কিছু ভাই শায়খ উসামা রহ.-এর কাছে আবেদন করেছিলেন, তিনি যেন স্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে তানজীমের জন্য একটি লিখিত মানহাজ প্রণয়ন করেন। যে মানহাজের আলোকে তানজীম কাজ করবে এবং যা অন্যান্য দল থেকে তানজীমকে আলাদা করবে। কিন্তু শায়খ উসামা রহ. খুব সহজভাবে ভাইদের বলেছিলেন—
‘আমাদের মানহাজ তো তা-ই, যা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহতে এসেছে; যা হেয়াদেতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীন এবং তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারী উম্মাহর সালাফদের পথ ও পদ্ধতিতে রয়েছে।’
এ ব্যাপারে শায়খ হুসাইন বিন মাহমুদ তাঁর ‘هذه هي القاعدة (এটাই আল-কায়েদা)’ শিরোনামের প্রবন্ধে বলেন—
‘আল-কায়েদার বই-পুস্তকে ‘আল-কায়েদার জন্য বিশেষায়িত’ কোনো কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না। লিখিতভাবে আল-কায়েদার আলাদা কোনো আকীদা বা মানহাজ নেই। যা আছে তা হলো, উদ্ভূত নানান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ফিকহী সিদ্ধান্তের সংকলন। এ ক্ষেত্রে মুজাহিদগণ সাধারণত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের উলামায়ে কেরামের ইজতিহাদ ও গবেষণা থেকে সহায়তা নেন। আল-কায়েদার আলাদা মানহাজ বা আকীদা না থাকাটা আসলে অজ্ঞতা বা অপারগতার কারণে নয়; বরং এটা প্রজ্ঞারই বহিঃপ্রকাশ। কেননা, প্রতিটি মুসলিমের প্রকৃত মানহাজ তো আল্লাহর যিম্মায় (কুরআনে) লিখিত ও সংরক্ষিত আছে।
অতএব কোনো দলের জন্য নতুনভাবে বিশেষ কোনো মানহাজ লিখে মুসলমানদের থেকে স্বতন্ত্রতা তৈরি করে তার আলোকে ওয়ালা-বারা’র আকীদাকে পুনর্মূল্যায়ন করার কোনো প্রয়োজন নেই। তাছাড়া পূর্ববর্তী অনেক আলেমই বিশুদ্ধ ইসলামী মানহাজের ব্যাপারে লিখে গেছেন। গ্রহণযোগ্য বিশুদ্ধ দলীলই মুজাহিদদের মানহাজ।
সালাফে সালিহীন যেভাবে কুরআনুল কারীম ও রাসূলের সুন্নতকে বুঝেছেন, সেটাই আল-কায়েদার মানহাজ। ইসলাম বলতে আমরা একেই বুঝি। কুরআন ও সুন্নতে যা কিছু আছে, সালাফের ব্যাখ্যার আলোকে সেটাই আল-কায়েদার আকীদা। এই আকীদাই আমরা লালন করি। প্রচলিত অর্থে আল-কায়েদার আকীদা ও মানহাজ প্রণয়ণের জন্য আলাদা কোনো তাত্ত্বিক নেই, যেমনটা অন্যান্য দলের আছে। আল-কায়েদা কেবল কুরআন, সুন্নত এবং উলামায়ে কেরামের অনুসরণ করে, যারা শরয়ী নুসুসের প্রশস্ত সীমার মধ্যে থেকে ইজতিহাদ ও গবেষণার গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকেন।
ইজতিহাদ ও গবেষণার ক্ষেত্রে আল-কায়েদাকে দিকনির্দেশনাদানকারী এই উলামা ও তালেবে ইলমগণ সাধারণত উম্মতের প্রাচীন ও সমকালীন আলেমদের ফিকহী মাযহাব, দেশ বা সাংগঠনিক পরিচয়কে একপাশে রেখে তাদের গ্রহণযোগ্য মতামত থেকে উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে বিদআতী ও প্রবৃত্তিপূজারীদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। আল-কায়েদার কাছে কেবল শরীয়তের দলীলই গ্রহণযোগ্য। যখন কোনো বিষয় শরয়ী দলীল দ্বারা প্রমাণিত হবে, সেটাই আল-কায়েদার কাছে মাযহাব ও মানহাজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবে। [1]
এর দ্বারাই স্পষ্ট হয়, আল-কায়েদা প্রচলিত অর্থে সাধারণ কোনো সংগঠন নয়; বরং আল-কায়েদা মুসলিম উম্মাহর অবিচ্ছেদ্য অংশ। উম্মত থেকে আল-কায়েদাকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। মিডিয়া যতই প্রোপাগাণ্ডা করুক, সরকার যতই চেষ্টা করুক, উলামায়ে সু আল-কায়েদাকে উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য যত নাম ও উপাধিই দিক, কারও পক্ষেই আল-কায়েদাকে উম্মতে মুসলিমা থেকে আলাদা করা সম্ভব না। তারা আল-কায়েদাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে, ‘গোমরাহ ফেরকা’ বলে, ‘চরমপন্থি’ বলে, ‘বোমাবাজ’ বলে, ‘উগ্র’ বলে, ‘খারেজি’, ‘তাকফীরী’-সহ আরও অনেক নামে ডাকে, বাস্তবতার কষ্টিপাথরে যাচাই করলে তাদের দেওয়া এ সকল অপবাদ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।’
আল-জাযীরার সাংবাদিক তাইসীর আল্লুনী শায়খ উসামা রহ.-কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ব্যক্তি উসামা বিন লাদেনের সাথে আল-কায়েদার সম্পর্ক ও অস্তিত্ব কতটা নির্ভরশীল?’ এ প্রশ্নের জবাবে শায়খ রহ. জোর দিয়ে বলেন—
‘আপনি যে ব্যাপারটি উল্লেখ করেছেন, সে ব্যাপারে আমি আগেও কথা বলেছি। আলহামদুলিল্লাহ, এখানে আমি বা আল-কায়েদা কোনো বিষয় না; বরং আমরা উম্মতে মুসলিমার সন্তান, আমাদের নেতা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমাদের রব এক, আমাদের নবী এক, আমাদের কিবলা এক, আমাদের কিতাব এক, আমরা এক জাতি। এই সম্মানিত কিতাব ও আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র সুন্নত আমাদেরকে ঈমানী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। তাই সকল মুমিন ভাই ভাই। ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পরে ভাই ভাই’। [সূরা হুজুরাত (৪৯): ১০)
পশ্চিমারা যেভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করে যে, এই নামে বিশেষ একটি দল রয়েছে, আসলে বিষয়টি তেমন না। নামটি অনেক পুরোনো। কোনো ধরনের পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই নামটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। মূলত সন্ত্রাসী সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে আবু উবায়দা পানশীরী রহ. একটি ট্রেইনিং ক্যাম্প শুরু করেছিলেন। সেই জায়গাটিকে আমরা অন্যান্য ট্রেইনিং ক্যাম্পের মতোই ‘আল-কায়েদা’ (ঘাঁটি) বলতাম। পরে ধীরে ধীরে এই নামটিই সংগঠনের নাম হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়ে যায়। তবে আমরা কখনোই উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম না, আমরা এই উম্মতেরই সন্তান, এই উম্মতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। পূর্ব দিকের ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে ভারত, পাকিস্তান-সহ মৌরিতানিয়া পর্যন্ত এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর অন্তরের অব্যক্ত কথাই আমরা বলি।
নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে যে যুবকরা নিজেদের কুরবানী করেছে, আল্লাহ তাদের সকলকে কবুল করুন, তারা উম্মতের চেপে রাখা বেদনাকেই উচ্চস্বরে ঘোষণা করেছে। এই উম্মতের প্রাণের দাবি একটিই—সকল জালেম, অত্যাচারী, অপরাধী, নিরপরাধ মানুষদের ভীতিপ্রদর্শনকারী আসল সন্ত্রাসীদের থেকে প্রতিশোধ নিতে হবে। সব সন্ত্রাস নিন্দনীয় নয়; কিছু সন্ত্রাস নিন্দনীয় আর কিছু আছে প্রশংসনীয়। চোর পুলিশকে ভয় পায়, তাই বলে কি আমরা পুলিশকে বলব, তুমি চোরকে ভয় দেখাচ্ছ, তাই তুমি একজন সন্ত্রাসী? যদি আমরা পশ্চিমাদের কথা মেনে নিই, তাহলে তো পুলিশও সন্ত্রাসী। কিন্তু আমরা তা বলি না। কেননা, চোরের বিরুদ্ধে পুলিশের সন্ত্রাস প্রশংসনীয় সন্ত্রাস। আর নিরাপদ মানুষদের বিরুদ্ধে অপরাধীর সন্ত্রাস হলো নিন্দনীয় সন্ত্রাস। আমেরিকা ও ইসরাইল এই নিন্দনীয় সন্ত্রাস চর্চা করছে, আর আমরা ফিলিস্তিন ও অন্যান্য ভূখণ্ডে এই সন্ত্রাসীদের হাত থেকে আমাদের সন্তানদের জীবন রক্ষা করতে প্রশংসনীয় সন্ত্রাসের চর্চা করছি।’ [2]
টীকা-
[1] দলগতভাবে আল-কায়েদার কোনো নির্দিষ্ট মাযহাব নেই। যেহেতু আল-কায়েদা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত একটি সংগঠন আর এতে সারা বিশ্বের নানা দেশের নানা মতের মানুষ কাজ করে, তাই প্রত্যেক দেশের মানুষ এবং তাদের ফিকহী মাযহাবকে আল-কায়েদা সম্মান করে। নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের প্রতিনিধিত্ব আল-কায়েদা করে না। হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী, সালাফী—সকলেই এক পতাকাতলে যেন একতাবদ্ধ হতে পারেন, এ জন্য আল-কায়েদা নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের পক্ষপাতিত্ব করে না। আল-কায়েদার কোনো মাযহাব নেই—এ কথার উদ্দেশ্য এটিই। [সম্পাদক]
[2] শায়খ উসামা রহ. এর চিঠি ও বক্তৃতা সংকলন।
Comment