Announcement

Collapse
No announcement yet.

"শাযারাত মিন তারিখিল কায়েদাহ" থেকে অনূদিত || মাকতাবুল খিদমাতের অজানা ইতিহাস

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • "শাযারাত মিন তারিখিল কায়েদাহ" থেকে অনূদিত || মাকতাবুল খিদমাতের অজানা ইতিহাস



    শায়খ উসামা রহ.-সহ মুসলিম বিশ্বের দানশীল ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন দেশ, বিশেষত উপসাগরীয় দেশগুলো আফগান জিহাদের জন্য বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও অন্যান্য অনুদান পাঠিয়েছিল। যার পরিমাণ ছিল কয়েক হাজার মিলিয়ন ডলার। এই অনুদানের পুরোটাই দেওয়া হয়েছিল আফগান মুজাহিদদের সংগঠন আল-ইত্তিহাদুল ইসলামীর হাতে। আবদে রাব্বির রাসূল সাইয়াফ এই সংগঠনের প্রধান হওয়ার পাশাপাশি পুরো আফগান জিহাদের শরয়ী আমীরের ভূমিকাও পালন করছিল। এই লোকটির আমানতদারি ও সততা নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা ছিল, যা পরে স্পষ্ট হয়েছিল। সে মুজাহিদদের জন্য পাঠানো অর্থ তাঁদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে খেয়ানত করত।

    শায়খ জালালুদ্দীন হক্কানী রহ. ১৪০৪ হিজরীর হজের মৌসুমে (সেপ্টেম্বর ১৯৮৪) শায়খ উসামা ও শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ.-এর কাছে এ মর্মে প্রস্তাব দেন যে, আরব থেকে আসা আর্থিক অনুদানগুলো কারো মধ্যস্থতা ছাড়া সরাসরি আরব ভাইদের মাধ্যমে যেন বণ্টন করা হয়। সাথে এটাও উল্লেখ করা হয়, আরব ভাইয়েরা যেন সরাসরি যুদ্ধফ্রন্টে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ময়দানের চাহিদা অনুযায়ী সরাসরি মুজাহিদদের হাতে অনুদান পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন, পেশোয়ারের নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে অনুদান না পাঠান। কারণ নেতাদের মধ্যে দুর্নীতি, বৈদেশিক হস্তক্ষেপ, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা-সহ নানা অনিয়মের ফলে ময়দানের মুজাহিদদের ঐক্যের পথে বিরাট বাধা সৃষ্টি হয়েছে।

    শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. ও শায়খ উসামা রহ. অত্যন্ত আগ্রহের সাথে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন এবং এর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। তবে শরয়ী বৈধতার জন্য সাইয়াফ থেকে এর অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন মনে করেন। সে-ও তখন মক্কাতেই ছিল। সাইয়াফের সামনে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হলে সে বুঝতে পারে, আফগানের ময়দানে তার যে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এই প্রস্তাবের ফলে তা খর্ব হবে। এ কারণে সে দ্রুত এটাকে নিজের তত্ত্বাবধানে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং শর্ত দেয়, এই কার্যক্রম তার সংগঠন ‘আল-ইত্তিহাদুল ইসলামী লি-মুজাহিদি আফগানিস্তান’-এর ব্যানারে হতে হবে। এ-দিকে এই প্রস্তাব দ্রুত কার্যকর করার জন্য হজের পরপরই ‘মাকতাবুল খিদমাত’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে এটাই আফগান জিহাদের জন্য মুসলিমদের অনুদান পাঠানোর সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে পরিণত হয়। বিশেষত সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে এই মাধ্যমেই অনুদান আসতে থাকে। অন্যদিকে যে সমস্ত আরব যুবক মাকতাবুল খিদমাতে কাজ করতে চাইত, শায়খ উসামা রহ. তাদের দেশ থেকে বের হওয়া থেকে শুরু করে দেশে ফেরা পর্যন্ত বাসস্থান, টিকিট, অন্যান্য খরচ ও পরিবারের দেখাশোনার দায়িত্ব পর্যন্ত নিয়ে নিতেন।

    মাকতাবুল খিদমাতের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ.। মাকতাবের তত্ত্বাবধানে অনেকগুলো বিভাগ গঠন করা হয়। তার মধ্যে ছিল—সামরিক বিভাগ, প্রশাসনিক বিভাগ, প্রশিক্ষণ বিভাগ, প্রত্যাবাসন বিভাগ (এই বিভাগ মুহাজির কাফেলাগুলোকে আফগান ভূমিতে প্রেরণের কাজে নিয়োজিত ছিল)। মাকতাবুল খিদমাতের অধীনে আরও কিছু তৎপরতা শুরু হয়, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘সদা’ এলাকায় সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা, ‘আল-জিহাদ’ পত্রিকার সূচনা এবং শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ.-এর সকল দাওয়াতী সফরের ব্যবস্থা করা। আফগান জিহাদের পক্ষে জনসমর্থন তৈরির উদ্দেশ্যে শায়খ বিভিন্ন দেশে সফর করতেন এবং মানুষকে জিহাদের জন্য উৎসাহ দিতেন। যুবকদেরকে আফগানিস্তানে হিজরত করে জিহাদের ফরয আদায় করতে উদ্বুদ্ধ করতেন। শায়খ আব্দুল্লাহ আযযামের লিখিত প্রথম বই ছিল “আয়াতুর রহমান ফী জিহাদি আফগান (আফগান জিহাদে রহমানের নিদর্শন)”। দ্বিতীয় বই ছিল “আদ-দিফা আন আরাদিল মুসলিমীন (মুসলিম ভূমির প্রতিরক্ষা ঈমান আনার পর প্রথম ফরয)”। এই বইয়ে তিনি মাজুর ব্যতীত সকল মুসলমানের ওপর আফগান জিহাদে অংশগ্রহণ করা ফরয মর্মে ফতওয়া প্রদান করেন।

    উক্ত ফতওয়ার সমর্থনে শায়খ রহ. ৮০ জনের বেশি বিশ্ববরেণ্য আলেমের স্বাক্ষর নিতে সক্ষম হন। যাদের শীর্ষে রয়েছেন—শায়খ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.-সহ বিলাদুল হারামাইনের প্রথম সারির উলামায়ে কেরাম। আল-আযহারের কয়েকজন আলেম, বিভিন্ন দেশের ইখওয়ানুল মুসলিমীনের কয়েকজন আলেম ও দাঈ এবং পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের আরও কিছু আলেম এতে স্বাক্ষর করেন। তাঁর এই বই ও ফতওয়া জিহাদের উৎসাহ প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

    শুরুর দিকে মাকতাবুল খিদমাত পেশোয়ারে অবস্থানরত ৩০ জন আরব ভাইকে নিয়ে কাজ শুরু করে। মাকতাবুল খিদমাতে কর্মরত আরব ভাইদের ভূমিকা কেমন হবে—এ ব্যাপারে শায়খের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। এ ক্ষেত্রে শায়খের অবস্থান ছিল খুব দৃঢ়। শায়খ মনে করতেন, আফগানদের মাঝে দাওয়াতী কাজ করে তাদের মধ্যে ইসলামী আদর্শের প্রচার করা, মুজাহিদদের সংগঠনগুলোর মাঝে ঝগড়া-বিবাদ দেখা দিলে তা মীমাংসা করে দেওয়া, যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হয়ে তাদের মনোবল বৃদ্ধি করা এবং প্রয়োজন হলে তাদের সাথে কিতালে শরীক হওয়া—এগুলোই আরবদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। তিনি মনে করতেন, আফগানিস্তানে যুদ্ধের জন্য আরবদের চেয়ে আফগানরাই বেশি উপযুক্ত। আর যুদ্ধের জন্য তাদের লোকবলের তেমন প্রয়োজন নেই।

    মাঠপর্যায়ে মাকতাবুল খিদমাতের প্রধান কাজ ছিল মুজাহিদদের লজিস্টিক সাপোর্ট প্রদান করা। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে মুজাহিদদের ঘাঁটিগুলোতে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ পৌঁছানোই ছিল মাকতাবের প্রধান কাজ। পাহাড়ের গিরিপথ দিয়ে খচ্চরের কাফেলার মাধ্যমে এসব পাঠানো হতো। একবার সীমান্তবর্তী পথে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ আটকে গিয়েছিল। ঠিকাদারদের দাবি ছিল, এসব জিনিস বহন করে মুজাহিদদের ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়ার পর মুজাহিদদের দলগুলো তাদের পরিবহণ-খরচ পরিশোধ করেনি, তাই তারা সবকিছু সীমান্তেই আটকে রেখেছে। এই পরিবহণ-খরচের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। অবশেষে এই সমস্যা সমাধানের জন্য মাকতাবুল খিদমাতই উদ্যোগ নেয়। তারা সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে কিছু ঘাঁটি স্থাপন করে। এই ঘাঁটিগুলোতে মালামাল ওজন করে খচ্চর মালিকদের পরিবহণ-খরচ প্রদান করা শুরু করে। অধিকাংশ সময় এই কাফেলাগুলোর সাথে কিছু আরব যুবকও আফগানিস্তানে প্রবেশ করত। তারা মুজাহিদদের মাঝে মাকতাবুল খিদমাতের পাঠানো সামগ্রী বণ্টনের দেখাশোনা করত।

    শায়খ উসামা রহ. শুধু মাকতাবুল খিদমাতের বিভিন্ন কাজেই প্রতি মাসে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি খরচ করতেন, যা তখনকার হিসেবে প্রায় পঁচিশ হাজার মার্কিন ডলারের সমান ছিল। শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. তাঁর অসীয়তনামায় মাকতাবুল খিদমতের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি ভাই আবু আব্দুল্লাহ উসামা বিন মুহাম্মাদ বিন লাদেনের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি নিজের সম্পদ দিয়ে এই মাকতাবুল খিদমাতের দেখাশোনা করেছেন। দোয়া করি আল্লাহ তাআলা যেন তার সম্পদ ও পরিবারে বরকত দান করেন। তার মতো ব্যক্তি আরও তৈরি করে দেন। আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, তাঁর মতো মানুষ আমি পুরো মুসলিম বিশ্বের কোথাও পাইনি। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি তাঁর দীন ও সম্পদ হেফাযত করুন, তাঁর হায়াতে বরকত দান করুন।”

    মাকতাবুল খিদমাত প্রতিষ্ঠা করা কৌশলগত দিক থেকে অনেক বড় একটি সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু আরবদের সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে মাকতাবের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা ছিল না। এটি ছিল মাকতাবুল খিদমাতের মৌলিক একটি ত্রুটি। শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. এ বিষয়টির প্রতি খেয়াল করতে পারেননি। আরবদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় মাকতাবের মধ্যে ধীরে ধীরে বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হতে থাকে। পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব, সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কোন্দল-সহ নানা জটিলতা তৈরি হতে থাকে। অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণহীনতার দরুন মাকতাবের অধীনস্থ আরব মুজাহিদগণ নিজেদের ভূমিকা নিয়ে দ্বিধান্বিত হতে থাকেন। ফলে কেউ যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকতা শুরু করেন, কেউ দাতব্য সংস্থার সদস্যের মতো বিভিন্ন যুদ্ধফ্রন্টের সংবাদ ও চাহিদার তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন আর কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে আফগান মুজাহিদীন ও কমান্ডারদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনের চেষ্টা শুরু করেন এবং পারস্পরিক সংঘাত ও দলাদলি দূর করতে ট্রেইনিং ক্যাম্প তৈরি করেন। এর প্রায় বছরখানেক পর শায়খ উসামা রহ. যখন সশরীরে সামরিক কাজ শুরু করেন, তখন এই অব্যবস্থাপনার দরুন নিজেকে মাকতাব থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন।

    উল্লেখ্য, জাজির যুদ্ধে শায়খ উসামার সফলতা ও রুশ কমান্ডো বাহিনীর পরাজয়ের পর আরবদের সামরিক ট্রেইনিংয়ের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে শায়খ উসামার সিদ্ধান্তের ওপর শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং আফগান জিহাদে সাধারণ সহযোগিতার পাশাপাশি সামরিক সহায়তা করার ব্যাপারেও শায়খ উসামার সাথে একমত পোষণ করেন। শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. ১৯৮৯ সালে শাহাদাতবরণের কিছুদিন আগে ‘আত-তাআমুরুল আলামী’ নামে একটি বই লেখেন। তাতে তিনি বলেন, ‘কেবল সাহায্য পৌঁছানোই আফগানিস্তানে আমাদের দায়িত্ব নয়; বরং আফগানিস্তানে আমাদের মূল দায়িত্ব হলো আল্লাহর জমিনে তার দীন প্রতিষ্ঠা করা, যা আল্লাহ রব্বুল আলামীন সাত আসমানের ওপর থেকে আমাদের ওপর ফরয করেছেন। আমাদের উদ্দেশ্য অনুদান সংগ্রহ করা বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করাও নয়। আমরা আল্লাহর সেনাবাহিনী, পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে তিনি আমাদের তাঁর দীনের জন্য প্রস্তুত হতে আদেশ করেছেন। যারা এই পথে আমাদের সাথি হতে চায়, আমরা তাদের স্বাগত জানাই, বুকে জড়িয়ে নিই। আমরা যাদের নিষ্ঠাবান মনে করি, তাদের ভুলত্রুটিকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখি। আর অন্যদের বিষয় আল্লাহ তাআলার কাছে সোপর্দ করি।’

    ১৯৮৪ সালের শেষ থেকে ১৯৮৫ সালের শেষ অবধি শায়খ উসামা রহ. আফগান রণাঙ্গনে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারেননি। যেহেতু মাকতাবুল খিদমাত ও শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. আফগানিস্তানের ভেতরে যুদ্ধফ্রন্টগুলোতে মুজাহিদদের কাছে আরবদের অনুদান ও সাহায্য পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট তৎপর ছিলেন; যেহেতু এটাই ছিল প্রধান কাজ আর তা যথাযথভাবেই বাস্তবায়ন হচ্ছিল, তাই শায়খের সরাসরি অংশগ্রহণের প্রয়োজনও ছিল না।
    Last edited by আবু আব্দুল্লাহ; 3 hours ago.

  • #2
    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শাইখ আব্দুল্লাহ আযযাম ও শাইখ উসামা রাহিমাল্লাহু সহ যারাই আফগান জিহাদে এবং বিশ্বময় জিহাদের কাজে সহযোগিতা করে গিয়েছেন ও করছেন তাদের সকললে তাঁর শান অনুযায়ী উত্তম বিনিময় দান করুন, আমীন।

    Comment

    Working...
    X