Announcement

Collapse
No announcement yet.

ফিরাসাহ্ : তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি

Collapse
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • ফিরাসাহ্ : তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি

    ফিরাসাহ্ হলো কোনো বিষয় দেখে (তার বাস্তবতা) দ্রুত বুঝে ফেলার ক্ষমতা, তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি ও প্রখর উপলব্ধি।

    মহান আল্লাহ বলেন,
    إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْمُتَوَسِّمِينَ
    "নিশ্চয়ই এতে 'মুতাওয়াসসিমীন'দের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে।" [সূরা হিজর, আয়াত: ৭৫]

    এই 'মুতাওয়াসসিমীন' শব্দের অর্থ নিয়ে কোরআনের মহান ব্যাখ্যাকারগণ যা বলেছেন, তা নিচে দেওয়া হলো:

    মুজাহিদ (রহ) বলেন: এর অর্থ "যাঁদের দেখার ও বোঝার ক্ষমতা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ।"

    ইবনু আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: এর অর্থ "যাঁরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।"

    কাতাদাহ্ (রহ) বলেন: এর অর্থ "যাঁরা শিক্ষা গ্রহণ করেন।"

    মুকাতিল (রহ) বলেন: এর অর্থ "যাঁরা চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করেন।"


    এই ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে আসলে কোনো নেই। যেমন—কেউ যদি আল্লাহর রাসুলদের অমান্যকারী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর বাড়িঘর বা ধ্বংসাবশেষ দেখে, তবে সে সেখান থেকে অন্তর্দৃষ্টি পাবে, শিক্ষা নেবে এবং গভীরভাবে ভাবার সুযোগ পাবে।

    ফিরাসাহ্ দেখার মাধ্যমেও হতে পারে, আবার শোনার মাধ্যমেও হতে পারে। আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেছেন,

    "তোমরা মুমিনের ফিরাসাহ্ থেকে বেঁচে থাকো, কারণ সে আল্লাহর নূর বা আলো দিয়ে দেখে।" এরপর তিনি কোরআনের সেই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন, " নিশ্চয়ই এতে 'মুতাওয়াসসিমীন'দের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। " (তিরমিযী)।

    মূলত ফিরাসাহ্ হলো এমন এক নূর, যা মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার হৃদয়ে ঢেলে দেন। এই নূরের সাহায্যেই একজন বান্দা সত্য ও মিথ্যার তফাত করতে পারে এবং ভালো ও মন্দের ভেদাভেদ বুঝতে পারে।

    ফিরাসাহ্-এর আসল রূপ হলো এমন এক জোরালো অনুভূতি বা ভাবনা, যা হুট করে অন্তরে এসে ভর করে এবং মনের সব চিন্তাভাবনাকে এক নিমেষে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। শিকারের ওপর সিংহ যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে (আরবিতে যাকে 'ফারিসাহ্' বলা হয়), এই অনুভূতিটাও ঠিক সেভাবেই মানুষের মনকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলে।

    কারো ফিরাসাহ্ বা অন্তর্দৃষ্টি কতটা জোরালো হবে, তা নির্ভর করে তার ঈমানের শক্তির ওপর। যার ঈমান যত মজবুত, তার অন্তর্দৃষ্টিও ততটাই তীক্ষ্ণ।

    আমর বিন নুজাইদ বলেন, শাহ আল-কিরমানির অন্তর্দৃষ্টি ছিল অসম্ভব ধারালো, যা কখনো ভুল হতো না। তিনি নিজে প্রায়ই বলতেন—যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ জিনিসের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখে, মনের কুপ্রবৃত্তি দমন করে, মনকে সবসময় আল্লাহর স্মরণে (মুরাকাবা) ডুবিয়ে রাখে, নিজের বাহ্যিক জীবনকে সুন্নাহ অনুযায়ী গড়ে তোলে এবং সবসময় হালাল খাবার খাওয়ার অভ্যাস ধরে রাখে, তার অন্তর্দৃষ্টি বা ফিরাসাহ্ কখনো ভুল হতে পারে না।

    আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন,
    "পৃথিবীতে তিন ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ও সঠিক ছিল:

    প্রথমজন: মিসরের সেই আজিজ (মন্ত্রী), যিনি ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-কে দাস হিসেবে কিনে নিজের স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘তার থাকার সুব্যবস্থা কর, সম্ভবতঃ সে আমাদের উপকারে আসবে কিংবা তাকে আমরা পুত্র হিসেবেও গ্রহণ করে নিতে পারি।' [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২১]

    দ্বিতীয়জন: শুআইব (আলাইহিস সালাম)-এর কন্যা, যিনি মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর বিশ্বস্ততা ও শক্তি দেখে নিজের বাবাকে বলেছিলেন, হে পিতা! পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তাকে নিযুক্ত করুন, আপনি যাদেরকে মজুর নিযুক্ত করবেন তাদের মধ্যে উত্তম যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত।' [সূরা কাসাস, আয়াত: ২৬]

    তৃতীয়জন: আবু বকর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু), কারণ তিনি তাঁর দূরদর্শিতা দিয়ে উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-কে নিজের উত্তরাধিকারী (পরবর্তী খলিফা) হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।"


    অন্য একটি বর্ণনায় (আবু বকরের জায়গায়) ফেরাউনের স্ত্রীর কথা বলা হয়েছে, যিনি শিশু মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে দেখে ফেরাউনকে বলেছিলেন, "এ শিশু আমার ও তোমার চক্ষু শীতলকারী, তাকে হত্যা কর না, সে আমাদের উপকারে লাগতে পারে অথবা তাকে আমরা পুত্র হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি…" [সূরা কাসাস, আয়াত: ৯]

    এই উম্মতের মধ্যে আবু বকর আস-সিদ্দিক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-কে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি বা ফিরাসাহ্-এর অধিকারী মনে করা হয়, আর উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন এর পরেই।

    উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর অন্তর্দৃষ্টির প্রমাণ মেলে এমন ঘটনা এত বেশি যে, সেগুলো সবার খুব পরিচিত ও সুপরিচিত। কোনো বিষয়ে তিনি যদি বলতেন, "আমার মনে হয় বিষয়টা এমন," তবে বাস্তবে সেটি ঠিক তেমনই হতো। বেশ কিছু ঘটনায় খোদ কুরআন তাঁর মতামতের পক্ষে সায় দিয়েছে—উমরের প্রখর অন্তর্দৃষ্টির প্রমাণ হিসেবে এটিই যথেষ্ট। এর মধ্যে অন্যতম একটি ঘটনা ছিল বদরের যুদ্ধের বন্দিদের মুক্তিপণের ব্যাপারে তাঁর দেওয়া মতামত।

    একবার সাওয়াদ বিন কারিব নামের এক ব্যক্তি উমরের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি তাঁকে দেখে বললেন, "এই লোক হয় গণক (ভবিষ্যদ্বক্তা), না হয় জাহেলিয়াত আমলে সে গণক ছিল।" পরে সাওয়াদ যখন উমরের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) সামনে এসে বসলেন, তখন বললেন, "হে আমিরুল মুমিনীন! আপনি অন্য কোনো মেহমানকে বোধহয় এভাবে (সন্দেহের চোখে) অভ্যর্থনা জানাননি, যেভাবে আমাকে জানালেন।"

    উমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) উত্তরে বললেন, "জাহেলিয়াতের যুগে আমরা যা করতাম তা এর চেয়েও খারাপ ছিল। তা যাক, আমি তোমাকে যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দাও।" সাওয়াদ তখন বললেন, "হে আমিরুল মুমিনীন, আপনার অনুমান একদম সত্যি! জাহেলিয়াতের যুগে আমি আসলেই গণক ছিলাম।" এরপর তিনি তাঁর পুরো ঘটনাটি খুলে বললেন।

    সাধারণভাবে সব সাহাবীর অন্তর্দৃষ্টিই ছিল সবচেয়ে নিখুঁত ও তীক্ষ্ণ। আসল ফিরাসাহ্ বা অন্তর্দৃষ্টি আসে মন ও জীবনের পবিত্রতা থেকে এবং সেই নূরের মাধ্যমে, যা মহান আল্লাহ তাঁর খাঁটি বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দান করেন। যখন অন্তর আল্লাহর আলো ও জীবন খুঁজে পায়, তখন তার অন্তর্দৃষ্টির অনুমান আর কখনোই ভুল হয় না।

    মহান আল্লাহ বলেন,
    "যে ব্যক্তি মৃত ছিল, তাকে আমি জীবিত করলাম, তার জন্য আলোর ব্যবস্থা করলাম যার সাহায্যে সে মানুষের মাঝে চলাফেরা করে, সে কি তার মত যে অন্ধকারে নিমজ্জিত, যাত্থেকে সে কক্ষনো বেরিয়ে আসতে পারবে না?" [সূরা আনআম, আয়াত: ১২২]

    এই আয়াতে মানুষকে "মৃত" বলা হয়েছে কারণ তার অন্তরে কুফর (অবিশ্বাস) ছিল এবং সে জাহেলিয়াত বা অজ্ঞতার জীবনে ডুবে ছিল। কিন্তু এরপর আল্লাহ তাকে ঈমান ও জ্ঞানের মাধ্যমে নতুন জীবন দান করেন। আল্লাহর এই উপহারগুলো গ্রহণ করার পর, কোরআন ও ঈমানই হয়ে ওঠে তার পথ চলার আলো; যা তাকে (কুফর ও অজ্ঞতার) অন্ধকার থেকে বের করে সরল সঠিক পথ দেখায়।

    ফিরাসাহ্ বা অন্তর্দৃষ্টি মানুষের তিনটি অঙ্গের সাথে সরাসরি জড়িত: চোখ, কান এবং অন্তর।

    একজন মানুষের চোখ চারপাশের পরিস্থিতি, বাহ্যিক রূপ ও বিভিন্ন আলামত খুঁটিয়ে দেখে;

    তার কান লক্ষ্য করে মানুষের কথাবার্তা, মুখের অভিব্যক্তি, পরোক্ষ ইশারা-ইঙ্গিত, কথার বিষয়বস্তু, যুক্তি এবং কণ্ঠস্বরের ওঠানামা।

    আর তার অন্তর চোখ ও কান দিয়ে অর্জন করা এই সমস্ত তথ্যকে বিশ্লেষণ করে অন্য মানুষের মনের লুকিয়ে থাকা আসল চিন্তাটা ধরে ফেলে।


    মানুষের ভেতরের রূপ আর বাইরের আচরণের এই চুলচেরা বিশ্লেষণটা ঠিক কেমন জানেন?

    ঠিক যেন একজন জহুরি বা পারদর্শী মানুষের মতো, যিনি কোনো মুদ্রার ওপরের অংশটা দেখার পর তা আসল নাকি জাল—সেটা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে নেন।

    এর আরেকটি চমৎকার উদাহরণ হলো মুহাদ্দিসগণ (হাদিস বিশারদ)। তাঁরা হয়তো এমন একটি হাদিস পড়ছেন যার বর্ণনাকারী বা রাবীদের সিলসিলা (সনদ) আপাতদৃষ্টিতে একদম নিখুঁত মনে হচ্ছে, কিন্তু হাদিসের মূল বক্তব্য (মতন) গভীরভাবে পরীক্ষা করতেই ধরে ফেলেন যে এটি আসলে একটি জাল বা বানোয়াট হাদিস।

    ফিরাসাহ্-এর পেছনে মূলত দুটি বিষয় কাজ করে।

    প্রথমটি হলো মানুষের নিজের প্রজ্ঞা, মনের তীক্ষ্ণতা ও উপস্থিত বুদ্ধি।

    দ্বিতীয়টি হলো অন্য মানুষের আচরণে ফুটে ওঠা বিভিন্ন লক্ষণ ও ইঙ্গিত।

    যখন এই দুটি বিষয়ের সঠিক মেলবন্ধন ঘটে, তখন মানুষের অন্তর্দৃষ্টি আর ভুল হয় না।


    ~ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ​



    ~~~ফেসবুক থেকে সংগৃহীত~~~
    বছর ফুরিয়ে যাবে এতো রিসোর্স আছে https://gazwah.net সাইটে
Working...
X