"সর্বোত্তম পাথেয়"
বর্তমান সময়ে আমরা হাজার হাজার ওয়াজ নসীহাহ শুনি, শত শত বই পড়ি, কিন্তু কতগুলো নসীহাহ মনে রাখতে পারি? দেখা যায় একটা নসীহা শুনলে আরেকটা নসীহাহ ভুলে যাই। ফলে আমাদের আমলেও ঘাটতি পড়ে। তাই আমি ( লেখক) পবিত্র কুরআন থেকে এমন কয়েকটি আয়াত নিয়ে আলোচনা করেছি যে আয়াত সমূহের ব্যাপারে আমি মনে করি, যে কেউ এই আয়াতগুলো যতবেশি ভালোভাবে বুঝবে, অন্তর দিয়ে চিন্তা করবে সে জীবনের সবক্ষেত্রে তার উপর ফরয ওয়াজিবগুলো আদায় করার ব্যাপারে ততবেশি সতর্ক হবে, গুনাহ থেকে বাঁচার ব্যাপারে সতর্ক হবে।
এই আয়াতগুলোর মধ্যেই রয়েছে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সকল সমস্যার সমাধান। আজ উম্মাহর যত সমস্যা, যত নির্যাতন নিপিড়ন এই সব কিছু থেকে মুক্তি পেতে হলে এই আয়াত সমূহের উপরেই আমল করতে হবে। তাই প্রতিটি আলেম, উলামা, ও সাধারন মুসলিমের উচিত হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি কাজে, প্রতিটি পদক্ষেপে এই আয়াতগুলো স্মরন রাখা। নিজের নাম যেভাবে স্মরন রাখে, নিজের বাবা, মায়ের নাম যেভাবে স্মরন রাখে নিজের বাড়ির নাম যেভাবে স্মরন রাখে তার চাইতেও বেশি এই আয়াত সমূহ স্মরন রাখতে হবে।
কঠিন দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলে ওষুধ খাওয়ার কথা যেভাবে অক্ষরে অক্ষরে মনে রাখে তার চাইতেও বেশি এই আয়াত সমূহ মনে রাখতে হবে। মোট কথা ঘুমানোর সময় ব্যতিত বাকি প্রতিটি সময় এই আয়াতগুলো স্মরন রাখতে হবে এবং আমল করতে হবে, এই আয়াত সমূহের আলোচনা ব্যাপকভাবে হতে হবে, বার বার মানুষের সামনে আলোচনা হতে হবে। প্রতিটি খুতবা, ওয়াজে, দারসে বিভিন্ন ভাবে এই আয়াতের উপর আলোচনা হতে হবে। যাতে প্রতিটি মানুষ দ্বীনের অন্যান্য বিধি বিধান না জানলেও বা কম জানলেও অন্তত এই আয়াতগুলোর ব্যাপারে যেন বিস্তারিত জানে। কেননা কেউ যদি ভালোভাবে এই আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা করে, তার অন্তর এই আয়াতের আলোচনা প্রভাব সৃষ্টি করে তাহলে সে নিজেই দ্বীনের বিধিনিষেধ মানার ব্যাপারে আলেম উলামার নিকটে যাবে।
আসুন আমরা সেই আয়াতসমূহ নিয়ে কিছু আলোচনা পড়ি ও নিজে নিজে একটু চিন্তা করি। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَ مَنۡ یَّتَّقِ اللّٰهَ یَجۡعَلۡ لَّهٗ مَخۡرَجًا ۙ﴿۲﴾ وَّ یَرۡزُقۡهُ مِنۡ حَیۡثُ لَا یَحۡتَسِبُ ؕ
"আর যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন। এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রিযিক দান করবেন।" (সূরা তালাক ২, ৩)
আলোচ্য আয়াতে تقوى তথা আল্লাহভীতির দু'টি কল্যাণ বর্ণিত হয়েছে-
এক. আল্লাহভীতি অবলম্বনকারীর জন্য আল্লাহ তা'আলা নিষ্কৃতির পথ করে দেন। কি থেকে নিষ্কৃতি? এ সম্পর্কে সঠিক কথা এই যে, দুনিয়ার যাবতীয় সংকট ও বিপদ থেকে এবং পরকালের সব বিপদাপদ থেকে নিষ্কৃতি।
দুই. তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দান করেন, যা কল্পনায়ও থাকে না। এখানে রিযিকের অর্থও ইহকাল এবং পরকালের যাবতীয় প্রয়োজনীয় বস্তু।
এই আয়াতে মু'মিন-মুত্তাকীর জন্য আল্লাহ্ তা'আলার এই ওয়াদা ব্যক্ত হয়েছে যে, তিনি তাঁর প্রত্যেক সমস্যাও সহজসাধ্য করেন এবং তার অভাব-অনটন পূরণের দায়িত্ব গ্রহণ করে এমন পথে তার প্রয়োজনাদি সরবরাহ করেন, যা সে ধারণাও করতে পারে না- (রুহুল মা'আনী)
যে ব্যক্তিই আল্লাহকে ভয় করবে আল্লাহ তার প্রতিটি সমস্যা সমাধানের পথ বাহির করবেন। একটি কাজ তখনই আমাদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে যখন আমরা কাজের ফলাফল সম্পর্কে অবগত হই। কঠিন কাজটিও সহজ হয়ে যায় যখন কোন কাজের বিরাট পুরষ্কার সম্পর্কে জানতে পারি । আমরা তাকওয়া অর্জনের ব্যাপারে অনেক আলোচনা শুনি কিন্তু তাকওয়ার পুরষ্কার সম্পর্কে আমরা খুব একটা জানি না। অত্র আয়াতে আল্লাহকে ভয় করার দুটি মহান পুরষ্কার ঘোষনা করেছেন। প্রথমত সমস্যা থেকে উত্তরনের পথ বের করে দিবেন আর দ্বীতিয়তা অকল্পনীয় উৎস থেকে রিযিক দিবেন।
এমন অনেক ঘটনা আছে যারা ব্যক্তিজীবনে আল্লাহকে ভয় করার ফলে অনেক বড় বড় সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিকও লাভ করেছেন । কিন্তু এখানে ব্যক্তি জীবনের ঘটনা উল্লেখ না করে দুইটি শহরের মানুষ নিয়ে আলোচনা করবো। যাদের মধ্যে একটি শহরের মানুষ আল্লাহকে ভয় করার কারনে সীমাহীন সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়েছিলো। সে শহরটি হলো মদীনা। এই শহরের মানুষ গুলো নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করতো। ঠুনকো বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর যুদ্ধ করতো। কোন ভাবেই সমস্যা থেকে উত্তরনের পথ পাচ্ছিল না। কিন্তু ঈমান আনার কারনে ও আল্লাহকে ভয় করার কারনে তাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় কল্পনাতীত ভাবে, যারা এক সময় নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করতো তারাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। বাবা, দাদা, কিংবা ভাইয়ের হত্যাকারির সাথে মিলিমিশে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করা কি সাধারন ব্যাপার? জিহাদের বরকতে আল্লাহ মদীনাতে অকল্পনীয় উৎস থেকে রিযিকের ব্যবস্থাও করে দেন।
অপরদিকে আরেকটি শহর মক্কার অবস্থা ছিলো খুবই ভালো। তাদের সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়:
"আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেথায় আসতো সর্বদিক হতে প্রচুর জীবনোপকরণ; অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল; ফলে তারা যা করত, তার জন্য আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ। " (সূরা নাহল ১১২)
অধিকাংশ তাফসীরকারকদের মতামত হলো এই আয়াতে মক্কাবাসীর উপমা বর্ননা করা হয়েছে। তারা ছিলো নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। যেখানে প্রচুর রিযিক আসতো। কিন্তু তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করেছে, তারা ঈমান আনে নি আল্লাহকে ভয়ও করে নি। উল্টো মুসলিমদের কঠিন কষ্ট দিয়েছিলো। ফলে তাদের উপর সাত বছর দুর্ভিক্ষ চেপে বসে। এমন দুর্ভিক্ষ যে, তারা হাড় ও গাছের লতাপাতা, কুকুর, ময়লা আবর্জনা খেয়ে জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।
যে সমাজের মানুষ আল্লাহকে ভয় করবে তারা মদীনা বাসীর মতই দুনিয়া আখিরাতে সফল হবেন।
এখন আল্লাহর ভয় বলতে আমরা কি বুঝি? আমরা মনে করে থাকি মদ, জুয়া, ঘুষ, যিনা থেকে বিরত থাকাই হলো আল্লাহর ভয়। কিন্তু আমরা যখন নামাযে দাড়াই, কিংবা রোজা রাখি অথবা দ্বীনি অন্য যেকোন কাজ করি সেক্ষেত্রে আমরা কি আল্লাহকে ভয় করি? যে ব্যক্তি নামায পড়ে না তার ক্ষেত্রে আমরা বলে থাকি আল্লাহকে ভয় করো। কিন্তু আমরা যারা নামায পড়ি তারা কি নামাযে মনোযোগ থাকার ব্যাপারে, কিরাত সহিহ ও রুকু সিজদা ঠিক থাকার ব্যাপারে আল্লাহর ভয়ের কথা স্মরন করি?
যে ব্যক্তি দ্বীনের পথে বাঁধা দেয় তার ব্যাপারে আমরা আল্লাহকে ভয় করার কথা বলি, কিন্তু যারা দ্বীনের বিভিন্ন অঙ্গনে কাজ করে যাচ্ছেন তারা কি দ্বীনি কাজ ঠিক মত হচ্ছে কিনা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীদের মত হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে আল্লাহকে কতটুকু ভয় করি? উম্মাহর ঐক্য নষ্ট হবে এমন কোন কথা বলার আগে আমরা কি আল্লাহকে ভয় করি? যখন দ্বীন কায়েমের পথ ও পদ্ধতি কি হবে সেটা নিয়ে ইখতেলাফ হয়, যখন কোন মাসআলা নিয়ে মতভেদ তৈরী হয় তখন আমরা কি আল্লাহকে ভয় করার কথা চিন্তা করি নাকি নিজের দল বা নিজ পছন্দের আলেমের মতামত প্রাধান্য দেই?
আমরা মনে করি , নামায পড়া, রোজা রাখা ও দ্বীনি অন্যান্য কাজ করছি সেটাইতো অনেক, কিন্তু সেটা কুরআন সুন্নাহ মত হচ্ছে কিনা, যথাযথ হক সহ আদায় করতে পারছি কিনা সেটার দিকে অনেকক্ষেত্রে গুরুত্ব কম দেই। ফলে আমাদের উম্মাহর সমস্যা দিন দিন শুধু বাড়তেছে। আমাদের পারিবারিক সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনে সমস্যার কোন শেষ নেই। পরিবারগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে, দাম্পত্য নিয়ে কত আলোচনা হচ্ছে কিন্তু কোন সমাধান হচ্ছে না। আমাদের সামাজিক জীবনে কত সমস্যা, হানাহানি মারামারির শেষ নেই, যুবক তরুনরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, মাদক আরও বাড়ছে, বেকারত্ব, মূর্খতা বেড়েই চলছে। আর রাষ্ট্রীয়ভাবে তো অশান্তির কোন সীমা নাই।
এসব কিছুর মূল কারনই হচ্ছে আমরা আল্লাহকে ভয় করি না। যার কারনে সমস্যা থেকে উত্তরনের সঠিক কোন সমাধান বের করতে পারি না। আমাদের অবস্থা ওই ডাক্তারের মত যে শুধু রোগীর বাহ্যিক ব্যাথা যন্ত্রনা দেখেই ওষুধ দেয়। রোগের উৎস খুঁজে বের করেন না।
আমরা আজ সমাজে সমস্যার আসল কারন খোঁজ করি না। অথচ আল্লাহ বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করলে তিনি সমস্যা থেকে উত্তরনের পথ বের করে দিবেন, শুধু তাই না, এমন জায়গা থেকে রিযিক দিবেন যা সে কল্পনা ও করে নি। সুতরাং আপনি যখন কোন গুনাহ ছাড়তে কষ্ট হয় তখন আপনি এই আয়াত স্মরন করুন। যখন দ্বীনের কোন কাজ করতে অলসতা বা অবহেলা আসে তখন এই আয়াত স্মরন করুন, যদি দ্বীনের কোন কাজ করতে ভয় হয় এই আয়াত স্মরন করুন। দেখবেন দ্বীন কায়েমের কাজে অবহেলা কেটে যাবে, অলসতা কেঁটে যাবে ইনশাআল্লাহ। যখন অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে হারাম দিকে বা সুদের দিকে পা বাড়াতে মন চায় তখন এই আয়াত স্মরন করুন। যারা দ্বীনের বড় বড় খেদমত করার সুযোগ পেয়েছেন তারা আরো বেশি এই আয়াত স্মরন করুন। বিশেষ করে যখন কোন মতানৈক্য সামনে আসে, তখন আল্লাহকে ভয় করুন।
কুরআনের আরেক আয়াতে আল্লাহ আরও সুসংবাদ দিছেনঃ
ؕ وَ مَنۡ یَّتَّقِ اللّٰهَ یَجۡعَلۡ لَّهٗ مِنۡ اَمۡرِهٖ یُسۡرًا ﴿۴﴾
"আল্লাহকে যে ভয় করবে, তিনি তার কাজ সহজ করে দেবেন।" (সূরা তালাক ৪)
যারা আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তাদের কাজ কতটা সহজ করেন তার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সীরাত থেকে দেখতে পাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনি পড়লে আমরা দেখতে পাই তিনি খুব অল্প সময়ে, অল্প ত্যাগ ও শহীদের বিনিময়ে আল্লাহর জমীনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করেছেন। কেন অল্প ত্যাগ বললাম সেটার ব্যাখ্যা বিস্তারিত পড়ার পর বুজতে পারবেন আশা করি।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাত্র তেরো বছর দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার ফলে মদীনাতে একটি পূর্নাঙ্গ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। এই তেরো বছরে যারাই মক্কাতে ঈমান এনেছেন তারাই নির্যাতিত হয়েছেন, সীমাহিন নির্যাতিত হয়েছেন, কিন্তু উনাদের সংখ্যা কত? মক্কাতে প্রায় ২০০ জনের কমবেশি হবে ঈমান এনেছেন। আর উনারাই চরম নির্যাতিত হয়েছেন। জেল খেটেছেন, সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তবে যেহেতু উনাদের সংখ্যা কম ছিলো তাই অল্প ত্যাগ বললাম। কিন্তু আজ দেখুন পৃথিবীতে কত কোটি মুসলিম নির্যাতিত, কত লক্ষ মুসলিম ঘর বাড়ি হারা। উইঘুর, কাশ্মির, মায়ানমার, ফিলিস্তিন, আরকান সহ অন্যান্য দেশের নির্যাতিত মুসলিমদের সংখ্যার তুলনা মক্কার নির্যাতিত সাহাবীর সংখ্যা কত কম।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মদীনাতে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর শুরু হলো জিহাদ। সেই জিহাদ ও দাওয়াতের ফলে উনি বেঁচে থাকাকালীনই মাত্র দশ বছরে ইসলাম রোম পারস্য পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। কিন্তু ইসলাম এতদূর পৌঁছাতে কতজন মুসলিম শহীদ হয়েছেন? কতটুকু সময় লেগেছে?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদীনার দশ বছরে ৮৬ টা জিহাদ হয়েছিল। আর এতগুলো যুদ্ধে মাত্র ৪০০ এর কম সংখ্যক সাহাবী শহীদ হয়েছেন। আরও আশ্চর্য ব্যাপার হলো ৮৬টা যুদ্ধের মধ্যে মুসলিমরা একটা যুদ্ধে জয়ী হতে পারেন নি আর তা হলো ওহুদ যুদ্ধ। এছাড়া সকল যুদ্ধে বিজয় লাভ করেছেন। আবু বকর রাঃ এর সময়েও কোন জিহাদে পরাজয় হয় নি। ওমর রাঃ এর সময়ে ১৩ হিজরীতে সেতুর যুদ্ধে মুসলিমরা পরাজয় বরন করে।
কল্পনা করুন, কত কম সংখ্যক সাহাবী শহীদ হয়েছেন অথচ ইসলাম কতদূর পর্যন্ত পৌছে গেছে। অথচ নিকট অতিত থেকে বর্তমান অবস্থার দিকে তাকিয়ে দেখুন কত লক্ষ লক্ষ মুসলিম শহীদ হচ্ছে, কত ত্যাগ, কত জুলুম সহ্য করতে হচ্ছে। কত দাওয়াতের কাজ হচ্ছে, অথচ সেই বৃটিশ শাসন থেকে আজ পর্যন্ত উপমহাদেশে কতগুলো বছর পার হয়ে গেলো, এক ইঞ্চি জমিনেও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হলো না। পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কত শহীদ হলো, বিগত সতেরো বছরে কত জুলুমের স্বীকার হতে হয়েছে এই জনপদের মুসলিমদের। কিন্তু তেমন কোন পরিবর্তন নেই। কারন আমরা আল্লাহকে ভয় করি না, সাহাবিরা ভয় করেছেন ফলে উনারা বিজয় হয়েছেন, সাহায্য লাভ করেছেন।
আল্লাহ বলেনঃ
بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوْا وَيَأْتُوْكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ هُذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ الفٍ مِنَ الْمَلَبِكَةِ مُسَوِّمِينَ
"হ্যাঁ, যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, আর তারা হঠাৎ তোমাদের মুখোমুখি এসে যায়, তবে তোমাদের রব পাঁচ হাজার চিহ্নত ফেরেশতা দ্বারা তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।" [সূরা আলে ইমরান ১২৫]
সাহাবীরা বদর, ওহুদ, খন্দকের যুদ্ধে কি পরিমান আল্লাহকে ভয় করেছেন ও ধৈর্য্য ধরেছেন জিহাদের পেক্ষাপট পড়লেই বুঝতে পারবেন। তাবুকের যুদ্ধের পেক্ষাপট পড়ুন, আর আবেগ নয় বরং বিবেক দিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন সে সময় আমি থাকলে এই ঈমান দিয়ে কি করতে পারতাম? আমরাতো জিহাদে গিয়ে আল্লাহকে ভয় ও ধৈর্য্য ধরা দূরের কথা, জিহাদের ভুলত্রুটি যুক্ত ব্যাখ্যা করতে আমাদের অন্তরে একটু ভয় হয় না। যেই বিধানকে ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়া বলা হয়েছে সেটা সম্পর্কে কথা বলতে আমাদের অন্তরে কি একটুও ভয় হয়? আমরা না জেনেই এই মহান আমল সম্পর্কে মনগড়া বলে থাকি, বর্তমানে ফিকহের কিতাবে জিহাদের অধ্যায়ও পড়া হয় না , এমনকি ভোটাভুটিকেও জিহাদ বলে থাকেন অনেকে। এমন অবস্থায় কিভাবে আমরা সব সমস্যার সমাধান আশা করি?
যারা জেনে বা না জেনে ইসলামি বিধিবিধানের অর্থ পরিবর্তন করেন, আবেগকে প্রাধান্য দেন তারা এই আয়াতটি নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করুনঃ
اِنَّ الَّذِیۡنَ یَکۡتُمُوۡنَ مَاۤ اَنۡزَلۡنَا مِنَ الۡبَیِّنٰتِ وَ الۡهُدٰی مِنۡۢ بَعۡدِ مَا بَیَّنّٰهُ لِلنَّاسِ فِی الۡکِتٰبِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَلۡعَنُهُمُ اللّٰهُ وَ یَلۡعَنُهُمُ اللّٰعِنُوۡنَ ﴿۱۵۹﴾ۙ
"আমি যে সব স্পষ্ট নিদর্শন ও পথ-নির্দেশ অবতীর্ণ করেছি, মানুষের জন্য স্পষ্টভাবে আমি কিতাবে ব্যক্ত করার পরও যারা ঐ সকল গোপন করে, আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দেন এবং অভিশাপকারীরাও তাদেরকে অভিশাপ দেয়। " (সূরা বাকারা১৫৯)
আয়াতের তাফসীরে বলা হয়েছে- وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ আয়াতে কোরআনে-করীম লা'নত বা অভিসম্পাতকারীদের নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেনি, কারা লা'নত করে! তাফসীর শাস্ত্রের ইমাম হযরত মুজাহিদ ও ইকরিমা (র) বলেছেন, এভাবে বিষয়টি অনির্ধারিত রাখাতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, দুনিয়ার প্রতিটি বস্তু এবং প্রতিটি সৃষ্টিই তাদের উপর অভিসম্পাত করে থাকে। এমনকি জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গও তাদের প্রতি অভিসম্পাত করে। কারণ, তাদের অপকর্মের দরুন সে সব সৃষ্টিরও ক্ষতি সাধিত হয়। হযরত বারা' ইবনে আযেব (রা) বর্ণিত এক হাদীসেও তার সমর্থন পাওয়া যায়। তাতে রসূলে করীম (সা) বলেছেন, اللَّاعِنُونِ -এর অর্থ হলো সমগ্র পৃথিবীতে বিচরণশীল সমস্ত জীব। (কুরতুবী)
হাদীসে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যে ব্যক্তি কোন ইলম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হওয়ার পর তা গোপন করে সে ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন আগুনের একটি লাগাম পরানো হবে। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, বাইহাকী, হাকেম অনুরূপ। ) আচ্ছা বলুনতো কুরআন হাদিস গোপন করা বেশি মারাত্মক নাকি কুরআন হাদিসের অর্থ বিকৃত করা বা ভুল ব্যাখ্যা করা বেশি মারাত্নক?
যদি কুরআনের আয়াত গোপন করলে আল্লাহ লানত করে এবং গোটা সৃষ্টি জীব লানত করে, কিয়ামতের দিন আগুনের লাগাম পরানো হয়, তাহলে যারা ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়া জিহাদের অর্থ বিকৃত করে তাদের কি অবস্থা হবে? যারা কুফরি গনতন্ত্রের পক্ষে দলিল দেয় তাদের কি পরিনতি হবে? এই তন্ত্রের পক্ষে কথা বলার আগে কখনও কি ভেবেছেন যে, কত বড় বড় আলিম এটার বিপক্ষে। সুতরাং এটা নিয়ে কথা বলার আগে ভালো করে যাচাই-বাছাই করা দরকার।
আল্লাহর লানত কত মারাত্মক জানেন? আল্লাহ ইহুদিদের লানত করেছেন, ফলে তাদের ইতিহাস পড়ুন, তারা কত লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছে। তারা সবসময় ছিলো বাস্তুহারা জাতি, নিজস্বতা কোন ভুমি ছিলো না। (আজ যা করছে সেটাও আমরিকার সাহায্যে করে। ) আজ আমরাও আল্লাহকে যথাযথ ভয় না করাতে চারদিকে লাঞ্ছিত হচ্ছি। দিকে দিকে মুসলিমরা বাস্তুহারা হয়ে শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে।
হযরত ইউসুফ আঃ এর জীবনি দেখুন, তিনি আল্লাহকে কি পরিমান ভয় করেছেন। মিশরের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী, সবচেয়ে সুন্দরী নারী, রাজ প্রাসাদের সাতটি দরজা আটকিয়ে উনাকে পাপের দিকে ডেকেছিলো। অতঃপর তিনি তার পাপের ডাকে সাড়া দেন নি। উনি আল্লাহর ভয়ে দরজার দিকে দৌড় দিলেন। আল্লাহ উনার জন্য সাতটি দরজাই খুলে দিলেন। সে দরজাগুলা সাধারন কোন দরজা নয়, রাজপ্রাসাদের দরজা। যেখান থেকে বের হওয়া অসম্ভব, কিন্তু আল্লাহকে ভয় করলে এভাবেই আল্লাহ কঠিন সব সমস্যা, বাঁধা থেকে উদ্বার করেন। এরপর উনাকে জ্বেল পর্যন্ত খাঁটতে হয়েছে। উনি রাজ প্রাসাদের সেই আরাম আয়েশ ত্যাগ দিয়ে আল্লাহর ভয়কেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এরপর বিনা যুদ্ধে, চেষ্টা পরিশ্রম ছাড়াই তিনি মিশরের বাদশাহ হয়ে গেলেন। তিনি যেমন জেল থেকে নাজাত পেলেন, তেমনি উনার মাধ্যমে মিশরের জনসাধারন দুর্ভিক্ষের কঠিন কষ্ট থেকে নাজাত পেলো। মিশরবাসীর দূর্বিষহ জীবন সহজ হয়ে গেলো। এটাই ইউসুফ আঃ এর তাকওয়া ও ধৈর্য্যের ফল। যেটা দ্বারা শুধু তিনি নিজেই উপকৃত হন নি বরং গোটা মিশর বাসী উপকৃত হয়েছে।
এবার ইউসুফ আঃ কি পরিমান আল্লাহকে ভয় করেছেন সেটা বুঝার জন্য উনার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করুন। আপনি হলে এমন পরিস্থিতিতে কি করতেন? আপনি নানা যুক্তি দিয়ে হয়ত পাপে জড়াতেন। আপনি ভাবতেন জুলেখার পাপে সাড়া না দিলেও বিপদ। কারন তার ডাকে সাড়া না দিলে সে আপনাকে ধর্ষন করার অপবাদ দিবে, ফলে সমাজে আপনার দূর্নাম বয়ে বেড়াবে। আপনি তখন বিভিন্ন অজুহাত দাঁড় করিয়ে হয়ত পাপে জড়াবেন।
আজ অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিরা সহশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে চাকরী করেন, নিজেদের ছেলেমেয়েদের পড়ান। সহশিক্ষার মত হারামের ব্যাপারে খুব নমনীয়। আর তারা কি করে ইউসুফ আঃ এর মত জাতির নেতৃত্ব দিবে? আজ গোটা বিশ্বের সমস্ত কুফরি শক্তিকে জুলেখা ভাবুন, আর তাদের পারমাণবিক বোমা, বিশাল বাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র, তাদের ইন্টারনেট ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট জুলেখার সাতটি দরজা মনে করুন। আর নিজেদের নিয়ে চিন্তা করুন আমরা ইউসুফ আঃ এর অবস্থানে থেকে কি করতেছি? কুফফাররা জুলেখার জায়গায় থেকে আমাদের কে তাদের কুফরি তন্ত্রমন্ত্র, তাদের সংবিধান, তাদের তৈরী করা মডারেট ইসলামের দিকে ডাকছে। আর আমরাও বর্তমান কুফফার দের দেওয়া বিভিন্নভাবে কুফরি তন্ত্রমন্ত্র, তাদের আইন হজম করে নিচ্ছি, আমরা মডারেট মুসলিম হয়ে যাচ্ছি। কারন আমরা মনে করি পুর্নাঙ্গ ইসলাম মানতে গেলে তারা সন্ত্রাসী বলবে, তারা বিভিন্ন অপবাদ দিবে।
অথচ ইউসুফ আঃ কি এটা চিন্তা করেছেন? তিনি কি এটা চিন্তা করেছেন যে, আমি দরজা দিয়ে বাহির হলে জুলেখা জোরপূর্বক ধর্ষনের অভিযোগ দিবে, আর আমার মানসম্মান নষ্ট হবে। আসলে তিনি আল্লাহকে ভয় করার মত ভয় করেছেন। ফলে আল্লাহ উনার জন্য শুধু সাতটি দরজাই খুলে দেননি , অবুঝ শিশুর মুখ দিয়ে উনার নিষ্পাপ হওয়াটা প্রমান করেছেন।
আল্লাহকে ভয় করার ফলে আল্লাহ ইউসুফ আঃ এর জন্য সকল বাধা, সমস্যা থেকে উত্তরনের পথও তৈরী করেছেন, আবার উনার জন্য মিশরের ক্ষমতার আসনে গিয়ে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়াকে সহজও করে দিছেন। আমরাও যদি কোন যুক্তি, কোন অজুহাত না দেখিয়ে, কুফফারদের সকল তন্ত্রমন্ত্রকে ডাস্টবিনে ছূড়ে ফেলে আল্লাহকে ভয় করার মত করতে পারতাম তাহলে আল্লাহ আজও আমাদের জন্য সকল সমস্যার দরজা খুলে দিতেন। আমাদের এতটা নির্যাতিত, গোটা বিশ্বে আজ এতো মার খাওয়া লাগতো না।
এই পৃথিবীতে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করেছিলেন নবীরা। উনারা সবচেয়ে বেশি ভয় করে কি ব্যর্থ হয়েছেন? অবশ্যই না বরং সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছেন। একা বড় বড় কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয় হয়েছেন। ইব্রাহিম আঃ এর বিরুদ্ধে সবাই ছিলো, এমনকি আপন বাবাও বিরুদ্ধে ছিলো, তবুও তিনি বিজয় হয়েছেন। উনাকে আদেশ করা হয়েছিলো তিনি যেন মরুভুমিতে স্ত্রী সন্তান রেখে আসেন। তিনি স্ত্রী সন্তানের পরিনতির কথা না ভেবে আল্লাহর আদেশ পালন করেছেন। এরপর আদেশ দেওয়া হয়েছে ইসমাইল আঃ জবাই করার জন্য, তিনি আদেশ পালন করেছেন। ফলে আল্লাহ উনাকে গোটা জাতির পিতা বানিয়ে দিলেন। আচ্ছা যদি তিনি স্ত্রী সন্তানের পরিনতির কথা ভেবে মরুভূমিতে দিয়ে না আসতেন, আর আল্লাহ শাস্তি স্বরুপ উনার স্ত্রী সন্তান কেঁড়ে নিতে চাইতেন, তাহলে উনি তাদের পাকড়াও থেকে বাঁচাতে পারতেন?
আজ আমরা যে বিপদের ভয়ে আল্লাহর ভয় কে অগ্রাধিকার দিই না, সে বিপদের চাইতেও ভয়াবহ পরিস্থিতির স্বীকার হতে হয়। বনী ইসরায়েলকে এক জাতির বিরুদ্ধে জিহাদের আদেশ করা হলো, কিন্তু তারা সে জাতির দৈহিক শক্তি সামর্থ্যের কথা শুনে জিহাদ করলো না, তারা আল্লাহকে ভয় করলো না। ফলে তীহ নামক প্রান্তরে চল্লিশ বছর উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরতে হয়েছে। সকালে সে জায়গা থেকে বের হওয়ার জন্য চেষ্টা করতো, দিনশেষে দেখতো তারা সেই জায়গায়ই আছে। বর্তমানে আমাদেরও একই অবস্থা, আমরা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা উত্তরনের কত চেষ্টাই না করি, কুরআনের আইন প্রতিষ্ঠা করে এই শান্তিময় সমাজ বিনির্মানের জন্য কত চেষ্টা করি অথচ সব ব্যর্থ হচ্ছে, এভাবেই আমাদের আরও কত সংকটের মধ্যে পড়তে হয় তা কেউ জানে না । কারন আমরাও জিহাদ ছেড়ে দিছি, আল্লাহকে ভয় করি নি।
আমরা আল্লাহকে কতটুকু ভয় করি? আমরা সত্যিকারে আল্লাহকে কতটুকু ভয় করি একটু আত্মসমালোচনা করি। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনে কত কষ্ট, ত্যাগ সহ্য করতে হয়েছে। উনার জীবদ্দশায় উনার সাতটি সন্তান মারা গেছেন, প্রিয় স্ত্রী হারিয়েছেন, প্রিয় চাচা আবু তালেবকে হারিয়েছে, তায়েফে রক্ত ঝরেছে। সব ছেড়ে হিজরত করতে হয়েছে, ওহুদে রক্ত ঝরছে, প্রিয় চাচা সহ সত্তর জন সাহাবী শহীদ হয়েছেন। এতো কষ্ট সহ্য করার পরেও উনি বলেন নি যে, এত এত কষ্ট আমার চুল পাকিয়ে দিয়েছে। অথচ তিনি বলেছেন, কুরআনের কিছু সূরা উনার চূলকে সাদা করে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সূরা হূদ, ওয়াকিয়া, মুরসালাত, আম্মা ইয়াতাসা-আলুন, ইযাশ-শামসু কুভভিরাত আমাকে বৃদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে।
আমরা একটু নিজেকে জিজ্ঞেস করি, যে সূরা সমূহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বৃদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে সে সূরা আমাদের কতটুকু নাড়া দেয়, আমাদের কি এক ফোঁটা চোখের পানিও আল্লাহর আযাবের ভয়ে পড়ে? কল্পনা করুন আমাদের অন্তরের অবস্থা কতটা ভয়ানক। হযরত ওসমান রাঃ কবর দেখলে বেশি বেশি কাঁদতেন অথচ আমরা দিনে কতবার কবরের পাশ দিয়ে আসা যাওয়া করি কিন্তু আমাদের কি একটুও নাড়া দেয়? সাহাবারা এক দিকে যেমন আল্লাহর ভয় কান্নাকাটি করতেন অপরদিকে শত প্রতিকুল পরিস্থিতিতে আল্লাহর বিধান পালনে ছিলেন অটল অবিচল। কঠিন পরিস্থিতিতে জিহাদের ময়দান থেকে পিছপা হন নি। কিন্তু আমরা আল্লাহর বিধানগুলোও ঠিক মত পালন করি না, আল্লাহর ভয়ে কাঁদতেও পারি না। আমরা সর্বশেষ কবে নিরবে জাহান্নামের ভয়ে কেঁদেছিলাম? কবে জান্নাত হারানোর ভয়ে আঁতকে উঠেছিলাম? এখন প্রশ্ন কেন আমাদের মনে আল্লাহর ভয় নাই? কেন আমরা আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে পারি না? আসুন জেনে নেই এর উত্তর।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র মক্কাতে তেরোটি বছর দাওয়াত দিয়েছেন, কিন্তু উনার দাওয়াতের বিষয় বস্তু কি ছিলো? কখনও কি চিন্তা করেছেন যে, উনি তেরো বছর কি এমন দাওয়াত দিয়েছেন যে, পরবর্তীতে যখন যে বিধান নাযিল হয়েছে সাহাবীরা তা যথাযথ পালন করেছেন। সাহাবীদের কাছে গিয়ে বিভিন্ন বিধানের উপকারিতা বা ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করতে হয় নি, মদ পান করলে কি ক্ষতি হবে, রোজা রাখার উপকারিতা কিংবা সমাজে আল্লাহর আইন চালু হলে মানুষের কি কল্যান লাভ হবে এসব নিয়ে মানুষের ধারে ধারে গিয়ে বুঝাতে হয় নি। যখন যে আইন নাযিল হয়েছে সে আইন সর্বোচ্চ সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছেন। এর কারন কি?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাতে যে তেরো বছর যে কয়টি বিষয়ের উপর দাওয়াত দিয়েছেন সে কয়টি বিষয় ছিলো, তাওহীদ, রিসালাত ও পরকাল সম্পর্কে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেরোটি বছর আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, বড়ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন, তার অসীম দয়া মানুষের সামনে বর্ননা করেছেন। কিন্তু আজ কি এসব নিয়ে আলোচনা হয়? মানুষ তাকেই ভয় করে, সম্মান করে, তার পিছনে ছুটে, ভালোবাসে যার ক্ষমতা আছে, সম্পদ আছে, দান করে। কিন্তু আমরা কয়জন আল্লাহর ক্ষমতা, বড়ত্ব, তার অপার করুনা সম্পর্কে জানি? সারা বছর কিংবা সারা জীবনে আমাদের মাঝে তেরো দিনও তো এসব আলোচনা করা হয় না। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেরো বছর এই দাওয়াত দিছেন।
এরপরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেরো বছর পরকালের ভয় দেখিয়েছেন। কিন্তু আজ এসব আলোচনা যেন হারিয়েই গেছে। জান্নাতের নেয়ামত নিয়ে মানুষ কি একটুও চিন্তা করে? কয়টা কুরআনের আয়াত ও হাদিস জানে? জাহান্নাম নিয়ে মানুষ কতটুকুই বা জানে? চিন্তা করে দেখুন যে সকল আলোচনা আজ খুব বেশি করা হয় না, সেসব আলোচনা মক্কাতে তেরো বছর জুড়ে হয়েছে।
আমরা মনে করি কোন একটি আলোচনা একবার দুইবারই যথেষ্ট। অথচ কুরআনের দিকে তাকিয়ে দেখুন সেখানে সূরা আর রাহমানে একই আয়াত কয়বার এসেছে। কুরআনে একই ঘটনা বার বার আলোচনা এসেছে। মানুষকে স্মরন করিয়ে দেওয়ার জন্য, মানুষে হৃদয়ে গেঁথে দেওয়ার জন্য বার বার আলোচনা করতে হয়। ফলে যার অন্তরে একবার পরকালের আলোচনা, আল্লাহর ক্ষমতা, বড়ত্বের আলোচনা গেঁথে যাবে তার অবস্থা এমন হবে যে, তার দ্বীনের বিধান পালনের জন্য ফজিলত বলতে হবে না, হারামের ক্ষতিকর দিক বলতে হবে না। সে নিজেই এসে দ্বীন সম্পর্কে জানতে চাইবে। জান্নাতে যাওয়ার রাস্তা সম্পর্কে সে নিজ আগ্রহে জানতে চাইবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো আল্লাহর দেখানো পদ্ধতি হলো সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্বতি। তিনি মানুষ, সমাজ পরিবর্তনের যে পদ্ধতি দিয়েছেন সেটাই সর্বোত্তম ও মহান। আল্লাহ তা'য়ালা চাইলে পবিত্র মক্কাতে ইসলামের বিধিনিষেধ, আইনকানুন নাযিল করতে পারতেন, আর এসবের সৌন্দর্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সামনে বর্ননা করতেন। কিন্তু ইসলামের বিধিনিষেধ নাযিল হয় মদীনাতে। আর মক্কাতে তেরো বছর কয়েকটি বিষয়ের উপর আয়াত নাযিল হয় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব আয়াত দিয়ে দাওয়াতের কাজ করেন। ফলে অল্প কিছু সংখ্যক সাহাবী তৈরী হয় যাদের মধ্যে একজন সাহাবীর (মুসয়াব বিন ওমায়ের রাঃ)দাওয়াতেই গোটা মদীনা ইসলামের জন্য এমন ভাবে তৈরী হয় যে, ইসলামের জন্য, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য গোটা বিশ্বের কুফরী শক্তির শত্রুতে পরিনত হয়।
ভেবে দেখুন মক্কাতে নাযিল হওয়া সেই আয়াত সমূহ কত মহান তাৎপর্যপূর্ন ও মহা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আমরা তাওহীদ ও পরকাল সম্পর্কে খুব বেশী জানি না, জানার চেষ্টাও তেমন করি না। একজন ব্যক্তি, যে জাহান্নামের ভয়ে ও জান্নাত হারানোর ভয়ে শিরক, কুফর থেকে বের হয়ে আসবে, তাগুতকে বর্জন করবে, সকল হারাম ছেড়ে দিবে, সে জাহান্নাম ও জান্নাত সম্পর্কে তো আগে জানতে হবে। একজন যুবক হারাম সম্পর্ক ছেড়ে দিবে কিসের আশায়? তাকে তো জান্নাতের হুরদের সম্পর্কে আগে জানতে হবে। আজ নামাযের গুরুত্ব সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়, অথচ সাহাবীদের সময় কি এতো আলোচনা করা লাগছে? বিধান নাযিল হওয়ার সাথে সাথেই আমল শুরু হয়ে গেছে।
তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত সম্পর্কে জানার সবচেয়ে বড় সুফল হলো, একজন ব্যক্তি যখন আল্লাহর বড়ত্ব, ক্ষমতা, জান্নাত, জাহান্নাম সম্পর্কে যখন খুব ভালোভাবে জেনে বুঝে দ্বীন পালন করা শুরু করে তখন তার জন্য হক্ব গ্রহন করা সহজ হয়, কেননা তার আসল লক্ষ থাকে জান্নাত লাভ করা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া। ফলে দেখা যায় যদি কখনও তার মত ভুল প্রমানিত হয় বা দল বা পছন্দের আলিমও যদি ভুল করে সে ভুল মেনে নিয়ে সঠিকটা গ্রহন করা সহজ হয়। সে সব সময় হক্ব গ্রহনের ব্যাপারে আগ্রহী থাকে। আর যদি এসব নিয়ে ভালোভাবে না জেনে দ্বীন পালন শুরু করে তাহলে হক্ব গ্রহন করা কঠিন হয়। যেমন ধরুন, কেউ কোন নেককার ব্যক্তি সাথে থাকতে থাকতে দ্বীন পালন শুরু করছে অথবা কেউ কোন বড় বিপদে পড়ে দ্বীন পালন শুরু করছে অথবা পরিবার দ্বীনদার তাই সেও দ্বীনদার ইত্যাদি । এমন ব্যক্তিদের সামনে হক্বের চাইতে নিজের মত, পছন্দের নেতা বা দলের আদর্শই বেশি প্রাধান্য পায়।
আরেকটা বিষয় খেয়াল করুন, বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় কিছু দিন খুব ভালোভাবে দ্বীন পালন করে এরপর আস্তে দ্বীনের পথ থেকে হারিয়ে যায় অথবা আমলের গতি কমে যায়। এর মৌলিক একটি কারন হলো, আল্লাহর মারেফাত, জান্নাত, জাহান্নাম সম্পর্কে না জানা। কেউ যদি ভালোভাবে এসব জেনে দ্বীনের পথে আসে এবং এসব নিয়ে প্রতিদিন নিজে নিজে চিন্তা করে, মানুষকে বেশি বেশি এসবের উপর দাওয়াত দেয় আশা করি সে শত বাঁধা উপেক্ষা করে দ্বীনের উপর অটল থাকবে ইনশাআল্লাহ। আপনি একমাস ট্রাই করে দেখুন, বেশি বেশি আল্লাহর মারেফাত সম্পর্কিত আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন, জান্নাত, জাহান্নাম নিয়ে জানুন, কুরআনের শেষের দিকের সূরা সমুহ পড়ুন, মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরন করুন, মানুষের সাথে আলোচনা করুন এরপর দেখুন ঈমানের অবস্থা কি হয়।
ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক শক্তি। সামাজিক শক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার একটি উদাহরণ হলো সূরা বুরুজের আসহাবে উখদুদের সেই বালকের ঘটনা। জালিম বাদশাহ বালককে সবার সামনে মারতে চায় নি, সবার আড়ালে মারতে চেয়েছিলো, কারন হলো বালকের সামাজিক শক্তি ছিলো, সমাজের মানুষ বালকের পক্ষে ছিলো। আজও ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হলে সামাজিক শক্তি প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। আর শক্তি অর্জন করতে হবে আল্লাহর মারেফাত, পরকাল, রিসালাত, পূর্ববর্তী জাতিদের ধ্বংসের ইতিহাস, দুনিয়ার ধোঁকা ইত্যাদি বিষয়ের দাওয়াতের মাধ্যমে। এরপর শিরক, কুফর সম্পর্কে জানাতে হবে।
মদীনার অবস্থা দেখুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাওয়ার পূর্বেই ইসলাম মদীনাতে সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো ইসলাম যেই মদীনাতে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করলো সেটা কোন দাওয়াতের দ্বারা লাভ করেছে? মুসয়াব বিন ওমায়ের রাঃ কি মদীনাতে গিয়ে তাদের শরীয়া শাসনের গুরুত্ব বুঝিয়েছে কিংবা কোন আমলের কি ফজিলত তা বুঝিয়েছেন? তখন তো শরীয়া আইন নাযিলই হয় নি। চোরের শাস্তি, যিনার শাস্তি অথবা মদের বিধান ইত্যাদি নাযিল হয় নি। বিভিন্ন আমলের ফজিলতও নাযিল হইছে পরে।
আসলে যে সমাজ আল্লাহকে চিনবে, পরকাল চিনবে, পরকালের পাগল হবে, বার বার শহীদ হতে চাইবে তারাই হবে বিজয়ী ও সফল কাম হবে । আল্লাহর নিকট বেশি বেশি দোয়া করুন তিনি যেন তার ভয় অন্তরে বাড়িয়ে দেন।
আল্লাহর ভয় নিয়ে এত আলোচনার হয়ত মনে রাখা সম্ভব হবে না, তবে আয়াতের পাশাপাশি এই কথাটুকু ভালোভাবে মনে রাখুন যদি আপনাকে বলা হয় যে, তুমি কি অনেকগুলো স্বর্ণ নিবে, নাকি এমন একটি পাথর নিবে যেটার স্পর্শে যেকোন ধাতু স্বর্ণ হয়ে যাবে, আপনি তখন কি নিবেন? অবশ্যই সেই মুল্যবান পাথরটিই নিবেন, এবং যদি এমন পাথর পেয়ে যান তাহলে সেটা জানপ্রান দিয়ে রক্ষার চেষ্টা করবেন । প্রিয় ভাই, তাকওয়াও মানুষের জীবনে এমন এক অর্জন যেটা অর্জন করলে মানুষের দুনিয়া আখিরাতের সব সমস্যা দূর হবে, অকল্পনীয় রিযিক (যাবতীয় প্রয়োজন) আসবে, কাজ সহজ হবে।
যে সমাজ আল্লাহকে ভয় করবে সে সমাজ সমস্যা থেকে মুক্ত। আজ আমরা রিযিকের জন্য হাজার মাইল পাড়ি দিই, কত কষ্ট করি। অথচ আমরা আল্লাহকে ভয় করি না। আশা করি কেউ আল্লাহর ভয়ের গুরুত্ব বুঝলে সে তাহাজ্জুদ পড়ে কান্নাকাটি করে তাকওয়া অর্জনের জন্যই বেশি দোয়া করবে । পরকাল সম্পর্কে জানবেন, ও আল্লাহর মারেফাত সম্পর্কে জানবেন এবং মানুষদেরকেও জানাবেন ইনশাআল্লাহ।
বিশুদ্ধ চিন্তা চেতনার গুরুত্বঃ
বর্তমান বিশ্বে মুসলিমরা যেসকল কারনে পরাজিত, তার অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য কারন হলো দূষিত চিন্তা। এটি এমন এক মহা সমস্যা যা মুসলিমদেরকে লড়াইয়ের ময়দানে নামার আগেই পরাজিত করে দেয়। আপনি কোন অক্ষমতা, দূর্বলতা বা কাপুরষতা বা কোন পিছুটানের কারনে আজ দ্বীনের কোন একটি বিধান পালন করতে পারতেছেন না, কিংবা যেভাবে পালন করার দরকার সেভাবে পালন করতে পারতেছেন না। কিন্তু আপনার পরবর্তী প্রজন্ম হয়ত আপনার মত হবে না, তারা আপনার মত দূর্বল বা কাপুরষ হবে না। আপনি যদি বিশুদ্ধ চিন্তা চেতনা লালন করেন তাহলে এই চিন্তার বীজ পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে বপন করতে পারবেন। ফলে আপনার দ্বারা যেটা হয় নি তাদের দ্বারা হয়ত সেটা হবে।
মনে করুন, আপনি একজন উস্তাদ, শত শত ছাত্র আপনার দারসে থাকে তাদের মাঝে কেউ একজন ওমরের মত, খালিদ বিন ওয়ালিদ, আলী রাঃ মত সাহসী ও শক্তিশালী। আপনি যদি বিশুদ্ধ চিন্তা চেতনা লালন করেন তাহলে এই চিন্তা চেতনার ফলে হয়ত কেউ একজন আপনার দ্বারা অনুপ্রানিত হয়ে দ্বীনের জন্য বিরাট অবদান রাখবে।
আমরা অনেকেই আসহাবে উখদুদের কাহিনী জানি, একটি তাওহীদবাদী বালকের দাওয়াতে একটি কওম ঈমান এনেছে অতপর তারা আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। যে বালকের দাওয়াতে পুরো কওম ঈমান আনলো, সে বালক ঈমান এনেছে একজন সাধকের মাধ্যমে। বালকের দ্বারা যে বিরাট কাজ হয়েছিলো সেটা সাধকের দ্বারা হয় নি। কিন্তু সাধক দিনের পর দিন বিশুদ্ধ চিন্তা লালন করার ফলে বালককে বিশুদ্ধ চিন্তাচেতনার দিকে দাওয়াত দিতে পেরেছে। ফলে সাধকের দ্বারা যে কাজ হয় নি, বালকের দ্বারা আল্লাহ সেই কাজটা করিয়ে নিছেন। কিন্তু বালকের পুরো কাজের সওয়াবের অংশ ওই সাধকও পাবেন ইনশাআল্লাহ ।
তাই আপনি যদি নিজের ঈমানের দূর্বলতার কারনে বা অন্য কারনে কোন বিধান পালন করতে নাও পারেন অন্তত নিজের চিন্তাচেতনা ঠিক রাখুন। পরবর্তী প্রজন্মকে বলুন আমরা পারি নাই, কিন্তু তোমরা কেউ পারবে। কিন্তু যদি আপনি দূষিত চিন্তা লালন করেন আর এই চিন্তার বীজ সবার মাঝে বপন করেন, তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আপনার দূষিত চিন্তা দ্বারা প্রতারিত হতেই থাকবে।
কাফেররা জানে মুসলিমদের সাথে তারা কখনই সম্মুখ যুদ্ধে পারবে না। তাই মুসলিমদের শেষ করে দেওয়ার জন্য সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো তারা মুসলিমদের মাঝে বিষাক্ত চিন্তা চেতনা ঢুকিয়ে দেয়। এই যে তাতারীরা মুসলিমদের উপর আক্রমন করার আগে কিছু সংবাদ মুসলিমদের মাঝে প্রচার করে দিতো, তারা মুসলিমদের মাঝে ছড়িয়ে দিতো যে, তারা হলো ইয়াজুজ-মাজুজ, তারা অপরাজেয়, তাদের কেউ হারাতে পারবেনা। যেহেতু ইয়াজুজ-মাজুজকে হারানো সম্ভব না তাই মুসলিমরা ভিতর থেকে আগেই পরাজয় বরন করে নিতো। এই বিষাক্ত চিন্তাই মুসলিমদের উপর আক্রমন করার আগেই মুসলিমদের হীনবল করে দিতো। আজও একই কায়দায় মুসলিমদের শেষ করে দেওয়া হচ্ছে, যেমন আমরিকা, ন্যাটো অপরাজেয়, তারা প্রযুক্তির দ্বারা সব খোঁজ খবর রাখে, তাদের হারানো সম্ভব না। (যদিও আফগানদের কাছে তাদের শোচনীয় পরাজয় বরন করতে হইছে)।
এই চিন্তা গুলোই মুসলিমদের ভিতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে তাদের বিভিন্ন কুফরি মতবাদ। এক সময় যেই মুসলিমরা শরীয়ার জন্য জীবন দিতো, সেই মুসলিমরা আজ কাফেরদের কুফরী মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে। আর এই দূষিত মতবাদ গুলো প্রতিষ্ঠার পিছনে সবচেয়ে বেশি ভুমিকা রাখে অনুসরনীয় ব্যক্তিরা। একজন সাধারন মানুষের ভিতরে দুষিত কোন চিন্তা প্রবেশ করলে সেটা তার নিজের ভিতর বা আশপাশের কিছু ব্যক্তির মাঝে প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু যদি কোন বড় আলিম বা উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ কোন ব্যক্তির মাঝে কোন দূষিত চিন্তা প্রবেশ করে, সেটা পুরো উম্মাহর বিরাট ক্ষতি করে। এজন্য আলিম কিংবা উম্মাহর কোন অনুসরনীয় ব্যক্তির পদস্খলন জালিম বাদশাহর চাইতেও ভয়ঙ্কর, কেননা জালিম তার জুলুম নিয়ে মারা যায় কিন্তু কোন অনুসরনীয় ব্যক্তির দূষিত চিন্তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম উম্মাহকে ধোঁকা দিতেই থাকে।
দেখুন ইমাম বুখারী রহঃ সেই শত শত বছর আগে যদি একটি ভুল হাদীস বর্ননা করতেন তাহলে আজ কত কোটি কোটি মানুষ সেই হাদিস পড়তো ও ভুল আমল করতো। অথচ তিনি কত খোদাভীরু ছিলো। তিনি কত যাচাই-বাছাই করে হাদিস সংগ্রহ করতেন। কিন্তু এরপরেও তিনি কোন একটি হাদিস লিখার আগে দুই রাকাত নামায পড়ে ইস্তেখারা করে হাদিসখানা লিখতেন। তাই নিজের চিন্তাচেতনা বিশুদ্ধ করুন, চিন্তা চেতনা বিশুদ্ধ রাখার ব্যাপারে নিজের আবেগ কিংবা অন্ধ অনুসরণ প্রাধান্য দিবেন না। সবার আগে তাওহীদের ব্যাপারে ভালোভাবে জানুন, শিরক কুফর সম্পর্কে জানুন। তাগুত সম্পর্কে জানুন। ফরয ও নফলের ব্যাপারে যত্নবান হন।
হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, যে আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে আমি তার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দিলাম। আমি বান্দার উপর যা ফরয করেছি আমার নিকট তা থেকে অধিক প্রিয় এমন কোনো বিষয় নেই যা দ্বারা বান্দা আমার অধিক নৈকট্য অর্জন করতে পারে। আর আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমনকি আমি তাকে ভালোবেসে নেই। যখন আমি তাকে ভালোবাসি তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে, আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে, আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে, আমি তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। যদি সে আমার নিকট কোনো কিছু চায় তাহলে আমি অবশ্যই তাকে তা প্রদান করি। যদি সে আমার নিকট আশ্রয় চায় তাহলে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দান করি। (বুখারী, হাদীস-৬০৫৮)
কেউ কি যুদ্ধে পরাজিত হতে চায়? যুদ্ধে পরাজিত হওয়াতো লজ্জাকর। তাহলে আল্লাহ তা'য়ালা কি যুদ্ধে পরাজিত হতে চাইবেন? কখনও নয়, বরং যারা উনার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। তারা যত বড় পারমাণবিক বোমার অধিকারী হোক কিংবা যত বড় ক্ষেপণাস্ত্রের অধিকারী হোক না কেন।
উক্ত হাদিসে বলা হইছে আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন যারা তার ওলী সাথে শত্রুতা করে। তাহলে আগে আমাদের ওলী হতে হবে। যদি আমরা তার ওলী হতে পারি তাহলে আমাদের বিরুদ্ধে যারা যাবে তাদের ধ্বংস নিশ্চিত।
প্রশ্ন হলো আমরা ওলী হবো কিভাবে?
হাদীসে প্রথমে ফরয ইবাদাতের কথা বলা হয়েছে। বান্দা ফরযের মাধ্যমে আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নৈকট্য লাভ করে।
এখন আমরা কি ফরয গুলো ঠিক মত আদায় করি? আমরাতো নামাজটাও মনোযোগ সহ আদায় করি না।
আমরা কি দ্বীন কায়েমের কাজ ঠিকমত আদায় করি?
আমরা কি কখনও জিহাদের ফরয আদায় করেছি? তাহলেতো আমরা প্রথমেই ব্যর্থ।
এরপর আমরা বেশিরভাগ মানুষ নফলকে গুরুত্ব কম দিয়ে থাকি। অথচ গভীর ভাবে লক্ষ করুন হাদীসে নফলের কত বিরাট ফজিলত বলা হয়েছে। ফরযের পাশাপাশি আপনি নফল ইবাদাত বেশি বেশি করলে তখন আপনি ওলী হতে পারবেন যে ওলীর সাথে শত্রুতা করলে আল্লাহ যুদ্ধ ঘোষনা করেন।
নফল ইবাদাতের এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হইছে যে, আল্লাহ বলেন এক পর্যায়ে আমি তাকে ভালোবাসি, তার কান, চোখ, হাত, পা হয়ে যাই। যখন আপনি ফরয ও নফল ঠিক মত আদায় করবেন তখন আল্লাহ আপনাকে দুইটি মহান পুরষ্কার দিবেন। প্রথমটি হলো আপনি কোন কিছু চাইলে তা দিবেন, আর আপনি আশ্রয় চাইলে আশ্রয় দিবেন। এত বড় দুইটি পুরষ্কার পেলে আর কি লাগে? এর চেয়ে বড় পুরষ্কার আর কি হতে পারে?
আজ আমরা কত কিছু চাই, আমরা ইসলামি শাসন চাই, জালিমদের পতন চাই, ইহুদিদের ধ্বংস চাই, মুসলিমদের শান্তি নিরাপত্তা চাই, নিজের ব্যক্তিগত কত কিছু চাই অথচ আমরা ফরজ নফল গুলো ঠিক মত আদায় করি না। আল্লাহ আমাদের ফরয ও নফলগুলো সঠিক ভাবে আদায় করে এমন ওলী হওয়ার তাওফিক দান করুন যে ওলীর সাথে শত্রুতা করলে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন।
পরিশেষে বিনীত অনুরোধ রইল লিখাটি বার বার পড়ুন, যতবেশী পড়বেন ততবেশি এর গভীরতা অনুধাবন করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।
Comment