মা’সাদাহ প্রতিষ্ঠার সময় সাতটি কামরা নির্মাণ করা হয়েছিল। এই কামরাগুলোতে মোট ৭০ জনের মতো যুবক অবস্থান করতেন। কুরবানী ও শাহাদাতের জন্য প্রত্যেকেই ছিলেন সদা প্রস্তুত। কামরাগুলো বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হতো। খাদ্য ও অস্ত্র সংরক্ষণের জন্য দুটি, রান্নার জন্য একটি, অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান সংরক্ষণের জন্য একটি, কমান্ড রুম হিসেবে একটি, মারকাযে বদর ও তায়েফ নামে সাধারণ কাজে ব্যবহারের জন্য দুটি কামরা নির্ধারিত ছিল। অপারেশন শুরু করার জন্য যুবকরা শায়খ উসামার কাছে বারবার আবেদন করতেন আর শায়খ তাদের সবর করতে বলতেন। প্রথমে মজবুত আশ্রয়স্থল ও অবস্থান নির্মাণের গুরুত্বের ব্যাপারে তাদের বোঝাতেন। কাজটি শায়খ উসামা রহ.-এর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। যুবকদের জন্যও এভাবে দীর্ঘ সাত মাস শত্রুর একেবারে সামনে অবস্থান করেও কোনো অভিযান না করে আশ্রয়স্থল ও বাঙ্কার তৈরির কাজ করা ছিল আরও কঠিন।
একবার শীত শেষে বরফ গলা শুরু হলো। শায়খ উসামা তখন কোনো কাজে পেশোয়ারে গিয়েছিলেন। শায়খ আবু হাজের ইরাকী ফা.আ. মা’সাদার দায়িত্বে ছিলেন। শায়খ উসামার অনুপস্থিতির সুযোগে যুবকরা শায়খ আবু হাজেরকে অপারেশনের জন্য পীড়াপীড়ি করা শুরু করে। টানা তিনদিনের পীড়াপীড়িতে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তিনি ছোট একটি অপারেশনের অনুমতি দেন। এ বিষয়ে শায়খ আবু হাজের বলেন, ‘টানা তিনদিন পীড়াপীড়ি করে তারা আমাকে নিরুপায় বানিয়ে দিয়েছিল। অবশেষে তাদের দাবি মেনে নিয়ে অপারেশনে বের হতে রাজি হই। শায়খ তামীমের উৎসাহ ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি আমাদের রেখেই পাহাড় থেকে নেমে যান। আমি দূর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম, তারা বলাবলি করছিল, শায়খ তামীম তাদের বলে গেছেন ‘আগামী মোলাকাত হবে জান্নাতে’।
তাদের কথাবার্তা শুনে আমি একটু হাসলাম। কিতাল এত সহজ হয় কীভাবে?’ আবু মুহাম্মাদ সূরী ছিলেন এই অভিযানের বিপক্ষে। শায়খ আবু হাজের তাকে বলেছিলেন, ‘আবু মুহাম্মাদ, আপনি পেরেশান হবেন না। যদিও আমি জানি কাজটি ঠিক হচ্ছে না, তবু আমি তাদের সাথে যাচ্ছি। তারা একাকী যাওয়ার চেয়ে আমার সাথে গেলেই বেশি ভালো হবে।’ এই অভিযানে ভাই আহমদ যাহরানী মর্টারের গোলার আঘাতে শহীদ হন। তিনি ছিলেন তায়েফের নাগরিক। তিনিই ছিলেন মা’সাদার প্রথম শহীদ। শাহাদাতের সময় তার বয়স ছিল ২০ বছর।
শায়খ উসামা রহ.-এর ইচ্ছা ছিল, মা’সাদার প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে যথেষ্ট শক্তিশালী করার পর শত্রুর ওপর বড় ধরনের আঘাত হানবেন। কাঙ্ক্ষিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরির পর ভাইয়েরা শত্রুর ওপর হামলা করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। ১৭ই শাবান ১৪০৭ হিজরী মোতাবেক ১৭ই এপ্রিল ১৯৮৭ সালে মা’সাদার আরব যুবকদের নেতৃত্বে প্রথম আক্রমণ চালানো হয়। আক্রমণের মূল পরিকল্পনা করেছিলেন অফিসার আবু খালেদ। তিনি ইজিপশিয়ান ইসলামিক জিহাদের একজন নেতা ছিলেন। এ ছাড়াও মিশরীয় সেনাবাহিনীতে অফিসার হিসেবেও কাজ করেছিলেন। আবু খালেদের পরিকল্পনা ছিল, প্রথমে আর্টিলারির কভার নিয়ে মা’সাদার সবচেয়ে কাছের দুটি শত্রুঘাঁটি দখল করা হবে। তারপর গনীমত সংগ্রহ করে ঘাঁটি দুটি উড়িয়ে দেওয়া হবে।
যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করাই ছিল এই অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য। ১২০ জন আরব যুবক এতে অংশ নিয়েছিল। আবু উবায়দা পানশীরী ও শায়খ আবু হাফস কমান্ডার মিলে টার্গেট নির্ধারণ করেন এবং অপারেশনের বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রস্তুত করেন। শায়খ উসামা রহ. ভাইদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ছোট ওয়ারলেস দেন। এর ফলে যে-কোনো প্রান্তে যে-কোনো সময় মুজাহিদদের নির্দেশনা দেওয়া সহজ হয়ে যায়। আফগান যুদ্ধে সেবারই প্রথম ওয়ারলেস ব্যবহার করা হয়। এ যুদ্ধে শায়খ উসামা রহ. ভাইদের পর্যাপ্ত পরিমাণ শক্তিশালী বাইনোকুলারও সরবরাহ করেছিলেন। এর মধ্যে একটি ছিল নাইট ভিশন বাইনোকুলার। এভাবেই ভাইয়েরা এই এলাকায় প্রথম শক্তিশালী নজরদারি নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেন।
মুজাহিদদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এক ভাগ রাখা হয় পেছন থেকে মা’সাদাকে রক্ষা করে শত্রুর ওপর গ্রাউন্ড টু গ্রাউন্ড মিসাইল (GGM) নিক্ষেপ করার জন্য। তাদের দায়িত্বে ছিলেন শায়খ আবু বুরহান সূরী। আর আবু খালেদ মিসরীর নেতৃত্বে আরেক ভাগকে শত্রুর ওপর সরাসরি হামলা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। লাগাতার কয়েকদিন চিন্তাভাবনা করে হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়। এটি ছিল আরবদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. উপস্থিত ছিলেন, শায়খ তামীম আদনানী রহ.-ও উপস্থিত ছিলেন।
সন্ধ্যা ছয়টায় অপারেশন শুরু হয়। শত্রুদের প্রথম সারির প্রতিরক্ষা পোস্টগুলোকে টার্গেট করে যুবকরা আঘাত হানে এবং ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম হয়। এতে তাদের মনোবল অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু পরিপূর্ণ প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও এই অপারেশনে যুবকরা শত্রুদের কোনো ক্যাম্প জয় করতে পারেনি। কারণ অপারেশনের শুরুতেই কমান্ডার আবু খালেদ আঘাতপ্রাপ্ত হন। আবু সাহল মিসরীও আহত হন। তারা উভয়ে অপারেশনের শেষ পর্যন্ত রণক্ষেত্রের বাইরেই ছিলেন। শত্রুদের একদম কাছে ছিল শফীক ভাইয়ের ইউনিট। তার সাথে ৮ জন আরব মুজাহিদ ছিল। তাদের মধ্য থেকে চারজনই আহত হয়ে ফিরে আসে। এতে পুরো অপারেশনের ওপর বিশাল প্রভাব পড়ে। পরে শায়খ আবু উবায়দা পানশীরী নেতৃত্ব নিজ হাতে নিয়ে নেন আর তার সহকারী হিসেবে থাকেন শায়খ আবু হাফস কমান্ডার।
বিশেষ কিছু কারণে এ অপারেশনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, যখন অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সময় নির্ধারণ করা হয়, তখনও পর্যন্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ—বিশেষত গোলাবারুদের—পরিপূর্ণ ব্যবস্থা হয়নি। গোলাবারুদ যতটুকু ছিল, তা-ও সকল ইউনিটের কাছে যথাসময়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকায় এমন হয়েছিল। যার কারণে আক্রমণকারী টিমের কাছে যথাসময়ে গোলাবারুদ পৌঁছায়নি, ফলে গোলাবারুদের অভাবে নির্ধারিত সময়ে আক্রমণ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
আবু মুহাম্মাদ সূরী বলেন—
‘আমি আক্রমণকারী ইউনিটের সদস্য ছিলাম। শত্রুর একটি ক্যাম্পকে আমরা “উম্মুল খানাদিক” নামে ডাকতাম। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, আমরা এই ক্যাম্পে আক্রমণ করব। সে মতে সামনে অগ্রসর হয়ে ক্যাম্পের খুব কাছে চলে যাই। শত্রু থেকে যখন আমরা ৩০/৪০ মিটার দূরে, তখনই বুঝতে পারি শত্রু পরিপূর্ণ সতর্ক অবস্থায় আছে। এতে আমরা একটু ঘাবড়ে যাই। শত্রুর যে দুটি ক্যাম্পে আমাদের আক্রমণ করার কথা ছিল, সে দুটি ছাড়া আশপাশের ১৬টি ক্যাম্প লক্ষ্য করে মুজাহিদরা তখন গোলাবর্ষণ করছিল। এভাবেই হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
আমরা ধারণা করেছিলাম, অন্য ক্যাম্পগুলোর ওপর হামলা হলে শত্রুরা সেখানে ব্যস্ত থাকবে আর এই সুযোগে আমরা এই দুটি ক্যাম্প দখল করে নেব। কিন্তু আমাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে শত্রুরা সবগুলো ক্যাম্পেই সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছিল। তাই আমরা ক্যাম্পের কাছাকাছি যেতেই বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু হয়। অন্ধকার হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা মাথা-ই ওঠাতে পারিনি।
আক্রমণের শুরুতেই আমার দুই পায়ে গুলি লাগে। যে জায়গায় আমরা অবস্থান করছিলাম, তার ঠিক বাম দিকে খোলা টিলার ওপর থেকে শত্রুবাহিনীর গোরিউনোভ (Goryunov) মেশিনগান থেকে অনবরত ফায়ার করা হচ্ছিল। আমরা জানতামই না যে, এখানে শত্রুর মেশিনগান আছে। একটু সামনে এগোতেই বাম দিক থেকে হঠাৎ গুলিবর্ষণ শুরু হওয়ায় আমরা আঁতকে উঠি। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটি ধাক্কা ছিল। এ ব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় মূলত এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। শত্রুর আক্রমণ শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট পর সবচেয়ে কাছের মারকাযে আমাদের ফিরে আসার আদেশ দেওয়া হয়।
শায়খ উসামা রহ. সেখানেই ছিলেন। ততক্ষণে যেহেতু আমাদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গিয়েছিল, তাই সকলকে পিছু হটার আদেশ জারি করা হয়, যেন কোনো ভাই প্রাণ না হারান। কিন্তু অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে, তৎক্ষণাৎ কারো পক্ষে পিছু হটাও সম্ভব ছিল না। রাতের অন্ধকার নেমে আসলে ধীরে ধীরে সবাই গোপনে পিছু হটতে থাকেন। পাঁচটি ইউনিট ময়দানে সক্রিয় ছিল। তাদের মধ্য থেকে চারটি ইউনিট মা’সাদায় পৌঁছাতে পারে। একটি ইউনিট পথ হারিয়ে ফেলায় মা’সাদায় পৌঁছাতে পারেনি। মধ্যরাত পর্যন্ত তারা নিখোঁজ ছিল। এই যুদ্ধে আমি ও ইদরিস ভাই আহত হয়েছিলাম।’
এরপর শায়খ আবু উবায়দা পানশীরীর নেতৃত্বে পূর্ণ একমাস লাগাতার অপারেশন চালানো হয়। ১৭ই রমযানের লড়াই পর্যন্ত মোট নয়টি সংঘর্ষ ও খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ সকল অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা। এর মধ্যে একবার টহল দেওয়ার সময় তিনজন ভাইয়ের মাঝখানে একটি বোমা এসে পড়ে। এতে আবু যাহাব ভাই শাহাদাতবরণ করেন এবং আজমিরাই ভাই আহত হন। এই লড়াই চলাকালে মুজাহিদদের পক্ষ থেকে শত্রুবাহিনীর ক্যাম্প লক্ষ্য করে প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করা হয়। এতে ৪৫ জন সৈনিক ও অফিসার হেকমতিয়ারের অনুগত আল-হিযবুল ইসলামীর এক নেতার কাছে আত্মসমর্পণ করে।