Announcement

Collapse
No announcement yet.

"শাযারাত মিন তারিখিল কায়েদাহ" থেকে অনূদিত || আলেমের বেশধারী গুপ্তচর আবু ইবরাহীম আহমদ বিন নাসরুল্লাহ মিসরীর ঘটনা ও শিক্ষা

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • "শাযারাত মিন তারিখিল কায়েদাহ" থেকে অনূদিত || আলেমের বেশধারী গুপ্তচর আবু ইবরাহীম আহমদ বিন নাসরুল্লাহ মিসরীর ঘটনা ও শিক্ষা


    আলেম হিসেবে পেশোয়ারে এই লোকটির খুব নামডাক ছিল। এমনকি এক সময় তিনি তানজীমের শরয়ী শাখার দায়িত্বশীলও ছিলেন। জিহাদ, রিবাত, শাহাদাতের ফযীলত-সহ অনেক বিষয়ে তিনি অনেকগুলো বই ও রিসালাও লিখেছিলেন। তার এ সমস্ত বই-পুস্তক মুজাহিদদের মেহমানখানাগুলোতে বিতরণ করা হতো, বিভিন্ন ময়দানে ও মারকাযে এগুলো রাখা হতো। তিনি সব সময় কোনো না কোনো ইলমী বিষয়ে কোর্স করাতেন। মাঝে মাঝে আল-কায়েদার মেহমানখানা, বাইতুল আনসার এবং অন্যান্য স্থানে বিভিন্ন বিষয়ে দরস দিতেন ও নসীহত প্রদান করতেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অনেকের সাথে তিনিও সুদানে হিজরত করেছিলেন। পরে সম্ভবত ১৯৯৪ সালে তিনি সুদান থেকে ইয়েমেন চলে গিয়েছিলেন।

    ইয়েমেন গিয়ে এই ব্যক্তি সেখানকার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আল-কায়েদা ও অন্যান্য জিহাদী দলকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাপত্র তৈরি করে তাদের কাছে পেশ করে। তখন হিযবুল ইসলাহের অনেক সদস্য এজেন্সিতে সক্রিয় ছিল। তাদেরই একজন [1] তার ফাইলটি গোপনে মুজাহিদ ভাইদের কাছে পৌঁছিয়ে দেন। ফলে ভাইয়েরা তাকে বন্দি করেন এবং হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সে ভাইদের কাছে মিনতি করে বলে, তার অবস্থা নাকি সাহাবী হাতেব বিন আবি বালতাআ রাযি.-এর মতো। অর্থাৎ সে মুনাফেকি করেনি, সে যা করেছে তা কেবল জীবিকার তাড়নায় বাধ্য হয়ে করেছে।

    তার এমন দাবির ফলে ভাইদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে যায় এবং তাকে নিয়ে মতানৈক্য শুরু হয়। পরে ভাইয়েরা তাকে ছেড়ে দেন। এরপর সে পালিয়ে মিশর চলে যায়। সেখানে যাওয়ার পর তার আসল পরিচয় প্রকাশ পায়। মূলধারার পত্রিকাগুলোতে তার ব্যাপারে সংবাদ প্রকাশিত হয়, ‘মিশরীয় গোয়েন্দা সংস্থা তাদের এক এজেন্টকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে’। এক সাক্ষাৎকারে সে গর্বের সাথে নিজেকে ‘একজন সফল এজেন্ট’ বলেও দাবি করে। আমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে নিরাপত্তা ও দৃঢ়তা কামনা করছি।

    আবু ইবরাহীম মিসরীর ঘটনা ও আমাদের শিক্ষা

    আবু ইবরাহীমের ঘটনায় শিক্ষণীয় এমন অনেক কিছুই আছে, যা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। শায়খ আবু কাতাদা ফিলিস্তিনী হাফি. তাঁর প্রবন্ধ রজউস সাদা–তে [2] এর সারসংক্ষেপ আলোচনা করেছেন। তিনি লেখেন—

    ১. এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, নিজ পরিণতির ব্যাপারে ভয় করা। নিজের ওপর অধিক ভরসা না করা। সর্বদা আল্লাহ তাআলার মুরাকাবা করা, তাঁর প্রতি মনযোগী থাকা এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকা। ইলম, ইবাদত ও জিহাদে কোনো ব্যক্তির অবস্থান যত উঁচুতেই হোক না কেন, ফিতনা থেকে নিরাপদ নয়। মানুষ যত বড় হবে, তার ফিতনা ও পরীক্ষা তত মারাত্মক হবে, তার পতন তত কঠিন হবে। এ জন্য মানুষের ইলম ও মর্যাদা যত বৃদ্ধি পায়, তার ফিতনার আশঙ্কাও তত বৃদ্ধি পায়। তাই অধিক সতর্ক ও ভীত থাকা উচিত।

    আমি সব সময় সুফিয়ান সাওরী রহ.-এর একটি কথা বলে থাকি। একবার তিনি কাঁদছিলেন। লোকেরা মনে করল, তিনি হয়তো গুনাহের কথা স্মরণ করে কাঁদছেন। এ কথা বুঝতে পেরে তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, ‘মৃত্যুর সময় ঈমান হারানোর ভয়ে আমি কাঁদছি।’

    এই ব্যক্তি (আবু ইবরাহীম) কিছুদিন আগেও মানুষকে নসীহত করেছে, মৃত্যুর সন্ধানে যুদ্ধের ময়দানে ঘুরে বেড়িয়েছে, অথচ আজ তার পরিণতি কী হয়েছে দেখুন। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে, প্রত্যেকের ভীত থাকা উচিত। অন্তরের পরিবর্তনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করা পর্যন্ত ভয় ও শঙ্কা নিয়েই বাঁচা উচিত।

    ২. এ ধরনের ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় এবং সতর্ক করে যে, দীনের প্রকৃত খাদেমদের কাছে প্রতারকদের আসল চেহারা একদিন না একদিন উন্মোচিত হবেই। আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের ওপর রহম করেছেন। যারা গোপনে এই উম্মত ও জিহাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, আল্লাহর দীনের সাথে প্রতারণা করে এবং এই উম্মতের সাথে খেয়ানত করে, তিনি কিছুদিন তাদের বিষয়গুলো গোপন রাখেন। তবে একদিন আল্লাহ তাআলা তাদের আসল চেহারা প্রকাশ করে দেন। যতই নিজেদের গোপন করার চেষ্টা করুক বা আড়ালে থাকুক না কেন। এ সকল লোকের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার নীতি এটাই—তিনি তাদের লাঞ্ছিত করেন, তাদের মুখোশ উন্মোচন করে দেন এবং তাদের অপমানিত করেন, যাতে দীনের নিবেদিতপ্রাণ খাদেমগণ প্রতারণার এই অভিশাপ থেকে বাঁচতে পারেন।

    আমাদের সালাফগণ সত্যই বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে আল্লাহর দীনের ব্যাপারে মিথ্যা ষড়যন্ত্র করবে, সকালবেলা লোকেরাই তার ব্যাপারে বলাবলি করবে, অমুক মিথ্যাবাদী’। আল্লাহর দীন ও জিহাদের ব্যাপারে কেউ মিথ্যা বলে সারা জীবন লুকিয়ে থাকতে পারবে, এমন ভাবার সুযোগ নেই। আল্লাহর কসম, আল্লাহর কসম, মৃত্যুর আগেই আল্লাহ তার সব জারিজুরি ফাঁস করে দেবেন। আল্লাহ তাআলাই মানুষের মুখে তার ওপর লানতের ধারা চালু করে দেবেন। এই লানতের বোঝা সে বেঁচে থাকতেও বহন করবে, মৃত্যুর পরেও বহন করবে। মানুষ তার নাম শুনলেই পাথর নিক্ষেপ করবে, যেমন আবু রুগালের কবরে নিক্ষেপ করে থাকে।

    ৩. গুপ্তচরবৃত্তি প্রাচীন কৌশল। কোনো সমাজই এর থেকে শতভাগ মুক্ত থাকতে পারে না, তা যতই পবিত্র আর নিরাপত্তাবেষ্টিত হোক না কেন। মুসলমানদের মধ্যে এমন কোনো যিন্দিকের উপস্থিতি প্রকাশ পেলে এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে দোষারোপ করা যায় না। কিন্তু এই দীনের একটি বৈশিষ্ট্য আছে, যা অন্য কোথাও নেই। তা হলো, আল্লাহ তাআলা এই দীনের সাথে খেয়ানতকারীদের কুকীর্তি একসময় না একসময় ফাঁস করেই দেন। তার আগ পর্যন্ত তাকে ছাড় দেন, তার অপকর্মগুলো গোপন রাখেন। এর দ্বারা আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন আর অপেক্ষা করেন, সে তাওবা করে কি-না।

    এ কারণে মুজাহিদ, আলেম ও সাধারণ মানুষের প্রতি আমাদের সুধারণা রাখা উচিত, যতক্ষণ না তাদের ব্যাপারে বিপরীত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়। আমাদের দায়িত্ব এতটুকুই। এর বাইরে যা কিছু আছে, তা আমরা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেব। আল্লাহ তাআলাই তাকে লাঞ্ছিত করবেন, তার কুকীর্তি ফাঁস করবেন এবং তাকে অপদস্থ করেই ছাড়বেন। নির্ধারিত সময় আসলে তিনিই তার সম্মানকে লাঞ্ছনায় পরিবর্তন করে দেবেন, তার নামকে অপমান আর ভর্ৎসনার পাত্র বানিয়ে দেবেন এবং দীনের উসিলায় যে মর্যাদা অর্জন করেছে, তা বিলীন করে সাধারণ মানুষের মাঝেই তার প্রতি ঘৃণা তৈরি করে দেবেন।

    এই আবু ইবরাহীমের আসল পরিচয় প্রকাশ হওয়ার পেছনে তাকদীর কীভাবে কাজ করেছে, তা জানলে আপনিও অবাক হবেন। প্রতারকদের পরিচয় ফাঁস হওয়ার এই সুন্নত যদি না থাকত, তাহলে কেউই তার ব্যাপারে একটি কটুবাক্যও বলতে পারত না। আমি এ সব বলছি কেবল আল্লাহর ক্রোধ থেকে মানুষকে সতর্ক করার জন্য; আল্লাহর এই ‘মুখোশ উন্মোচনের সুন্নত’ থেকে মানুষকে সতর্ক করার জন্য। তাকদীরের ব্যাপারে আল্লাহর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দুঃসাহস আছেই বা কার!

    সাথে সাথে এই ঘটনা মুসলিমদের নিশ্চিত করেছে, এই দীন চিরকাল নিরাপদ থাকবে। এটা আল্লাহ তাআলার দীন, তিনিই এই দীনকে সকল অনিষ্টকারী ব্যক্তি ও কথা থেকে রক্ষা করবেন। এই ঘটনায় ভয়ের কিছুই নেই। এর কারণে মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থা তৈরির কোনো সুযোগ নেই, কারো গোপন বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করারও প্রয়োজন নেই। যে ব্যক্তি মানুষের গোপন বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করে, আল্লাহ তাআলা তার গোপন বিষয়গুলো মানুষদের সামনে প্রকাশ করে দেন, যদিও সে তার অন্দরমহলে অবস্থান করে।

    এই ঘটনা আমাদের আরও শিক্ষা দিচ্ছে, শত্রুরা আমাদের পছন্দসই মাধ্যম অবলম্বন করে জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাদের দোসরদের অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে। এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে তারা হাত দেয়নি। দীনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘাপটি মেরে বসে থাকা সুযোগসন্ধানীদের খুঁজে বের করে নিজের শিকারে পরিণত করতে তাদের সর্দার ইবলিসেরও চেষ্টার কোনো শেষ নেই। ইলমের ময়দান বা জিহাদের ময়দান—কোনো ক্ষেত্রেই ইবলিস ও তার দলবল কখনো হতাশ হয়নি। কোনো না কোনো ভাবে নিজেদের লোক তারা তৈরি করে নিয়েছে।

    তাই দীনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, সকল পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এটা আমাদের জন্য কঠিন কিছু না। তারা আপনার সামনে আসবে দাড়ি-টুপি আর দীনী লেবাসের বেশ ধরে। কখনো আসবে ভক্তি, মুহাব্বত আর জিহাদপ্রেমের খোলস জড়িয়ে। এ ধরনের দীনী আবেগ ব্যবহার করে অনুপ্রবেশ করাই তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ। কিন্তু দিনশেষে মানুষের সামনে লাঞ্ছিত হওয়া আর মানসম্মান হারিয়ে অপদস্থ হওয়াই তাদের ভাগ্যের লিখন। তবু সতর্ক থাকা আমাদের কর্তব্য।

    শত্রুদের ব্যবহৃত এসব কূটকৌশল যত জানবেন, তাদের ভেতরের কদর্যতা ততই আপনার সামনে স্পষ্ট হতে থাকবে। দীনদার ব্যক্তিদের তারা এমন এমন ফাঁদে ফেলে দেয়, যে সম্পর্কে দীনদার ব্যক্তিরা কিছুই জানেন না। নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের ওপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে, মনে হবে তারা মাতাল হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। এ সকল নির্লজ্জ কাজ দেখে বুঝতে পারবেন, তারা ঠিক কতটা নিকৃষ্ট। আসলে তাদের অপরাধ ও কদর্যতার কোনো সীমা নেই।

    ৪. এটাই আমাদের জীবন। কোনো ভয়ভীতির পরোয়া না করে আমরা আমাদের জীবন কাটাব। কেউ ভালো কাজের আহ্বান করলে আমরা সাড়া দেব। আর কেউ মন্দ কাজের আহ্বান করলে উপেক্ষা করব। আমরা মানুষের বাহ্যিক অবস্থা দেখে তাদের বিচার করব আর অন্তরের বিষয় আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেব। শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কারো মানহানি করা কোনো অবস্থাতেই জায়েয নয়। সত্যের যেমন আলামত আছে, মিথ্যারও রয়েছে হাজারো আলামত।

    এই মুজাহিদ [আবু ইবরাহীম] যদি ফিতনার শিকার হওয়ার আগে শাহাদাতবরণ করতেন, তাহলে জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছে যেতেন। মনে রাখতে হবে, দীনী যত আলোচনা তিনি করেছেন, তা শুধু এ জন্য বাতিল হবে না যে তিনি খারাপ। হক সর্বদা হকই থাকে, যদিও তা কোনো অযোগ্য ব্যক্তির মুখ থেকে বের হয়। তেমনই বাতিল সর্বদা বাতিলই থাকে, যদিও তা কোনো ওলীর মুখ থেকে বের হয়।

    [এ ধরনের ঘটনা] আপনার মনোবলে যেন চিড় ধরাতে না পারে। আপনি নিজেকে দীনের কাজে নিয়োজিত রাখুন। হক ও হেদায়েতের পরিচয় লাভ করাই আপনার কাজ। শয়তান যদিও মিথ্যাবাদী, তবু সে আপনাকে কখনো সত্যও বলতে পারে। হক-বাতিলের অন্তর্নিহিত পরিচয় প্রকাশ করার দায়িত্ব আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিন। আপনি যেন হকপন্থি হতে পারেন আর হকের ওপর মৃত্যুবরণ করতে পারেন, শুধু এ দিকেই মনোযোগ দিন।

    কথাগুলো লেখার পেছনে আমার উদ্দেশ্য—

    প্রথমত: আমরা এমন একটি সময়ে বাস করছি, যখন হক ছেড়ে বাতিলের দিকে হিজরত করা আর দীনের পথ থেকে ছিটকে পড়ার জোয়ার শুরু হয়েছে। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, তিনি যেন আপনাকে এই ফিতনা থেকে হেফাযত করেন, আমৃত্যু এই পথে অটল রাখেন।

    দ্বিতীয়ত: নিজেকে এবং ভাইদের সতর্ক করার জন্য। যেন আল্লাহর সাথে আমাদের সাক্ষাৎ মন্দ অবস্থায় না হয়।

    তৃতীয়ত: সাদিকীন ও হকপন্থী ভাইদের এ কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, সত্য ও হকের পথে অল্পসংখ্যক মানুষই বাকি আছে, তাই ধৈর্য ধরুন।

    চতুর্থত: সকলকে এই বার্তা দেওয়ার জন্য, যে আল্লাহর সাথে শক্তি পরীক্ষায় নামে, আল্লাহই তার ওপর জয়ী হন। ‘আর আল্লাহ নিজ কাজে পূর্ণ ক্ষমতাশীল।’ [শায়খের কথা এখানেই শেষ]

    এই ঘটনা থেকে আরও কিছু শিক্ষা আমরা নিতে পারি—

    অনেকে আল-কায়েদার সাথে কাজ করতে ভয় পায়। তারা বলেন, ‘এই ব্যক্তির মতো গোয়েন্দা যদি তোমাদের দলে অনুপ্রবেশ করে শরয়ী বিভাগের দায়িত্বশীল পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে, তার মানে তো তোমাদের পুরো জামাতটাই গোয়েন্দাদের দখলে।’

    তাদের উত্তরে আমরা বলব, আল্লাহ তাআলার এই আয়াতটির কথা চিন্তা করে দেখুন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—

    وَمِمَّنۡ حَوۡلَكُم مِّنَ ٱلۡأَعۡرَابِ مُنَـٰفِقُونَۖ وَمِنۡ أَهۡلِ ٱلۡمَدِینَةِ مَرَدُوا۟ عَلَى ٱلنِّفَاقِ لَا تَعۡلَمُهُمۡۖ نَحۡنُ نَعۡلَمُهُمۡۚ

    ‘আর তোমাদের আশপাশের মরুবাসীদের মধ্যে কিছু লোক মুনাফিক এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কিছু লোক কঠোর মুনাফিকিতে লিপ্ত আছে। তুমি তাদেরকে জান না, আমি তাদেরকে জানি।’ [সূরা তাওবা (৯) : ১০১]




    খাইরুল কুরুনে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনাতেও মুনাফিক ছিল। আল্লাহ তাআলা তাদের উল্লেখ করছেন ‘নিফাকের ক্ষেত্রে কট্টর’ বলে। এরপরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ব্যাপারে জানতেন না। সাহাবীদের যুগেই যদি এই অবস্থা হয়, আমাদের এই যুগ তো সাহাবীদের যুগ থেকে অনেক নিম্নমানের, তাহলে এই যুগের অবস্থা কেমন হবে?

    এতটুকুই নয়; বরং বর্তমানে আমাদের সমাজে গোয়েন্দা তৎপরতার যে মুসীবত ছড়িয়ে পড়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় মদীনার সোনালি সমাজও এই মুসীবত থেকে মুক্ত ছিল না। মুসলমানদের শত্রু খ্রিষ্টানদের গুপ্তচরেরা মদীনার ভেতরেও সক্রিয় ছিল। মুসলমানদের দুর্বলতার সুযোগে কোনো সাহাবীকে দলে টানার কোনো সুযোগই তারা হাতছাড়া করত না। সীরাতের কিতাবগুলোতে জলীলুল কদর সাহাবী কাব বিন মালেক রা.-এর ঘটনা বিস্তারিত এসেছে। বিনা ওজরে তাবুক যুদ্ধে না যাওয়ার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে যখন সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে বয়কট করেছিলেন, তখন তিনি অবর্ণনীয় কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। সে ঘটনার কথা কাব বিন মালেক রা. নিজেই বলেন—

    ‘আমি একদিন মদীনার বাজার দিয়ে যাচ্ছিলাম, এ সময় মদীনার বাজারে শাকসবজি বিক্রির উদ্দেশ্যে আগত সিরিয়ার এক কৃষক বলতে লাগল, আমাকে কাব বিন মালেকের ঠিকানা বলতে পারে এমন কেউ আছে কি? লোকেরা ইশারায় আমাকে দেখিয়ে দিলে সে আমার নিকট আসল এবং গাসসানী সম্রাটের একটি চিরকুট দিলো। (চিরকুটটি এক টুকরো রেশমের ওপর লেখা ছিল।) যেহেতু আমি লেখাপড়া জানতাম। তাই তা পড়লাম। এতে লেখা ছিল, “আমি জানতে পেরেছি, তোমার সঙ্গী মুহাম্মাদ তোমার প্রতি জুলুম করেছে; অথচ আল্লাহ পাক তোমাকে এমন জায়গায় থাকতে বাধ্য করেননি, যেখানে তোমাকে লাঞ্ছিত করা হয় আর তোমার অধিকার খর্ব করা হয়। সুতরাং তুমি আমাদের নিকট চলে এসো। আমরা তোমাকে আমাদের অংশীদার বানিয়ে নেব।’ [সহীহ বুখারী : ৪৪১৮; সহীহ মুসলিম : ৬৭৬০]

    সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচনের ব্যাপারে আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর কঠিন মানদণ্ডের বিষয়টি তো সবাই জানে। দৃঢ়চেতা, আমানতদার, বিশ্বস্ত, মুত্তাকী, পরহেযগার ও আল্লাহর বিধি-নিষেধের প্রতি যত্নবান ব্যক্তি ছাড়া তিনি কাউকে ইসলামী রাষ্ট্রের কোনো কাজে নিয়োগ দিতেন না। এতকিছুর পরও তার কর্মকর্তাদের মধ্যে এক মুনাফিক ছিল।

    ‘উসদুল গাবাহ ফী মা’রিফাতিস সাহাবাহ’ কিতাবে ইবনুল আসীর রহ. বর্ণনা করেন, একমাত্র হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাযি.-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের ব্যাপারে গোপন তথ্য দিয়েছিলেন। এ জন্য উমর রা. তাকে একবার জিজ্ঞাসা করলেন, আমার কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো মুনাফিক আছে? হুযায়ফা রা. বললেন, হ্যাঁ একজন আছে। উমর রা. তার পরিচয় জানতে চাইলে হুযায়ফা রা. তার পরিচয় দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। হুযায়ফা রা. বলেন, এরপর উমর রা. সেই লোকটিকে বরখাস্ত করেছিলেন। সম্ভবত উমর রাযি. লোকটিকে চিনতে পেরেছিলেন।

    খাইরুল কুরুনেই যদি মুনাফিকদের এই অবস্থা হয়, তাহলে হাজার বছর পরে এসে কী অবস্থা হবে তা বলাই বাহুল্য। আল-কায়েদার মতো একটি দল, যাদের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের কুফফার গোষ্ঠী নিজেদের সিক্রেট এজেন্সিগুলোকে লাগিয়ে রেখেছে; যাদের সদস্যদের ধরার জন্য নিজেদের সকল শক্তি ব্যয় করছে; যাদের মানহাজ ও নেতৃবৃন্দকে বিকৃতভাবে জনসম্মুখে উপস্থাপন করার জন্য দরবারী আলেম আর সরকারি-বেসরকারি মিডিয়াগুলোকে ব্যবহার করছে—এমন একটি দল মুনাফিকদের থেকে মুক্ত থাকবে কীভাবে? مَا لَكُمۡ كَیۡفَ تَحۡكُمُونَ (তোমাদের কী হলো, তোমরা কেমন বিচার করছ!)

    শায়খ সায়্যিদ কুতুব শহীদ রহ. তার তাফসীর ‘ফী যিলালিল কুরআনে’ বনু মুসতালিক যুদ্ধে আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের ঘটনা আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন—

    ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় মুসলিমদের মধ্যে মুনাফিকরা প্রবেশ করে দীর্ঘ ১০ বছর এভাবেই কাটিয়ে দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে দল থেকে বের করে দেননি এবং আল্লাহ তায়ালাও মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে তাদের নামধাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়েছেন। এর আগে বিস্তারিতভাবে কখনো জানাননি। যদিও তাদের কথার ভাবভঙ্গি, ছলচাতুরি আর প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে রাসূল তাদের চিনতে পারতেন।

    এত দীর্ঘ সময়েও আল্লাহ তাআলা রাসূলকে মুনাফিকদের বিস্তারিত বিবরণ জানাননি। কারণ, মানুষের অন্তরের বিষয়কে আল্লাহ তাআলা কোনো মানুষের হাতে ছেড়ে দিতে চান না। অন্তর কেবল তারই নিয়ন্ত্রণে, তিনিই জানেন মানুষের অন্তরে কী আছে এবং তিনিই তার হিসাব নেবেন। মানুষ শুধু বাহ্যিক বিষয়কেই বিবেচনা করবে। তারা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে অভিযুক্ত করবে না, কারও ব্যাপারে শুধুমাত্র বিচক্ষণতা (!) ও দূরদৃষ্টি (!)-র নামে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না।

    এমনকি আল্লাহ তায়ালা যখন তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জীবনের শেষ দিকে কট্টর মুনাফিকদের পরিচয় জানান, তখনও তিনি তাদেরকে মুসলিমদের দল থেকে বের করে দেননি। কারণ তারা নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দিত এবং ইসলামের বিধানগুলো পালন করত। মুনাফিকদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু একাই চিনতেন।

    সাহাবীদের মধ্যে শুধু হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাযি.-কেই তাদের ব্যাপারে জানিয়েছিলেন। তিনিও বিষয়টি মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে দেননি। এমনকি হযরত উমর রা. নিজের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য হুযাইফা রা.-এর কাছে আসতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকদের তালিকায় উমরের নাম বলেছেন কি না জিজ্ঞাসা করতেন। তখনও হুযাইফা রা. শুধু এতটুকুই বলতেন, হে উমর, আপনি তাদের অন্তর্ভুক্ত নন। এর চেয়ে বেশি কিছুই বলতেন না।

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের জানাযায় শরীক হতে নিষেধ করেছিলেন। তাই সাহাবায়ে কেরাম রা. যখন দেখতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ব্যক্তির জানাযায় নেই, তারা বুঝে নিতেন লোকটি মুনাফিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর হুযাইফা রা. মুনাফিকদের জানাযায় যেতেন না।

    উমর রাযি. হুযাইফা রাযি.-কে লক্ষ করতেন। যদি দেখতেন হুযাইফা রা. জানাযায় উপস্থিত হয়েছেন, তাহলে বুঝে নিতেন মৃত লোকটি মুনাফিক না। তখন তিনিও জানাযায় শরীক হতেন। আর যদি তাকে না দেখতে পেতেন, তিনিও জানাযায় শরীক হতেন না। তবে কিছু বলতেনও না। তাকদীরের লিখন অনুযায়ী এভাবেই সময় এগিয়ে চলছিল নিজ লক্ষ্যপানে। এর পেছনে ছিল অনেক রহস্য ও উদ্দেশ্য। এর মধ্যে ছিল তারবিয়াত ও শিক্ষা; শিষ্টাচার, শৃঙ্খলা ও উত্তম চরিত্রের উপকরণ।’


    টীকা-

    [1] হিযবুল ইসলাহের যে ভাই মুজাহিদদের কাছে আবু ইবরাহীমের ফাইল পৌঁছে দিয়েছিলেন, মিশরীয় গোয়েন্দা সংস্থা তার পরিচয় বের করেছিল। ২০০২-এর সেপ্টেম্বরে এক ব্যাবসায়িক সফরে থাকাকালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে ‘আল-কায়েদার সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে’ তাকে মার্কিন সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে গুয়ান্তানামো কারাগারে পাঠানো হয়। আজ অবধি তিনি সেখানে বন্দি আছেন। মার্কিন সরকার তাকে-সহ আরও কয়েকজনকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’র অভিযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দি করে রেখেছে। আল্লাহ তাআলা দ্রুত তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করে দিন, আমীন।

    [2] ২০১৭-১৮ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শায়খ আবু কাতাদা ফিলিস্তিনী হাফি. নিয়মিত লেখালিখি করতেন। তাঁর এই লেখাগুলোর একটি সংকলন বের হয়েছে ‘শুযুরুয যাহাব’ নামে। এই সংকলনে উল্লিখিত লেখাটি আছে।
    Last edited by আবু আব্দুল্লাহ; 23 hours ago.

  • #2
    আল্লাহ সকল মুওয়াহহিদ মুজাহিদ ভাইদেরকে নিরাপত্তার চাদরে আবৃত রাখুন এবং সতর্কতার সাথে দ্বীন কায়েমের পথে লেগে থাকার তাওফীক দান করুন ।

    ধৈর্যশীল, সতর্ক ব্যক্তিরাই লড়াইয়ের জন্য উপযুক্ত।”
    -শাইখ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ

    Comment


    • #3
      আল্লাহ তা’আলা মুজাহিদীিনকে হিফাযত করুন ও আমাদেরকে ঈমানের উপর অটল-অবিচল রাখুন,আমীন।

      Comment

      Working...
      X