প্রাসঙ্গিক গবেষণা-প্রবন্ধ সংকলনঃ- ০৩. নিজের অজান্তে আমরা শিরকে লিপ্ত না তো?
কয়েকটি জরুরি জ্ঞাতব্যঃ-
- নীচের প্রবন্ধটি "সরকারী পাঠ্যবই ও ইসলাম সিরিজের" প্রাসঙ্গিক জরুরি একটি গবেষণাপ্রবন্ধ।
- এই প্রবন্ধটি অসংখ্য লেখা ও আর্টিকেলের নির্বাচিত অংশের সমষ্টি। যে লেখাগুলো অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। তাই এগুলো আমার নিজের লেখা নয়; এ হিসেবে আমি উক্ত লেখাগুলোর একজন সংকলক মাত্র। আল্লাহ মূল লেখকবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট সকলকে জাযায়ে খায়র দিন।
- প্রবন্ধটি অসংখ্য আর্টিকেলের সংকলন হলেও এখানে বহুবিদ সম্পাদনার প্রয়োজন ছিল। ভাষাসম্পাদনা, অঙ্গসজ্জা, শারঈ সম্পাদনাসহ সার্বিক সম্পাদনার প্রয়োজন ছিল। সেগুলো আমার করা। এ হিসেবে আমি এ প্রবন্ধের একজন সম্পাদকও বটে।
- শেষে উল্লেখিত ফাতওয়াটি একজন বিজ্ঞ ও মুহাক্কিক মুফতির কাছ থেকে সংগৃহীত। যেহেতু সমগ্র প্রবন্ধজুড়ে ফাতওয়ার শারঈ দলীলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে একবার উল্লেখ করা আছে, তাই ফাতওয়ার নীচে নতুনভাবে আর দলীলগুলো দেওয়া হয়নি।
- প্রবন্ধটি যেহেতু ২১শে ফেব্রুয়ারি ও ভাষাদিবসকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে; সেহেতু স্থানে স্থানে শহীদ মিনারের নাম উল্লেখ করে লেখা হয়েছে। তবে এ প্রবন্ধটি সকল প্রকার দিবসের অসারতা প্রমাণের ক্ষেত্রে সমান প্রযোজ্য।
- প্রবন্ধের শুরুতে "ইসলামে দিবস পালনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ০৫টি মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যা জানলে শহীদ মিনারের বৈধতা-অবৈধতা উপলব্ধি করা সহজ হবে।
- "সেদিন মূর্তির সম্মানে যা যা করা হয়ঃ শহীদ মিনারকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠানসমূহ: যেগুলো ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ" এই শিরোনামের অধীনে সেদিন পালনকৃত হারাম ও শিরকমিশ্রিত কার্যক্রমগুলোকে লিস্টেড করা হয়েছে। এবং সেগুলো কেন হারাম, সেটাও প্রবন্ধজুড়ে স্পষ্ট করা হয়েছে।
- প্রবন্ধটির শেষে এবিষয়ে শরীয়াহর অবস্থান নিয়ে সংশয়বাদীদের অলীক সংশয়সমূহ ও সেগুলোর জবাব দেওয়া হয়েছে।
- সম্মানিত পাঠক ভাইবোনদের নিকট আবেদন থাকবে, দিবসপালন বিষয়ক জরুরি কোনো লেখা, আর্টিকেল, প্রবন্ধ বা তথ্য আপনার সংগ্রহে থাকলে কমেন্টে পেস্ট করে দিতে পারেন। সবাই আরো জানবে, আরো বেশি সচেতন হবে।
- এ প্রবন্ধে কোনো ভুলত্রুটি থেকে গেলে সেটার দায় একান্তই লেখক ও সম্পাদকের। তখন সেটা আমাদের ব্যক্তিগত মতামত বলে গণ্য হবে।
- একটু দীর্ঘ হওয়ার কারণে সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি একইথ্রেডে দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই প্রবন্ধের বাকি অংশ ধীরে ধীরে পোস্ট করা হবে।
আশা করি প্রবন্ধটি সকল দ্বীনমুখী ভাইবোন ও দ্বীনবিরোধীদের জন্য সহায়ক হবে। কারো দ্বীনের পথে অটল থাকার; আর কারো দ্বীনের দিকে ফিরে আসার। পরিশেষে একটা আবেদন করতেই পারি, আপনাদের নেক দুআয় আমাদেরকে ভুলবেন না।
-------------------------------
ইসলামে দিবস পালনের বিষয়ে কয়েকটি মূলনীতি জানলেই শহীদ মিনারের বৈধতা-অবৈধতা উপলব্ধি করা সহজ হবে। আমরা কুরআন ও হাদিসের আলোকে মূলনীতিগুলো উল্লেখ করছি। এতে ভাষা শহীদ দিবসসহ অন্যান্য সকল দিবস পালনের অসারতা ও অবৈধতা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে।
১ নং মূলনীতিঃ ইসলামে জাতিগতভাবে উৎসব পালনের জন্য শুধুমাত্র দুটি দিন নির্ধারণ রয়েছে। এক হলো ইদুল ফিতর আর দ্বিতীয়টি হলো ইদুল আজহা। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যই আমি নিয়ম-কানুন নির্ধারণ করে দিয়েছি যা তারা পালন করে। সুতরাং তারা যেন এ ব্যাপারে তোমার সঙ্গে বিতর্ক না করে। [সূরা আল হাজ্ব, আয়াত ৬৭]
আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মদিনায় আসলেন তখন তাদের দুটি উৎসবের দিন ছিল। তিনি বললেন, এ দুটি দিনের তাৎপর্য কী? তারা বলল, জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ দুটি দিনে উৎসব পালন করতাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এ দিনগুলোর পরিবর্তে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন; কুরবানির ইদ ও রোজার ইদ। [সুনানু আবি দাউদঃ ১/২৯৫, হাদিস নং ১১৩৪, প্রকাশনীঃ আল মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরুত]
এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে জাতীয়ভাবে দুটি উৎসবই নির্ধারিত। আর কুরআনের ভাষ্যমতে মুসলিমদের জন্য নিজ ধর্মের অনুমোদিত উৎসবই শুধু বৈধ, এর বাইরে অন্য কোনো উৎসব-পার্বন পালনের অনুমতি নেই। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদিনায় এসে প্রথমেই যে সকল কুসংস্কৃতি বন্ধ করেন, তন্মধ্য হতে অন্যতম ছিল নববর্ষ পালন উৎসব। ইসলামপূর্ব সময়ে মদিনাতেও নববর্ষ পালনের প্রথা চালু ছিল। কিন্তু ইসলাম এসে তা বন্ধ করে তাদের উৎসবের জন্য নতুন দুটি দিবস দান করে। অতএব, বিধর্মীদের উদযাপিত নববর্ষের পরিবর্তে ইসলাম-প্রদত্ত দুটি দিবস পেয়েও যারা সন্তুষ্ট নয়, এখনও যারা নববর্ষ পালন করতে আগ্রহ দেখায় বা পালন করে, তারা মূলত ইসলামের পূর্ণতাকে অস্বীকার করে পূর্বের সে জাহিলিয়াতের দিকেই ফিরে যেতে চায়। এমনটি করা একজন মুসলিমের পক্ষে কী করে সম্ভব যে, যে দিবসের পরিবর্তে আল্লাহ তাকে উত্তম দিবস দান করলেন, তথাপিও নিষিদ্ধ সে দিবস পালন করার জন্যই সে উদগ্রীব হয়ে থাকে।
২ নং মূলনীতিঃ ইসলামে বিধর্মী ও বদদ্বীন লোকদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। হুজাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি অন্য জাতির সঙ্গে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। [মুসনাদুল বাজ্জারঃ ৭/৩৬৮, হাদিস নং ২৯৬৬, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল উলুম ওয়াল হিকাম, মদিনা]
এ হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয় যে, বিজাতীয় ও বদদ্বীন লোকদের অনুষ্ঠান বা মেলায় শরিক হওয়া, এতে সমর্থন দেওয়া নাজায়িজ ও হারাম। অতএব, যারা এসব বিজাতীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবে, তারাও এ ক্ষেত্রে তাদের শ্রেণীভুক্ত হয়ে যাবে।
৩ নং মূলনীতিঃ অশ্লীলতাপূর্ণ উৎসব পরিত্যাগ করা মুসলিমদের জন্য একান্ত আবশ্যক। নিজে অশ্লীল কাজ করা বা এর প্রচার কামনা করা জঘন্যতম অপরাধ ও হারাম। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার ঘটুক তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। [সূরা নূর, আয়াত ১৯]
আমাদের কারও অজানা নয় যে, দিন দিন পহেলা বৈশাখে অশ্লীলতা কী পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতএব, পহেলা বৈশাখসহ অশ্লীলতাপূর্ণ সকল কর্মকাণ্ড মুসলিমদের জন্য হারাম। তাতে শরিক হওয়া কিংবা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন করা সবই নাজায়িজ।
৪ নং মূলনীতিঃ অপচয় ও অনর্থক কাজ থেকে মুসলমানদের বেঁচে থাকা একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ আর তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। [সূরা আল আরাফ, আয়াত ৩১]
আল্লাহ তা’আলা আরও বলেনঃ নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা হলো শয়তানের ভাই। [সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ২৭]
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো, অনর্থক বিষয় ত্যাগ করা। [সুনানুত তিরমিজিঃ ৪/১৩৬, হাদিস নং ২৩১৭, প্রকাশনীঃ দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরুত]
এসব দিবসে কী পরিমাণ অপচয় হয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
৫ নং মূলনীতিঃ সংশয়পূর্ণ বিষয় পরিত্যাগ করে সংশয়মুক্ত বিষয় গ্রহণ করার নির্দেশ রয়েছে। হাসান বিন আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ যা তোমাকে সন্দেহে নিপতিত করবে তা পরিত্যাগ করো আর যাতে কোনো সন্দেহ নেই সেটিই করো। [সুনানে নাসায়ীঃ ৮/৩২৭, হাদিস নং ৫৭১১, প্রকাশনীঃ মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়্যা, হালব]
সুতরাং কোনো বিষয়ে মতানৈক্য বা মতবিরোধ থাকলে তা যদি আবশ্যকীয় কাজ না হয়ে থাকে তাহলে একজন মুমিনের কর্তব্য হলো তা পরিত্যাগ করা। কেননা কাজটি বৈধ হলেও তা না করার কারণে তার কোনো গুনাহ হবে না, কিন্তু তা অবৈধ হয়ে থাকলে এতে জড়িত হওয়ার দরুন সে গুনাহগার হয়ে পড়বে, যা কখনো একজন সাচ্চা মুমিনের কামনা হতে পারে না। তাই শরিয়তের অপব্যাখ্যা করে কেউ ভাষাদিবস, পহেলা বৈশাখ পালন জায়িজ হওয়ার কথা বললেও তার কথার দিকে ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না।
সারকথাঃ এ পাঁচটি মূলনীতিকে সামনে রেখে বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কারভাবে বুঝে আসে যে, বর্তমানের প্রচলিত পহেলা বৈশাখ, নারী-দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ভ্যালেন্টাইন্স ডে, থার্টি ফার্স্ট নাইট সহ এ জাতীয় দিবসসমূহ পালন করা, এতে শরিক হওয়া ও এর সমর্থন করা হারাম ও নাজায়িজ। কেননা আমাদের মুসলিমদের জন্য কুরআন এবং সুন্নাহর বাহিরে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই। আর কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের উৎসবের জন্য নির্ধারিত দুটি দিন রেখে অন্যান্য সকল উৎসবকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
--------------------------------------------
ধারাবাহিক চলবে......। আপনাদের মতামত জানাবেন। জাযাকুমুল্লাহ।