১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসে আল-কায়েদার সূচনা হয়। এর আগ পর্যন্ত আফগানিস্তানের আরব মুজাহিদগণ শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম ও শায়খ উসামা রহ.-এর নেতৃত্বে কাজ করতেন। উভয় শায়খের মাঝে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। যত দিন যাচ্ছিল, কাজের অগ্রগতি হচ্ছিল, যুবকরাও দলে দলে ছুটে আসছিল জিহাদের ময়দানে। ফলে বিশৃঙ্খলা দূর করতে নতুন নতুন অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছিল। আরব মুজাহিদদের কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করতে গিয়ে কৌশলগত কিছু বিষয়ে উভয়ের মাঝে কিছু মতভিন্নতাও দেখা দিচ্ছিল। আরবরা কি আফগানদের সাথে মিলে যাবে, না-কি স্বতন্ত্রভাবে কাজ করবে—এ বিষয়েও শায়খদের ভিন্ন ভিন্ন মত ছিল।
১৯৮৭ সালের আগ পর্যন্ত আরব মুজাহিদদের সংখ্যা ছিল একেবারেই কম। তাই শায়খ আব্দুল্লাহ আযযাম রহ. আরবদের জন্য স্বতন্ত্র কোনো দল গঠনের পক্ষে ছিলেন না। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল—আরব মুজাহিদগণ আফগান মুজাহিদদের সাথে মিলে যাবেন এবং তাদেরকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেবেন, তাঁদের মাঝে ইসলামী আদর্শ ছড়িয়ে দেবেন। কখনো মুজাহিদদের মাঝে মতবিরোধ হলে তাদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করবেন। সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হয়ে আফগান মুজাহিদদের মনোবল বৃদ্ধি করবেন। এর পাশাপাশি যতটুকু সম্ভব নিজেরাও কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন। [যেহেতু শায়খের দৃষ্টিতে যুদ্ধ করা প্রধান লক্ষ্য ছিল না,] এ জন্য তিনি আরবদের আলাদা দল গঠন করার বিরোধিতা করতেন।
অন্যদিকে শায়খ উসামা রহ. মনে করতেন, পেশোয়ারে আরব মুজাহিদদের জন্য ব্যয়ের পরিমাণ কমিয়ে বেঁচে যাওয়া অর্থ আফগানিস্তানের ভেতরে মুজাহিদদের জন্য ব্যয় করা উচিত। কারণ কমিউনিস্ট শাসন ধ্বংস হয়ে যখন ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তাৎক্ষণিকভাবে মুজাহিদদের ওপর অনেক দায়দায়িত্ব এসে পড়বে, ফলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। [কমিউনিস্ট শাসন ধ্বংস করে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা যেহেতু শায়খের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল,] এ জন্য শায়খ উসামা রহ. আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং সরাসরি যুদ্ধে আরবদের কার্যকারী ভূমিকা রাখার প্রতি জোর দিতেন।
কিন্তু আরবরা যদি আফগানদের বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, তাহলে এ ধরনের জোরালো ভূমিকা পালন করা সম্ভব ছিল না। বিশেষত যখন কি-না সব আফগান নেতাই আরবদেরকে নিজের দলে শামিল করার চেষ্টায় লিপ্ত। তাই শায়খ উসামা রহ. আরবদের জন্য স্বতন্ত্র দল গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেন। পাশাপাশি আফগানদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার নীতি গ্রহণ করলেন।
এর ভিত্তিতেই শায়খ আবু উবায়দা পানশীরী, শায়খ আবু হাফস কমান্ডার, শফীক মাদানী রহ. এবং অন্যান্যদের নিয়ে শায়খ উসামা রহ. জাজির পাহাড়ে মা’সাদাতুল আনসারের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আফগান জিহাদের উদ্দেশ্যে আগত আরব যুবকদের এই ঘাঁটিতে সংঘবদ্ধ করা এবং রুশ ভল্লুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্য করে গড়ে তোলা।
এ ব্যাপারে শায়খ সাইফ আল-আদল শায়খ উসামা রহ. থেকে বর্ণনা করেন—
‘যখন দেখলাম আফগানদের সহযোগিতার জন্য বহু মানুষ তৈরি হয়ে আছে, তখন চিন্তা করলাম আফগানদের সামরিক সহযোগিতার জন্য আমরা কোনো সংগঠন তৈরি করছি না কেন। এমন একটি সংগঠন, যার লক্ষ্যই হবে প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের মাধ্যমে আফগানদের সামরিক সহযোগিতা দেওয়া।’ এই চিন্তা থেকে শায়খ উসামা রহ. ময়দানের প্রবীণ ভাইদের সাথে পরামর্শ করেন। তাদের কেউ কেউ তাঁর এই চিন্তাকে নাকচ করেন, কারণ তাদের কাছে এটি ছিল নতুন আরেকটি দলের সূচনামাত্র। [অথচ ময়দানে তখন অনেক দল ছিল।] আর কেউ কেউ এই চিন্তাকে স্বাগত জানান। তাঁদের হাত ধরেই পরে আল-কায়েদা প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে একটি “সামরিক সেবাদানকারী সংস্থা” হিসেবে আল-কায়েদার সূচনা হয়।’
আল-জাযীরার সাংবাদিক তাইসীর আল্লুনীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শায়খ উসামাকে আল-কায়েদার নাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন—
‘নামটি অনেক পুরোনো। কোনো ধরনের পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই নামটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। মূলত সন্ত্রাসী সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে আবু উবায়দা পানশীরী রহ. একটি ট্রেইনিং ক্যাম্প শুরু করেছিলেন। সেই জায়গাটিকে আমরা অন্যান্য সামরিক ট্রেইনিং ক্যাম্পের মতোই ‘আল-কায়েদা’ (ঘাঁটি) বলতাম। পরে ধীরে ধীরে এই নামটিই সংগঠনের নাম হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়ে যায়। তবে আমরা কখনোই উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম না, আমরা এই উম্মতেরই সন্তান, এই উম্মতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
Comment