শাইখ ইয়াদ আল-গালি : আফ্রিকার সবচেয়ে দুর্ধর্ষ জিহাদি কমান্ডার
হামিদ আল-কৌসি
অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান
হামিদ আল-কৌসি
অনুবাদ: মুনশি আব্দুর রহমান
তিনি হলেন উত্তর মালির কিদাল অঞ্চলের এক যাযাবর তুয়ারেগ পশুপালকের সন্তান ইয়াদ আল গালি। সাবেক এক কূটনীতিক থেকে তিনি আজ সাহেল অঞ্চলের জিহাদি সংগঠনগুলোর অন্যতম প্রভাবশালী ও দুর্ধর্ষ নেতায় পরিণত হয়েছেন। ২০১৭ সাল থেকে তিনি ‘জামাআত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন’ (JNIM)-এর নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এটি সাহেল অঞ্চলে আল-কায়েদার একটি শাখা। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, তিনি এই সংগঠনটিকে গোটা অঞ্চলের জন্য হুমকিস্বরূপ সবচেয়ে শক্তিশালী এক সশস্ত্র গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
৬৭ বছর বয়সী আল গালি কিদালের এক যাযাবর পশুপালক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পশ্চিম আফ্রিকায় আল-কায়েদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠার আগে তাঁর জীবনের গতিপথ নানা বাঁক পেরিয়ে এসেছে। তিনি কখনও কাজ করেছেন কূটনীতিতে, কখনও মধ্যস্থতা করেছেন জিম্মি মুক্ত করার ক্ষেত্রে, আবার কখনও প্রত্যক্ষ সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত থেকেছেন।
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকায় সালাফি মতাদর্শ প্রসারে সক্রিয় ‘দাওয়াত ও তাবলিগ’-এর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাথে তিনি যুক্ত হন। পরবর্তীতে আলজেরিয়ার ‘সালাফিস্ট গ্রুপ ফর প্রিচিং অ্যান্ড কমব্যাট’ (GSPC)-এর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, যা পরে ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাগরেব’ (AQMI) নামে আত্মপ্রকাশ করে। এই সম্পর্কের মধ্য দিয়েই তাঁর জিহাদি চেতনার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত হয়। সেই সময়ে পশ্চিমা জিম্মিদের মুক্ত করার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই কাজ তাকে আলজেরিয়ার শীর্ষ জিহাদি নেতাদের সাথে এক বিস্তৃত যোগাযোগের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
আল গালির এমন একটি সামরিক অতীত রয়েছে, যা অনেকের কাছেই অজানা। গত শতাব্দীর আশির দশকে তিনি লিবিয়ার তৎকালীন নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির গঠিত একটি সংরক্ষিত বাহিনী ‘ইসলামিক লিজিয়ন’ (প্যান-আফ্রিকানিস্ট)-এ যোগ দেন। ১৯৮২ সালে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-এর সাথে যুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি বৈরুতে লিবীয় বাহিনীর হয়ে তিনি কাজ করেন। এরপর ১৯৮৭ সালে লিবিয়া-চাদ যুদ্ধেও তিনি লড়াই করেন। সশস্ত্র জিহাদের পথে পা বাড়ানোর আগে লিবিয়া ও আলজেরিয়ায় তিনি একজন মেকানিক এবং প্রশাসনিক কর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন।
১৯৯০ সালে আল গালি "উত্তরের অধিবাসীদের দুর্দশা"-র অবসানের স্লোগান তুলে তুয়ারেগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে সশস্ত্র লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। ১৯৯৬ সালে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তিনি মালির সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং ব্যবসায়ের দিকে মনোযোগ দেন। এরপর তিনি কিছুকালের জন্য লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান।
২০০২ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সৌদি আরবে মালির দূতাবাসে কনস্যুলার উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আল গালি। মালির কূটনীতিকদের মতে, সেই সময়ে তিনি সালাফি মতাদর্শের আরও কাছাকাছি চলে আসেন এবং তাঁর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি দৃশ্যত আরো বেশি রক্ষণশীল হয়ে ওঠে।
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পালাবদলটি ঘটে ২০১১ সালে, যখন তিনি ‘আনসার আদ দ্বীন’ নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১২ সালে মালিতে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের পর খুব দ্রুতই এই গোষ্ঠীটি উত্তর মালির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সেখানে শরিয়া আইন কার্যকর করে। সেই সময়ে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত ও পাথর নিক্ষেপের মতো শাস্তির পাশাপাশি গানবাজনা নিষিদ্ধ করা হয়। টিম্বাক্টু শহরে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় থাকা ১৬টি সমাধিসৌধের মধ্যে ১৪টি তারা ধ্বংস করে দেন। এই কার্যকলাপের জের ধরে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনে।
২০১৩ সালে ফরাসি সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে মালির এই জিহাদি প্রকল্পটি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। তবে ২০১৭ সালে আল গালি এক অভূতপূর্ব শক্তি নিয়ে আবারও ফিরে আসেন। তিনি সে-সময় ‘আনসার দ্বীন’, ‘কাতিবা ম্যাসিনা’ এবং ‘আল-মুরাবিতুন’—এই তিনটি গোষ্ঠীকে একীভূত করে "জামাআত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন" (JNIM) নামক একক একটি প্ল্যাটফর্ম গঠনে সক্ষম হন।
সংগঠন পরিচালনার অসামান্য দক্ষতা এবং আল-কায়েদার সাথে সম্পৃক্ত অথচ পূর্বে দ্বন্দ্বে লিপ্ত গোষ্ঠীগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার অসাধারণ সক্ষমতার কারণে বিশেষজ্ঞরা তাকে একজন দক্ষ "কৌশলবিদ" হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তাঁর নেতৃত্বে এই জামায়াতের প্রভাব কেবল মালিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বুরকিনা ফাসো, নাইজার, টোগো এবং বেনিন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এমনকি উত্তর নাইজেরিয়াতেও এর আধিপত্য ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি, পশ্চিম মালিতেও এই গোষ্ঠী তাদের উপস্থিতি সুদৃঢ় করেছে; বিশেষ করে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ‘কায়েস’ অঞ্চলে। দেশের মোট উৎপাদিত স্বর্ণের ৮০ ভাগই আসে এই অঞ্চল থেকে। তাছাড়া, এটি মালির অভ্যন্তরে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জামায়াত তুলনামূলক নমনীয় শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তারা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা রোধ এবং নারীদের হিজাব পরিধানের মতো সামাজিক নিয়মকানুনগুলো আরোপের পাশাপাশি স্থানীয় সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে বিভিন্ন চুক্তিতেও আবদ্ধ হয়েছে। সংগঠনটিতে জনবল বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রভাবকে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে তারা আরবি, ফুলানি এবং বামবারা ভাষাতেও তাদের প্রচার মাধ্যমকে বিস্তৃত করেছেন।
এই সংগঠনটি মূলত স্থানীয় সম্পদের ওপরই নির্ভরশীল। তবে সম্প্রতি জিম্মিদের মুক্তিপণের বিনিময়ে তারা কয়েক কোটি ডলার অর্জন করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো এক সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিক এবং তাঁর সঙ্গীদের মুক্তির বিনিময়ে পাওয়া ৫ কোটি ডলারের মুক্তিপণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নজিরবিহীন অর্থের পরিমাণ সংগঠনটিকে বিশাল এক কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে।
বর্তমানে ইয়াদ আল গালিকে গোটা সাহেল অঞ্চলের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ সামরিক নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে "সন্ত্রাসী" হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাঁকে খুঁজছে।
সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসে রমজান চলাকালীন তাকে প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল। সে-সময় তিনি তাঁর সংগঠনের অন্যান্য নেতাদের সাথে জামাতে সালাত আদায় করছিলেন।
*****
Comment