এই যুদ্ধ সম্পর্কে শায়খ উসামা রহ. বলেন—
‘মা’সাদাহ প্রতিষ্ঠার পর বড় এক অধ্যায়ের দিকে আমরা এগিয়ে যেতে শুরু করি। ১৪০৭ হিজরীর রমযান মাসে শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে আমরা বিশেষ কিছু তথ্য পাই। তবে এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় আমরা পাহাড়ের পাদদেশে পরিখা তৈরির কাজে মনোনিবেশ করি। আনুমানিক ১৪ই রমযানের দিকে আমরা একটি অপারেশন চালানোর সিদ্ধান্ত নিই। সে সময় আফগান নেতা গুলবুদ্দীন হেকমতিয়ার সেই এলাকায় ছিলেন। শায়খ সাইয়াফও সেখানে উপস্থিত হন। পরে আমরা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ২৬শে রমযান আক্রমণের পরিকল্পনা করি। নির্ধারিত সময়ে পাহাড়ের ঢালুর দিকে অবস্থিত শত্রুবাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে আক্রমণ শুরু করি। জবাবে দূরের একটি জায়গা থেকে আমাদের দিকে বিএম-২১ রকেট লাঞ্চারের গোলা আসতে শুরু করে।
এই যুদ্ধ প্রায় তিন সপ্তাহ চলতে থাকে। বোঝাই যাচ্ছিল, শত্রুবাহিনী আটঘাট বেঁধেই নেমেছে। অন্যদিকে আমরা কেবল এক দিনের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। শত্রুদের লক্ষ্য ছিল, এই ক্যাম্প (মা’সাদাহ) ধ্বংস করে আফগানিস্তানে সাহায্য আসার প্রধান রাস্তা জাজির সীমান্তপথ বন্ধ করে দেওয়া। মূলত আফগানিস্তানের ওপর সোভিয়েত বাহিনীর আক্রমণ ব্যর্থ হতে দেখে প্রেসিডেন্ট গর্বাচেভ সেনাবাহিনীকে আফগান থেকে বের হয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েত জেনারেলরা শেষবারের মতো একটি সুযোগ চেয়ে নিয়েছিল এবং একে নিজেদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। জেনারেলরা প্রেসিডেন্টকে এ আশ্বাসও দিয়েছিল যে, তারা মুজাহিদদের পাকতিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে পাক-আফগান সীমান্তের খাইবার পাস পর্যন্ত দখল করে নেবে।
এই লড়াইয়ে সফল হলে সোভিয়েত জেনারেলগণ গর্বাচেভের সাথে নেওয়া চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হতে পারত। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। আল্লাহর অনুগ্রহে মুজাহিদদের মাত্র ৭০ জনের একটি দল তাদের পিছু হটতে বাধ্য করে। কলেজপড়ুয়া, অল্পবয়সি, হালকা-পাতলা গড়নের এই আরব যুবকগুলো পিকে মেশিনগান হাতে রুশ বাহিনীর আগ্রযাত্রা রুখে দেয়। তাদের একটি ফায়ারেই রুশ কমান্ডো বাহিনীর তিন-চারজন সৈন্য অনায়াসে কুপোকাত হচ্ছিল। অথচ [রুশ বাহিনী এতটাই সতর্ক ছিল যে, জোরে কোনো কথাও বলত না।] পাখির আওয়াজের মাধ্যমে ইশারা-ইঙ্গিতে কাজ করত। এমনকি তারা ছদ্মবেশ ধারণে এতটাই পারদর্শী ছিল যে, হঠাৎ সামনে চলে আসায় অনেক যুবকই চিনতে না পেরে হকচকিয়ে যেত।
লড়াইটি বাস্তবিক অর্থেই অনেক কঠিন ছিল। এতে রাশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী অংশগ্রহণ করেছিল। পুরো এলাকাটিকে অসংখ্য সৈন্য ও আর্টিলারি দিয়ে ঘিরে রেখেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা চেয়েছিলেন, মুমিন বান্দারা বিজয়ী হবে। অবশেষে আল্লাহর ইচ্ছাই বাস্তবায়ন হয়েছিল এবং সত্য হয়েছিল আল্লাহর এই বাণী—
إِن یَنصُرۡكُمُ ٱللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمۡۖ
‘আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করলে কেউ তোমাদের পরাস্ত করতে পারবে না।’ [সূরা আলে ইমরান (৩): ১৬০] كَم مِّن فِئَةࣲ قَلِیلَةٍ غَلَبَتۡ فِئَةࣰ كَثِیرَةَۢ بِإِذۡنِ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ مَعَ ٱلصَّـٰبِرِینَ
‘এমন কত ছোট দলই না রয়েছে, যারা আল্লাহর হুকুমে বড় দলের ওপর জয়যুক্ত হয়েছে। আর আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন, যারা সবরের পরিচয় দেয়।’ [সূরা বাকারা (২): ২৪৯]এ যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শায়খ রহ. বলেন—
‘২৯শে রমযান আফগান সরকার ও রুশ বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণ শুরু হয়। আমরা জানতে পারি, অগ্রবর্তী বাহিনীর সংখ্যাই ১০ হাজারের কাছাকাছি। এদের মধ্যে রাশিয়ান বাহিনীর তিনটি রেজিমেন্টের পাশাপাশি রাশিয়ান কমান্ডোও আছে। শত্রুবাহিনী আমাদের দিকে আসতে শুরু করে। ট্যাংকগুলো যখন মুজাহিদদের ফায়ারিং রেঞ্জে প্রবেশ করে, আমরা বিসমিল্লাহ বলে তাকবীর দিয়ে আক্রমণ শুরু করি। ওয়ারলেসে সকল আর্টিলারি ইউনিটকে একযোগে আক্রমণ করার সংকেত প্রেরণ করি। সকল ইউনিট থেকে একসাথে তাদের ওপর বোমাবর্ষণ শুরু হয়। আমি ঘাঁটি থেকে হামলার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। আল্লাহর রহমতে মুজাহিদদের নিক্ষিপ্ত বোমা শত্রুদের ওপর পড়ছিল আর তাদের সবকিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছিল।
হামলার প্রচণ্ডতায় পাহাড়গুলো কেঁপে কেঁপে উঠছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমাদের কোনো ভাই আহত হননি। মাগরিব পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। ঘাঁটি থেকে ফিরে এসে আমি ভাই আবু উবায়দা পানশীরীর সাথে সাক্ষাৎ করি। তিনি কুরআনের হাফেয ছিলেন। আমরা বুঝতে পারি, রুশ বাহিনী আজকের আক্রমণের পর চুপ করে বসে থাকবে না। আগামীকাল তারা আরও তীব্র আক্রমণ করবে। এ জন্য আমরা ৩০ জন আরব মুজাহিদকে আমাদের পেছনের ঘাঁটিতে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমরা তখন ৭০ জনের মতো ছিলাম।
যা অনুমান করেছিলাম, পরদিন ঠিক তা-ই ঘটে। দিনের আলো ফোটার সাথে সাথে প্রচণ্ড বোমা হামলা শুরু হয়। মা’সাদায় ৪০ জনের মতো ভাই অবস্থান করছিলেন। আমি নয়জন ভাইকে সাথে নিয়ে আল-মুতাকাদ্দিমা নামের একটি গুহায় অবস্থান করছিলাম। গুহাটি ছিল অনেক ছোট। ভারী বোমার আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা তার ছিল না। শত্রুরা বিমান থেকে হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা [আশপাশে] নিক্ষেপ করছিল। ক্ষণে ক্ষণেই পাহাড়গুলো কেঁপে উঠছিল।
আমরা আগেই ভাইদের সাথে কথা বলে একটি সংকেত ঠিক করে রেখেছিলাম, যখন ভাইয়েরা বুঝতে পারবেন, শত্রুবাহিনী ঘাঁটি ঘেরাও করবে, তখন তারা পরপর তিনবার ফায়ার করবেন। হঠাৎ ডান দিকের বদর মারকায থেকে সাইফুল্লাহ মাগরিবী ভাই আমাদের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, বিশেষ বাহিনীর পোশাক পরিহিত প্রায় দু’শ রাশিয়ান সৈন্যকে তিনি গোপনে ঘাঁটির দিকে এগিয়ে যেতে দেখেছেন। তখন ভাই সতর্ক সংকেত অনুযায়ী পরপর তিনবার ফায়ার করেন। সাথে সাথে আমি মুজাহিদদের প্রধান ঘাঁটিতে সংবাদ প্রেরণ করি যে, শত্রুরা ঘাঁটি ঘেরাও করার জন্য এগিয়ে আসছে, তোমরা প্রস্তুত হও। এরপর আমার সাথে থাকা ভাইদেরকে অস্ত্র নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে বলি। আমরা ছিলাম মাত্র ১০ জন। কিন্তু, ভাইয়েরা ভীত না হয়ে সামনে আগানো শুরু করেন। তারা জানতেন, শত্রুর সংখ্যা দু’শর কাছাকাছি।
আমরা কেউই প্রশিক্ষিত সৈনিক ছিলাম না; সবাই ছিলাম সাধারণ মানুষ। তারপরও কেউ বিচলিত হইনি। আল্লাহ তাআলা সকলকে সম্মানিত করুন। সকলে অস্ত্র হাতে সামনে আগাতে থাকি। আমাদের টার্গেট ছিল, কোনো উঁচু টিলা থেকে শত্রুর ওপর আক্রমণ করা। শত্রুর নজর এড়াতে ভাইদের কয়েক দলে ভাগ করে দিই। ভাই যবীহ ও আবু সাহল মিসরী রহ.-কে একটি ওয়ারলেস দিয়ে আল-মুতাকাদ্দিমা গুহায় রেখে যাই। ভাই আবু হানীফার সাথে কয়েকজন ভাইকে ডান দিকে যেতে বলি। আর বাকিদের নিয়ে আমি সামনের দিকে এগিয়ে একটি টিলার চূড়ায় উঠে পড়ি।
আমরা ছিলাম মাত্র তিনজন। খিযির ভাই ও মুখতার ভাই (দুজনেই দাম্মামের বাসিন্দা) আর আমি। কিছুক্ষণ পর খালেদ কুর্দি এসে আমাদের সাথে যুক্ত হন। আমি তাকে পানি, খেজুর ও আরপিজির জন্য আরও কিছু গ্রেনেড আনতে পাঠাই। তিনি চলে যাওয়ার পর আবারও আমরা তিনজন হয়ে যাই। দুইশত কমান্ডোর সামনে আমরা মাত্র তিনজন কী আর করব? কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাদের তিনজনকেই দৃঢ়পদ রাখেন। সুবহানাল্লাহ, আমাদের মধ্যে ভীতি বা উৎকণ্ঠার লেশমাত্র ছিল না। অথচ আমি আগেই জানতে পেরেছিলাম, এই বাহিনীর বিশেষ টার্গেট হলো আমাকে বন্দি করা।
প্রত্যেকের মাঝে দশ মিটারের মতো দূরত্ব রেখে আমরা তিনজন টিলার ওপর এমনভাবে অবস্থান নিই, যেন একে অপরকে দেখতে পারি। পরিস্থিতি দেখে অন্য ভাইদের কাছে সাহায্য চাই। কিন্তু তারা আমাদের থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার দূরত্বে ছিলেন। তখন খিযির ভাই এসে আমাকে বললেন, মুখতার ভাই টিলার নিচে গাছপালার মধ্যে খুব কাছ থেকে রুশ বাহিনীর কথাবার্তার আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন। আমরা তখন সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সাহায্য আসার আগেই রুশ বাহিনী এসে পড়েছিল। সাথে সাথে আমি সবাইকে টিলার চূড়ায় একত্র হতে বলি। ঠিক এমন মুহূর্তে খালেদ ভাই এসে আমাদের সাথে মিলিত হন। আবু উবায়দাও এসে পৌঁছান। তিনি এখানে আসার আগেই বদর ক্যাম্প থেকে একটি ইউনিটকে শত্রুর আগ্রগামী বাহিনীকে থামানোর জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
আমরা বামদিক দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলাম আর শত্রুরা ডানদিক দিয়ে আসছিল। কিছুদূর এগিয়ে আমরা একটি টিলায় উঠি। টিলাটি আয-যাহরানী নামে পরিচিত ছিল। আহমাদ যাহরানী রহ. এই টিলার ওপর শাহাদাত বরণ করেছিলেন, তাই টিলার এই নাম। টিলার নিচে শত্রুদের দেখতে পেয়ে তাদের ওপর আক্রমণের জন্য হ্যান্ড গ্রেনেড বের করি। শত্রুরা আমাদের নিচে থাকায় আমরা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলাম। গ্রেনেড প্রথমে আমিই বের করি। কিন্তু ভাই আবু উবায়দা বলেন, শত্রুদের সবাই পরিপূর্ণভাবে আমাদের আওতায় আসা পর্যন্ত যেন বিলম্ব করি। এরমধ্যে হঠাৎ চারজন মুজহিদ ভাই আমাদের সাহায্যে এসে উপস্থিত হন, অথচ তাদের কেউ আমাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতেন না। ভাইদের পায়ের আওয়াজ শুনে রুশ বাহিনী সতর্ক হয়ে যায়। তারা ধারণাও করতে পারেনি, এখানে কোনো মুজাহিদ থাকতে পারে। তারা ভেবেছিল, লাগাতার পাঁচদিন বোমা হামলার কারণে মা’সাদার সবাই হয় নিহত বা আহত হয়েছে।
২৬শে মে ১৯৮৭ সালের জাজির রণক্ষেত্র:
রুশ বাহিনী আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধীরে ধীরে সে জায়গা থেকে সরে যেতে শুরু করে। মা’সাদাহ ক্যাম্প থেকে এত আগে মুজাহিদদের দেখে তারা ভড়কে গিয়েছিল। এখানেও কেউ থাকতে পারে—তারা কল্পনাও করেনি। তাদের ফেলে যাওয়া ওয়ারলেসে কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারি, আমাদের অবস্থানের ব্যাপারে তাদের আর্টিলারি ইউনিটকে জানিয়ে দিয়েছে। রুশ আর্টিলারি ইউনিট সামনে যা পায়, তা-ই তছনছ করে ফেলে। আমি হ্যান্ড গ্রেনেড নিয়ে তাদের অপেক্ষা করতে থাকি। ততক্ষণে পলায়নরত সৈন্যরা প্রায় দু’শ মিটার পেছনে সরে গিয়েছে। ঠিক তখনই আমাদের ওপর বৃষ্টির মতো মর্টার হামলা শুরু হয়। হামলা এতটাই তীব্র ছিল, নিজেদের মধ্যেও কোনো কথা বলার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছিল না।
প্রায় এক ঘণ্টার মতো বিরতিহীন ভারী বোমাবর্ষণ চলে। এরই মাঝে মিনিটখানেকের জন্য হামলা বন্ধ হলে আল্লাহর রহমতে আমরা সেখান থেকে সরে আসি এবং আমাদের ক্যাম্পের সীমানার ভেতরে একটি জায়গায় তাদের জন্য অ্যাম্বুশ তৈরি করি। বিরতিহীন এই বোমা হামলার পর তারা অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায় যে, এই টিলায় কারো পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব না। তাই অনেকটা নির্বিঘ্নেই ওপর উঠতে থাকে। টিলার ওপরে আসতেই আমরা তাদের ওপর আক্রমণ শুরু করি। এতে তাদের কয়েকজন সৈন্য নিহত হয় আর বাকিরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এভাবেই যুদ্ধ চলতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা বিমানবাহিনীর সহায়তা তলব করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকটি যুদ্ধবিমান এসে মিসাইল নিক্ষেপ করা শুরু করে। এর সাথে কিছু স্মোক গ্রেনেডও নিক্ষেপ করা হয়। চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় ভাইদের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমাদের আশঙ্কা হচ্ছিল, এগুলো কোনো বিষাক্ত গ্যাস কি না। পরে অবশ্য বুঝতে পারি, এগুলো সাধারণ স্মোক গ্রেনেড। দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চলতে থাকায় সকলেই হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। অবশেষে হামলা থেকে বাঁচার জন্য পেছনের এক ঘাঁটিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
আমরা রাতে সেখান থেকে চলে আসি। মা’সাদায় তখন শুধু আফগান ও আরব ভাইদের একটি ইউনিট অবস্থান করছিল। আল্লাহর রহমতে ততক্ষণে আফগান মুজাহিদদের পক্ষ থেকে সাহায্য চলে এসেছিল। তারা রাশিয়ান কমান্ডো বাহিনীর ওপর লাগাতার ৩৫টি আরপিজি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। কমান্ডো বাহিনীর ধারণা ছিল, ক্যাম্পে যারা আছে সবাই আহত। কিন্তু মুজাহিদদের এই আচমকা হামলায় তাদের ধারণা বদলে যায়। তারা ধরে নেয়, মা’সাদার ভেতরে এখনো অনেক বড় বাহিনী আছে। তাই তারা আক্রমণ বন্ধ করে ক্যাম্পে বসেই রাত কাটিয়ে দেয়। আসলে তারা আমাদের ক্যাম্পের ওপর হামলা করতে ভয় পাচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে ক্যাম্পে তখন বড় কোনো বাহিনীই ছিল না। সবই আল্লাহ তাআলার দয়া।
সকালে ভাইদের দুই দলে ভাগ করে দিই। একদল মা’সাদায় চলে যায়, আরেকদল মাঝপথে অপেক্ষা করতে থাকে। আমরা রাস্তা ও আশপাশ পরিদর্শন শেষে তাদেরকেও ক্যাম্পের (মা’সাদাহ) দিকে অগ্রসর হতে বলি। ওই জায়গাটিকে পুরো অঞ্চলের হৃৎপিণ্ড মনে করা হতো। তাই জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে শত্রুরা মরিয়া হয়ে যুদ্ধ করছিল। তখন ভাই আবু উবায়দা পরামর্শ দেন, তিনি ৮ জন ভাইকে সাথে নিয়ে রাশিয়ান বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে পেছন থেকে তাদের ওপর আক্রমণ করবেন।
আমি আবু উবায়দাকে বললাম, বাম পাশ তো খালি হয়ে যাবে। সেখানে কে থাকবে? তখন আমি অসুস্থ ছিলাম। হাঁটতেও অনেক কষ্ট হতো। কিন্তু ভাই আবু উবায়দা আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, আমি যেন বাম পাশে থাকি। কথামতো আমি বাম পাশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। আমার সাথে মাত্র তিনজন ভাই ছিলেন। মুহাম্মাদ উতাইবী রহ. (আবুল ওয়ালীদ), ইয়াসিন কুর্দী ও আসাদুল্লাহ সানাদী।
ভাই আবুল হাসান মাদানী আমাদের দেখতে এসেছিলেন। এই মেহমান ভাইও আমাদের সাথে যুক্ত হন। আমরা ৫ জন মিলে শত্রুর বাম বাহুর দিকে রওনা করি। চতুর্দিক থেকে শত্রুবেষ্টনীর মধ্যে ছিলাম আমরা। তবু অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত করে বাম দিকে যাত্রা শুরু করি। প্রত্যেকের হাত ছিল বন্দুকের ট্রিগারে। বাম পাশের সম্মুখভাগে পৌঁছাতেই পাঁচজন ভাইকে ডানে-বামে ভাগ করে দিই। ভাই আবু উবায়দা আরপিজি নিয়ে একাই ডান পাশে দাঁড়িয়ে যান। ভাই আসাদুল্লাহ গোরিউনোভ মেশিনগান (মাঝারি মানের মেশিনগান) নিয়ে বাম পাশে দাঁড়িয়ে যান। ইয়াসিন কুর্দী পেছন থেকে কভার দেন। মাঝখানে আমি আর আবুল হাসান মাদানী অবস্থান গ্রহণ করি।
ভাইদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে না দিতেই দেখি রুশ বাহিনী [মা’সাদাহ] ক্যাম্পের সম্মুখভাগের কামরা থেকে মাত্র ৭০ মিটার দূরে অবস্থান করছে। আমরা ছিলাম কামরার পেছন দিকে। তখনই তাদের সাথে আমাদের হালকা গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। তাদের লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকি। ইয়াসিন কুর্দী ও আবুল ওয়ালীদকে সামনে অগ্রসর হয়ে বাম দিক থেকে আক্রমণ করতে বলি, যেখানে রুশ সৈন্যদের দেখতে পেয়েছি। আমাদের হামলার জবাবে শত্রুরা ক্লাকোভ [একে-৭৪] দিয়ে গুলি করতে শুরু করে। ক্লাকোভের [একে-৭৪] শব্দ কালাশনিকভ [একে-৪৭] থেকে অনেকটা আলাদা। এটি রাশিয়ার স্পেশাল ফোর্সের অস্ত্র হিসেবে পরিচিত আর কালাশনিকভ হলো আফগান কমিউনিস্ট বাহিনীর অস্ত্র।
ঈদের দিন এমন প্রতিরোধের মুখে পড়ে রুশ কমান্ডো বাহিনী একটু অবাক হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তারা পিছু হটতে শুরু করে। তাদের এক দল অন্য দলকে কভার দিচ্ছিল। [আমরা শত্রুদের বাম পাশ দিয়ে পেছনে চলে এসেছিলাম। তাই শত্রু যখন পিছু হটতে শুরু করে,] তখন ইয়াসিন ও আবুল ওয়ালীদ ভাইকে [আমাদের অবস্থান থেকে] ১৫০ মিটারের ভেতরে আক্রমণ করতে বলি। আমার ধারণা ছিল, তারা পিছু হটতে হটতে এ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। তখন পর্যন্ত আমি ভাবছিলাম, আক্রমণ শুধু বাম দিক থেকে আসবে। কিন্তু যখন ওয়ারলেসে কথা বলার জন্য টিলার চূড়ায় উঠি। তখন আচমকা শত্রুদের মধ্যবর্তী স্থান থেকে আমার দিকে আরপিজি থেকে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। গ্রেনেডটি আমার পাশ দিয়ে গিয়ে কাছেই বিস্ফোরিত হয়, তবে আমার গায়ে এর কোনো আঁচড় লাগেনি। মনে হচ্ছিল সামান্য মাটি আমার ওপর ঝরে পড়েছে। আমি শান্তভাবে নিচে নেমে ভাইদের জানাই, শত্রুরা কেবল বাম দিকে নয়, মাঝখানেও আছে।
আবু উবায়দার সাথে যে দলটি রুশ বাহিনীকে ঘেরাও করার জন্য গিয়েছিল, আমি তাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। অনেকবার চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাই না। তাদের নিয়ে চিন্তা হতে থাকে। যোগাযোগের চেষ্টা বন্ধ করলেও ওয়ারলেস খোলা রেখে দিই। এরই মধ্যে শত্রুরা আবার নতুন করে এই স্থানে বৃষ্টির মতো ট্যাংক ও কামান থেকে বোমা হামলা শুরু করে, সাথে বিমান হামলাও চলতে থাকে। আমরা সবাই সেখান থেকে নেমে গুহায় প্রবেশ করি আর গুহার বাইরে এক ভাইকে পাহারায় রাখি, যেন রুশবাহিনী এ দিকে আসলে আমরা জানতে পারি।
গুহায় বসে ট্যাংক ও কামানের গোলাবর্ষণ পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। যখনই আক্রমণ সরাসরি আমাদের ওপর হতো, আমরা গুহায় আশ্রয় নিতাম। কিন্তু হামলা যখন একটু দূরে হতো, তখন আবার গুহা থেকে বের হয়ে টিলার ওপরে উঠে আসতাম। নতুন এই কৌশলটি এই যুদ্ধেই আমরা রপ্ত করেছিলাম। কেননা বোমা বর্ষণের আড়ালে শত্রুদের সামনে অগ্রসর হওয়ার আশঙ্কা ছিল। একদিকে ট্যাংক ও মর্টার থেকে ২০০ মিটার দূরে গোলাবর্ষণ করবে, অন্যদিকে এই হামলার কভার নিয়ে সামনে অগ্রসর হবে।
শত্রুদের পেছন থেকে আক্রমণ করতে যাওয়া ভাইদের নিয়ে আমার খুব চিন্তা হচ্ছিল। হঠাৎ ওয়ারলেস থেকে আওয়াজ আসতে শুরু করে, এতে আমার হালে পানি ফিরে আসে। ভাই আবু উবায়দা বলছিলেন, ‘আবুল কা’কা, আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?’ আমি দ্রুত ওয়ারলেস উঠিয়ে বলি, ‘হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি, আপনি বলুন।’ আবু উবায়দা বললেন, ‘আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! সুসংবাদ গ্রহণ করুন, আমরা রুশ কমান্ডোদের হত্যা করতে সক্ষম হয়েছি। তারা এখন মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আল্লাহু আকবার।’
তাকবীরের আওয়াজের সাথে সাথে ভাইদের মধ্যে বিজয়ের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহর এমন অনুগ্রহে আমরা যারপরনাই আনন্দিত হই। পেছন দিক থেকে রুশ বাহিনীর ওপর ভাইদের এই আক্রমণ রুশ বাহিনীর কল্পনারও বাইরে ছিল। ভাইয়েরা এমন জায়গা থেকে হামলা করেছিলেন, যেখান থেকে হামলা হতে পারে এমন ধারণাও রুশ বাহিনীর ছিল না। ভাই মুহাম্মাদ আযমান ওরফে মুখতার একাই এক হামলায় ছয়জনকে হত্যা করেন। হামলায় মেশিনগান আর হ্যান্ডগ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। এতেই কমান্ডো বাহিনীর মনোবলে ভাঙন ধরে।
রাশিয়ার দুইশত কমান্ডোর বিপরীতে ভাইদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৯ জন। কিন্তু ভয়ের কারণে তারা ভাইদের শক্তি আন্দাজ করতে পারেনি। গাছপালা ও জঙ্গলের কারণে আক্রমণকারীর সংখ্যাও বুঝতে পারেনি। আচমকা এই হামলা তাদেরকে আতঙ্কগ্রস্ত করে ফেলে। প্রায় ৩৫ জন কমান্ডো ও অফিসার নিহত হয়। বাকিরা প্রাণের ভয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে পালিয়ে যায়। এই বিজয়ে শুধু এই অঞ্চলেই নয়, পুরো আফগানিস্তানের মুজাহিদদের মনোবল বেড়ে যায়। এটা ছিল ভাইদের ওপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ।’
জাজির লড়াইয়ের পর নেতৃস্থানীয় আরব মুজাহিদগণ পেশোয়ারে একত্র হন। কাজের ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে আলোচনা হয়। শায়খ উসামা রহ.-কে আরবদের আমীর ঘোষণা করা হয়। শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ.-কে সদা (صدى) ট্রেইনিং ক্যাম্পের দায়িত্বশীল নির্ধারণ করা হয়। আবুল হাসান মাদানী (ওয়ায়েল জুলাইদান)-কে পেশোয়ারের দায়িত্বশীল নির্বাচন করা হয় এবং শায়খ উসামা বিন লাদেন, শায়খ আবু উবায়দা পানশীরী, আবুল হাসান মাদানী, শায়খ আবু হাজের ইরাকী, ইসাম লীবী ও শায়খ আবু হাফস কমান্ডার—এই ছয়জনের সমন্বয়ে একটি সামরিক কমিটি গঠন করা হয়।
Comment