
আমার স্বামী দিনের অধিকাংশ সময় ঘরের বাইরে জিহাদের কাজে কাটাতেন। এসময়টাতে আমার এই বোনের সাথে সময় কাটাতে লাগলাম। বোনের সাথে যত সময় কাটাচ্ছিলাম ততই আমার স্বামীর কথা সঠিক প্রমাণিত হচ্ছিল। আসলেই এই বোন থেকে আমি অনেক কিছু শিখার সুযোগ পেয়েছিলাম। আল্লাহ তাআলা বোনকে ইলম, বুঝশক্তি ও প্রশিক্ষণের কৌশল দ্বারা সৌভাগ্যবান করেছিলেন। আমি যেহেতু আমলী জিন্দেগিতে নতুন তাই বৈবাহিক জীবনের নানান বিষয়ে অজ্ঞ ছিলাম। একজন অভিভাবকের অভাব গভীরভাবে অনুভব করতাম। বোন আমার এই অভাবকে উত্তমভাবে পূর্ণ করেছিলেন। তিনি নানান বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ, উপকারী অভিমত ও কার্যকরী উপদেশ দ্বারা আমাকে সাহায্য করেছেন। এসকল কারণেই সময়ের সাথে সাথে বোনের সাথে বন্ধুত্ব ও মুহাব্বতের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে যায়।
এখানে থাকাকালীন সময়েই আমি বুঝতে পারলাম যে, একজন পুরুষের জন্য স্ত্রীকে সময় দেয়াটাই জীবনের আসল উদ্দেশ্য ও অগ্রগণ্য বিষয় নয়। বরং আসল উদ্দেশ্য হলো যে ক্ষেত্রে আল্লাহর রহমত আছে, সে ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সহযোগী হবে।
এ কারণেই আমার স্বামীর অধিকাংশ সময় জিহাদি কাজে ব্যয় করার জন্য নির্ধারিত ছিল। তারপরও আমার মানসিক চিন্তা-ফিকিরের পরিশুদ্ধতার প্রতিও তাঁর পরিপূর্ণ খেয়াল ছিল। প্রথমত তিনি আমাকে শায়খ সাফারুল হাওয়ালীর কিতাব ‘সর্বশেষ কি হবে?’ পড়তে দিয়ে বলেছিলেন– “তুমি প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পুরো কিতাবটি পড়বে, আমি তোমার পরীক্ষা নিব।” ঐ সময় পর্যন্ত আমার কিতাবাদির সাথে বিশেষ কোনো সম্পর্ক ছিল না।
যাই হোক, হাকিমের কল্যাণকর হুকুম অনুযায়ী কিতাব পড়া শুরু করে দেই। তবে কিতাবটি পড়ার সময় আমার চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী পড়েছি অর্থাৎ প্রথম পৃষ্ঠা দেখেছি, লেখকের নাম পড়েছি, পূর্বকথা, ভূমিকা ইত্যাদি বিষয় যেগুলোকে জরুরি মনে করিনি, ছেড়ে দিয়েছি। শুধু কিতাবের মূল অংশটি পড়েছি। তারপর একদিন তিনি সুযোগ পেয়ে পরীক্ষা নেয়ার জন্য বসে পড়লেন। সময়টা ছিল শীতকালের দিনের বেলা। এসময় রোদের তাপ ছড়িয়ে পড়ছিল। তিনি রুমের বাইরে বারান্দায় একটি পিলারের সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়লেন এবং আমাকেও বসার জন্য বললেন। আমি যেহেতু সবে মাত্র শহুরে জীবন ছেড়ে এসেছি, তাই কাপড় ময়লা হয়ে যাবে মনে করে থেমে গেলাম। কিন্তু তিনি আমাকে জোরপূর্বক মাটিতেই বসিয়ে দিলেন (অনেকদিন পর বুঝতে পেরেছিলাম যে, এটাও আমার প্রশিক্ষণের অংশ ছিল। এটা এই জন্য যেন আমার অন্তরে নমনীয়তা আসে এবং কৃত্রিমতা ছেড়ে যেন আমি প্রকৃতির কাছাকাছি আসতে পারি)।
পরীক্ষা শুরু হলো। প্রথম প্রশ্ন ছিল: ‘কিতাবের নাম এবং লেখকের নাম কি?’ আমি এর উত্তর দিয়ে দিলাম। অতঃপর প্রশ্ন করলেন– “লেখক কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন? এবং তিনি কোন এলাকার?” আমি পেরেশান হয়ে বললাম– “কিতাবের মূল অংশের কোথাও এ কথা লেখা নেই।” এটা শুনে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন– “প্রথম পৃষ্ঠার মধ্যভাগে লেখকের পুরো পরিচয় আছে।” তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়তে বলার উদ্দেশ্য কি। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে কিতাব পড়ার নিয়মাবলীর বিষয়টা আমার পরিপূর্ণ শেখা হয়ে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ।