অনলাইন জগতে কথোপকথনে বেয়াদবি: কারণ ও করণীয়
সামনাসামনি তর্ক-বিতর্কে আমরা অনেক সময় একে অপরের চোখে চোখ রেখে, কণ্ঠস্বরের সুরে, মুখের ভাবভঙ্গিতে পরস্পরের প্রতিক্রিয়া দেখে কথা বলি। ফলে উগ্রতা সংযত থাকে, ভদ্রতা বজায় রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট বক্সে বা অনলাইন ফোরামে একই বিতর্ক যখন হয়, তখন কথার তীব্রতা বেড়ে যায়, অশালীনতা, গালাগালি, হুমকি—এমনকি হিংসাত্মক ভাষা ব্যবহার হয়ে যায়। এই বৈপরীত্য কেন?
যখন আমরা সামনাসামনি কথা বলি, তখন আমাদের চারপাশের সংস্কৃতি—পরিবারের শিক্ষা, সমাজের রীতিনীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ—একটা অদৃশ্য সীমানা তৈরি করে রাখে। চোখের দৃষ্টি, কণ্ঠস্বরের সুর, উপস্থিতির অনুভূতি সেই সীমানাকে জীবন্ত রাখে। কিন্তু ডিজিটাল জগতে সেই সীমানা যেন মিলিয়ে যায়। স্ক্রিনের আড়ালে বসে আমরা এমন কথা লিখে ফেলি, যা বাস্তবে মুখ ফুটে বলতে লজ্জা পেতাম।
অফলাইনে যে সাংস্কৃতিক সীমানা আমাদের সংযত রাখে, অনলাইনে এসে তা অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়—এর পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, অনলাইনে নিজের নাম-পরিচয় গোপন রাখা সম্ভব; “কেউ আমাকে চিনবে না” এই ধারণা দায়বোধ কমিয়ে দেয়, ফলে মানুষ অনেক সময় সংযম হারিয়ে ফেলে। দ্বিতীয়ত, এখানে মুখোমুখি যোগাযোগের অভাব থাকে—চোখের দৃষ্টি, কণ্ঠস্বরের সুর বা মুখের অভিব্যক্তি অনুপস্থিত থাকায় সহানুভূতি জাগ্রত হওয়ার সুযোগ কমে যায়, এবং অন্যকে আঘাত করা তুলনামূলক সহজ হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, অনলাইন পরিবেশে বয়স, সামাজিক মর্যাদা বা আর্থিক অবস্থানের পার্থক্য অনেকটাই অস্পষ্ট হয়ে যায়; ফলে ভয় বা আনুষ্ঠানিক সম্মানবোধের চাপ না থাকায় মানুষ প্রায়শই সীমা লঙ্ঘন করতে দ্বিধা বোধ করে না।
এই অনলাইন উগ্রতার প্রভাব কিন্তু শুধুই ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি ধীরে ধীরে আমাদের সামাজিক সম্পর্ক এবং গণআলোচনার সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে। ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতা কমে যায়, যুক্তির জায়গা দখল করে আবেগ আর আক্রমণ। ফলে সুস্থ বিতর্কের বদলে তৈরি হয় বিভাজন ও বৈরিতা। তবে এই পরিস্থিতি অপরিবর্তনীয় নয়। সচেতনতা এবং ব্যক্তিগত সংযমের মাধ্যমে আমরা অনলাইন আচরণকে আরও মানবিক করতে পারি। আসলে, অনলাইন জগৎ আমাদের ভেতরের সেই দিকটাকেই প্রকাশ করে, যেটা সামাজিক চাপে আমরা লুকিয়ে রাখি। তাই অনলাইন হোক বা অফলাইন—আচরণের মূল ভিত্তি যদি উপযুক্ত হয়, তাহলে মাধ্যম বদলালেও মানবিকতা হারাবে না।
প্রশ্ন: সেই উপযুক্ত ভিত্তি কী?
উত্তর: ইসলাম।
ইসলাম অনলাইন-অফলাইনের পার্থক্য করে না; বরং প্রত্যেক কথা ও কাজের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লার সামনে জবাবদিহি করতে হবে। অনলাইনে অজ্ঞাতপরিচয়ের আড়ালে গালাগালি, হিংসাত্মক কথা বলার সময় আমরা ভুলে যায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা সবকিছু দেখছেন—তার সামনে কোনো ‘অ্যানোনিমিটি’ কাজ করে না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা বলেন,
وَاِ ذْ اَخَذْنَا مِيْثَا قَ بَنِيْۤ اِسْرَآءِيْلَ لَا تَعْبُدُوْنَ اِلَّا اللّٰهَ وَبِا لْوَا لِدَيْنِ اِحْسَا نًا وَّذِى الْقُرْبٰى وَا لْيَتٰمٰى وَا لْمَسٰکِيْنِ وَقُوْلُوْا لِلنَّا سِ حُسْنًا وَّاَقِيْمُوا الصَّلٰوةَ وَاٰ تُوا الزَّکٰوةَ ۗ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ اِلَّا قَلِيْلًا مِّنْکُمْ وَاَ نْـتُمْ مُّعْرِضُوْنَ
"আর স্মরণ কর, যখন বানী ইসরাঈলের শপথ নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ‘ইবাদাত করবে না, মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, অনাথ ও দরিদ্রদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে, নামায কায়িম করবে এবং যাকাত দিবে। কিন্তু অল্প সংখ্যক লোক ছাড়া তোমরা অগ্রাহ্যকারী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলে।"
(২/৮৩)
উপরোক্ত আয়াতে বলা হচ্ছে "وَقُوْلُوْا لِلنَّا سِ حُسْنًا" অর্থাৎ, "মানুষের সাথে সদালাপ করবে (সুন্দর কথা বলবে)"। ইহুদি-খ্রিস্টানও এ নির্দেশের আওতাভুক্ত। সুতরাং একজন মুসলিম যত মন্দই হোক না কেন, সে কেন এই নির্দেশনার আওতায় পড়বে না? তাফসীরে মাআ'রিফুল কুরআনে এই আয়াতের ব্যাখ্যা এসেছে এভাবে, যখন মানুষের সাথে কথা বলবে, নম্রভাবে হাসিমুখে ও খোলা মনে বলবে—যার সাথে কথা বলবে, সে সৎ হউক অথবা অসৎ, তবে কারও মনোরঞ্জনের জন্য সত্য গোপন করা যাবে না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা যখন মূসা ও হারুন আ. কে নবুয়ত দান করে ফেরআউনের কাছে পাঠিয়েছিলেন, তখন এ নির্দেশ দিয়েছিলেন—
"فَقُوْلَا لَهٗ قَوْلًا لَّيِّنًا"
অর্থাৎ, "তার (ফেরাউনের) সঙ্গে তোমরা নম্রভাবে কথা বলবে"। আর আজ আমরা যারা অন্যের সাথে কথা বলি, তারা হযরত মূসা আ. এর চাইতে উত্তম নয় এবং যার সাথে কথা বলি, সে ফেরআউন অপেক্ষা বেশি মন্দ ও পাপিষ্ঠ নয়। তাহলে, একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের আচরণে ফুটে ওঠা এই বেয়াদবি কী গ্রহণযোগ্য?
প্রিয় ভাইয়েরা, এই খারাপ কাজের সাথে আমরা যারা জড়িত আছি, আমাদের সতর্ক হতে হবে। আমরা হয়ত অনেক বড় বড় আমল করি কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হয় এমন সব আমলকে আমরা অবজ্ঞা করি। এটা খুবই ভয়ানক একটা বিষয়। প্রিয় ভাই, মনে রাখবেন—পাহাড়ের সঙ্গে হোঁচট খেয়ে কারো হাত-পা ভাঙে না; বরং সামান্য একটা ইটের টুকরায় হোঁচট খেয়েই মানুষ বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীন হয়। যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথম করণীয় হলো সমস্যাটাকে সমস্যা বলে স্বীকার করে নেওয়া, তবেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। তাই যারা অনলাইনে একে অপরের সাথে ভাব বিনিময়ের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে ফেলেন, তারা যদি এই সমস্যার সমাধান চান, তাহলে কিছু পরামর্শ আপনার জন্য—
১) তাকওয়া অর্জনের চেষ্টা করুন, এটা এমনি এমনি আসবে না, আপনাকে চেষ্টা করতে হবে, হিসাব করে কাজ করতে হবে।
২) সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকুন, আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় না থাকলে, পোস্ট-কমেন্ট না করলে, ইসলামের কোনই ক্ষতি হবে না; বরং এর দ্বারা আপনিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, এটা স্বীকার করে নেন।
৩) প্রয়োজনের কারণে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাবহার করতে হলে—সব ধরনের পোস্ট করা থেকে বিরত থাকুন, নিজের মতামতধর্মী সব ধরনের কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন এবং লাইক ব্যাতীত অন্য সব ধরনের রিয়্যাক্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
এগুলোর পাশাপাশি প্রোডাক্টিভ কাজে সময় ব্যায় করুন, কোনো না কোনো কাজে যোগ্য হয়ে ওঠার চেষ্টা করুন।
একটা হাদিস স্মরণ করিয়ে দিয়ে শেষ করছি—আবূ হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই। সে তার সাথে কোনরকম বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, তার প্রসঙ্গে মিথ্যা বলবে না, তাকে অপমান করবে না। প্রত্যেক মুসলিমের মান-সম্মান, ধন-সম্পদ ও রক্তের (জীবনের) উপর হস্তক্ষেপ করা অপর মুসলিমের উপর হারাম। তাক্বওয়া এখানে (অন্তরে)। কেউ মন্দ বলে প্রমাণিত হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার অপর মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ জ্ঞান করে।
(জামে' আত-তিরমিজি, হাদিস নং ১৯২৭)