আফগানিস্তানে আরব মুজাহিদদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অবদান ছিল মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ প্রদান। যুদ্ধের পরও এর গুরুত্ব পূর্বের মতো বহাল ছিল। নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের ধ্বজাধারী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও তাদের দোসররা ট্রেইনিংয়ের এই ধারাকে বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। আফগানিস্তানে থাকা বেশ কিছু দক্ষ প্রশিক্ষককে তারা হত্যা করতে সক্ষমও হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে পানি অনেক দূর গড়িয়ে গিয়েছিল। চেচনিয়া, বসনিয়া, সোমালিয়া, তাজিকিস্তান-সহ ইসলামী বিশ্বের পরিবর্তনশীল ঘটনাপ্রবাহের দরুন খাঁটি আরব ও ইসলামী পরিচয় ধারণকারী একাধিক প্রশিক্ষিত বাহিনী ততদিনে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বব্যাপী জিহাদ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে আফগানিস্তানের জিহাদী ক্যাম্পগুলোতে প্রশিক্ষণ নেওয়া মুজাহিদদের অনেক বড় অবদান ছিল। তাই আফগানিস্তান থেকে মুসলিমরা যে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
মাকতাবুল খিদমাতের অধীনে পরিচালিত সদা (صدى) ক্যাম্পটি ছিল আরবদের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রথম প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। ১৯৮৪ সালের শেষদিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে জাজির কাছাকাছি একটি স্থানে এর সূচনা হয়। শুরুর দিকে প্রশিক্ষণের মান ছিল খুবই সাধারণ। সাধারণ কিছু অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। শায়খ আবু বুরহান সূরী রহ. [১] যখন ক্যাম্পের দায়িত্ব নেন, তখন থেকে এর মান উন্নত হতে শুরু করে। তিনি উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। জিহাদের ময়দানে আসার আগে তিনি সিরিয়ান সেনাবাহিনীর অফিসার ছিলেন।
টেপ রেকর্ডে সংরক্ষিত শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ.-এর এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, ১৯৮৪ সালে সদা (صدى) ক্যাম্পে মুজাহিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১২ জন। এক বছরের মধ্যে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ২৫ জন হয়। ১৯৮৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই সংখ্যা ২০০-এর কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এখানে প্রশিক্ষণরত মুজাহিদগণ বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছিলেন। তবে বেশিরভাগই ছিলেন সৌদি, মিশর ও ফিলিস্তিনের নাগরিক।
মা’সাদার ইতিহাসে জাজির শাবান ও রমযান মাসের যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে এড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এই যুদ্ধ মুজাহিদদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল, তাদের সামরিক প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ একেবারেই দুর্বল। এটিই ছিল এ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। যা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন। এর কারণ ছিল, সে সময় পুরো আফগানিস্তানে কোনো উন্নত প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছিল না। তাই যুবকদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে ভাইয়েরা প্রশিক্ষকদের জন্য কোর্সের ব্যবস্থা করা শুরু করেন। অবশ্য প্রশিক্ষণের দুর্বলতার পেছনে যুবকদেরও কিছু দায় ছিল। অনেক যুবক জিহাদের প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে আফগানিস্তানে আসত। তারা অল্প সময়ে সামান্য কিছু প্রশিক্ষণ নিয়েই যুদ্ধের ময়দানে নেমে যেত। অথচ যুদ্ধের ব্যাপারে তাদের কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতাও ছিল না।
এ কারণে জাজির যুদ্ধের পর শায়খ উসামা বিন লাদেন রহ. ও শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. উভয়েরই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় যুবকদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং তাদের সামরিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এ উদ্দেশ্যে শায়খ আবু উসামা মিসরী (আব্দুল আযীয আলী) [২]-কে ডেকে আনা হয় এবং শায়খ উসামার সাথে যুদ্ধফ্রন্টে কাজ করতে ইচ্ছুক যুবকদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৮ সালের শুরুর দিকে পেশোয়ারে ওয়ারসাক (ورسك) ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণের পরপরই শায়খদ্বয় ক্যাম্পটি বন্ধ করে দেন।
মূলত শায়খ আবু উসামা মিসরী ছিলেন আফগান মুজাহিদ নেতৃবৃন্দের কড়া সমালোচক। তিনি মনে করতেন, আফগানের জিহাদী দলগুলোর নেতারা জিহাদের নামে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করেন, নেতৃত্ব নিয়ে টানাটানি করেন আর মুসলমানদের নামে মিথ্যা ছড়ান। তার এ ধরনের চিন্তা-ভাবনার কারণে ক্যাম্পের প্রশিক্ষণ শুরুর আগেই তাকে বলে দেওয়া হয়েছিল, তিনি যেন আফগান মুজাহিদদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কোনো কথা না বলেন। কিন্তু তিনি সে শর্ত রাখতে পারেননি। একে তো তিনি কঠিনভাবে কথাগুলো বলতেন, তার ওপর তার এমন চিন্তাভাবনা পুরোটাই ছিল শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম ও শায়খ উসামার কথার বিপরীত। রাখঢাক ছাড়াই এ ধরনের কথাবার্তা বলার কারণে প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে অসন্তোষ তৈরি হতে থাকে।
পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল, যদি কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হতো, তাহলে যুবকরা মুজাহিদদের প্রতি একরাশ ঘৃণা নিয়ে ময়দান ছেড়ে চলে যেত। তাই বাধ্য হয়ে শায়খ আবু উসামাকে অপসারণ করে ওয়ারসাক (ورسك) ক্যাম্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে শায়খ আবু উসামা পাঁচজন ভাইয়ের প্রশিক্ষণ শেষ করাতে পেরেছিলেন। এদের প্রত্যেকেই আবু উসামার সাথে ক্লান্তিকর কঠোর প্রশিক্ষণে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে তারাই আফগানিস্তানে আরব মুজাহিদদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হন। শায়খ আবু উসামা রহ.-এর এই অবদান যদিও খুবই সামান্য, কিন্তু এ কারণেই তাকে আফগানিস্তানে আরব মুজাহিদদের সামরিক প্রশিক্ষণের পুরোধা মনে করা হয়।
[১] একজন প্রবীণ মুজাহিদ শায়খ। ‘মাওসুআতুল জিহাদ’ নামে ৯/১০ খণ্ডের সুবিশাল গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। প্রথম জীবনে সিরিয়ান সেনাবাহিনীতে অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে আশির দশকে শামের মুজাহিদ নেতৃবৃন্দের ডাকে জিহাদে যোগ দেন। সেখানে মুজাহিদদের ওপর নিপীড়ন ও ধরপাকড় শুরু হলে তিনি আফগানিস্তান চলে আসেন এবং প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
স্বভাবগতভাবে তিনি কঠোর প্রকৃতির ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে হিজরত করে সুদান চলে যান। সেখানে শায়খ উসামা রহ.-এর কিছু প্রকল্প দেখাশোনার কাজ করতে থাকেন। শায়খের মজলিসে শূরার সদস্যও ছিলেন তিনি। সুদান থেকে শায়খ উসামা রহ. নির্বাসিত হওয়ার পর শায়খের ফেলে আসা কাজগুলো তিনিই দেখাশোনা করতে থাকেন। শায়খ আবু বুরহান রহ. ছিলেন একজন ইবাদতগুজার, অধিক সিয়াম পালনকারী ও তাহাজ্জুদগুজার ব্যক্তি। একাকিত্ব, নির্জনতা ও আল্লাহর সান্নিধ্যকে তিনি ভালোবাসতেন।
নাইবোরি ও দারুস সালাম হামলার পর যখন সুদান সরকার শায়খ উসামার সকল প্রকল্প বন্ধ করে দেয়, তখন তিনি খার্তুম থেকে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। রাজধানী থেকে দূরে এক নির্জন গ্রামে জমি কিনে সেখানে চলে যান। নিজের থাকার জন্য একটি মাটির ঘর আর ঘরের সাথেই এলাকাবাসীর জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। গ্রামের মানুষ ভ্রান্ত সুফিবাদে লিপ্ত ছিল। তিনি মসজিদে নামায পড়াতেন আর এলাকাবাসীর মাঝে সহীহ দীনের দাওয়াত দিতেন। এই বইয়ের কাজ শেষ করার আগেই সুদান থেকে খবর আসে, শায়খ করোনায় আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহ তাআলা শায়খকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সাথে তাঁকে জান্নাতে উঁচু মাকাম নসীব করুন, আমীন।
[২] শায়খ আবু উসামা আব্দুল আযীয আলী মিসরী রহ. ছিলেন হাসানুল বান্না রহ.-এর সময়ে ইখওয়ানুল মুসলিমীনের সামরিক শাখার একজন দায়িত্বশীল। ১৯৪৮ সালের প্রথম আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইখওয়ানুল মুসলিমীনের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। দৃঢ় মনোবল, অসামান্য গাম্ভীর্য আর যশ-খ্যাতিতে তিনি ছিলেন অনন্য। সিরিয়ার জিহাদ চলাকালেও তিনি মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেছিলেন।
পরে ইখওয়ানুল মুসলিমীনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া গোলযোগ ও নেতৃবৃন্দের বিচ্যুতির কারণে তিনি ইখওয়ান থেকে আলাদা হয়ে যান। আফগান যুদ্ধের সময়ও তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত আফগান নেতৃবৃন্দের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, আফগানের এই নেতারা প্রতারক, তারা জিহাদ করতে চায় না, তারা শুধু নিজেদের পকেট ভারী করতে চায়, নেতৃত্ব আর ক্ষমতার জন্যই তারা লড়াই করে আর মুসলিমদের নামে মিথ্যা বলে বেড়ায় ইত্যাদি।
Comment