("প্রত্যক্ষদর্শীর যবানে অপারেশনের ইতিবৃত্ত" এর অবশিষ্ট অংশ)
- সানিয়া নামের এক বাচ্চার ঘটনা এর চেয়ে আরও বেশি ইমান জাগানিয়া। আমি যখন বাচ্চাদের উৎসাহ দিতে গিয়ে এটা বলেছিলাম যে,"আমরা এই মুহূর্তে পরীক্ষার সময় অতি পার করছি,এবং আল্লাহ রব্বুল ইজ্জত যাকে ভালোবাসেন তাকে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন।"
- ঘটনা এই ঘটল যে, মাগরিবের নামাজের সময় জামিয়া হাফসার বারান্দায় রাখা বৃষ্টির পানিতে ভরা বালতিগুলো থেকে পানি নিতে গেল। আমি তাকে বললাম:"সানিয়া আমার মা,তায়াম্মুম করে নামাজ পড়ে নাও।" পানি পূর্ব থেকে কম, কিন্তু সে আশ্চর্য ধরনের পাগলামির সাথে সামনে অগ্রসর হল। বালতি থেকে পানি নিলো অজু করলো এবং অজু থেকে ফারেগ হয়ে যখনি দাঁড়ালো তখন নিজের ছোট ছোট আঙ্গুল উঠিয়ে কালেমা শাহাদাত পড়তে শুরু করে তখনই একটি গোলা এসে তার শাহরগ পার হয়ে যায়। তখন ওই ছোট্ট বাচ্চা রক্ত রঞ্জিত হয়ে যায় এবং পড়ে যায়। আমি দৌড়িয়ে তাকে উঠানোর জন্য যাই। তখন সে আমার দিকে তাকিয়ে জোরে হাসে এবং বলতে থাকে: "আপাজান আপনি ঠিক বলেছিলেন বাস্তবেই আল্লাহতালা আমাদের অনেক ভালবাসেন" । এরপর সে সবসময়ের জন্য চুপ হয়ে যায়।
- এক ছেলে ওই চাউল গুলো মসজিদে অবস্থানরত জখমিদের দেওয়ার জন্য চলে গেল। সে যখনই বাইরে বের হলো তখনই একটা গোলা এসে লাগলো সে কালেমা পড়তে লাগলো।আমি তার দিকে যাইতে লাগলাম তখন হাসসান আমাকে নিষেধ করল এবং সে নিজে তাকে কালেমা পড়িয়ে আখেরাতের সফরে বিদায় জানালো।
- অপারেশনের সময় আমার মামুল এই ছিল যে, আমি আমার জানের পরোয়া না করে বিভিন্ন কামরায় যেতাম, দরসগাহ সমূহে যেতাম, বাচ্চাদেরকে সান্তনা দিতাম। তারা সকলে জিকির এবং মোনাজাতে লিপ্ত হয়ে যেত। তাদের মধ্যে অধিকাংশ নিজ প্রভুর দরবারে প্রচুর কান্না করত। কেউ কেউ নিজের যখমি সাথীদের সেবায় নিয়োজিত থাকতো। যখন জালেমেরা অগ্নিগোলা নিক্ষেপ করতে লাগলো এবং তাখাসসুসের দরসগাহে ও লাইব্রেরীতে আগুন লেগে গেলো এবং হিফজ বিভাগের দরসগাহে রাখা কুরআনে কারীমের নুসখাগুলো জ্বলতে লাগলো। তখন আমার কিছু দুঃসাহসী এবং মহান বাচ্চারা ডর ভয়হীন ঐ অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং আল্লাহর পবিত্র কিতাব রক্ষণাবেক্ষণের চেষ্টা করতে লাগলো। অতঃপর ওই পবিত্র কিতাবের সাথে সাথে তারা নিজেরাও আগুনে চলে শহীদ হয়ে গেল।
- সম্ভবত সেটা জুমার রাত ছিল,যেদিন মাওলানা এনামুল্লাহ সাহেবের নামে সংবাদ পাঠিয়েছিলাম যে, আল্লাহ পাক আপনার দোয়া সমূহ কবুল করেন। আপনি আসমান থেকে মান্না সালওয়া প্রেরণকারী রবের কাছে দোয়া করুন যে, এই বাচ্চাদের জন্য খানা ও পানির কোন বন্দোবস্ত করেন এবং বিষাক্ত গ্যাস থেকে মুক্তির কোন রাস্তা মেলে। ওই রাতে জানিনা মাওলানা এনামুল্লাহ সাহেব শহীদ রাহমাতুল্লাহ আলাইহি কিভাবে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা বৃষ্টি বর্ষণ করেন যার দ্বারা আমরা সমস্ত বর্তন গুলো পানির দ্বারা ভরেনেই। তুফান এমনভাবে আসল যে, বিষাক্ত গ্যাসের সমস্ত প্রতিক্রিয়া শেষ হয়ে গেল।
ওই রাতেই মসজিদের মেহরাবে মধুর দুটি বড় গেলন পাওয়া গেল। আমি মধুর এমন স্বাদ জীবনভর কখনো অনুভব করিনি। এদিকে তো শুহাদাদের দেহগুলো থেকে খুঁশবো আসতেছিল কিন্তু মধুর সুঘ্রাণ ইহার থেকেও ভিন্নতর ছিল। ওই মধুর সুঘ্রাণ এমন বিস্ময়কর ছিল যে, আমরা যে পাত্রে মধুর শরবত বানাচ্ছিলাম সেটা থেকেও খুশবো আসতেছিল। ওই ধাঁধা আজ পর্যন্ত আমার জন্য অমীমাংসিত যে,ওই মধু কোথা থেকে এসেছিল। হয়তো এমন রিজিকের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন যে
ويرزقه من حيث لايحتسب
- আল্লাহ তায়ালা নিজের পরহেজগার বান্দাদেরকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দান করেন যেখান থেকে তাদের চিন্তার ধারণাও হয় না
আমার বারবার খেয়াল আসতে ছিল যে, যেই আল্লাহ তাআলা মারিয়াম আলাইহিস সালামকে বেমৌসুমে ফল দিতে পারেন তিনি জামিয়া হাফসার মাসুম এবং মাজলুম মারইয়ামদেযকে নিজের ভান্ডার থেকে কেন দিতে পারবেন না?
- মধু ছাড়াও আমরা আল্লাহ তাআলার নুসরাতের আশ্চর্য ও দুর্লভ বিষয়ে প্রত্যক্ষ করি। শহীদ বাচ্চা ছেলে মেয়েদের সুগন্ধময় সুঘ্রাণ আমাদের সাহসিকতা/ উদ্যমতা বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। আল্লাহর বড়ত্ব এবং শাহাদাতের সত্যতা প্রকাশিত হচ্ছিলো। গুলি থেকেও বেশি কষ্ট বিষাক্ত গ্যাসের কারণে হচ্ছিল।এই গ্যাসের কারণে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। এমন মনে হচ্ছিল যে কোন মানুষের গলা চেপে ধরা হচ্ছে। বাচ্চারা বলতেছিল আপাজান দোয়া করুন আমরা গুলিতে শহীদ হয়ে যাই, কিন্তু এই গ্যাসের কষ্ট আমরা সহ্য করতে পারছি না।
- আমাদের কাছে তো মাত্র ১৪ টি ক্লাশনিকোভ ছিল আর গুলিও না হওয়ার মতই ছিল। গাজী সাহেবের পক্ষ থেকে কঠোরভাবে এই নির্দেশনা ছিল যে, কোন অনর্থক ফায়ার করবে না। বরং শুধু এক দুইটি গুলি কিছু সময় পরপর এজন্য ফয়ারিং করবে যাতে তাদের এই খোঁজ না মিলে যে, আমরা নিরস্ত্র অথবা আমাদের কাছে অস্ত্র কম। কিন্তু আল্লাহ তাআলার আশ্চর্যজনক শান ছিল যে, যখন চারদিক থেকে মাদ্রাসায় এবং মসজিদের উপর ভাড়ি হাতিয়ার সমূহ থেকে ফায়ারিং করা হতো তখন সৈন্যদের নিজেদের গুলি ক্রস হয়ে অন্যদিকে সৈন্যদের লাগতো। আর তারা এটাকে মনে করত যে, সম্ভবত ভেতর থেকে ফায়ারিং এবং লড়াই হচ্ছে।
এই ঘটনার সময় আমার অন্তরে কত গভীর ক্ষত হয়েছে উহার অনুমান কে করতে পারে? আপনারা বাচ্চা ছেলে মেয়েদের বিষয় বাদ দিন আমি আপনাদের কোন ভাষায় বলবো যে,যখন মসজিদের পবিত্র দেওয়াল সমূহ এবং আলমারি সমূহের মধ্যে রাখা কুরআন মাজীদ গুলির দ্বারা ঝাঁঝরা হচ্ছিল ওই সময় আমাদের কলিজা কিভাবে টুকরো টুকরো হচ্ছিল এবং যখন আমাদের সামনে জামিয়া সাইয়্যেদা হাফসার পবিত্র কিতাবগুলো ও কোরআনের কারীমের পাতাগুলো জ্বলছিল তখন আমরা আমাদের চাদর ও বোরকা সমূহের দ্বারা নিজেদের জানের পরোয়া না করে ওই আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছি।
ওখানে প্রত্যেক কামরা এবং দরসগাহে কুরআনে কারীমের নুসখা ছিল। পবিত্র কিতাবাদি ছিল, হাদিস মোবারকের পৃষ্ঠা সমূহ ছিল এবং পূন্যময় স্বভাবের মেয়েরা ছিল।
- আমরা কি কি করতাম? বাচ্চা ছেলে মেয়েদেরকে সান্ত্বনা দিতাম, আয়াত পড়ে পড়ে ফাযায়েল শোনাতাম, উৎসাহ দিতাম, তাদের প্রবাহিত রক্ত বন্ধ করতাম,তাদের প্রবাহিত অশ্রু মুছে দিতাম অথবা জলন্ত কুরআনে কারিমে লাগা আগুন নিভাতাম।আমরা আমাদের বাচ্চা ছেলে মেয়েদের চেয়ে কোরআনুল কারীমের বেশি ফিকির করতাম। কিন্তু আমরা আমাদের পূর্ণ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কুরআনুল কারীমের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারিনি।
- আমাকে গাজী সাহেব শহীদ রহমাতুল্লাহ আলাইহির ওই অবস্থা কখনো ভোলানো যাবে না যখন তিনি ওলামায়ে কেরামের ফোন নাম্বার মিলানোর চেষ্টা করতেছিলেন এবং সকলের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল অথবা আমরা অপারগ ও মাজলুমগনের কথা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। বেচারা গাজী সাহেব প্রায় আধা ঘন্টা নাম্বার মিলানোর চেষ্টা করেছেন। যখন কোন নাম্বার বন্ধ পেতেন বা গাজী সাহেবের নাম শুনে ফোন বন্ধ করে দিত তখন গাজী সাহেব ওই হযরতের ঐ ভালোবাসাহীনতা এবং উদাসীনতার প্রতি খুব ব্যথিত হন।
- তখন সে জবাবে আশ্চর্যজনক দূঢ়তার সাথে বলতো:"আমি আমার যেই রবের জন্য জান দিচ্ছি তিনি আমার আহলিয়া ও বাচ্চাদেরকে হেফাজত করবেন,পারবেনও"।
- আম্মাজানের (মাওঃ আব্দুল আজিজ ও গাজী আঃ রশিদ রহঃ এর মা) ঈমানী জজবাও অন্যরকম ছিল। তিনি(হামলার সময়) বলতেন:"দেখো আমি তোমাদের বলেছিলাম আল্লাহ তায়ালা আমাকে শাহাদাতের সৌভাগ্য দান করবেন। এখন আমার এই বিছানার উপর শাহাদাত মিলবে।"
- আর আমার হাসসান (মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেব এবং ঘটনার বর্ণনাকারি উম্মে হাসান আসমা এর ছেলে) তো আশ্চর্য ধরনের কথা বলতেছিল যে:"আমার এই صوم وصال(ধারাবাহিক রোজা রাখা) দাদা আব্বু(অর্থাৎ:দাদাজানের, উনার দাদা তথা মাওলানা আব্দুল আজিজ ও গাজী সাহেব শহীদ রহঃ এর বাবা মাওলানা আবদুল্লাহ শহীদ রহঃ)এর) সাথে ইফতার করব।" পরিশেষে আল্লাহ তা'আলা তাঁর ভাগ্যে এই সৌভাগ্য দান করেছেন। সে এত ছোট বয়সেই নিজের শহীদ দাদা আব্বুর ( দাদার)কাছে চলে গেছে।(শহীদ হয়ে গেছে)
মাওলানা সাহেবের গ্রেফতারের পর গাজী সাহেব তো এরকম প্রতিদিন আমাকে বলতেন যে ,"ভাবি আপনি বাইরে চলে যান" কিন্তু ৮ জুলাই গাজী শহীদ পীড়াপীড়ি, বারবার বলা এবং মিনতি করে বাহিরে যাওয়ার জন্য আমাকে অপারপ করে দেয়। হাসসান এবং গাজী সাহেব আমাকে বারবার বলে যে," আমরা আপনাকে আমির হিসেবে হুকুম দিচ্ছি যে, আপনি বাহিরে চলে যান। কেননা আপনি যদি জীবিত অবস্থায় ওই জালেমদের হস্তগত হন, তাহলে এরা আপনাকে সর্বদার জন্য গুম করে দিবে।"
পরবর্তীকালের ঘটনাগুলো তাদের কথার সত্যতা প্রমাণ করে দেখিয়েছে। কেননা যে লোকেরা আম্মাজানের লাশ গায়েব করে দেয়,তাদের ব্যাপারে আপনি অনুমান করুন যে,তারা কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে।
- যখন আমি (উম্মে হাসান আসমা)অন্যান্য জখমি বাচ্চাদের নিয়ে ওখান থেকে বের হতে লাগলাম। তখন নিজের মন,অন্তর,কলিজা এবং নিজের বাচ্চাদের লাশগুলো, কিতাবসমূহ সহ নিজের সবকিছু সেখানে ছেড়ে এসেছি। কোন মা'ই আমার এই অবস্থার অনুমান করতে পারবে। যখন আমি আমার আদরের একমাত্র যুবক ছেলে হাসান শহীদের কপালে নিজের জীবনের শেষ চুমু দিচ্ছিলাম ওই সময় আমার দিলের উপর দিয়ে কি অতিক্রম হচ্ছিল?
- কিন্তু আমি হাসানকে বললাম: "বেটা আমি তোমাকে আজকের দিনের জন্যই লালন পালন করেছি সাহস হারিওনা দৃঢ়তার প্রকাশ ঘটাও। মসজিদের পবিত্রতা, কোরআনে কারীমের মর্যাদা এবং নিজের মজলুম ভাইবোনদের হেফাজতের জন্য যদি আমার আল্লাহ তোমার কোরবানি কবুল করে নেয় তাহলে এটা আমার জন্য সৌভাগ্য ও উঁচু মর্যাদার মাধ্যমে হবে। আমি হাসসানকে বলেছি: "বেটা গুলি যেন সিনায় লাগে। দেখো আমাদেরকে আমাদের আল্লাহ তাআলার সামনে লজ্জিত করিও না।এই কথা স্মরণ রাখিও যে, আমাদেরকে আমাদের সর্দার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে যেন লজ্জিত অবস্থায় উঠা না লাগে।
- আমার খাতুনে জান্নাত হযরত সৈয়দাতুন নিসা হযরত ফাতেমাতুজজাহরা (রাঃ)এর দিকে সম্পৃক্ত একটি কবিতা খুবভাবে মনে পড়ছে
صبت على مصائب لو أنها
صبت على الأيام صرنا ليالى
আমার উপর যে বিপদ এসেছে সেটা যদি দিনের উপর আসতো তাহলে দিন হয়তো রাত্র পরিণত হয়ে যেত।।
(সানেহায়ে লাল মসজিদ হাম পর কিয়া গুজরে:১৯-৩১ পৃষ্ঠা)
চলবে ইনশাআল্লাহ.........