Announcement

Collapse
No announcement yet.

"শাযারাত মিন তারিখিল কায়েদাহ" থেকে অনূদিত || জালালাবাদের বিখ্যাত যুদ্ধ

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • "শাযারাত মিন তারিখিল কায়েদাহ" থেকে অনূদিত || জালালাবাদের বিখ্যাত যুদ্ধ


    প্রতিষ্ঠার পর থেকে শায়খ উসামা রহ.-এর নেতৃত্বে আল-কায়েদা বড় বড় যে যুদ্ধগুলো করেছে, জাজির যুদ্ধের পর জালালাবাদের যুদ্ধটি ছিল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৮৯ সালের গ্রীষ্মে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কমিউনিস্ট সরকারের বাহিনী আরবদের অবস্থান লক্ষ্য করে এই আক্রমণ পরিচালনা করেছিল। সাংবাদিক ইসাম দারায তার ‘মা’সাদাতুল আনসার’ বইয়ে শায়খ উসামা রহ. থেকে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করেছেন। শায়খ রহ. বলেন—

    ‘আরব মুজাহিদগণ যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে শহরকেন্দ্রিক যুদ্ধ ছিল এটাই প্রথম। যুদ্ধটি ব্যাপক পরিসরে সংঘটিত হয়েছিল। আফগানিস্তানের অন্যান্য যুদ্ধ থেকে জালালাবাদ যুদ্ধ ছিল সবদিক থেকে আলাদা। আগের যুদ্ধগুলো হয়েছিল শত্রুদের বিভিন্ন ঘাঁটি ও দুর্গকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে জালালাবাদ হলো আফগানিস্তানের বড় শহরগুলোর একটি, আবার এর অবস্থান রাজধানী কাবুলের সবচেয়ে কাছে। জালালাবাদের এই যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ মুজাহিদদের হাতে ছিল না। কারণ, ততদিনে শহরের আশপাশে থাকা শত্রুদের অনেকগুলো ঘাঁটি মুজাহিদদের দখলে চলে এসেছিল। এমনকি আফগান মুজাহিদগণ জালালাবাদ বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন।

    এমতাবস্থায় শত্রুবাহিনী শহর রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, মুজাহিদগণ যদি পিছু হটে, তাহলে তাদের সকল পরিশ্রম ও অর্জন নিমেষেই ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলে রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধটি শুরু হয়, যা লাগাতার কয়েক মাস অব্যাহত থাকে। ভাইয়েরা এই যুদ্ধ থেকে এমন অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, যা ইতঃপূর্বে অন্য কোনো যুদ্ধে অর্জিত হয়নি।

    ‘জালালাবাদের আশেপাশে আরব মুজাহিদদের ১৮টি ক্যাম্প ছিল (মা’সাদাতুল আনসার)। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতিতে শক্তি ধরে রেখে লাগাতার কয়েক মাস যুদ্ধ পরিচালনা করা আমাদের জন্য কষ্টকর ছিল। দীর্ঘ এই যুদ্ধ চালাতে নিরবচ্ছিন্ন সাহায্য, রসদ এবং যথাসময়ে বারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট লাঞ্চার দরকার ছিল। আহত-নিহত ভাইদের উদ্ধার করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও করতে হচ্ছিল। যারা নিহত হয়েছেন আল্লাহ তাদের শহীদ হিসেবে কবুল করুন। তা ছাড়া শত্রুর গতিবিধির ওপর নজর রাখার জন্য প্রতিটি ঘাঁটিতে সব সময় কারো না কারো উপস্থিতি জরুরি ছিল, যেন শত্রুপক্ষের কোনো তৎপরতা দেখলেই গুলিবর্ষণ করতে পারেন।

    এই যুদ্ধে ভাইদের রকেট লাঞ্চার, মিসাইল ও মর্টার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ অভিজ্ঞতা অর্জন হয়। হামলার জন্য ভাইয়েরা মানচিত্র ব্যবহার করেন। সঠিকভাবে দূরত্ব নির্ণয় করা এবং লক্ষ্যবস্তুকে টার্গেট করে নিখুঁতভাবে হামলা করার ক্ষেত্রে ভাইয়েরা স্থানাঙ্ক (কোঅর্ডিনেট) ব্যবহার করেন। নতুন এই অভিজ্ঞতার কারণে আরব ভাইদের মধ্যে দক্ষ একটি দলের জন্ম হয়। প্রচণ্ড যুদ্ধের সময়ও তারা ছিলেন অবিচল। মাসের পর মাস এমন প্রচণ্ড যুদ্ধের মুখে টিকে থাকতে পারা কোনো সহজ কাজ ছিল না।

    পরিবহণ-মাধ্যম, অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় অন্যান্য দলের চেয়ে আরব ভাইদের তৎপরতা ছিল গতিশীল। যোদ্ধাদেরকে কয়েকটি ইউনিটে ভাগ করে প্রত্যেক ইউনিট-কমান্ডারকে গাড়িও দেওয়া হয়েছিল। কমান্ডার খালেদের নেতৃত্বে একটি অ্যাসল্ট গ্রুপ তৈরি করা হয়েছিল। তিনি ছিলেন জালালাবাদের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ আফগান কমান্ডার। এই মহান কমান্ডারের হাতে অনেকগুলো জায়গা বিজয় হয়েছিল। আরব ভাইদের দলই ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত। কিছু কিছু অভিযানে আক্রমণকারীদের সবাই থাকত আরব, শুধু কমান্ডার খালেদই থাকতেন একমাত্র আফগান। কারণ তার অনুগত অধিকাংশ আফগান মুজাহিদই পূর্বের যুদ্ধগুলোতে শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন।

    আরব মুজাহিদদের আরেকটি ইউনিট কমান্ডার সাযনুরের অধীনে ছিলেন। আরব মুজাহিদদের অংশগ্রহণে আল্লাহ তায়ালা তাদের হাতেও অনেকগুলো ঘাঁটির বিজয় দান করেন। তার মধ্যে একটি ছিল তাবাব (ফারকান্দ), যাকে সারাকাহ সামরিক ঘাঁটি বা সাখরী ঘাঁটি বলা হতো। সেখান থেকে আরব ভাইয়েরা অনেকগুলো দূরপাল্লার হেভি ট্যাংক গনীমত লাভ করেছিলেন। এছাড়া আরও অনেকগুলো সাধারণ ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান গনীমত হিসেবে লাভ করেছিলেন। ভাইদেরকে এ সমস্ত অস্ত্র—বিশেষ করে ট্যাংক—ব্যবহারের জন্য সফলভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধের শেষদিকে যখন কমিউনিস্ট বাহিনী আরবদের অবস্থান লক্ষ্য করে সর্বশেষ আক্রমণ করেছিল, তখন ভাইয়েরা তাদের বিরুদ্ধে ট্যাংক ব্যবহার করেছিলেন। সে সময় নতুন করে আরও অনেকগুলো ট্যাংক গনীমত হিসেবে হাতে এসেছিল।’

    শায়খ উসামা রহ.-এর জবানিতে জালালাবাদের যুদ্ধ [১]

    যুদ্ধের বিবরণ দিতে গিয়ে শায়খ রহ. বলেন—

    ‘১৪০৯ হিজরীর ১০ই যিলহজ (৩রা জুলাই ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) শত্রুবাহিনী আমাদের অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা শুরু করে। এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল আরব মুজাহিদদের অবস্থানকে ধ্বংস করা এবং তাদেরকে অবরুদ্ধ করে জীবিত বন্দি করা। কারণ, আরব মুজাহিদদের কাছে তখন বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ ছিল, যেগুলো আমরা পাকিস্তানের অস্ত্রবাজার থেকে কিনে রেখেছিলাম। প্রায় ৩০ ট্রাক গোলাবারুদ কিনে জমা করা হয়েছিল। এ কারণে জালালাবাদের আশপাশে থাকা আফগান সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সুশৃঙ্খল ও তীব্র আক্রমণ পরিচালনা করা আমাদের জন্য সহজ ছিল।

    একদিন জানতে পারি, শত্রুর বিশাল এক বাহিনী এদিকে আসছে। আমরা সেই বাহিনীর ওপর লাগাতার তিনদিন হামলা চালাই। এই হামলায় ৭০ জন হিন্দু সৈন্যও নিহত হয়। মূলত রুশ বাহিনী চলে যাওয়ার পর আফগান সরকার ব্যাপক সৈন্যঘাটতির মুখে পড়ে গিয়েছিল। এই ঘাটতি পূরণের জন্য তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আফগানিস্তানে নিয়ে এসেছিল। অথচ রুশ বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেও প্রায় ২০ হাজার রাশিয়ান সৈন্য তখনও আফগানিস্তানে অবস্থান করছিল।

    এদিকে আফগান মুজাহিদদের গোলাবারুদ ছিল শেষের পথে। তাই আমাদের কাছে থাকা গোলাবারুদ ব্যবহার করেই শত্রুকে চাপের মধ্যে রাখতে চাচ্ছিলাম। এ জন্য টানা তিন সপ্তাহ আমরা শত্রুর স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে বিরতিহীন আক্রমণ করতে থাকি। ততদিনে সরকারি বাহিনী বুঝে গিয়েছিল, আরবরা তাদের গলার কাঁটা হয়ে আটকে আছে। তাই তারাও আমাদের DC ফিল্ড গান আর রকেট লাঞ্চারের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমানহামলা শুরু করে। তখন আমাদের কাছে মাত্র দুটি রকেট লাঞ্চার ছিল। শত্রুরা যখন দেখল বিমান থেকে বোম্বিং করে আর মিসাইল অ্যাটাক করেও আমাদের আর্টিলারিকে থামানো যাচ্ছে না, তখন তারা আমাদের অবস্থান টার্গেট করে স্কাড মিসাইল নিক্ষেপ শুরু করে। স্কাড মিসাইল হলো মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল, এই ধরনের মিসাইল দ্বারা মূলত শহরে আক্রমণ করা হয়; কিন্তু তারা সেটা আমাদের ও আমাদের আর্টিলারির বিরুদ্ধে ব্যবহার করে।

    এতেও যখন তেমন সফলতা দেখল না, তখন আমাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা করার জন্য বিশাল সামরিক শক্তি প্রস্তুত করা শুরু করে। এই বাহিনীর চিফ কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয় রহিমী নামক এক ব্যক্তিকে আর সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইসমাইল নামক আরেক কমান্ডারকে। তারা নজিবুল্লাহ সরকারের কাছে এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করে যে, এইবারের অভিযানে তোরখাম পর্যন্ত বিজয় করে ফেলবে। তোরখাম হলো পাক-আফগান সীমান্তবর্তী একটি এলাকা, জালালাবাদ থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। স্থলপথে কাবুল থেকে জালালাবাদ হয়ে পাকিস্তানের পেশোয়ারের সাথে সংযুক্ত মহাসড়কের পাশেই এর অবস্থান।

    ১৯৮৯ সালের ৩রা জুলাই আক্রমণ শুরু হয়। ১৪০৭ হিজরীর জাজির যুদ্ধের পর এটাই ছিল আরব মুজাহিদদের জন্য সবচাইতে মারাত্মক ও ভয়াবহ যুদ্ধ; বরং এই যুদ্ধ ছিল আগের চেয়েও বেশি কঠিন। কারণ, জালালাবাদের আশপাশের অঞ্চলগুলো সমভূমি হওয়ায় সাঁজোয়া যান ও ভারী যুদ্ধযান চলাচলের উপযোগী ছিল। অন্যদিকে [জাজির যুদ্ধ পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায়] সাঁজোয়া যান সেখানে বেশি সুবিধা করতে পারেনি।

    প্রথমেই তারা আমাদের বাম বাহুর দিকে বাহিনী পাঠায়। সেখানকার মুজাহিদগণ ফজরের পর আমাদের সাথে যোগাযোগ করে জানান, অনেকগুলো ট্যাংক তাদের দিকে আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছে, তাদের সাহায্য প্রয়োজন। আমরা তাদের জন্য দুটি গাড়িতে অস্ত্রশস্ত্র-সহ কিছু ভাইকে পাঠাই। এর কিছুক্ষণ পর ডান বাহুর মুজাহিদগণ যোগাযোগ করে জানান, তাদের দিকেও ট্যাংক বহর এগিয়ে আসছে। ডান বাহুর অবস্থান ছিল জালালাবাদ বিমানবন্দরের কাছেই। তাদের অবস্থান থেকে কেন্দ্রীয় ঘাঁটি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ছিল। তারাও সাহায্যের আবেদন করেন এবং মিসাইল নিক্ষেপের জন্য লাঞ্চার পাঠাতে বলেন। তাই আমরা একটি রকেট লাঞ্চার ডান বাহুর দিকে, আরেকটি বাম বাহুর দিকে রওনা করিয়ে দিই। দুই বাহুর মাঝখানে মুজাহিদদের কিছু ছোট ছোট চৌকি ছিল, তারাও যোগাযোগ করে সাহায্যের আবেদন করেন।

    কেন্দ্রীয় ঘাঁটিতে থাকা রিজার্ভ ফোর্সের সাথে কিছু অস্ত্র দিয়ে তাদের কাছে পাঠিয়ে দিই। কিন্তু এ সব ছিল শত্রুর কৌশলমাত্র। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল কেন্দ্রীয় ঘাঁটিতে আক্রমণ করা। [উভয় দিকে বাহিনী পাঠানোর ফলে যখন কেন্দ্রীয় ঘাঁটি খালি হয়ে গিয়েছিল,] তখন কেন্দ্রীয় ঘাঁটির দিকে শত্রুর ২৭টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের বিশাল একটি বহর অগ্রসর হতে শুরু করে। এ সময় তারা আকাশ থেকেও জোড়ালো বিমান হামলা শুরু করে। ফজরের পরপরই তারা ৭টি স্কাড মিসাইল নিক্ষেপ করে। খুব ভেবেচিন্তেই তারা হামলার জন্য এই দিনটি বেছে নিয়েছিল। কারণ, সেদিন ছিল ঈদুল আযহার প্রথম দিন। আফগান মুজাহিদদের অভ্যাস তাদের জানা ছিল। বছরের বেশিরভাগ সময় আফগান মুজাহিদরা পরিবার থেকে দূরে যুদ্ধের ময়দানে থাকত আর ঈদের দিনগুলো পরিবারের সাথে কাটানোর জন্য বাড়ি চলে যেত।

    শত্রুবাহিনী ক্রমেই আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। তখন ঘাঁটিতে আমরা মাত্র ৩০ জন বা তার চেয়েও কম মুজাহিদ ছিলাম। আমাদের ওপর ২৭টি ট্যাংক একযোগে আক্রমণ করে। পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের কাছে যে রিজার্ভ ফোর্স ছিল, তাদের তো আগেই ডান ও বাম বাহুর দিকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। একটি ট্যাংক ছিল, সেটাও প্রধান সড়কের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেন সেদিক দিয়ে কোনো হামলা না হয়। T62 মডেলের আরেকটি ট্যাংক ছিল, সেটি বাম বাহুতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে শত্রুরা কেন্দ্রীয় ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হওয়া শুরু করে। ঘাঁটিতে থাকা ভাইদের কাছে অস্ত্র বলতে শুধু একটি আরপিজি ছিল। কিছুক্ষণ প্রতিরোধের পর আরপিজি বহনকারী সে ভাই শহীদ হয়ে যান। আল্লাহ তায়ালা তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন।

    অবশেষে আমাদের কাছে একটি 75 mm অ্যান্টি ট্যাংক গান ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ভাই শফীক মাদানী অ্যান্টি ট্যাংকটি স্থাপন করেন। সাধারণত যুদ্ধের সময় একটি 75 m.m অ্যান্টি ট্যাংক পরিচালনা করতে পাঁচজন সৈন্যের প্রয়োজন হয়। [২] কিন্তু শফীক ভাই একাই অ্যান্টি ট্যাংকটি প্রস্তুত করে তা থেকে হামলা করা শুরু করেন। ট্যাংক-বিধ্বংসী অন্যসব অস্ত্রের তুলনায় 75 mm অ্যান্টি ট্যাংক থেকে গোলা নিক্ষেপ করা অনেক বেশি কঠিন। কারণ এটায় প্রথমে তার ভেতরে মিসাইল রেখে তা ফায়ার করতে হয়, এরপর মিসাইলের শেল বের করে পুনরায় আরেকটি মিসাইল স্থাপন করতে হয়।

    ‘শত্রুবাহিনী আমাদের চারপাশ থেকে ঘেরাও করার চেষ্টা করছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, তারা আরব মুজাহিদদের জীবিত বন্দি করতে চায়। অ্যান্টি ট্যাংক আরপিজি দিয়ে তেমন কোনো প্রতিরোধ করা যাচ্ছিল না। কারণ আরপিজির রেঞ্জ ছিল মাত্র ৩০০ মিটার। এই সুযোগে শত্রুবাহিনীর ট্যাংকগুলো অনেকটা নিশ্চিন্তেই আমাদের ওপর বোমাবর্ষণ করছিল। এ জন্য আমি ভাইদের বললাম, ট্যাংকগুলো ৩০০ মিটারের ভেতরে পৌঁছানোর পর যেন তারা আরপিজি ব্যবহার করেন। ট্যাংকগুলো ৩০০ মিটারের ভেতরে আসার পর ভাইয়েরা আরপিজি দিয়ে হামলা শুরু করেন। কিন্তু ২৭টি ট্যাংকের সামনে একটিমাত্র আরপিজি তেমন কোনো কাজেই আসছিল না। এ দিকে আরপিজি বহনকারী আরেক ভাই ল্যান্ড মাইন বিস্ফোরণে আহত হন। ট্যাংকগুলো আমাদের দিকে ক্রমেই অগ্রসর হচ্ছিল, আসতে আসতে তারা আমাদের ঘাঁটির প্রথম টিলার কাছে চলে আসে। এই পাথুরে টিলাটি ছিল শত্রুদের সামনে আমাদের প্রথম অবস্থান।

    শফীক ভাই শত্রুদের দিকে 75 mm অ্যান্টি ট্যাংক দিয়ে হামলা করা শুরু করেন। তখন ট্যাংকগুলো আমাদের থেকে মাত্র ৪০০ মিটার দূরে ছিল। ট্যাংকের পাশাপাশি মেশিনগান থেকেও গুলিবর্ষণ করছিল তারা। তীব্র বোমাবর্ষণ করে পুরো এলাকাটিকে ঝাঁঝরা বানিয়ে ফেলছিল। যে দুই টিলায় আমরা অবস্থান নিয়েছিলাম, এর মাঝে একটি সমতল ভূমি ছিল। শত্রুদের সাঁজোয়া যান এই সমতল ভূমিতে প্রবেশ করলে ভাইয়েরা ছড়িয়ে পড়েন। সাঁজোয়া যান থেকে নেমে সৈন্যরা যখন টিলায় উঠতে শুরু করে, ভাইয়েরা তাদের ওপর গোরিউনোভ মেশিনগান থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। এভাবে আনুমানিক চার ঘণ্টা পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকে। সামনে শত্রুবাহিনীর ২৭টি ট্যাংক আর আমাদের কাছে মাত্র একটি অ্যান্টি ট্যাংক, যা মাত্র একজন ভাই চালাচ্ছেন। এতকিছুর পরও আল্লাহ তায়ালা শত্রুদের অন্তরে ভয় ঢেলে দেন।

    আমরা যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করে টিলা থেকে নেমে পেছনের একটি জায়গায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ওই জায়গাটি অনেক গাছপালা আর টিলাবিশিষ্ট হওয়ায় ট্যাংকের জন্য দুর্বল পয়েন্ট ছিল। ময়দানে থাকা অন্য ভাইদেরও সেখানে চলে যেতে বলি। জায়গাটির নাম ছিল ‘সামার খেল’। ইতোমধ্যে আফগান মুজাহিদদের কাছেও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একটু পরেই শত্রুরা সামনে অগ্রসর হয়ে আমাদের ঘাঁটি দখল করে নেয়। আল্লাহর রহমতে তখন আমাদের কেউ সেখানে ছিল না। শফীক ভাই অ্যান্টি ট্যাংক চালানো অবস্থাতেই শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে যেভাবে শাহাদাত চেয়েছিলেন, আল্লাহ তায়ালা ঠিক সেভাবেই তাকে শাহাদাত দান করেন। [৩] আল্লাহ তায়ালা তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন। যে তিনজনের হাতে মা’সাদার সূচনা হয়েছিল, তিনি ছিলেন তাদেরই একজন। শফীক ভাইয়ের শাহাদাত আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

    আমাদের নতুন জায়গায় চলে যাওয়া দেখে শত্রুরা বীরদর্পে সামনের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমরাও কয়েক দিন তাদের আক্রমণ মোকাবিলা করতে থাকি। প্রধান সড়কে যে ভাইয়েরা ছিলেন, তারাও শত্রুদের প্রতিরোধ করতে থাকেন। এভাবে ৯ দিন চলে যায়। দশম দিনের আবহাওয়া ছিল প্রচণ্ড গরম। পুরো জালালাবাদের তাপমাত্রা সেদিন ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। মাগরিবের ঘণ্টাখানেক আগে তারা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে আমরা তাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালাই। ভাই ইয়াকুব আল-বাহর 82 mm অ্যান্টি ট্যাংক দিয়ে শত্রুদের একটি ট্যাংক ধ্বংস করতে সক্ষম হন। আরেক মুজাহিদ ভাই মিলান (MILAN) অ্যান্টি ট্যাংক মিসাইল দিয়ে শত্রুদের আরও একটি ট্যাংক ধ্বংস করেন। মাঝরাত পর্যন্ত এভাবে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকে।

    ফজরের পর ভাইয়েরা শত্রুদের অবস্থান অনুসন্ধান করে দেখতে পান, তারা ১৮টি অক্ষত ট্যাংক ফেলে রেখে পেছনে সরে গেছে। ভাই সালেহ গামেদী ওরফে হামযা এবং আমীরুল ফাতাহ মিসরী ট্যাংক চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তারা ট্যাংকে উঠে শত্রুর ওপর হামলা চালান। কিছুক্ষণ গোলাগুলির পর আরও একটি ট্যাংক তারা দখল করতে সক্ষম হন। হামযা ভাই ট্যাংক চালিয়ে যাহরানী নামক স্থান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। শত্রু বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। ৪২টি ট্যাংক তারা হারিয়েছিল। এর মধ্যে ২০টিরও বেশি ট্যাংক সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় মুজাহিদদের হাতে এসেছিল। আরব ভাইদের ভাগে পড়েছিল পাঁচটি ট্যাংক, তার মধ্যে দুটি ছিল T-62 মডেলের। এ লড়াইটি ছিল জালালাবাদ যুদ্ধের সর্বশেষ লড়াই। আফগান যুদ্ধে বিগত কয়েক বছরে যতজন আরব মুজাহিদ শহীদ হয়েছিলেন, শুধু জালালাবাদ যুদ্ধেই আরব শহীদদের সংখ্যা তা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা তাদের সকলকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন।’


    টীকা-​​

    [১] মা’সাদাতুল আনসার: ইসাম দারায

    [২] ছোট অ্যান্টি ট্যাংক চালাতে দুই বা তিনজন সৈন্যের প্রয়োজন হয়।

    [৩] শফিক মাদানী রহ.-এর ইচ্ছা ছিল, দুনিয়াতে যেন তার কোনো কবর না হয়। তিনি যখন অ্যান্টি ট্যাংক দিয়ে বিশাল ট্যাংক বহরের মোকাবিলা করছিলেন, ঠিক সে মুহূর্তে একটি বোমা সরাসরি তার শরীরে আঘাত হানে। ফলে তার পুরো শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। পরে তার কোনো চিহ্নই খুঁজে পাওয়া যায়নি।


  • #2
    মহান রাব্বুল আলামীন আফগান যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল মুজাহিদের কুরবানি কবুল করুন। আর যারা শাহাদাত বরণ করেছেন, তাদেরকে প্রকৃত শহীদ হিসেবে কবুল করুন। আমীন।

    Comment

    Working...
    X