চতুর্থ ঘটনা: লাল মসজিদ
লাল মসজিদে হামলার পূর্বে আল্লামা মুফতী তাকি উসমানি হাফিঃ মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেবকে বুঝাতে গিয়েছেন সে ঘটনা সালিম শেহজাদ এভাবে উল্লেখ করেছেন যে,:
- "পাকিস্তানি কর্মকর্তারা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের ছেলে ইজাজুল হক প্রায়ই মাওলানা আব্দুল আজিজকে দেখতে আসেন। আজিজের বাবা মাওলানা আবদুল্লাহ এবং জেনারেল জিয়া খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অবাক হওয়ার কিছু নেই তাদের মধুর সম্পর্ক কেন সেটা ভেবে। এই সম্পর্ক তাদের পিতৃপুরুষের কাল থেকেই অব্যাহত ছিল।
- "মাওলানা আমি আপনাকে অনুরোধ করছি দয়া করে আপনি এগুলো বন্ধ করুন। আমি জানি শেষ পর্যন্ত এটি মারাত্মক কারণ হয়ে উঠবে। আমি যেন আগুনের মহাসাগর দেখতে পাচ্ছি।"
- "তিনি এক ইঞ্চিও পিছপা হবেন না তার অবস্থান থেকে।"
আমন্ত্রণ জানানো হয় বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব, আধ্যাত্মিক প্রাণপুরুষ আল্লামা তাকী উসমানীকে।তিনি মাওলানা আব্দুল আজিজের শিক্ষক।করাচি থেকে ইসলামাবাদে এলেন। এদিকে মাওলানা আব্দুল আজিজকেও উপস্থিত করা হলো।এ যেন উত্তপ্ত তেলে জল সিঞ্চনের মত ব্যাপার।
- :কী করছ? তাকি উসমানী সাহেব মাওলানা আব্দুল আজিজকে জিজ্ঞাসা করলেন।
- : তবে এক্ষেত্রে তুমি কোন আদর্শ অনুসরণ করছ? নবীজীর, না তোমার নিজের?
- তাকি সাহেব আবারো জিজ্ঞাসা করলেন
- : তুমি দয়া করে এর ন্যায় অন্যায় সম্পর্কে খুলে বুঝিয়ে বলো তো? এই যে শিশু লাইব্রেরি দখল, পতিতাদের অপহরণ, মসজিদে পুলিশকে আটক করা এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে অস্থিরতা তৈরি করা এগুলো কি আছে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগ্রামের ইতিহাসে? আমরা কি সালাফদের কাউকে এজাতীয় লড়াইয়ের বৈধতা দিতে দেখেছি? ইসলামী আইন বাস্তবায়ন আর সংগ্রামের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মধ্যে একটি পার্থক্য যে আছে, তুমি কি তা অনুধাবন করো?
- : আব্দুল আজিজ আমার একটা উত্তর দরকার!
- : তুমি কি তাহলে আমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছ এগুলো থেকে বিরত থাকার? এবং এই মর্মে যে, ভবিষ্যতে এমন কর্মকান্ডে জড়াবেনা।
- তাকি সাহেব বললেন তোমার কাছে কুরআন সুন্নাহর সহীহ কোন দলিল নেই তারপরও কি তুমি এসব কর্মকাণ্ড করার পরিকল্পনা করছো?
- তাকি সাহেব রেগে গিয়ে বললেন,'আব্দুল আজিজ আমি শুনতে পেয়েছি তুমি বলে থাকো তোমার সাথে আমার আধ্যাত্মিক সম্পর্ক আছে। তবে আমি এখন বলছি, তোমার সাথে আমি আর এসম্পর্কটি রাখছিনা। তুমি আমার কাছ থেকে কোন দিক নির্দেশনা গ্রহণ করো এটা আর বলে বেড়াবে না।
- এরপর মোশাররফ প্রসাশনের আর কোন উপায়ন্তর ছিল না। তবুও তারা হাল না ছেড়ে তাদের সর্বশেষ চেষ্টাটি করলেন। এবং এক্ষেত্রে নূন্যতম কার্পন্য করেনি মোশারফ প্রশাসন।মসজিদুল হারাম মক্কার ইমাম শাইখ আব্দুর রহমান আস সুদাইসকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এই আশায় যে, তার যুক্তি লাল মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল আজিজ শ্রদ্ধাবশত হলেও মেনে নেবেন; কিন্তু দুঃখজনক ভাবে আস সুদাইসের আজিজের বৈঠকের ফলাফলও ছিল তথৈবচ।বলা যায় অযথাই এসব চেষ্টা চরিত্র করতে গিয়েছিল সরকার।
(আরব্য রজনীর অজানা অধ্যায়)
- সম্মানিত পাঠকবৃন্দ এখানে সালিম শেহজাদ সাহেবের উপস্থাপনাটা এমন যে, মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেব বিশাল শরীয়ত বিরোধী ও ভুল কাজ করে ইসলামের বদনাম করে ফেলছেন। আসলে ইতিপূর্বে মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেবের কার্যক্রম, দৃষ্টিভঙ্গি সহ অনেক বিষয়ই উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেব তাঁর পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের জন্য প্রণীত রূপরেখা অনুযায়ী পাকিস্তানের উপর জোরপূর্বক আপতিত কুফরী শাসনব্যবস্থার মূলোৎপাটনের পক্ষপাতী ছিলেন। মাওলানার এই অবস্থানকে অনেক উল্লেখযোগ্য আলিমও সমর্থন করেছেন এবং তারা তাকে সাহায্য করার অঙ্গীকারও দিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বইপত্রে তাদের সাথে একাত্মতা পোষণকারি সেসব আলিমের নামও উল্লেখিত হয়েছে।
"২৪এ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ এ অনুষ্ঠিত এক উপস্থিত আলিম উলামা ও ছাত্রদের সম্বোধন করে মাওলানা আব্দুল আজিজ বলেন:
- আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করার আহবান আমরা আজ করিনি, বরং বিগত বছরের পর বছর এদাবি জারি রয়েছে। শ্রদ্ধেয় আব্বাজান রহঃ এর শাহাদাতের প্রেক্ষিতেও সেদিন আমি এই আওয়াজ তুলেছিলাম যে, আমি কোন একক ব্যক্তিকে আব্বাজানের ঘাতক মনে করিনা। বরং প্রকৃত ঘাতক তো সেই সাম্রাজ্যবাদী শাসনব্যবস্থা, আল্লাহর আইনের মোকাবেলায় যা এখানে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।এই জন্য যদি আমার লড়াই হয় তাহলে সেটি শাসনব্যবস্থার সাথেই আমার লড়াই হবে।আজ যেসকল সুরিদয় এই অভিযোগ আরোপ করছে যে, আমরা এজেন্সিগুলোর রিমোর্টে পরিচালিত হচ্ছি তাঁরা আমার পূর্বের বক্তৃতাগুলো শুনে নিন।এসব বক্তৃতাই সাক্ষ্য দেবে যে, সাম্রাজ্যবাদী শাসনব্যবস্থার বিপক্ষে আমি সে সময় থেকেই কথা বলে আসছি। আফগানিস্তানের উপর যখন হামলা হলো তখনও আমি একথাগুলোই বলেছি।ইরাকের উপর যখন আক্রমণ করা হলো তখনো আমি সুউচ্চ কন্ঠে একই আওয়াজ বুলন্দ করেছি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ওয়াজিরিস্তানে হামলা করার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল এবং তালেবান আল কায়েদা সহ অন্য সব মুজাহিদরা বিরাট ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল তখনো আমি একই কথা বলে এসেছি।"
- এসকল বক্তব্য পড়লে এবং মাওলানার পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের জন্য প্রণীত রূপরেখা সামনে রাখলে এফলাফলে পৌঁছতে বেগ পেতে হয় না যে, তিনি আমাদের উপর জোরপূর্বক আপতিত কুফরী শাসনব্যবস্থার কেবল শাখাগত সংশোধনের আহ্বায়ক ছিলেন না, বরং তিনি প্রচলিত এই ব্যবস্থার মূলোৎপাটনের পক্ষপাতী ছিলেন। মাওলানার এই অবস্থানকে অনেক উল্লেখযোগ্য আলিমও সমর্থন করেছেন এবং তারা তাকে সাহায্য করার অঙ্গীকারও দিয়েছেন।
মুনাজিরে আযম মাওলানা সরফরাজ খান সফদর,
- শাইখুল মাশায়িখ মাওলানা সায়্যিদ মাহমুদ চন্দলবাবাজি,
- মাওলানা ডঃ শের আলী শাহ,
- শাইখুল হাদীস মাওলানা নুরুল হুদা করাচি,
- হযরত মাওলানা আব্দুল করিম কলাচওয়ি,
- মাওলানা পীর আব্দুর রহিম নকশবন্দি,
- মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম হক্কানী,
- মাওলানা সাইফুল্লাহ হক্কানী,
- শাইখুল হাদীস মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ ফরিদ সহ আরো অনেক বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ, বিদগ্ধ আলিমের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
এসকল আল্লাহ ওয়ালা হক্কানী আলিমগনের কীর্তি হলো তারা জিহাদি আন্দোলন গুলোকে নিজেদের নিন্দা ও সমালোচনার লক্ষবস্তুত বানাননি বরং উল্টো সেগুলোর তত্ত্বাবধান করে মুজাহিদদের সাহস সঞ্চার করেছেন এবং আল্লাহর পথের সৈনিকদের জন্য সর্বদা দুয়া অব্যাহত রেখেছেন।
(রক্তাক্ত লাল মসজিদ:১৫-১৭ নং পৃষ্ঠা)"
এগুলো জানার পর এমন কীভাবে বলা সম্ভব! যে, মাওলানা আব্দুল আজিজ দলিল ছাড়া এমন কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন? কখনোই সম্ভব নয়। বরং তাঁর আন্দোলন ছিল দলিল ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ। যা তিনি বারবার বিভিন্ন সময়ে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন প্রকাশ করেছেন। কিন্তু আল্লামা মুফতী তাকি উসমানি হাফিঃ এর সাথে তর্কে না জড়িয়ে নম্রতা ও বিনয়ের সাথে কেন উত্তর দিয়েছেন সেটা দুজনের কথোপকথন থেকে বুঝা যায়। আসুন কথোপকথন টি একটু ব্যাখ্যার আলোকে খোলাসা করে বুঝার চেষ্টা করি ইনশাআল্লাহ।
(কথোপকথন)
- :কী করছ? তাকি উসমানী সাহেব মাওলানা আব্দুল আজিজকে জিজ্ঞাসা করলেন।
- : তবে এক্ষেত্রে তুমি কোন আদর্শ অনুসরণ করছ? নবীজীর, না তোমার নিজের?
- (ব্যাখ্যা: অর্থাৎ মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদর্শ মেনেই পাকিস্তানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন)
: তুমি দয়া করে এর ন্যায় অন্যায় সম্পর্কে খুলে বুঝিয়ে বলো তো? এই যে শিশু লাইব্রেরি দখল, পতিতাদের অপহরণ, মসজিদে পুলিশকে আটক করা এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে অস্থিরতা তৈরি করা এগুলো কি আছে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগ্রামের ইতিহাসে? আমরা কি সালাফদের কাউকে এজাতীয় লড়াইয়ের বৈধতা দিতে দেখেছি? ইসলামী আইন বাস্তবায়ন আর সংগ্রামের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মধ্যে একটি পার্থক্য যে আছে, তুমি কি তা অনুধাবন করো?
- (ব্যাখ্যা:এবিষয়ে পূর্বে সুস্পষ্টভাবে আলোচনা হয়েছে যে, এখানে উল্লেখিত আন্দোলন গুলো সম্পূর্ণ তাবলীগি পন্থায় শান্তি শৃঙ্খলার সাথে শরীয়তের আলোকেই করা হয়েছিল। আর শরীয়তের আলোকে যখন হয়েছে তখন সালাফদের সম্মতির বাহিরে কীভাবে হবে? কারণ সালাফগন তো শরীয়তের বাহিরে কিছু বলেননি)
: আব্দুল আজিজ আমার একটা উত্তর দরকার!
- (ব্যাখ্যা: মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেব কেন আল্লামা মুফতী তাকি উসমানি হাফিঃ এর কথার উত্তর দেননি সেটা বিনয়ের সাথে প্রকাশ করে বলেন)
: তুমি কি তাহলে আমাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছ এগুলো থেকে বিরত থাকার? এবং এই মর্মে যে, ভবিষ্যতে এমন কর্মকান্ডে জড়াবেনা।
- (ব্যাখ্যা: মাওলানা আব্দুল আজিজ যখন শরীয়তের আলোকে ওলামাগনের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তাই যখন মুফতী তাকি উসমানি হাফিঃ সেপথ পরিহার করতে বললেন তখন তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন)
তাকি সাহেব বললেন তোমার কাছে কুরআন সুন্নাহর সহীহ কোন দলিল নেই তারপরও কি তুমি এসব কর্মকাণ্ড করার পরিকল্পনা করছো?
আজিজ চুপ করে রইলেন।
- (ব্যাখ্যা: এতদিনের দলিল সমৃদ্ধ আন্দোলনের ব্যাপারে তিনি মুফতী তাকি উসমানি সাহেব হাফিঃ এর কথায় চুপ এজন্য থাকেননি যে, তাঁর কোন দলিল প্রমাণ ছিল না বা ইসলাম বহির্ভূত ছিল বিষয়টি এমন নয়। বরং উস্তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এমনটি করেছেন। উনার কাছে যে, এই আন্দোলনের ব্যাপারে দলিল ছিল ইতিপূর্বে তা বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে তাই সেটির পুনরাবৃত্তি না করে পূর্বের আলোচনা দেখে নেওয়ার অনুরোধ করছি।)
চলবে ইনশাআল্লাহ...........