তৃতীয় ঘটনা: মজলিসে হাজিরা
- "পাকিস্তান সৃষ্টির পর ইলেম ও ফিকহের ক্ষেত্রে মুহাজির আলেমগণ বৈপ্লবিক খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। সময় ও যুগের চাহিদা অনুযায়ী নতুন ভূমিতে নতুন সব মেহনতের ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন।তারই একটি অংশ ছিল মজলিসে হাজিরা।"(আত্মজীবনী:১৬৪)
- "এই লক্ষ্যে আলোচিত মজলিসটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে শুরুতে কয়েকজন বিখ্যাত মুফতী একত্রিত হয়েছিলেন। তন্মধ্যে ছিলেন: মুফতী মুহাম্মাদ শফী সাহেব, মুফতী মাহমুদ মুলতানি, আল্লামা বানুরি, মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানবি, মুফতী আব্দুল্লাহ মুলতানি প্রমূখ। প্রথম যুগে এই হযরতগন একত্রে মজলিসে হাজিরাকে এগিয়ে নিয়েছেন। তাঁরা আধুনিক নানান সমস্যা নিয়ে মাসে এক অথবা দুইবার আলোচনায় বসতেন। যেসব মাসআলায় তারা এসব মজলিসে একমত হতেন সেগুলো লিখিতভাবে ফতোয়া হিসেবে প্রকাশিত হতো। এভাবে মজলিসে হাজিরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। পরবর্তী যুগে এই কয়েকজন হযরতের সাথে আরো কয়েকজন মুফতী সাহেব যুক্ত হন।হজরত আবদুল্লাহ মুলতানি, মুফতী আব্দুস সাত্তার মুলতানি, মুফতী আহমাদুর রহমান প্রমুখ নতুনভাবে মজলিসে হাজিরার সদস্য নির্বাচিত হন।তারা সকলে মিলে কয়েক বছর যাবত মজলিসকে সারা পাকিস্তানে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলেন। জনজীবনের সকল জটিল আধুনিক সমস্যার নিরসন তাদের মাধ্যমে হতে থাকে।এই মজলিসের প্রভাব আলহামদুলিল্লাহ জনগণের মাঝে এতবেশি সৃষ্টি হয় যে, আধুনিক ইসলামীক গবেষণা সংস্থার কোন ফতোয়াই আর পরবর্তীতে গ্রহনযোগ্যতা রাখেনি।...
(আত্মজীবনী:১৬৭-১৬৮)
(মজলিসে অংশগ্রহণ)
এরপর যখন আমি (মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামী রহঃ) শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাই, তখন মজলিসে হাজিরার তৃতীয় পর্যায় চলছিল। নিউটাউন থেকে আল্লামা মুফতী আহমাদুর রহমান, মুফতী ওয়ালি হাসান টুংকি এবং আল্লামা বানুরি এই তিন জন তখন মজলিসে নিয়মিত অংশ নিতেন। ততদিনে মুফতী শফি সাহেব ইন্তেকাল করেছিলেন। দারুল উলুম থেকে সেজন্য দুই ভাই শুধু অংশ নিতেন। নিউটাউনে কখনো আল্লামা বানুরি উপস্থিত না থাকলে আমি উপস্থিত থাকতাম । আমাদের সময় যাকাত প্রদানকেন্দ্রিক একটি ফতোয়া অত্যন্ত আলোচিত হয়ে উঠে।
- মূল ঘটনা হলো, পাকিস্তান সরকার জেনারেল জিয়াউল হকের সময়ে কেন্দ্রীয়ভাবে যাকাত গ্রহণ করে তা আদায়ের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছিল।সেই লক্ষ্যে তাঁরা বেশ কিছু মুফতী সাহেব থেকে ফতোয়া গ্রহণ করেছিল।এই বিষয়টি যখন মজলিসে উপস্থিত হয়, তখন অধিকাংশ মুফতী সাহেব এর বিরোধিতা করেন। তাদের যুক্তি ছিল: রাষ্ট্র যতক্ষণ না সম্পূর্ণ আমানতদারি ও দরদি মনোভাব প্রদর্শন করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের উপর আস্থা রেখে যাকাত প্রদান করা সম্ভব নয়।এটি একটি ফরজ বিধান।এর খাতসংখ্যা নির্দিষ্ট।এটি আদায় করা জনগনের উপর প্রথমত ব্যক্তিগতভাবে ফরজ করা হয়েছে। কিন্তু যখন শাসনভার ইসলামী হুকুমত ও পরিপূর্ণ ইসলামী শাসকের হাতে থাকবে তখনই শুধু যাকাত কেন্দ্রীয়ভাবে গৃহীত হতে পারে। কিন্তু মুফতী তাকি এবং মুফতী রফি সাহেবের মত ছিল ভিন্ন। তাঁরা কুরআন ও হাদীসে ইসলামী শাসকের সকল গুনাবলি তৎকালীন পাকিস্তানের শাসকদের জন্য ব্যবহার করছিলেন। তাদের মত ছিল, কেন্দ্রীয়ভাবে যাকাত গৃহীত হলে জনকল্যাণমূলক কাজ অত্যন্ত সুচারুরূপে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু অন্য মুফতিরা এই মতের সম্পূর্ণ বিরোধীতা করেন। একজন মুফতী সাহেব (আমি তার নাম উল্লেখ করবো না) কিছুটা ক্রোধানিত্ব হয়ে এতদূর পর্যন্ত বলে ফেলেন, যেই সরকার কাদিয়ানিদের কাফের হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারে না। তাঁরা কীভাবে যাকাত গ্রহণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আমানতদারি বজায় রাখতে পারবে।এটি সম্পূর্ণরূপে একটি বোকামি সিদ্ধান্ত হবে।এই বলে তিনি মজলিস থেকে উঠে চলে যান। এতে করে মাসআলাটি মজলিসে হাজিরার কাছে অমিমাংসিত রয়ে যায়।
- কিন্তু সরকারি চাপ বাড়তে থাকায় একদিন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের লক্ষ্যে নিউটাউনে মজলিসের আয়োজন করা হয়। মজলিসে মুফতী মাহমুদ মুলতানিও উপস্থিত ছিলেন। তিনি একসময় ভুট্টোর সাথে লিঁয়াজো করলেও এই সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।তার মত ছিল, কেন্দ্রীয়ভাবে যাকাত প্রদান বৈধ হবে না। সেজন্য তিনি এই মতের পক্ষে বিস্তারিত দলিল প্রমাণ সহ ২ ঘন্টা আলোচনা করেন। আল্লাহর কি শান! সেদিনই তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায়।ফলে মাসআলাটি অমিমাংসিত থাকা অবস্থাতেই এই মজলিসের ঐতিহ্যবাহী ধারাবাহিকতা সমাপ্ত হয়।(আত্মজীবনী:১৭১-১৭২)
- যাকাতের মাসআলাতেও দারুল উলুম ব্যতীত সকল মুফতী সাহেব সরকারকে যাকাত দিতে একমত ছিলেন না।(আত্মজীবনী:১৭৩)
মতের অমিল
- এছাড়াও বিগত সময়ে আরো কিছু মাসআলায় মজলিস একমত হতে পারেনি। মুফতী তাকি ও মুফতী রফি উসমানি হাফিজাহুমাল্লাহ ভ্রাতৃদ্বয় আধুনিক মাসআলার ব্যাপারে অত্যন্ত শিথিল আচরণের অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। অপরদিকে মুফতী রশীদ সাহেব ও মুফতী ওয়ালি হাসান সাহেব আধুনিক মাসআলায় কিছুটা কঠোরতা অবলম্বনের পক্ষে ছিলেন।ফলে অধিকাংশ আধুনিক মাসআলায় মজলিস দ্বিমতের সাথে সমাপ্ত হতো। তাই এটা সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র যে, মজলিসের ধারাবাহিকতা যেকোন দিন সমাপ্তির মুখ দেখবে। যাকাত কেন্দ্রীক ইস্যুতে মুফতী মাহমুদের ইন্তেকালের ফলে সেই সমাপ্তি রেখা সূচিত হয়।(আত্মজীবনী:১৭২)
- এছাড়াও মানব দেহে অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা বৈধ হবে কি না? এব্যাপারে দারুল উলুম করাচির মুফতীদের মত ছিল বৈধ হওয়ার আর অন্যান্য মুফতীদের মত ছিল বৈধ না হওয়ার।
- ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং প্রশ্নে চরম মত পার্থক্য পরিস্থিতি তৈরি হয়। মজলিসের সকল মুফতীগন একমত ছিলেন যে, সময়ের বাস্তবতা যত কঠিনই হোক ইসলামী ব্যাংকিং নামে কোন বিষয়ে তারা একমত হবেন না। কেননা পুঁজিবাদী অর্থনীতির মেরুদণ্ড এই ব্যাংকিং সিস্টেমকে ইসলামিকরণ করার অর্থই হলো এই পুঁজিবাদী সিস্টেমকে বৈধতা দেয়া। কিন্তু দারুল উলুমের ভ্রাতৃদ্বয় ইসলামী ব্যাংকিং সমর্থন করেছিলেন এবং ইসলামী ব্যাংকিংয়ের উপর নির্ভর করে অর্থনীতির মূলধারা তৈরির পক্ষে ছিলেন। এসব বিষয়ে মুফতী তাকি সাহেবের গবেষণাগুলো এখন অবশ্য সারাবিশ্বে সমাদৃত হয়েছে; কিন্তু আদতে অন্যদের সাথে এখানে আজও মতো পার্থক্য রয়ে গেছে।ফলে দেখা গেল প্রতিটি মাসআলায় মজলিস দ্বিমত পোষণ করছে এবং কোন সমাধান না হয়েই মজলিসগুলো সমাপ্ত হচ্ছে। সর্বশেষ যাকাতের মাসআলায় দ্বিমত পোষণ ও মুফতী মাহমুদের ইন্তেকালের ফলে মজলিসে হাজিরার ধারাবাহিকতা আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়।(আত্মজীবনী)
উল্লেখিত ঘটনাগুলোতে পূর্ব বর্ণিত ৪টি পয়েন্ট যদি দেখি।
- ১.এখানেও একই সূত্র পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র।মুফতী তাকি সাহেব মনে করেন।যার কারণে কুরআন সুন্নাহতে বর্ণিত ইসলামী শাসকের গুনাগুণ পাকিস্তানের গাদ্দার, আমেরিকার পদলেহি সরকারের জন্য তা ব্যবহার করেছিলেন।
- ২. এবারও সেই সূত্রের কারণে সরকারের পক্ষ অবলম্বন করা আর এর মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক মজলিসের সমাপ্ত হওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
- ৩.যেই অধিকাংশের কথা আমরা বারবার নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করি।সেই অধিকাংশ আলেমদের বিপরীতে এবারও এই পাকিস্তানের সরকার ইসললামী এই সূত্রের বরাতে মতামত দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য আরো বেশকিছু মাসায়েলে দারুল উলুম করাচি ব্যতীত সকল মুফতীগন একমত ছিলেন।যার কারণে মজলিসে হাজিরা সমাপ্ত হয়েছিল।
- ৪.একই প্রতিষ্ঠান,একই পরিবার এবং এখানেও সেই সরকারের পক্ষাবলম্বন।
চতুর্থ ঘটনা: লাল মসজিদ
লাল মসজিদের ঘটনা যেহেতু আমাদের আলোচ্য ইতিহাসের অংশ, তাই এর আলোচনা সর্বশেষে করবো ইনশাআল্লাহ।
চলবে ইনশাআল্লাহ......