
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আমি ইয়েমেনে যাই। আল-কায়েদা জাযীরাতুল আরব (AQAP)-এর সম্মানিত আমীর শায়খ আবু বাসীর (নাসির আব্দুল করীম উহাইশী) দীর্ঘদিন শায়খ উসামা বিন লাদেন রহ.-এর সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় শায়খকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। তাই আমি বারবার তাঁকে শায়খের সাথে কাটানো দিনগুলোর ইতিহাস লিখে রাখতে অনুরোধ করি। কিন্তু তিনি বরাবরই বড়দের উপস্থিতিতে এ বিষয়ে কিছু লিখতে অপারগতা প্রকাশ করছিলেন। যেহেতু তখনও হিজরত-জিহাদ, ইলম ও অভিজ্ঞতায় তাঁর চেয়ে প্রবীণ শায়খগণ জীবিত ছিলেন, তাই আগ বেড়ে কিছু করতে তিনি রাজি ছিলেন না। তিনি বলতেন, এ কাজের জন্য তাঁরাই বেশি যোগ্য। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, ড. আইমান আয-যাওয়াহিরী, শায়খ আবু মুহাম্মাদ মিসরী, শায়খ সাইফ আল-আদল হাফি.।
আল্লাহর রহমতে অধমেরও বেশ কিছু বছর শায়খ উসামা রহ.-এর পাশে থেকে সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয়েছে। তবে কখনো কল্পনাও করিনি, আমি এ ব্যাপারে কোনো কাজ করব। এরইমধ্যে ৩রা যিলকদ ১৪৩৭ হিজরীতে লেখা শায়খ আইমান আয-যাওয়াহিরীর একটি চিঠি আমার কাছে আসে। তিনি তাতে লিখেছিলেন, ‘আমি চাই ‘ইমামের সাথে অতিবাহিত দিনগুলো’ সিরিজে আপনিও শরীক হোন। আপনার লেখাগুলো ‘ইমামের সাথে অতিবাহিত দিনগুলো (উসামা বিন লাদেন রহ.-এর সাথে শায়খ খুবাইব সুদানীর স্মৃতিচারণ)’ শিরোনামে স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশিত হবে। যেন আস-সাহাব থেকে প্রকাশিত সিরিজের সাথে মিলে না যায়। আল্লাহ আপনাকে তাওফীক দান করুন।’
তখন ‘আল মালাহিম মিডিয়া’র ভাইয়েরাও আমার কাছে আল-কায়েদা ও শায়খ উসামা বিন লাদেনের সাথে কাটানো দিনগুলো নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক একটি বই লেখার আবেদন করছিলেন। আমিও এর গুরুত্ব বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু তাদের আবেদন ও অনুরোধ আমার কাছে কতটা যে ভারী মনে হচ্ছিল, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। সহজভাবে বললে, আমি এই ময়দানের লোক নই। যে নিজের সীমা বুঝতে পারে, সেই তো আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত। বই খুলে অধ্যয়নের গভীরে ডুব দেওয়াই যেখানে আমার জন্য কষ্টসাধ্য, সেখানে লেখালিখির জন্য কলম তুলে নেওয়া তো রীতিমতো অসম্ভব। তা-ও আবার স্পর্শকাতর ইতিহাস, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ব্যক্তিদের ব্যাপারে।
কিন্তু ভাইদের পীড়াপীড়ি ও অনুরোধের কারণে এবং শায়খ আবু মুসআব সূরীর সেই কথা মনে করে আল্লাহর নামে কলম তুলে নিলাম। যেন কোনো শত্রু, সাংবাদিকের বেশধারী চেতনার ফেরিওয়ালা বা জিহাদবিমুখ কেউ এই ইতিহাস বিকৃত করতে না পারে। এরপর শুরু হলো অতীতের স্মৃতি হাতড়ে রচনার এক সুদীর্ঘ কাজ। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘আল-মাসরা’ পত্রিকায় ‘أيام من مذكراتي (স্মৃতির পাতা থেকে কিছুদিন)’ শিরোনামে সাত পর্ব প্রকাশিত হয়। গুরুগম্ভীর এই শিরোনামটি পত্রিকার সম্পাদক মহোদয় আমাকে জিজ্ঞাসা করা ছাড়াই ঠিক করেছিলেন৷ এই নামের দরুন কী পরিমাণ অস্বস্তি অনুভব করেছি, তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। তা ছাড়া যে উদ্দেশ্যে প্রবন্ধটি লিখেছিলাম, শিরোনামটি তার বিপরীত বার্তা দিচ্ছিল। শিরোনামটি আমাকে এমনভাবে উপস্থাপন করছিল, যেন আমি সে সব বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত, যারা অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পছন্দ করে; অথচ আমি তেমন নই। আল্লাহর কসম! মানুষ যদি আমার প্রকৃত অবস্থা জানত, তাহলে সে কথাই বলত, যা বলেছিলেন ইমাম আবু হানীফা রহ.—‘এখন আবু হানীফার সময় হয়েছে দু’পা ছড়িয়ে বসার’।
সে প্রবন্ধটিই ধীরে ধীরে আল-কায়েদার ইতিহাস নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বইয়ের রূপ ধারণ করেছে। এই বই রচনায় আমার সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি। ইতঃপূর্বে যারা এ বিষয়ে লেখালিখি করেছেন, তাঁদের বই থেকেও প্রয়োজনমতো পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে অনেক আলোচনাও এখানে তুলে দেওয়া হয়েছে। সাথে আমার স্মৃতি থেকেও অল্পবিস্তর সংযোজন করেছি৷ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনাও উল্লেখ করেছি। বইটিকে মোট পাঁচ অধ্যায়ে ভাগ করে ইতিহাসের পাঁচটি পর্ব আলোচনা করেছি। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আক্রমণের সংবাদ শুনে শায়খ উসামা রহ.-এর পাকিস্তানে আগমন থেকে শুরু করে নাইন-ইলেভেনের (৯/১১) বরকতময় ঘটনা পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস এই বইয়ে পেশ করা হয়েছে। ৯/১১ পরবর্তী কিছু ঘটনার সামান্য বর্ণনাও এতে রয়েছে। আল্লাহর অপার অনুগ্রহে অবশেষে বইটি প্রকাশ হচ্ছে, যা এখন আপনাদের সামনে। আমি এর নাম দিয়েছি ‘شذرات من تاريخ القاعدة (শাযারাত মিন তারিখিল কায়েদাহ)’।
- শায়খ খুবাইব সুদানী হাফিযাহুল্লাহ
Comment