শায়খ ফারিস যাহরানী তার ‘উসামা বিন লাদেন: মুজাদ্দিদুয যমান ওয়া কাহিরুল আমরিকান’ বইয়ে লিখেছেন—
‘নির্দিষ্ট করে বললে আল-কায়েদার কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। ততদিনে জিহাদী চেতনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, যুদ্ধের ময়দানগুলোও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এবং দায়িত্বও বেড়ে গেছে। শায়খ উসামা রহ. খেয়াল করে দেখলেন, আরব মুজাহিদরা ব্যাপকভাবে আসা-যাওয়া করছেন এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে সরাসরি যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করছেন। এমনকি হতাহতের সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। অথচ এই পুরো কার্যক্রমের কোনো রেকর্ড তাঁর কাছে নেই। সৌদি ও ইয়েমেন থেকে আগত মুজাহিদদের পরিবারের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যেই তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হয়, কখনোবা তারা লোক পাঠিয়ে পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে খোঁজ নেয়। তাদের সন্তোষজনক কোনো উত্তর না দিতে পারায় শায়খ রহ.-কে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য শায়খ উসামা রহ. আরব মুজাহিদদের তথ্যসম্বলিত একটি রেকর্ড তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। যাতে মুজাহিদদের আগমন এবং আহত-নিহত ভাইদের যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। পরবর্তীতে এই চিন্তাকে আরও সম্প্রসারণ করে আফগানিস্তানে আগত প্রত্যেক আরব মুজাহিদের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শায়খ উসামার তত্ত্বাবধানে বিশেষ একটি দল পুরো বিষয়টির দেখাশোনা করা শুরু করে।
রেকর্ডে ধারাবাহিকভাবে তথ্যগুলো তুলে রাখা হতো। একজন ব্যক্তি কবে আফগানিস্তানে আসলেন, বাইতুল আনসারে কবে যোগ দিলেন, ট্রেইনিং ক্যাম্পে ভর্তি হওয়ার বিবরণ, যুদ্ধফ্রন্টে যোগ দেওয়ার বিবরণ—সবই এতে লিখে রাখা হতো। রেকর্ড রাখার কাজটি বড় হতে হতে একসময় স্বতন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠানের রূপ ধারণ করে। তখন নিজেদের মধ্যে পরিচিতির জন্য এর একটি নাম দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। শায়খ উসামা রহ. তাঁর সহযোগীদের সাথে পরামর্শ করে এর নাম রাখেন ‘আল-কায়েদার (ঘাঁটি) রেকর্ড’। কেননা, আল-কায়েদা (ঘাঁটি) শব্দের মধ্যে বাইতুল আনসার, প্রশিক্ষণক্যাম্প এবং যুদ্ধফ্রন্ট—সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত ছিল।’
বাইয়াত ও অঙ্গীকার
১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসে আল-কায়েদা আনুষ্ঠানিকরূপে আত্মপ্রকাশ করে। যে-সব যুবক শায়খ উসামা রহ.-এর সাথে থেকে জিহাদী কাজ করতে চায় এবং তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে তাঁর নির্ধারিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করতে চায়, শায়খ তাদের থেকে শ্রবণ ও আনুগত্যের বাইয়াত নেওয়া শুরু করেন। শুধু সৌদি বা আরব যুবকদের মাঝেই এই বাইয়াত সীমাবদ্ধ ছিল না; আরব-আজম সকলেরই বাইয়াতের সুযোগ ছিল।
ক্যাম্পগুলোতে অসংখ্য মুজাহিদদের ট্রেইনিং দেওয়া হলেও খুব অল্পসংখ্যক মুজাহিদকেই তানজীমের সাথে কাজ করার জন্য নির্বাচন করা হতো। নির্বাচিতদের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াটিও সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করা হতো। ৪৫ দিনের মৌলিক কোর্স শেষ করার পর ক্যাম্প-কর্তৃপক্ষ তাঁদের ব্যাপারে নির্দিষ্ট তথ্যের আলোকে সন্তোষজনক রিপোর্ট করলেই কেবল তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হতো। তানজীমে শত্রুর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। পাশাপাশি আরেকটি লাভও হয়েছিল। যেহেতু কেউ চাইলেই যখন-তখন তানজীমের সদস্য হতে পারত না, বরং কর্তৃপক্ষ থেকে সদস্য বাছাই করা হতো। ফলে প্রশিক্ষিত ও যোগ্য মুজাহিদরাই কেবল তানজীমের সদস্য হতো।
আল-কায়েদার জিহাদী কার্যক্রমের ওপর এই নীতির ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। তানজীমের লক্ষ্য ছিল এমন কিছু ব্যক্তি তৈরি করা, যাদের ওপর কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতিতেও নির্ভয়ে আস্থা রাখা যায়। এ জন্যই আল-কায়েদার অধিকাংশ সদস্য ছিলেন সবর ও ইয়াকীনের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অন্যদের পক্ষে যা অসম্ভব, আল-কায়েদার সদস্যরা অনায়াসেই তা করে ফেলতে পারতেন। নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত নিজ স্থানেই তাঁরা অবিচল থাকতেন। তাঁরা নিজেদেরকে জিহাদী অট্টালিকার সামান্য ইট বলে বিশ্বাস করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই মুবারক হাদীস তারা খুব ভালোভাবে অনুধাবন করেছিলেন—
طُوبَى لِعَبْدٍ آخِذٍ بعِنَانِ فَرَسِهِ في سَبيلِ اللَّهِ، أَشْعَثَ رَأْسُهُ، مُغْبَرَّةٍ قَدَمَاهُ، إنْ كانَ في الحِرَاسَةِ، كانَ في الحِرَاسَةِ، وإنْ كانَ في السَّاقَةِ كانَ في السَّاقَةِ
‘জান্নাতের সুসংবাদ তার জন্য, যে আল্লাহর পথে ঘোড়ার লাগাম ধরে সদা প্রস্তুত থাকে। যার চুল এলোমেলো, পা ধুলোমলিন। তাকে [বাহিনীর অগ্রভাগে] পাহারায় নিযুক্ত করলে, পাহারাতেই নিয়োজিত থাকে আর বাহিনীর পেছনে রাখলে, সেখানেই থাকে।’ [সহীহ বুখারী: ২৮৮৭]
আমীরের আনুগত্য ও সঙ্গীদের সাথে কোমল আচরণের ক্ষেত্রেও নিজেদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসের বাস্তব নমুনা হিসেবে তৈরি করেছিলেন তাঁরা।