প্রত্যক্ষদর্শীর যবানে অপারেশনের ইতিবৃত্ত
এবার মূল আলোচনা তথা লাল মসজিদের ঘটনায় ফিরে আসা যাক।
মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেবের সহধর্মিণী, অর্ধাঙ্গিনী, জামিয়া সাইয়্যেদা হাফসার সম্মানিত সাহেবে ইহতেমাম সকল ছাত্রীদের প্রাণপ্রিয় আপাজান, উম্মে হাসসান আসমা এর লাল মসজিদের অপারেশনের সময় সেখানে অবস্থানরত অবস্থায় স্বচক্ষে দেখা পরিস্থিতি ও নানা অলৌকিক ঘটনার বিবরণ। এখানে তাঁর বর্ননা হুবহু তুলে ধরা হলো।
- "..........তারা রাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপদ পরিবেশ খারাপ করা এবং গৃহযুদ্ধের লাগানোর জন্য অপারেশনের রাস্তা তৈরি করতে শুরু করে দেয় এবং কিছুদিন পর রেঞ্জার্স কমান্ডারেরা লাল মসজিদ অবরোধ করা শুরু করে লাল মসজিদের আশেপাশে বিল্ডিং গুলো মোর্চা বানাতে লাগলো। উহার প্রতি যখন অস্থিরতা ও পেরেশানি প্রকাশ করা হলো তখন তারা মৌখিকভাবে আশ্বস্ত করলো যে রাষ্ট্রের অপারেশনের পরিচালনার ইচ্ছা নেই । অপরদিকে অত্যন্ত জোরেশোরে অপারেশনের প্রস্তুতি চলছিল। এই পুরা সময়ে আমাদের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় যে, রাষ্ট্রের কিছু লোক মিথ্যা বলা ও ধোঁকাবাজির বিনিময়ে হয়তো বেতন নিয়ে থাকে। রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের ধোঁকা দিতে থাকে কখনো কেউ আলোচনার জন্য এসে যায় তখন আলোচনার একটা ফলাফলে পৌছার পর্যায়ে চলে আসে তখন আমাদের বলা হয় যে আমরা তো পরাধীন। অতঃপর অন্য কারো সাথে আলোচনা করা শুরু হয়।
- চৌধুরী শুজাআত হুসাইন সাহেবের সাথে যখন আলোচনা শুরু হলো তখন আমরা এটা মনে করলাম যে, চৌধুরী সাহেবের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে এবং তিনি তো ভালো মানুষ। হয়তো তিনি মসজিদ সমূহের নবনির্মাণ এবং রাষ্ট্রের অন্যায়ের পরিসমাপ্তির চেষ্টায় সফল হবেন। কিন্তু উনাকেও অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে হয় এবং তিনি মিডিয়ার সামনে ঘোষণা করেন যে মসজিদ ওয়ালাদের পক্ষ থেকে তো আমার প্রতি পরিপূর্ণ সহযোগিতা পরস্পরের বুঝাবুঝির পছন্দনীয় ভাবে মিলেছে কিন্তু cdi এবং কিছু অদৃশ্য শক্তির পক্ষ থেকে আলোচনা স্যাবোটাজ করা হয়েছে (স্যাবোটাজ হচ্ছে আসলে এমন একটি কাজ যা কোন উদ্দেশ্য হাসিল বা ক্ষতি করার লক্ষ্য ইচ্ছাকৃত এবং গোপন করা হয়)
আলোচনা চলায় অবস্থায় একদিকে পরস্পরের বুঝাবুঝির কথা বলা হচ্ছিল এবং শক্তির ব্যবহার না করার বিশ্বাস দেওয়া হচ্ছিল কিন্তু অপরদিকে অপারেশনের প্রস্তুতি চলমান ছিল এবং পরিশেষে সেটিই হল যেটার আমরা ভয় করতেছিলাম।
- আমরা অবশ্যই (দাবি দাওয়ার ক্ষেত্রে) কঠোর অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু আমাদের বিগত ছয় মাসে নিরাপদ আন্দোলন একথার সাক্ষী যে, আমাদের আন্দোলন চলাকালে কোন একটা আঙ্গুল পর্যন্ত কাটা যায়নি। কেউ একজন যখম পর্যন্ত হয়নি। বরং হৃদয়গ্রাহী কথা তো এটাই যে ৩ জুলাই যখন অপারেশনের জন্য আসা বাহিনীগুলো প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন মাওলানা(আবদুল আজিজ) সাহেব ওই সময় তাদের নামে চিঠি লিখছিলেন যে, আমাদের তোমাদের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধ এবং শত্রুতা নেই। আমরা এই সিস্টেমের পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় লিপ্ত। তোমরা অন্যদের বলার কারণে মসজিদ, কোরআন মাজীদ, মাসুম বাচ্চা এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপর কখনোই গুলি চালায়ও না। কিন্তু তারা কি আর ফিরে আসার ছিল?(অর্থাৎ তারা বিরত থাকলো না)।
- ৩ জুলাই থেকে নিয়ে ১০ এ জুলাই পর্যন্ত যা কিছু হয়েছে,যেভাবে আমাদের বাচ্চা ছেলে মেয়েদের উপর জুলুম নির্যাতনের পাহাড় ভেঙ্গে পড়েছে এরকম হয়তো ইতিহাসে কখনোই হয়নি। আমরা কখনো চিন্তাও করতে পারিনি যে আমাদের এ বাহিনীর ভাইয়েরা যাদেরকে আজ পর্যন্ত আমরা নিজেদের মুহাফেজ এবং রক্ষক মনে করেছিলাম তাদের থেকে আমাদের কখনোই এই আশা ছিল না যে,তারা এই সীমা পর্যন্ত চলে গেছে। যখন আমাদের বাচ্চারা হতে লাগলো তখন মাওলানা(আবদুল আজিজ) সাহেব মসজিদের এরিয়ার মধ্যে গেলেন। ওখানে সবদিকে মাসুম এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের লাশগুলো বিক্ষিপ্তভাবে পড়েছিল। মাওলানা ঐ সকল মাজলুম শহীদদের মাথায় হাত বুলানো শুরু করলেন এবং খুব দুঃখ পান।
মাওলানা যেহেতু খুবই নরম দিলের মানুষ ছিলেন এবং কোনভাবে খুন খারাবির মধ্যে ছিলেন না। এই তিনি যখন ফিরে এলেন তখন তিনি মশওয়ারার মাধ্যমে এটা সিদ্ধান্ত করলেন যে, যেকোনোভাবে অপারেশন বন্ধ করা হবে। যেহেতু পূর্ব থেকেই কিছু সরকারি লোক আলোচনার কথা বলতেছিল। এখন মাওলানা সাহেব তাদের কথা ও ধোঁকায় পড়ে গেলেন,এবং খুন-খারাবি বন্ধের জন্য আলোচনা উদ্দেশ্যে বাহিরে বের হলেন। আমি(উম্মে হাসসান আসমা) মাওলানার বাহিরে যাওয়ার পক্ষে ছিলাম না। এই বিষয়ে বারবার ইস্তেখারা করে শরহে সদর হচ্ছিল না। এজন্য আমি মাওলানার(আবদুল আজিজ) গ্রেফতার বা শাহাদাতের ব্যাপারে জেহনি/বুদ্ধি বৃত্তিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। মাওলানা কে কোন লোকেরা কিভাবে গ্রেফতার করিয়েছে আমি সব বিবরণে যাচ্ছি না বরং وأفوض أمرى إلى الله
আমরা আমাদের মুয়ামালা আমাদের আল্লাহ পাকের নিকট সোপর্দ করলাম।
- সংক্ষিপ্ত ঘটনা এই যে, মাওলানা(আবদুল আজিজ) সাহেবকে অত্যন্ত ঘৃনিতভাবে গ্রেফতার করে নেয়া হয়। অতঃপর মাওলানা কে নিয়ে হাসি তামাশা করে আমাদের কঠিন কষ্ট দিয়ে মর্মাহত করা হয়েছিল।
- নিজের যুবক ছেলে হাসসান কে তো অবশ্যই সাথে নিয়ে যেতেন। অন্য কিছু না হোক কমপক্ষে তো মাওলানা নিজের প্রিয়তমা আসমা কে ছেড়ে কখনোই নিজের জান বাঁচানোর জন্য প্রস্তুত হতেন না। মাওলানার গ্রেফতারির পর আমাদের আশা এই ছিল যে, হয়তো এখন মাওলানার গ্রেফতারির কোরবানির কারণে অপারেশন বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু জালিমদের রক্তের পিপাসা এরপরে নিভে যায়নি এবং তারা দিকবিদিক ফায়ারিং এবং অগ্নি বৃষ্টির ধারা অব্যাহত রাখে। কেননা তাদের উদ্দেশ্য তো মাওলানা বা গাজী সাহেবের গ্রেফতারি ছিল না বরং তারা নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘ করার জন্য আমেরিকার সন্তুষ্টি অর্জন, ডলার ও এফ১৬ বিমানগুলো লোভে নিজেদের বাচ্চা ছেলে মেয়েদের জবাই করতে উঠেপড়ে লেগেছিল।
চলবে ইনশাআল্লাহ......