Announcement

Collapse
No announcement yet.

দ্বীন প্রতিষ্ঠায় সমসাময়িক আকাবিরদের সংগ্রাম (তৃতীয় পর্ব)

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • দ্বীন প্রতিষ্ঠায় সমসাময়িক আকাবিরদের সংগ্রাম (তৃতীয় পর্ব)

    ইসলামী আন্দোলনের বীর সিপাহসালার
    হযরত মাওলানা মাহমূদুল হাসান দেওবন্দী (রহঃ)
    জন্মঃ ১২৬৮ হিজরী - মৃত্যুঃ ১৩৩৯ হিজরী





    ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বর্ণ খচিত ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে যদি নির্ভীক ও সংগ্রামী সিপাহসালার হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী (রহঃ) -এর স্বর্ণ উজ্জ্বল নাম বাদ দেয়া হয় তাহলে শুধু আমারই নয় বরং সকল এতিহাসিকের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী সেই ইতিহাস অপূর্ণ থেকে যাবে। এই নির্ভীক মুজাহিদের উজ্জলতম জীবন কথা এবং তার বিশ্বজননী চিন্তাধারার আলোচনা সংযোগেই আসবে ইতিহাসের গ্রহণযোগ্যতা।

    হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) এমন এক ব্যক্তিত্ব; যাকে “তাহরীকে খেলাফত" কালে "শাইখুল হিন্দ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। তিনি ছিলেন সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানের অধিবাসী। জীবন চক্রের এক পর্যায়ে তিনি যখন মিরাঠ অবস্থান করছিলেন ঠিক তখনই বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হয়। ১৮৫৭ সালের ঘটনাবলী তার খুব একটা দেখা হয়নি, আর তা স্মরণও থাকার কথা নয়। কারণ তখন তিনি সবে মাত্র শৈশব অতিক্রম করে কৈশোরে পা দিচ্ছিলেন। তবুও সাম্রাজ্যবাদের জুলুম-নির্যাতন ও অত্যাচার-উৎপীড়নের চিত্র সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও তার হৃদয় দর্পণে অঙ্কিত ছিল।

    এদিকে দিন যতই অতিবাহিত হচ্ছিল ইংরেজদের অত্যাচার, অবিচার এবং নিপীড়িত নিগৃহীত মানবতার অব্যক্ত হৃদয় জ্বালা ততই ক্রমবর্ধমান ধারায় তার দৃষ্টি ভেসে আসছিলো, আঘাত হানছিলো তার হৃদয়ের রুদ্ধকপাটে।


    মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে প্রথর মেধা, অসাধারণ বিচক্ষণতা এবং অনুপম স্মৃতিশক্তি দান করেছিলেন। উপরন্তু আল্লাহ-তায়ালা তাকে যুগ শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহঃ) -এর মত পরশ পাথরের সংস্পর্শ লাভেরও সুযোগ করে দিয়েছিলেন। যাঁর সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়ে, পূর্ণিমার আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অদম্য প্রেরণা নিয়ে মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) দেওবন্দ থেকে বের হলেন। জিহাদের অদম্য তামান্না নিয়ে হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) যখন দেওবন্দ থেকে যাত্রা করেন তখন তার মন-মস্তিষ্ক ছিল জিহাদী জযবার এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গীরি। তখন বলকান এবং তোরাবলাসের রক্তক্ষয়ী ঘটনাবলী তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রেশমি রুমাল আন্দোলন পরিচালনায় দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করে।

    শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) ছিলেন শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহঃ) -এর বিপ্লবী চিন্তাধারার সংরক্ষক এবং হযরত শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহঃ) -এর দ্বীনি অনুভূতির প্রতিচ্ছবি। দেশ ও জাতির দুর্দশায় তার পরম সহমর্মিতা ছিল। তিনি এক সময় দারুল উলুম দেওবন্দের মহাপরিচালক ছিলেন। তখনই তিনি আন্দোলন পরিচালনার জন্য প্রাথমিকভাবে সংগঠনের সদস্য তৈরি করেন। ধীরে ধীরে তার দলে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক সময় তিনি জিহাদের জন্য সর্বোতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অবশেষে তিনি “রেশমি রুমাল আন্দোলন” -এর ভিত্তি রাখেন। প্রাথমিক পর্যায়ে হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) তার প্রসিদ্ধ ছাত্র মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্দী (রহঃ) কে আন্দোলনের সদস্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাবুল পাঠান।

    ওদিকে তিনি তার ছাত্রদের মাধ্যমে দেশের প্রায় সকল এলাকায় একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এই নেটওয়ার্কের আওতায় তিনি বিভিন্ন স্থানে এই আন্দোলনের গোপন কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন।

    খদ্দরের পোশাক পরিহিত শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান, জ্ঞানী এবং একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ। তিনি হিন্দুস্তানের সর্বত্র ইংরেজ বিরোধী জনমত প্রতিষ্ঠার কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আঞ্জাম দেন। তিনি নিজেই ইসলামী বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, দেওবন্দের ভিত্তি স্থাপনই হয়েছে ১৮৫৭ সালের যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের জন্য।

    তিনি রহিম ইয়ার খান জেলার দ্বীনপুর, আসুট শরীফ, পীরজন্ডা এবং জেহলাম জেলায় মোট পাঁচটি গোপন ঘাটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেসব খাটি সুষ্কুভাবে পরিচালনার জন্য প্রতিটি ঘাটিতে একজন করে সেক্রেটারী নিযুক্ত করেন। ইয়ামানিস্তানের স্বাধীন অঞ্চলকে সৈন্যদের সশস্ত্র ট্রেনিং এর জন্য নির্ধারণ করেন। ভারতবর্ষের রাজনীতির ইতিহাসে এই সময়টা ছিল অত্যন্ত বিপদসংকুল। এর প্রতিটি পদক্ষেপেই রাশি রাশি বিপদের প্রবল আশংকা ছিল তখন নিজেদের আভ্যন্তরীণ গোপন পরামর্শের পরও কাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পারিপার্থিক পরিবেশের এই বিষাক্ত হাওয়া চারদিক থেকে গোটা কর্মসূচীকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

    মাত্র কিছুদিন পূর্বে ১৪ হাজার আলেমকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছে। অনেককে অথৈ সমুদ্রের অতল গহ্বরে চিরদিনের জন্য ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক আলেমকে বন্দীশালার অন্ধকার প্রকোষ্টে আবদ্ধ করে অগ্নিদগ্ধ টক্টকে লাল তাম্র কাঠি দিয়ে দাগ দেয়া হয়েছে। নির্যাতন-নিপীড়নের এসব বন্ধুর গিরি পথ পাড়ি দিয়ে নিস্পেষিত বনি আদমের ত্রাহি-ত্রাহি আত্মা দুঃসহ জীবন অতিক্রম করছিল। কিন্তু শত নির্যাতনের পরও ইংরেজ শাসক সেই বৃটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার মত সাহস তো দুরের কথা; তাদের বিরদ্ধে কিছু বলার চিন্তাটুকু করার মত সৎসাহসও কেউ করত না। সবাই সব সময় নিজের জীবন নিয়েই উৎকণ্ঠিত থাকত। সবার মনে সব সময় এসব প্রশ্ন উকি দিত যে, কে এই বন্ধাত্ব দূর করবে? কে এই নিস্ক্রিয়তার অবসান ঘটাবে? কে এই স্তিমিত আন্দোলন পুনর্জীবিত করবে? এসব প্রশ্ন হতাশ করছিলো সকলকে। ইত্যবসরে লোকেরা অবাক বিম্ময়ে দেখলো দারুল উলুম দেওবন্দের হাদীস শাস্ত্রের একজন স্বনামধন্য উস্তাদ মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে এ হতাশ পরিবেশের আমূল পরিবর্তন সাধনের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছেন।

    তার এই জগতজোড়া আন্দোলনের উদ্দেশ্য কি ছিল তা আমরা বৃটিশ রিপোর্টের মাধ্যমে জানতে পারি। সেই রিপোর্টের উদ্ধৃতি হল এমন "দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী উবায়দুল্লাহ সিন্ধী নামক তার এক নও মুসলিম ছাত্রকে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রেরণ করেন। এবং তিনি নিজে হিন্দস্তানের অভ্যন্তরে গোপন কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তার সেই ছাত্র উবাইদুল্লাহ সিন্ধী আফগানিস্তান থেকে ইস্তাম্বুল, সেখান থেকে তুরঙ্ক হয়ে রাশিয়া এবং চীনে যান। সব জায়গাতেই তিনি সর্ব সাধারণকে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেন।" তার এই প্রাণপণ প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে দেশের ভেতরের এবং বাইরের শক্তিসমূহের সাহায্যে যেন এক সময় যুগপৎ ভাবে বিদ্রোহ শুরু করা যায়।

    এদিকে শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আরব সফর করেন, সেখানে তিনি মদীনার তৎকালীন গভর্ণর গালেব পাশা এবং আনোয়ার পাশার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তারা তুরস্কসহ কয়েকটি রাষ্ট্রে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠান। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল ঘটনাটি খুব দ্রুত ফাঁস হয়ে যায়।

    ওদিকে শাইখুল হিন্দ (রহঃ) সেই পত্রটির একটি কপি মাওলানা খলীল আহমাদ (রহঃ) -এর মাধ্যমে হিন্দুস্তান পাঠিয়ে দেন। যেহেতু ঘটনাটি আগেই ফাঁস হয়ে গেছে, তাই চিঠি খানা হিন্দুস্তান প্রবেশের পূর্বেই তার পথ রোধ করে ইংরেজ সরকার বোম্বাই নৌবন্দরে হাজার হাজার পুলিশ মোতায়ন করে। তারা আগত প্রত্যেক যাত্রীর মালামাল চেক করে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা স্বীয় কুদরত দিয়ে চিঠিখানা তাদের হাত থেকে রক্ষা করেন।

    অতঃপর পত্রটির বৃহুল প্রচারের উদ্দেশ্যে কপি তৈরি করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। যখন দিল্লীর একটি প্রসিদ্ধ ফটোগ্রাফারের দোকানে এর কপি তৈরীর জন্য কাজ চলছিল তখন সেখানে অভিযান চালানো সত্বেও আল্লাহর পাকের অনুগ্রহে তা সংরক্ষিতই থেকে যায়।

    পরিশেষে যখন দূত চিঠি খানা নিয়ে উড়ো জাহাজে ওঠে তখন বৃটিশ বেনিয়াদের গোয়েন্দারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ পাঠায় যে, যদি আজকের ফ্লাইট চলে যায় তাহলে আগামী দিনের এই সময়ের মধ্যে বৃটিশ সাম্রাজ্যের পতন অনিবার্ধ হয়ে পড়বে। সংবাদ পেয়ে তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেয়া হল। উড্ডয়ন রোধ করে প্লেন আটকিয়ে চিঠিটি উদ্ধার করা হয়।

    অন্যদিকে আন্দোলনের প্রধান অধিনায়ক শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) কে মক্কা থেকে গ্রেফতার করে তাৎক্ষণিকভাবে জিদ্দার রাস্তায় কায়রো পাঠানো হয়। সেখানের আদালতে তার যবানবন্দী গ্রহণ করে তাকে মাল্টায় নযর বন্দী করে রাখা হয়।

    হযরত মাওলানা মাহমূদুল হাসান (রহঃ) -এর এই আন্দোলনই “রেশমী রুমাল আন্দোলন” নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই খ্যাতির কারণ, এই আন্দোলনে একজনের বার্তা অন্যজনের নিকট পৌঁছানোর কৌশল হিসেবে বার্তাটিকে রেশমী রুমালের উপর অঙ্কন করে রুমালটি পাঠিয়ে দেয়া হত। তার মধ্যে লেখা উহ্য থাকতো। আপাত দৃষ্টিতে কোন লেখা আছে বলে মনে হত না। প্রাপক রুমালটি পেয়ে পানিতে ভিজিয়ে সূর্যের আলোতে ধরলেই লেখা ভেসে উঠতো এবং সে চিঠির মর্ম উপলদ্ধি করে নিত।

    আজ আমাদের বিলাসী মন-মানসিকতার লোকদের জন্য গভীর চিন্তার বিষয় যে, মুজাহিদগণ কিভাবে নিজেদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে আযাদী আন্দোলনের বৃক্ষে পানি সিঞ্চনের কাজ করেছেন! স্বৈরাচারী, অভিশপ্ত ইংরেজরা আযাদী সংগ্রামের প্রধান অধিনায়ক শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) কে তার চার সাথীসহ খৃষ্টানদের প্রসিদ্ধ দ্বীপ মাল্টায় বন্দী করে রাখে। সেখানে তিনি তার জীবনের বিরাট একটি অংশ দুঃসহ অবস্থায় অতিক্রম করেন। বন্দীদশার শত কষ্ট-ক্লেশকে চির ম্লান করে দিয়ে সেখানে বসেই শাইখুল হিন্দ (রহঃ) মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের একটি ঐতিহাসিক তাফসীর রচনা করেন। শাইখুল হিন্দ (রহঃ) কে যে কারাগারে রাখা হয়েছিল, সেখানে গোটা পৃথিবীর বড় বড় ইংরেজ বিরোধীদেরকে বন্দী করে রাখা হত। তারা সকলেই হযরত শাইখুল হিন্দ (রহঃ) -এর জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তাই তারা এই বন্দীকালীন সময়টাকে সুযোগ মনে করে সকাল-সন্ধ্যা শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) -এর সংশ্রবে বসে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা পর্যালোচনা করে তর কাছ থেকে জ্ঞান-গর্ভ বক্তব্য শুনে উপকৃত হতেন।

    ওদিকে চলমান আন্দোলনের পুরোধা শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) কে গ্রেফতারের প্রতিবাদ এবং তাকে মুক্ত করার আন্দোলন হিন্দুস্তানে প্রবল হয়ে ওঠে। বেগবান হয় আন্দোলনের গতিধারা। পরিশেষে টানা চার বৎসর বন্দীজীবন কাটানোর পর ১৯১৯ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। দীর্ঘ এবং দুঃসহ এই কারাভোগের ফলে চরম দুর্বলতা এবং অক্ষমতা শাইখুল হিন্দ (রহঃ) কে গ্রাস করে ফেলে। ফলে চলা-ফেরায় তিনি অনেকটা অসমর্থ হয়ে পড়েন। মাল্টা থেকে দেশে আসার সময় শাইখুল হিন্দ (রহঃ) কে বহনকারী জাহাজটি যখন বোম্বাই নৌ-বন্দরে পৌছে তখন যে দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিলো; তা ছিল সত্যিই অপূর্ব, অব্যক্ত এবং চির স্মরণীয়। সে দিন গোটা ভারতবর্ষের এমন কোন রাজনীতিক বাকী ছিলেন না যিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের এই অন্যতম বীর সিপাহসালারকে দেখার জন্য বন্দর পানে ছুটে আসেননি। মুক্তি-পাগল লাখো জনতার ঢল সেদিন বোস্বাই নৌ-বন্দরের সকল কার্যক্রম স্থবির করে দিয়েছিল। শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) কে এক নজর দেখাই ছিল সেদিন সকলের একমাত্র বাসনা। বোম্বাই থেকে দিল্লী হয়ে দেওবন্দ পর্যন্ত অর্থাৎ তার সে দিনের গন্তব্যে পৌছার পথের প্রতিটি স্টেশনেই স্বাধীনতা প্রিয় লাখো মুসলিম জনতার উপচে পড়া ভীড় ছিল সত্যিই দেখার মত।


    মুক্তি লাভের কিছুদিন পর হযরত শাইখুল হিন্দ (রহঃ) অসুস্থতার কোলে ঢলে পড়েন! তখন তিনি দিল্লীতে তার স্বাধীনতা আন্দোলনের ত্যাগী নেতা হাকীম আজমল খাঁনের চিকিৎসালয়ে ডাক্তার আনছারীর বাড়ীতে চিকিৎসাধীন থাকেন। এই অসুস্থতার মাঝেই শয্যাশায়ী অবস্থায় একবার তিনি আলীগড় ইউনিভার্সিটির এক বিশাল সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। তখন আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী (রহঃ) তার পক্ষ থেকে যে ভাষণ পাঠ করেন তা ছিল রীতিমত আশ্চর্যজনক এবং বিরল প্রমাণাদী সম্বলিত! যার প্রতিটি অক্ষরেই ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতি চরম ঘৃণা, অবজ্ঞা ও বিদ্বেষের অপূর্ব চিত্র ফুটে উঠে।

    হিন্দস্তানের আকাশে উদিত জগৎ উদ্ভাসিক এই খ্যাতিমান সূর্য দীর্ঘ দিন আলো বিচ্ছুরণের পর পরিশেষে ২১ নভেম্বর ১৯২০ সালে ভূ-পৃষ্ঠকে আধার করে, সকলকে শোক সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে চিরদিনের জন্য অস্তমিত হয়ে যায়। মৃত্যুর পর তার লাশ আলীগড় থেকে দেওবন্দ নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

    মুফতী এন্তেজামুল্লাহ শিহাবী (রহঃ) তার বিখ্যাত “উলামায়ে হক এবং তাঁদের উপর নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা' নামক গ্রন্থে একটি মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি লেখেন- শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) -এর পবিত্র মৃত দেহ গোসল দেয়ার সময় যখন উপুড় করা হয় তখন উপস্থিত সকলে শিহরিত হয়ে উঠেন। তারা লক্ষ্য করেন যে, তার কোমরে হাড্ডি ছাড়া আর কিছুই নেই।

    এ ব্যাপারে তার প্রিয় ছাত্র এবং কারা জীবনের সাথী হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, মাল্টার কারাগারে বন্দী অবস্থায় শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) কে প্রত্যহ সকাল-বিকাল একটি ছোট্ট কক্ষে নিয়ে যাওয়া হত। সেখানে তাঁকে উপুড় করে শুইয়ে উত্তপ্ত লাল টকটকে লোহা তার কোমরে চেপে ধরা হত এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে তার অকুতোভয় অবস্থান থেকে ফিরে আসার জন্য তাঁকে চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হত। কিন্তু শ্রদ্ধেয় উস্তাদ হযরত শাইখুল হিন্দ (রহঃ) সব সময়ই এমন উত্তর দিতেন যে, স্বয়ং অত্যাচারীদের চোখও অশ্রু সজল হয়ে যেত। এভাবে শত প্রলোভন ও অকথ্য নির্যাতন চালিয়েও যখন তারা হযরতকে এক বিন্দুও টলাতে পারেনি এবং পারার আশাও করতে পারেনি। তখন তারা তাদের এই অমানবিক নির্যাতন থেকে বিরত থাকে।

    হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহঃ) বলেন, আমার উস্তাদ আমাকে শপথ করিয়ে বলেছিলেন, আমি যেন তার জীবদ্দশায় বন্দী জীবনের এসব অমানবিক অত্যাচারের তথ্য প্রকাশ না করি। আজ তিনি ধরা-ধামে নেই। তিনি আজ তারপ্রিয় মনিবের অতিথি হয়ে তার দরবারে উপস্থিত হয়েছেন। তাই আজ আমি কথাগুলো আপনাদের সামনে নিঃসংকোচে প্রকাশ করছি।

    শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহঃ) দীর্ঘ দিন যাবত দারুল উলূম দেওবন্দে হাদীসে নববীর দরস দেন। তিনি মহা গ্রন্থ আল-কুরআনের অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য একটি তরজমা লেখেন। যা প্রবর্তীতে তাফসীরে উসমানী নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। তিনি আরবী সাহিত্যের অলংকার শাস্ত্রের অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য কিতাব “মুখতাসারুল মাআনীর ” আরবী টাকা সংযোজন করেন। এছাড়াও তিনি ছোট-বড় অনেক গ্রন্থ রচনা করে জাতিকে উপহার দিয়ে যান।

    তার জ্ঞানদীপ্ত শিক্ষা ও দীক্ষা গ্রহণ করে এমন অনেক মহা মনীষী তৈরী হয়েছেন; যাঁদের দৃষ্টান্ত পেশ করতে গোটা ইসলামী জগৎ আজো সক্ষম হয়নি। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ক'জন হলেনঃ

    ১. হাকীমুল উম্মত, মুজাদ্দেদে মিল্লাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ)

    ২. দাওয়াত ও তাবলীগ জামা'আতের রূপকার ও পুরোধা হযরত মাওলানা ইলিয়াস দেহলভী (রহঃ)

    ৩. ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম শীর্ষ নেতা, অকুতোভয় সিপাহসালার হযরত মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধী (রহঃ)

    ৪. যুগ শ্রেষ্ঠ আলেম, অনুপম স্মৃতিশক্তির অধিকারী আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহঃ)

    ৫. যুক্তির দিশারী শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহঃ)

    ৬. বিশিষ্ট ইসলামী আইন শাস্ত্রবিদ মুফতী কেফায়েতুল্লাহ দেহলভী (রহঃ)

    ৭. শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী (রহঃ) প্রমুখ

    এরা সেসব ব্যক্তিত্ব, যাদের জ্ঞান, মহানুভবতা, উদারতা, খোদাভীতি, পরহেযগারী, বীরত্ব, রাজনীতি, দাওয়াত, তালীম, জিহাদ ও রচনার বিষয়ে শক্র-মিত্র নির্বিশেষে সকলই তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
    হে আল্লাহর পথের সৈনিক! ধৈর্যধারণ করুন ও হকের উপর অবিচল থাকুন। নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য।

  • #2
    মুহতারাম! তথ্যসূত্র গুলো উল্লেখ করলে বেশী পূর্ণ হতো ইনশাআল্লাহ।
    অনেক অনেক জাযা-কুমুল্লা-হু খাইরান আহসানাল জাযা
    Last edited by tahsin muhammad; 06-09-2023, 05:51 PM.
    হয় শাহাদাহ নাহয় বিজয়।

    Comment


    • #3
      এই লেখাগুলো মূলত সিপাহে সাহাবার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা জিয়াউর রহমান ফারুকী রহ. এর লেখা ইউরোপ কি সংগিন মুজরেম বই থেকে নেওয়া।
      হে আল্লাহর পথের সৈনিক! ধৈর্যধারণ করুন ও হকের উপর অবিচল থাকুন। নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য।

      Comment


      • #4
        Originally posted by Abdul Khalek View Post
        এই লেখাগুলো মূলত সিপাহে সাহাবার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা জিয়াউর রহমান ফারুকী রহ. এর লেখা ইউরোপ কি সংগিন মুজরেম বই থেকে নেওয়া।
        ঠিক আছে ভাই!
        জাযা-কুমুল্ল-হু খইরন আহসানাল জাযা!

        জীবনী গুলো পড়ে অনেক স্পৃহা তৈরী হয়। আলহামদুলিল্লাহ। সকলেরই আকারিরদের জীবনি পড়া উচিত।
        হয় শাহাদাহ নাহয় বিজয়।

        Comment

        Working...
        X