("প্রত্যক্ষদর্শীর যবানে ঘটনার ইতিবৃত্ত"এর পরবর্তী অংশ)
- ঐ ৭ দিন শত শত মিনিট এবং হাজার হাজার সেকেন্ড বা মুহূর্তের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জন্য কেয়ামত হয়ে অতিক্রম করে।আপনারা লোকদের গুলি লাগার কারণে মৃত্যু হতে দেখে থাকবেন, অসুস্থতার কারণে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে দেখে থাকবেন, কিন্তু ক্ষুধ পিপাসার কারণে কাউকে শক্তিহীন এবং পরিশ্রান্ত হতে হয়তো কখনো দেখেননি। আপনারা যুবকদের শরীর হতে প্রবাহিত রক্ত হয়তো দেখে থাকবেন কিন্তু ফুল এবং কলির মতো বাচ্চাদের হয়তো কখনো ওই অবস্থায় দেখেননি। সেটা কেমন অসহায়ত্বের জগত ছিল যে আমাদের ওই মাদ্রাসা যেখানে শত শত লা ওয়ারিশ বাচ্চাদের জন্য খানা প্রস্তুত হতো সেখানে একটি রুটিও সহজলভ্য ছিল না।
জালেমেরা সর্বপ্রথম কিচেনে এলোপাতাড়ি বোমা বর্ষণ করে উহাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে অতঃপর কিচেনে আগুন লাগিয়ে দেয়। প্রথম দুদিন তো নির্ধারিত কিছু খাবার ছিল অতঃপর যখন সেটা শেষ হয়ে যায় তখন মাদ্রাসার এরিয়ায় অবস্থিত ক্যান্টিন থেকে কিছু মিষ্টি জাতীয় এক প্রকার খাবার এবং কিছু বিস্কুট পাওয়া গেল। সেগুলো বাচ্চাদের মধ্যে বন্টন করা হলো। ট্রাফি দ্বারা কিভাবে একজন জীবিত মানুষের দিন অতিবাহিত করা ভালো কিভাবে হতে পারে?
- এরপর তো অবস্থা গাছের পাতা খাওয়া পর্যন্ত পৌঁছে গেল। এমন এক সময় যখন পুরা পাকিস্তানের লোকেরা মজাদার খাবার এবং আল্লাহর নেয়ামত সমূহ খাচ্ছিল তখন আমার বাচ্চারা পাতা খেয়ে দিন অতিবাহিত করছিল। আমি নিজে ক্ষুধার্ত থেকে যে বাচ্চাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছিলাম তাদেরকে অসহায়ত্বের কারণে পাতা খেতে দেখে আমার অনেক কষ্ট হতো। কিন্তু যখন গাজওয়ায়ে যাতুররিকা এর কথা স্মরণ হতো, যে সময় সাহাবাগণ (রাঃ)পায়ের সাথে নেকরা বেঁধে এবং পাতা খেয়েছিলেন তখন প্রশান্তি চলে আসে যে, আমরা এবং আমাদের বাচ্চা ছেলে মেয়েরা সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর সুন্নত জিন্দা করছে।
আমাদের চেষ্টা ছিল যে বাচ্চারা কোনভাবে বাহিরে চলে যাক। আমরা উৎসাহ দিয়ে দিয়ে বাচ্চাদের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু তারা উত্তর দিত আজ আমরা কোরআনে কারীমের জ্বলে যাওয়া পৃষ্ঠাগুলো, গুলির দ্বারা ঝাঁঝড়া হওয়া মসজিদ, নিজেদের মাদ্রাসা এবং ওস্তাদদের একা রেখে বাহিরে যাওয়ার জন্য কখনোই প্রস্তুত নই।
- আমি ওই দৃশ্য কখনো ভুলবো না যখন এক বাচ্চার বাবা তাকে নিয়ে নিতে আসলো উনি তাকে বারবার করে তাকিদ দিয়ে হুকুম দিচ্ছিল তার সাথে চলে যেতে। কিন্তু ঐ বাচ্চাটা বারবার বলতেছিল না আমি বাহিরে যাব না বরং এখানেই শহীদ হয়ে যাবো। যখন তার বাবা বারবার বলতে লাগল তখন সে আশ্চর্য ধরনের আচরণ করতে লাগলো নিজের বৃদ্ধ পিতার পায়ে পড়ে গেল। সামনে এক সাদা ধবধবে শহীদের লাশ মাটিতে রাখা ছিল। ঐ বাচ্চা ঐ লাশের দিকে ইশারা করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো: আব্বুজি আপনি ঐ শহীদের উসিলায় আমাকে আপনার সাথে নিয়ে যাইয়েন না এখানেই রেখে যান"। এভাবে তার পিতা বাধ্য হয়ে তার সন্তানের সামনে আত্মসমর্পণ করে।
- কিন্তু ঐ বাচ্চারা যখন এটা বলতে ছিল যে," আপাজান যে লোকেরা বড় ওস্তাদজির(মাওঃ আব্দুল আজিজ) মত মহান ব্যক্তিকে এত কষ্ট দিয়েছে এত লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করেছে ,যারা আমাদের ভাই-বোনদেরকে ধোকা দিয় বাইরে ডেকে নিয়ে জেল এবং রিমান্ড দিয়েছে। তাদের পরিধানের জামা খুলে তাদের হাতগুলো পিঠ মোরা করে বেঁধেছে। ঐসব ক্ষুধার্ত হিংস্র প্রাণীদের করুণার উপর আপনি কেন আমাদের বাহিরে যেতে বলেন? তখন আমি জবাবহীন নির্বাক হয়ে যাই।
ঐ সাত দিনে কোন একজন শিক্ষার্থীর কেউ বলেনি যে,"হায়, কেন আমরা ভিতরে রয়ে গেলাম" বরং তারা বলতো যে আমরা এখানে শহীদ হয়ে যাব কিন্তু বাহিরে যাব না।" আমরা সম্মান ও শহীদি মৃত্যুকে লাঞ্ছনার মৃত্যুর উপর প্রাধান্য দেব।"
- কিন্তু আশ্চর্য কথা এটাই যে,বাহিরে আমাদের ব্যাপারে প্রোপাগান্ডা হচ্ছিল যে, আমরা ভিতরে বাচ্চাদেরকে জোরপূর্বক এবং ঢাল বানিয়ে রেখেছি। পরিশেষে দুই ধরনের বাচ্চারা আমাদের সাথে ভিতরে রয়ে গেল।
- এক. ওই সকল বাচ্চারা যারা পিতা মাতাকে আল্লাহ তাআলা রাসুল এবং শহীদদের উসিলা দিয়ে দিয়ে ভেতরে অবস্থানে অনুমতির ক্ষেত্রে সফল হয়েছিল।
- ২.বড় সংখ্যক লা ওয়ারিশ বাচ্চারা ছিল যাদের কোন ওয়ারিশ ও অভিভাবক ছিল না।
(লা ওয়ারিশ অধিক সংখ্যক বাচ্চা থাকার কারণ বর্ননা করে বলেন:আবু বাসির)
- আসলে হয়েছিল এমন যে ভূমিকম্পর পর যখন মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেব আল কাসেম ফাউন্ডেশন এর কাজের ধারাবাহিকতায় যে টিম বালাকোট এবং কাশ্মীরে পাঠিয়েছিলেন সেখানে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে,যত লা ওয়ারিস ইয়াতিম এবং অসহায় বাচ্চা ছেলে মেয়েরা রয়েছে যদি তারা আমাদের এখানে আসতে চায় তাহলে তাদের সকলকে আমাদের এখানে নিয়ে আসবে। অতঃপর যখন ওই সকল বাচ্চা ছেলে-মেয়েদেরকে আমাদের মাদ্রাসায় নিয়ে আসা হলো। তখন মাওলানা সাহেব আমাকে রাসুল সাঃ এর ওই ঘটনা শোনালেন যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম ঈদের দিন একজন ইয়াতিম বাচ্চাকে নিজের ঘরে নিয়ে এসে বলেছিলেন: সামনে থেকে আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার পিতা এবং আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা তোমার মাতা।
- ওই বাচ্চাদের সামনে অসহায় হয়ে যাই।এইতো আমার শত শত বাচ্চারা আমার কোলের মধ্যে আখেরি হেঁচকি নিয়েছে এবং কালেমা পড়তে পড়তে নিজের জান আল্লাহ তালার কাছে সোপর্দ করেছেন।
কিন্তু এক বাঁচ্চার আখেরাতে রওয়ানা হবার অবস্থা আমি কখনো ভুলবো না।
- ঘটনা এই ছিল যে, কোন একজন শিক্ষিকার কোথাও থেকে কিছু আলু মিলেছিল। সে লাকড়ি একত্রিত করে উহাকে সিদ্ধ করার চেষ্টা করেন। ওই আলু যখন কোন এক পর্যায়ে খাওয়ার উপযুক্ত হয়ে যায় তখন আমাকে ছোট্ট এক বাচ্চা বলল: "আপাজান এই আলু বাহিরের কোন তালিবে ইলম ভাইকে দিয়ে আসি।" আমি বললাম: বেটা কালিমা পড়তে পড়তে যাও। যদি বাহিরের মাদ্রাসার কোন দরজার কাছে কোন ভাই থাকে তাহলে এই আলু তাকে দিয়ে আসো"। ওই বাচ্চা বাহিরে বের হওয়ার 15-20 মিনিট পর বাহিরের কোন তালিবে ইলমের আওয়াজ শোনা গেল।
সে সুউচ্চ কন্ঠে বলতেছিলাম উম্মে হাসান কোথায়? আপাজান কোথায়? আমরা সকলে তো বোরকা পরিধান করেই ছিলাম আমি সামনে আসলাম। তখন এক আশ্চর্য দৃশ্য সামনে উপস্থিত হলো রক্তের মধ্যে লুটোপুটি খেয়ে আমার ওই বাচ্চা যাকে আলু দিয়ে কোন ক্ষুধার্ত ভাইকে দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছিলাম ,তাকে একছাত্র এভাবে উঠিয়ে রেখেছিল যে, রক্তে রঞ্জিত ছিল। সে ওই বাচ্চা মেয়েকে আমার কাছে সোপর্দ করে। আমি তাকে আমার কোলে রাখি এবং ঐ বাচ্চা কালেমা পড়তে পড়তে সর্বদার জন্য ঘুমিয়ে গেলেন।
- ওই বাচ্চাকে নিয়ে আসা তালিবে ইলম বললো যে, আমার সামনে ওই বাচ্চার একটা গোলা এসে লাগল, সে মারাত্মক জখমি হয়ে নিচে পড়ল, তখন আমি তাকে সোজা করে শোয়ালাম এবং বললাম কালেমা পড়ো, সে উত্তরে বলল: কালিমাতো আমি পূর্ব থেকে পড়ছি, কেননা আমাকে আপাজান বলেছিলেন যে, কালেমা পড়তে পড়তে যাও। কিন্তু ভাইয়া আপনি এটা বলেন যে, আমি এত বেশি যখমি আমার এত রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, কিন্তু আমার সামান্যতম কষ্টও হচ্ছে না এর কারণ কি? অতঃপর যখন আমি ওই বাচ্চাকে ভিতরে নিয়ে আসার জন্য উঠলাম তখন সে বলতে লাগলো: "ভাইয়া আমাকে দ্রুত আপাজানের কাছে নিয়ে চলো" এরপর আমরা দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে তাকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি
চলবে ইনশাআল্লাহ........