন জিনিসের পরোয়া ছিল না। কিন্তু আমাদের সাথে সবচেয়ে বড় যে অন্যায় হয়েছে তা এই যে, আমাদের নিজেদের অন্তরের মধ্যে আমাদের ব্যাপারে ভুল বুঝ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাদেরকে এজেন্সিগুলোর জন্য কাজ করার অভিযোগ করা হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে বিস্তৃত বা বিশাল ময়দান এমন দক্ষতার সাথে সমতল করা হয়েছে যে, আমাদের নিজেরাও আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করলো।"
শরীয়ার দাবিতে কেমন ছিল লাল মসজিদ কর্তৃপক্ষের চাওয়া ও অবস্থান
- "সকলেই জানতো যে, দ্বীনের সংরক্ষণ ও দ্বীনের প্রচার প্রসারের জন্য আমাদের বংশের নীতি পদ্ধতি কেমন ছিল। সকলের জানা ছিল যে, আমরা নিজেদের জন্য কিছু চাচ্ছিলাম না। মাওঃ আব্দুল আজিজ সাহেব তো পূর্ণ জীবন দরবেশী এবং দরিদ্রতার জগতে কাটিয়েছিলেন। আমাদের কাছে এমন অনেক সুযোগ এসেছে যে, তখন যদি আমরা আপোষ করতে চাইতাম "কিছু দাও কিছু নাও" পলিছি গ্রহণ করতাম। তাহলে নিজের জন্য অনেক কিছু নিতে পারতাম। এতকিছু! যা অনেকের চিন্তারও অনেক উর্ধ্বে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সাক্ষী যে, আমরা নিজেদের জন্য কিছুই নেয়নি। আমরা আল্লাহর জন্য আল্লাহর দ্বীনের সারবুলন্দির(উচ্চতার) জন্য নিজেদের সমস্ত উপকার সমূহকে এমনকি নিজেদের জীবনের বাজি রেখে দিয়েছি এবং সবসময় দৃঢ়তার রাস্তা অবলম্বন করেছি। কিন্তু বুঝে আসে না আমাদের কেন একা এবং সাহায্য সহযোগিতা বিহীন ছেড়ে দেওয়া হলো? পরিশেষে আমাদের অপরাধ কি ছিল? সকলে আমাদের দাবিসমূহের সঙ্গদান করছিলেন। আমাদের মেহনতকে যুগের গুরুত্বপূর্ণ তাকাজা/ চাহিদা সাব্যস্ত করতেছিলেন। কিন্তু ভর্ৎসনা করা হচ্ছিল একথার উপর যে, লাল মসজিদ ওয়ালাদের পদ্ধতি ভুল। আমরা সর্বদা হাত জোড় করে আরজ করেছি যে, ইসলাম বাস্তবায়ন ও অশ্লীলতা বন্ধের মেহনতকে সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ মেহনত তো সকলেই মানে। এখন যদি এই মেহনত করার আমাদের পদ্ধতি ভুল হয় তাহলে সঠিক পদ্ধতিতে এই মেহনত শুরু করে দেয়া হোক। অথবা আমাদের সামনে সঠিক পদ্ধতি চিন্থিত করে দেয়া হোক। কিন্তু এমনটি কেউ করেনি। বরং এক বহুত বড় দল এমন ছিল যে, বিরোধীতা শুধু বিরোধীতা করার জন্যই ইখতিয়ার করেছেন।উকিল ভাইগন একটি দুনিয়াবি মাসআলার জন্য দৃষ্টান্তমূলক একতা ও ঐক্যবদ্ধতার প্রকাশ ঘটিয়ে হুকুমতকে রাষ্ট্রকে ঝুঁকতে বাধ্য করে দিয়েছিল। কিন্তু আমাদের দ্বীনদার ভাইয়েরা এক খালেছ/ একনিষ্ঠ দ্বীনি শরয়ী মাসআলার উপর একতা ঐক্যবদ্ধতা এবং একমত হওয়ার প্রকাশ ঘটাতে পারেনি।"
কেমন ছিল ইসলাম বাস্তবায়নের পদক্ষেপ ও পরিস্থিতি
- "আমরা ইসলাম বাস্তবায়নের মেহনতের প্রতি কাজের পদক্ষেপের মাধ্যমে আচার আচরণের পবিত্রতার জন্য প্রেশার দেয়া শুরু করলাম। মাওঃ আব্দুল আজিজ সাহেব বলতেন যে:"যতক্ষণ পর্যন্ত আচার আচরণের মধ্যে বিস্তার হওয়া অশ্লীলতার নাপাকি দূর না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সংশোধিত আচরণ অস্তিত্বে আসা এবং ইসলামী বিপ্লব রহমান আসার কোন সুযোগ নেই। এজন্য মাওলানা সাহেবকে এই ফিকির পেয়ে বসেছিল যে, রাষ্ট্র এবং শহরের বিভিন্ন জায়গায় অশ্লীলতার আড্ডাখানায় বাচ্চাদের উপর জুলুম হচ্ছিল তারা আমাদের বাচ্চাদের মত। আর যে যুবকদের পথভ্রষ্টতার সবক দেয়া হচ্ছিল তারা আমাদের বাচ্চাদের মত। এজন্য আমরা প্রাথমিকভাবে সিডি এবং অশ্লীলতার আসবাবপত্রের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া লোকদের মধ্যে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত শুরু করি।"
সেই মেহনত যেমন ছিল
এবার একটু সেই মেহনতের ধরন সম্পর্কে জানবো
- " রবিউল আউয়ালের শুরুতে রাজধানী ইসলামাবাদের বাজারগুলোতে বিভিন্ন মার্কেটে গিয়ে মসজিদ ও মাদ্রাসার ছাত্ররা দাওয়াতি গাশত শুরু করে। ছাত্ররা সিডি সেন্টারগুলোতে তাবলীগের জন্য যেতেন। তারা ভিডিও ক্যাসেট ও সিডির দোকানে গিয়ে দোকানদারকে বোঝায়। মুসলিম সমাজের চারিত্রিক অধঃপতনের উৎস এসব কারবার যেন তারা বন্ধ করে দেয় এবং অশ্লীল ফিল্মের দোকানদারকে এই ব্যবসা ছেড়ে কোন হালাল রিজিকের পন্থা অনুসরণের নসিহত করতেন। তাদের তাবলীগের কারণে কিছু দোকানদার তওবা করে এবং নিজেদের ইচ্ছায় অশ্লীল ফিল্মের সিডি গুলো পুরিয়ে দেয়। এছাড়াও তারা বিভিন্ন সেলুনে গিয়ে নরসুন্দরদের বুঝিয়ে আসে ।তারা যেন আল্লাহকে ভয়ে দাড়ি ছাঁটা ও মুন্ডন করার মতো শরিয়াহ নিষিদ্ধ কার্যাবলি পরিহার করে।
ভিডিও ক্যাসেট ও সিডি বিক্রেতা কিছু দোকানদার মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেবের কাছে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনে সহযোগিতা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।এর পাশাপাশি তারা দাবি জানায় এ অঞ্চলে অবস্থিত পতিতালয় গুলোকেও যেন বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। অন্যথায় সেগুলো যতদিন খোলা থাকবে মুসলিম যুবা প্রৌঢ়দেরকে চরিত্রহীন করার পিছনে ব্যাপক অবদান রাখবে এবং সমাজে অশ্লীলতা ছড়াবে। তাঁরা ইসলামাবাদে অবস্থিত অনেক পতিতালয়ের ঠিকানা ও পরিচয় সেখানে তুলে ধরে।
(রক্তাক্ত লাল মসজিদ, পৃষ্ঠা নং:২০, এবং উস্তাদ আহমদ ফারুক রহঃ জীবনী থেকে নেয়া অংশ অবলম্বনে)- "অনিষ্টতার এ উৎস সমূহকে বন্ধ করে দেয়া শুরু করি। আল্লাহ তায়ালা সাক্ষী যে, আমরা জবরদস্তি করে না কারো দোকান বন্ধ করে দিয়েছি না সিডি আগুনে পুড়িয়েছি। হ্যাঁ, বরং এমন অগনিত সৌভাগ্যবান ছিল,যারা মাওঃ আব্দুল আজিজ সাহেব এবং তাহরিকে তলাবা ওয়া তলিবাত (ছাত্র ছাত্রীদের আন্দোলন) এর দিকনির্দেশনার দাওয়াত দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজেই ঐ নাজায়েজ নাপাক ব্যবসা থেকে তওবা করার ঘোষণা দেয়ার ফয়সালা করে নেয়, এবং নিজ হাতে ঐ নাপাক আসবাব জালিয়ে দেয়। সকলের জানা আছে যে, লাল মসজিদের বাহিরে এক ব্যক্তি নিজ সন্তুষ্টি ও আগ্রহের সাথে ১৫ লক্ষ টাকার অশ্লীলতার আসবাবপত্র আগুনে নিক্ষেপ করে। এরকম ভাবে بہارہ کہو এর এক ব্যক্তি নিজের অডিও শপে বিদ্যমান অশ্লীলতার আসবাব সমূহ নিজে আগুনে নিক্ষেপ করায় তো তাকেও গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান দিয়ে অতিক্রমকারি আমাদের শিক্ষার্থীদের ধরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
অশ্লীলতার আসবাব শেষ করার এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ প্রিয় মাতৃভূমির নতুন প্রজন্মকে হেফাজতের লড়াই ছিল এবং নওজোয়ান প্রজন্মের যোগ্যতা সমূহ দ্বীন ও জাতির খেদমতে লাগানোর চেষ্টা ছিল।এই প্রচেষ্টার কারণে তো আমাদের এ্যাওয়ার্ড পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু উল্টা আমাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা শুরু করে দেয়া হলো, এবং আমরা ও আমাদের শিক্ষার্থীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হলো। আমাদের বাচ্চাদের গ্রেফতার করে জেলে ভরে দেয়া হল।"
(হাম পর কিয়া গুজরে, পৃষ্ঠা নং:১৬-১৭)
চলবে ইনশাআল্লাহ.......