গাজী সাহেবের অসিয়তনামা
শায়েখ গাজী আব্দুর রশিদ শহীদ রহমাতুল্লাহ আলাইহি তার শাহাদাতের মাত্র কয়েকদিন পূর্বে একটি অসিয়তনামা লিখে রেখে দিয়েছিলেন। যাতে তিনি তাগুতের মিডিয়ায় প্রচারিত প্রোপাগান্ডার খন্ডন করেছেন। মুরতাদ পারভেজ বাহিনীর জঘন্য কর্মকান্ডের কথা উল্লেখ করেছেন। নিঃসন্দেহে শায়েখ রহমাতুল্লাহ আলাইহি এর এই সর্বশেষ বার্তায় মুমিনদের জন্য উত্তম নির্দেশনা রয়েছে। আরো রয়েছে সাহস ও সাহসিকতার পর্যাপ্ত উপকরণ তিনি তার সেই অসিয়তনামায় লেখেন:
- "সম্ভাবনা আছে এই ছত্রগুলো প্রকাশিত হওয়ার আগেই আমরা যারা লাল মসজিদে অবরুদ্ধ আছি তারা শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করব। প্রায় ৩০ হাজার সদস্যের সিকিউরিটি ফোর্স এবং দেশীয় সেনা বাহিনী ও সাজোয়াযানের এবং গোলায় ক্ষতবিক্ষত এবং নিরপরাধ ছাত্র-ছাত্রীদের অস্রু সিক্ত লাল মসজিদ ও জামিয়া হাফসা বিজয় করে নিয়েছে। লাল মসজিদে এখন কারবালার দৃশ্য পরিদৃষ্ট হচ্ছে শহীদদের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন লাশ আহতদের গগন বিদারী আর্তচিৎকার মসজিদ মিনার এবং চতুর্দিকের দেয়াল গুলো যেন নিজেদের ভাষায় বলছে, ৬ লাখ মুসলমান যে উদ্দেশ্যে আত্মোৎসর্গ করেছিল এসব কিছু সেই আওয়াজ পুনরাবৃত্তি করার ফল। এ পরিস্থিতিতে লাল মসজিদের খতিব এবং ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহেবের অপ্রত্যাশিত গ্রেফতারি এবং এরপর টেলিভিশনে প্রকাশিত তার একটি ইন্টারভিউ নিঃসন্দেহে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা লালনকারী জনসাধারণের নৈরাশ্যের কারণ হয়েছে।
- এই পরিস্থিতি সম্বন্ধে যারা অভিজ্ঞ নয় তারা এটা ভাবেনা যে বাস্তবেই যদি মাওলানা আব্দুল আজিজ মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে জীবনের দিকে পলায়ন করে থাকে তাহলে নিজের ছেলে মেয়ে মা ও স্ত্রীকে কেন রেখে গেল। তাছাড়া বিষয়টি তেমনই হয়ে থাকলে আমি তার ছোট ভাই তার অন্যান্য সাথী বর্গ এবং অবশিষ্ট থাকা অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরাই বা আত্মসমর্পণের পথ কেন বেছে নিচ্ছে না? আমি অনুধাবন করছি এই সময়ে বিরুদ্ধবাদী লোকদের বোঝানোর চেষ্টা না করে নিজেদের ভগ্ন হৃদয়ের উদ্দেশ্যে এ বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া জরুরী যে, মাওলানা আব্দুল আজিজ গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার। যদিও এখন তার গ্রেফতারের উপর গোপনীয়তার পুরো পর্দা পড়ে রয়েছে কিন্তু সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে এই পর্দা উঠে যাবে এবং বাস্তবতা সকলের সামনে প্রতিভাত হবে।
আমরা এ কথা খুব ভালো করেই জানি যে, মাওলানা আব্দুল আজিজ জিহাদের পথের একজন মুসাফির এবং শাহাদাতের তামান্নায় পরিপুষ্ট এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর বিরুদ্ধে শুধু একটা কথাই বলা যেতে পারে যে, তিনি কঠিন সময় কিছু ভুল ব্যক্তির উপর আস্থা রেখেছিলেন যা তার ভুল ছিল। সর্বোপরি যার শাস্তি ভোগ করতেই হবে। সত্য এবং বাস্তব কথা হলো- মাওলানা আব্দুল আজিজ না মৃত্যু দেখে ঘাবড়ে গেছে আর না পলায়নের পথ বেছে নিয়েছে। বরং তিনি ওসিয়ত লিখে এবং গোসল করে শাহাদাতের জন্য প্রতীক্ষারত ছিলেন। এমতাবস্থায় অন্যান্য মানুষদের জীবন বাঁচানোর প্রত্যাশাই সব অনিষ্টের মূল হয়ে দেখা দিল। তবে যা হোক বাস্তবতা প্রমাণিত ও সুস্পষ্ট কথা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি এবং তিনি তা-ই করলেন।
- আমি শুধু এতটুকু বলব যে মাওলানা আব্দুল আজিজ এবং তাঁর জীবন বাজি রাখা সঙ্গীরা এই আন্দোলন কেবলই আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন ও শরিয়া প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে শুরু করেছিলে আল্লাহর দন্ডবিধির মধ্যে পরিমার্জন , একের পর এক মসজিদের শাহাদাত, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার অবাধ প্রসার, ইসলামী আকিদা বিশ্বাসের মনগড়া ব্যাখ্যা , জিহাদের নাম উচ্চারণকারীদের উপর আর্মি এ্যাটাক, মুসলিম মুজাহিদদের ধরে ধরে ভেড়া বকরীর মতো কুফফারদের হাতে তুলে দেওয়া এবং সেকুলারিজমের বাঁধভাঙ্গা প্রবাহ কখনো সহনীয় নয়। এ কারণে শরীয়াহ প্রতিষ্ঠার জন্য এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের গোড়াপত্তন করা হয়েছি।
- আমি এই বিষয়টিও সুস্পষ্ট করতে চাই যে, আমরা এই দেশে শরিয়ার ন্যায় শাসন কামনা করি আমরা আদালতে শরিয়া আইন কানুন বাস্তবায়িত হওয়ার প্রত্যাশী। আমরা চাই যে মজলুম জনসাধারণ ইনসাফ পাবে রুটি পাবে সকল প্রকার ষড়যন্ত্র ঘুষ অত্যাচার অশ্লীলতা এবং স্বজন প্রীতির অন্যায় ব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটবে শরিয়াহর প্রায়োগিক বাস্তবায়নই এসব সমস্যা একমাত্র কার্যকর সমাধান। এটা একে তো আল্লাহ তাআলার নির্দেশ উপরন্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান লক্ষ্যও এটাই। আমরা দুনিয়ার সকল স্বার্থকে পিছনে ফেলে কণ্টকাকীর্ণ পথের কাঠিন্য জেনে সম্পূর্ণ চেতন মনে আখিরাতের জীবনকে দুনিয়ার জীবনের উপর প্রাধান্য দিয়েছি।
আমার সঙ্গে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের অপরাধ কি? কিছু অপরাধীকে সংশোধনের নিয়তে উঠিয়ে আনার শাস্তি কি এই যে এই অগণিত নিরপরাধ প্রাণকে বুলেটের লক্ষ্য বস্তু বানানো হবে! দেশের মান ক্ষুন্ন হওয়ার প্রবক্তারা আল্লাহ তায়ালার বিধি-বিধান ও তার মান কেন পদে পদে ক্ষুন্ন করে আসছে?
যেসব লোক বিগত পাঁচ দিন যাবত কুরআনের হাফেজ এবং হাদিসের বর্ণনাকারি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে গুলি করে ঝাঝরা করেছে নিঃসন্দেহে তারা জালিম। এক্ষেত্রে মিডিয়া চ্যানেলগুলোও অন্যায় পক্ষপাতিত্ব মূলক আচরণ করেছে আমরা এ অভিযোগও আল্লাহ তাআলার নিকট করছি, নিশ্চয়ই তিনি সর্বোত্তম বদলাদাতা।
- সর্বশেষ আমি ওসিয়ত হিসেবে দ্বীন দরদী জনতা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্র-ছাত্রী তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিবর্গ এবং মিডিয়ার সামনে আমার কথা পুনরাবৃত্তি করব যে, আমাদের আন্দোলন উত্তম ও কল্যাণমূলক কিছু লক্ষ্যকে সামনে রেখে শুরু করা হয়েছিল। আমরা শরিয়া প্রতিষ্ঠায় দাবির উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছি আমরা এ ব্যাপারে আত্মপ্রশান্ত যে আমরা দ্বীনকে অগ্রাধিকার প্রদান, বিশ্বস্ততা রক্ষা এবং ত্যাগের পথ বেছে নিয়েছি। আমরা শরিয়া প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়াকে সৌভাগ্য মনে করি। আমাদের আল্লাহর রহমতের উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে যে, আমাদের রক্ত বিপ্লবের সুসংবাদ হবে। দুনিয়াবাসী কখনো আমাদেরকে দালাল বলেছে আবার কখনো বলেছে পাগল। আজ বারুদের বর্ষণ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে আমরা আল্লাহর পথে লড়াইরত রয়েছি । নিঃসন্দেহে হকপন্থীদের উপর বিপদ-আপদ আসা এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা। যদি আমাদের আমি হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু অপারগতার অবস্থায় শহীদ হয়ে থাকেন তাহলে আমরাও সেই কাফেলারেই যাত্রী। ইনশাআল্লাহ ইসলামী বিপ্লব এই দেশের চূড়ান্ত নিয়তি হবে। ‘চম্বল মে আয়েগি ফসলে বাহারা হাম নেহি হোগ ‘ বাগানে বসন্ত আসবে তবে আমরা তখন থাকবো না
- আমার এই আহ্বান বিশেষ করে পাকিস্তানের আলেমদের প্রতি। আমি তাদেরকে সেই ফরজ বিধানের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যা আল্লাহ তাদের উপর অবধারিত করেছেন। সত্য প্রচার, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধের ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
- স্মরণ করুন ওই সময়ের কথা, যখন আল্লাহতায়ালা তাদের থেকে অঙ্গীকার নিলেন যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল আপনারা মানুষের উদ্দেশ্যে কিতাব সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করবেন এবং তা মোটেও গোপন করবেন না।
- একইভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে সত্যের বাণী বর্ণনা করা
- (মুসনাদু ইবনিল জাদ, ৩২২৬, সুননানু ইবনে মাজাহ:৪০১২,মুসনাদু আহমাদ:11143, 18828,18830)
(রক্তাক্ত লাল মসজিদ,২৫-২৯ পৃষ্ঠা)
চলবে ইনশাআল্লাহ......