ইহুদিদের ফিলিস্তিনে জায়োনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ও লালসার কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় অবশেষে সুলতান নিজেকে খেলাফত থেকে সরিয়ে নেন। আরেকটি কারণ ছিল তার খেলাফতের ইতিহাস বিকৃতি ও নেতিবাচক সমালোচনায় ভরিয়ে তোলা। সুলতানের নিজের হাতে লিখিত ঐতিহাসিক সূত্র থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ক্ষমতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার পর এর কারণ ব্যক্ত করে সুলতান আবদুল হামিদ দামেশকের শাজিলি তরিকার শাইখ মাহমুদ আবুশ শামাতের কাছে একটি চিঠি পাঠান। প্রফেসর সাইদ আফগানি কুয়েত থেকে প্রকাশিত ‘আল-আরাবি’ পত্রিকার ১৩৯২ হিজরির শাওয়াল মোতাবেক ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর সংখ্যায় ‘সুলতান আবদুল হামিদের অপসারণের কারণ’ শীর্ষক নিবন্ধে চিঠিটি প্রকাশ করেন। নিবন্ধটির নির্বাচিত কিছু অংশ আমরা এখানে উল্লেখ করছি:- ইত্তেহাদ পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালীন শাইখ মাহমুদ আবুশ শামাত চিঠিটি নিজের হেফাজতে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সিরিয়া থেকে তুর্কি শাসনের অবসান ঘটলে তার কাছের কিছু লোক চিঠিটির ব্যাপারে জানতে পারেন। শাইখের মৃত্যুর পর তার সন্তানরাও চিঠিটি সংরক্ষণ করেন। এটি যেহেতু অনেক মূল্যবান একটি বিষয় ছিল, তাই এ নিয়ে লোকদের মাঝে আগ্রহ সৃষ্টি হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। তা সত্ত্বেও কেবল নিজেদের বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন লোকদেরকেই তারা এ বিষয়ে অবগত করেছিলেন। কিন্তু কালের ধূলিতে একটা সময় চিঠিটি যখন ক্ষয় হতে শুরু করে, তখন তারা এটি জনসম্মুখে প্রকাশ করেন। শাইখের ছেলেদের কিছু বন্ধু, যারা ছিল দামেশকের গণ্যমান্য ব্যক্তি; তারা শাইখের ছেলেদেরকে বুঝিয়েসুঝিয়ে আমার পর্যন্ত চিঠিটি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। যেহেতু এখন আর সেটি লুকিয়ে রাখা বৈধ হয় না। নয়তো একটি সত্য ইতিহাস পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। এর মাধ্যমে অনেক আলিম ও গবেষক নিজেদের ভুল এবং মিথ্যা দাবি সংশোধন করে নিতে পারবে। শাইখের উত্তরসূরিরা কৃতজ্ঞচিত্তে তাদের আহ্বানে সাড়া দেয় এবং ১৯৭২ সালের শুরুর দিকে আমাকে চিঠিটি ধার দেয়। আমি সেটি প্রিন্ট করে রেখে মূল চিঠিটি তাদের ফিরিয়ে দিই।
শাইখের উত্তরসূরিদের এক বিদ্বান বন্ধু চিঠিটির আরবি অনুবাদ করেন। যিনি আরবি-তুর্কি উভয় ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন। তিনি সুন্দর হস্তাক্ষরে চিঠিটির আরবি অনুবাদ লিখে দেন। তারা আরবি সংস্করণটিকেও মূল চিঠির মতোই হেফাজতে রাখেন। সেই অনূদিত চিঠিটি এখানে উল্লেখ করছি।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ওয়া বিহি নাসতাইন :
(শুরু করছি পরম দয়ালু আল্লাহর নামে এবং তার কাছেই সাহায্য কামনা করি)
হামদ ও সালাতের পর…
সম্ভ্রান্ত শাজিলি তরিকার সম্মানিত শাইখ, আমার আত্মিক চেতনার উৎস শাইখ মাহমুদ আফেন্দি আবুশ শামাতের কাছে আমি আমার এই আরজি পেশ করছি। আমি তার পবিত্র দুই হাতে চুমো খাই এবং তার নেক দাওয়াতি মিশনকে অভিবাদন জানাই।
যথাবিহিত সম্মান ও শ্রদ্ধা নিবেদনপূর্বক জানাচ্ছি যে, এই বছরের ২২ মে, আমি আপনার লেখা চিঠি হাতে পেয়েছি এবং আপনি সুস্থ ও নিরাপদ আছেন জেনে মহান আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আদায় করেছি।
সম্মানিত শাইখ, আল্লাহ তায়ালার তাওফিকে আমি দিনরাত আপনার বলে দেওয়া শাজিলি তরিকার আমল করে যাচ্ছি এবং বিনয়ের সাথে জানাচ্ছি, আমি সর্বদা আপনার আন্তরিক দোয়ার মুখাপেক্ষী।
ভূমিকার পর আমি আপনার মতো উদার, বুদ্ধিমান এবং প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির কাছে ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আমানত হিসেবে জানাতে যাচ্ছি :
আমার খেলাফত থেকে সরে যাওয়ার পিছনে একমাত্র কারণ হচ্ছে, জোয়ানে তুর্ক (তুর্কি ইয়াং ফেডারেশন) নামে পরিচিত জমইয়াতে ইত্তেহাদের (কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রোগ্রেস) অব্যাহত চাপ এবং হুমকি। তাদের কারণেই আমি অপারগ হয়ে খেলাফত ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।
ঐ সংগঠনের সদস্যরা আমাকে বারংবার চাপ দিয়েছে, যেন আমি পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জাতিগত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে সম্মত হই। তদুপরি আমি কিছুতেই তাদের এই প্রস্তাবে সম্মত হইনি। সবশেষে তারা আমাকে দেড়শ মিলিয়ন লিরা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। আমি এই প্রস্তাবও স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করি।
জবাবে স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ ভাষায় বলে দিই: ‘দেড়শ মিলিয়ন কেন, তোমরা যদি সারা পৃথিবীর সমান স্বর্ণমুদ্রাও আমার সামনে এনে পেশ কর, আমি কিছুতেই তোমাদের এই ষড়যন্ত্র মেনে নেব না। ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে আমি ইসলামি বিশ্ব এবং মুসলিম উম্মাহর সেবা করেছি। আমার পূর্বপুরুষ উসমানি সুলতান ও খলিফাগণের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমি কিছুতেই কলঙ্কিত করতে চাই না।’
এই অকাট্য জবাবের পর তারা আমাকে অপসারণ করার ব্যাপারে একমত হয় এবং আমাকে জানানো হয়, তারা আমাকে থেসালোনিকিতে নির্বাসিত করবে। আমি তাদের সর্বশেষ এই ষড়যন্ত্র মেনে নিই।
তবু আমি আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করি যে, আমি তাদের ষড়যন্ত্র ও চাপের শিকার হয়ে উসমানি সাম্রাজ্য এবং ইসলামি বিশ্বের জন্য ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চির লজ্জাজনক এই প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করিনি। এরপর যা হওয়ার তাই হল। এজন্য আমি বারবার আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করি। আমি বিশ্বাস করি, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বুঝাতে আমি যেটুকু তথ্য দিয়েছি, তাই যথেষ্ট। এই বলেই আমি আমার চিঠির ইতি টানছি।
আপনার বরকতময় দুটি হাতে আমি চুমো খাই। আশা করছি, আপনি আমার সালাম ও সম্মান গ্রহণ করে সকল ভাই-বেরাদার ও বন্ধু-বান্ধবকে জানাবেন।
সম্মানিত ওস্তাদ, আপনার উদ্দেশে প্রেরিত এই চিঠিতে অনেক দীর্ঘ কথা বলে ফেলেছি। কিন্তু আপনাকে এবং আপনার সকল অনুসারীকে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জানাতে আমাকে এই দীর্ঘ প্রসঙ্গের অবতারণায় যেতে হয়েছে। আপনার উপর আল্লাহ তায়ালার শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।
২২ সেপ্টেম্বর, ১৯১১; ১৩২৯ হিজরি
বিনীত
মুসলমানদের সেবক
আবদুল হামিদ বিন আবদুল মাজিদ
(সোর্স: সুলতান আব্দুল হামিদ (রাহি) এর রাজনৈতিক ডায়েরি, ৭ম টিকা)
শাইখের উত্তরসূরিদের এক বিদ্বান বন্ধু চিঠিটির আরবি অনুবাদ করেন। যিনি আরবি-তুর্কি উভয় ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন। তিনি সুন্দর হস্তাক্ষরে চিঠিটির আরবি অনুবাদ লিখে দেন। তারা আরবি সংস্করণটিকেও মূল চিঠির মতোই হেফাজতে রাখেন। সেই অনূদিত চিঠিটি এখানে উল্লেখ করছি।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ওয়া বিহি নাসতাইন :
(শুরু করছি পরম দয়ালু আল্লাহর নামে এবং তার কাছেই সাহায্য কামনা করি)
হামদ ও সালাতের পর…
সম্ভ্রান্ত শাজিলি তরিকার সম্মানিত শাইখ, আমার আত্মিক চেতনার উৎস শাইখ মাহমুদ আফেন্দি আবুশ শামাতের কাছে আমি আমার এই আরজি পেশ করছি। আমি তার পবিত্র দুই হাতে চুমো খাই এবং তার নেক দাওয়াতি মিশনকে অভিবাদন জানাই।
যথাবিহিত সম্মান ও শ্রদ্ধা নিবেদনপূর্বক জানাচ্ছি যে, এই বছরের ২২ মে, আমি আপনার লেখা চিঠি হাতে পেয়েছি এবং আপনি সুস্থ ও নিরাপদ আছেন জেনে মহান আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আদায় করেছি।
সম্মানিত শাইখ, আল্লাহ তায়ালার তাওফিকে আমি দিনরাত আপনার বলে দেওয়া শাজিলি তরিকার আমল করে যাচ্ছি এবং বিনয়ের সাথে জানাচ্ছি, আমি সর্বদা আপনার আন্তরিক দোয়ার মুখাপেক্ষী।
ভূমিকার পর আমি আপনার মতো উদার, বুদ্ধিমান এবং প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির কাছে ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আমানত হিসেবে জানাতে যাচ্ছি :
আমার খেলাফত থেকে সরে যাওয়ার পিছনে একমাত্র কারণ হচ্ছে, জোয়ানে তুর্ক (তুর্কি ইয়াং ফেডারেশন) নামে পরিচিত জমইয়াতে ইত্তেহাদের (কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রোগ্রেস) অব্যাহত চাপ এবং হুমকি। তাদের কারণেই আমি অপারগ হয়ে খেলাফত ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।
ঐ সংগঠনের সদস্যরা আমাকে বারংবার চাপ দিয়েছে, যেন আমি পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জাতিগত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে সম্মত হই। তদুপরি আমি কিছুতেই তাদের এই প্রস্তাবে সম্মত হইনি। সবশেষে তারা আমাকে দেড়শ মিলিয়ন লিরা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। আমি এই প্রস্তাবও স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করি।
জবাবে স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ ভাষায় বলে দিই: ‘দেড়শ মিলিয়ন কেন, তোমরা যদি সারা পৃথিবীর সমান স্বর্ণমুদ্রাও আমার সামনে এনে পেশ কর, আমি কিছুতেই তোমাদের এই ষড়যন্ত্র মেনে নেব না। ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে আমি ইসলামি বিশ্ব এবং মুসলিম উম্মাহর সেবা করেছি। আমার পূর্বপুরুষ উসমানি সুলতান ও খলিফাগণের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমি কিছুতেই কলঙ্কিত করতে চাই না।’
এই অকাট্য জবাবের পর তারা আমাকে অপসারণ করার ব্যাপারে একমত হয় এবং আমাকে জানানো হয়, তারা আমাকে থেসালোনিকিতে নির্বাসিত করবে। আমি তাদের সর্বশেষ এই ষড়যন্ত্র মেনে নিই।
তবু আমি আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করি যে, আমি তাদের ষড়যন্ত্র ও চাপের শিকার হয়ে উসমানি সাম্রাজ্য এবং ইসলামি বিশ্বের জন্য ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চির লজ্জাজনক এই প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করিনি। এরপর যা হওয়ার তাই হল। এজন্য আমি বারবার আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করি। আমি বিশ্বাস করি, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বুঝাতে আমি যেটুকু তথ্য দিয়েছি, তাই যথেষ্ট। এই বলেই আমি আমার চিঠির ইতি টানছি।
আপনার বরকতময় দুটি হাতে আমি চুমো খাই। আশা করছি, আপনি আমার সালাম ও সম্মান গ্রহণ করে সকল ভাই-বেরাদার ও বন্ধু-বান্ধবকে জানাবেন।
সম্মানিত ওস্তাদ, আপনার উদ্দেশে প্রেরিত এই চিঠিতে অনেক দীর্ঘ কথা বলে ফেলেছি। কিন্তু আপনাকে এবং আপনার সকল অনুসারীকে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জানাতে আমাকে এই দীর্ঘ প্রসঙ্গের অবতারণায় যেতে হয়েছে। আপনার উপর আল্লাহ তায়ালার শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।
২২ সেপ্টেম্বর, ১৯১১; ১৩২৯ হিজরি
বিনীত
মুসলমানদের সেবক
আবদুল হামিদ বিন আবদুল মাজিদ
(সোর্স: সুলতান আব্দুল হামিদ (রাহি) এর রাজনৈতিক ডায়েরি, ৭ম টিকা)
Comment