Announcement

Collapse
No announcement yet.

পাঠচক্র- ৪৪ || ইসলাম ও গণতন্ত্র ।। মাওলানা আসেম উমর রহিমাহুল্লাহ।। ত্রয়োবিংশ পর্ব

Collapse
This is a sticky topic.
X
X
 
  • Filter
  • Time
  • Show
Clear All
new posts

  • পাঠচক্র- ৪৪ || ইসলাম ও গণতন্ত্র ।। মাওলানা আসেম উমর রহিমাহুল্লাহ।। ত্রয়োবিংশ পর্ব

    ইসলাম ও গণতন্ত্র
    ।।
    মাওলানা আসেম উমর রহিমাহুল্লাহ।।
    এর থেকে–ত্রয়োবিংশ পর্ব

    গণতন্ত্র এবং কতিপয় ওলামায়ে কেরাম


    এখানে এ প্রশ্নটি অবশ্যই করা যেতে পারে যে, এই গণতন্ত্র যদি কুফরি হয়, তবে কোন কোন ওলামায়ে কেরাম এতে শরিক কেনো? তাদের হুকুম কি?

    যে সব ওলামায়ে কেরাম এই গণতন্ত্র ব্যবস্থার সাথে জড়িত এবং এখন পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন, তাদের সম্পর্কে আমরা এতটুকুই বলব যে, তাদের কাছে গণতন্ত্র ব্যবস্থার কুফরি হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল না শরীয়তের দৃষ্টিতে এটা একটা ওজর, আর ওজর থাকলে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে কাফের বলা যায় না। আবার তাদের মধ্যে হতে কতিপয় বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এই সাক্ষ্যই বিদ্যমান রয়েছে যে, শেষে তারা নিজেদের এই গণতন্ত্র থেকে মুক্ত করেছিলেন ।

    কারো কুফরি প্রকাশ হওয়া না হওয়া, কুফরি কারো বেলায় আগে প্রকাশ হওয়া কারো বেলায় পরে প্রকাশ হওয়া- এটা কারো তাকওয়া ও ইলমের জন্য বিপরীত বা প্রতিদ্বন্দ্বি (মুনাফী) বিষয় নয় । এক্ষেত্রে এ কথা বলা অনর্থক যে, গণতন্ত্র যদি কুফরিই হত, তবে বড় বড় সমস্ত আলেম এটাকে কুফরি বলেন না কোনো?

    মনে রাখবেন, আল্লাহ তায়ালা হক এবং বাতিলকে স্পষ্ট করার জন্য এবং দ্বীনে মুবিনের উপর উড়ে আসা ধুলিবালি পরিস্কার করার জন্য প্রত্যেক যুগেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বদেরকে নির্বাচন করেছেন । এটা আল্লাহর মহা-অনুগ্রহ, যিনি তা পেয়েছেন ।

    সাইয়িদিনা হযরত ওমর ফারুক রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যাকে হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম হক ও বাতিল পার্থক্যকারীর (ফারুক) খেতাব দিয়েছেনকিন্তু যাকাত দিতে অস্বীকৃতিজ্ঞাপনকারীদের বিরুদ্ধে যখন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কিতালের ঘোষণা করেন, হযরত ওমর ফারুক রাষিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তখন বললেন, যারা কালেমা পড়ে আপনি তাদের বিরুদ্ধে কিতাল করবেন? পরে তিনি নিজেই বলতেন, আল্লাহ তায়ালা হযরত আবু বকরের বক্ষ উন্মোচন করে দিয়ে ছিলেনএই ঘটনার কারণে হযরত ওমর ফারুক রাষিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর ফযিলত কমতে পারে না । কিন্তু আল্লাহ তায়ালার নিয়ম হল, প্রথম পর্যায়ে কোনো একজন ব্যক্তি বা একটি দলের সিনায় রহমতের তাজাল্লি ফেলেন।

    ইসলামের ইতিহাস হাতে নিয়ে দেখুন । খেলাফতকে নবুওয়াতের তরিকায় আনার জন্য হযরত হুসাইন রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, খলকে কুরআনের ফিতনায় হযরত আহমাদ বিন হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ক্রুসেডারদের ফিতনার বিরুদ্ধে থেকে বাঁচানোর জন্য সালাহুদ্দিন আইয়ুবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, আলমে ইসলামকে তাতারি ফিতনা থেকে বাঁচানোর জন্য শাইখুল ইসলম, রণাঙ্গনের মুজাহিদ, হকের উপর কারাগার এবং কারাগার থেকে প্রিয়জনের সান্নিধ্যে গমনকারি, ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের সাচ্চা জানেশীন...ইমাম ইবনে তাইমিয়া, দ্বীনে আকবরের বিরুদ্ধে মুজাদ্দিদে আলফে সানী, উপমহাদেশে রাষ্ট্রীয় পতনকে ইলম ও ইয়াকিনের কুওয়াত দ্বারা সুদৃঢ়কারী শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, মুসলিম ভারতে শরীয়তের খাতিরে জিহাদ ও কিতালের ভিত্তি স্থাপনকারী সাইয়িদ আহমাদ বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ক্ষমতাধর দুশমনের মোকাবেলায় জনশক্তির ওজর খণ্ডন করে শামেলীর ময়দানে অবতরণকারী কাসিম নানুতবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, শিয়াবাদ ও তার আড়ালে লুকায়িত কুফরিকে উন্মোচনকারী হক নাওয়াজ ঝঙ্গুভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, কুরআন এবং সুন্নাহর তরজে খালেস ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারী আমিরুল মুমিনীন মোল্লা মুহাম্মাদ ওমর মুজাহিদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি, আহলে ইলমরাও যখন এর আমলি কিয়াম তথা কার্যত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন এবং খেলাফতকে দরস-তাদরিস থেকেও বের করে দেয়া হয়েছিল- আনা রব্বুকুমুল আলা'র কথক ফেরাউন, আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করে তার অহঙ্কার পেন্টাগন ও ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারকে ধ্বংসস্তূপে দাফনকারী শহীদে উম্মত উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ, পারভেজ মুশাররফ এবং তার সেনাবাহিনীর কুফরিকে চ্যালেঞ্জকারী ইমামে ওয়াক্ত- গাজী আবদুর রশিদ শহীদ রহ.... তালিকা তো অনেক দীর্ঘ । কিন্তু আমার জাতি এই কতিপয় ব্যক্তিত্বের অনুগ্রহের যদি পরিশোধ করতে পারত!

    এসব ইতিহাস আমাদেরকে এ কথা বোঝার জন্য যথেষ্ট যে, প্রত্যেক যুগে যে কোনো ফিতনার বিরুদ্ধে সূচনাতে যে কোনো একজন ব্যক্তিকেই চয়ন করা হয়। এরপর আসমানে তার কবুলিয়াতের এলান করা হয়৷ সুতরাং সৌভাগ্য তাদের জন্য, যারা হক ও বাতিল স্পষ্ট হওয়ার পর বাতিলে বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে হকওয়ালাদের সঙ্গী হয় । আর দুর্ভাগ্য তাদের কপালে জোটে, যারা কেবল হঠকারিতাবশত হককে কবুল করা হতে বিরত থাকে

    সুতরাং গণতন্ত্রকে কেবল এ কারণে কুফরি না মানা যে, বড় বড় আলেমরা এটাকে কুফরি বলেননি, এটা কোনো দলিল নয়আবার এর জন্য ওলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে গাল-মন্দ শুরু করব, তাও ঠিক না।

    আল্লামা যাহাবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন-

    ان الكبير من أئمة العلم اذا كثر صوابه وعلم تحريه للحق واتساع علمه وظهر ذكاؤه عرف صلاحه وورعه واتباعه تغفر زلاته ولانضله نطرحه وننسي محاسنه نعم ولانقتدي به في بدعته وخطئه ونرجوله التوبة من ذلك

    আকাবির ওলামা এবং আয়েম্মায়ে ইলমের মধ্য হতে যাদের অধিকাংশ রায় সঠিক, যাদের হক পর্যন্ত পৌঁছার পিপাসা, ইলমের ব্যপকতা, মেধা ও বোধ-বুদ্ধির গভীরতা, দ্বীনদারী, তাকওয়া এবং ইত্তেবায়ে হকের জযবা জানা যায়, তাদের ভুল- ভ্রান্তিগুলোকে ছাড় দেয়া হবেতাকে গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট বলা হবে না এবং তাকে উপেক্ষাও করা হবে না। আর তার এই (ভুল-ভ্রান্তির কারণে তার) অবদানকেও ভুলে যাওয়া যাবে না। আবার তার বিদআত ও তার ভুল-ভ্রান্তির ইত্তেবা-অনুসরণও করব না। আল্লাহর নিকট আশা রাখব, আল্লাহ তায়ালা তার এসব ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমা করে দিবেন[1]

    সুতরাং যে সব ওলামায়ে কেরাম এই গণতন্ত্রে জড়িত ছিলেন এবং এই দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছেন, তাদের সম্পর্কে আমরা এটাই বলব যে, গণতন্ত্রের কুফরি হওয়ার বিষয়টি তাদের সামনে স্পষ্ট হয়েছিল না। এ আলোচনাকে দীর্ঘ করা আমাদের দাওয়াতের জন্য উপকারীও নয়, আমাদের আলোচ্য বিষয়ও নয়এ ক্ষেত্রেও আমাদেরকে আমাদের আসলাফের, ভারসাম্যের আঁচল ছাড়া উচিত নয় ।

    এমন ক্ষেত্রে তারা শুধু এতটুকুই উত্তর দিতেন যে-

    تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ ۖ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُم مَّا كَسَبْتُمْ

    সেটা ছিল একটি উম্মত, যারা বিগত হয়েছে । তারা যা অর্জন করেছে, তা তাদের জন্য আর তোমরা যা অর্জন করেছ, তা তোমাদের জন্য [সূরা বাকরা : ১৪১]

    আসল বিষয় হল, আমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার পরিজনকে এই কুফরি থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করব



    তাকফিরের মাসআলায় ওলামায়ে কেরামের মাঝে নম্রতা ও কঠোরতার তাৎপর্য


    আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এ বিষয়টিকে খুব সহজ ভাষায় বুঝিয়েছেন । তিনি বলেন-

    এই ভিন্নতা (ইখতিলাফ) লেখকদের (আরবাবে তাসানিফ) অবস্থার ভিন্নতার ভিত্তিতে হয়েছে । যেই লেখক যেই গোমরাহ ফেরকার মুখোমুখি হয়েছেন এবং তাদের গোমরাহীর গভীর পর্যন্ত পৌঁছার সুযোগ হয়েছে, তাদের ফাসেদ আকিদা ও আমল দ্বারা দ্বীনের ক্ষতি হওয়ার ব্যাপারে তিনি জেনেছেন এবং নিশ্চিত হয়েছেন, তিনি সে ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করেছেন এবং এমন তীব্রভাবে খণ্ডন করেছেন যে এটাকেই মিশন বানিয়েছেন এবং তার নাম-নিশানা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন । আর যেই লেখক এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি এবং গোমরাহীর গভীর পর্যন্ত পৌঁছার সুযোগ হয়নি, তারা সতর্কতাবশত, মুসলমান ও আহলে কিবলা মনে করে মূলের উপর ভিত্তি করে কাফের বলা হতে বিরত থেকেছেন [ইকফারুল মূলহিদীন : ২৮৯]



    সাধারণ মানুষের জন্য ওলামায়ে কেরামের অনুসরণ করার বিধি


    এখন সমস্যা হল এমন নাজুক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ কি করবে? সাধারণ মানুষ দেখে যে, গণতন্ত্রের ঝাণ্ডা উত্তোলনকারীদের মধ্যে এমন ব্যক্তিগণও রয়েছেন, যাদেরকে আলেম বলা হয় তাদের অনুসারীদের সংখ্যাও কম নয় । এ সম্পর্কে মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহমাতুল্লাহি আলাইহি অত্যন্ত দামি কথা বলেছেন। তিনি মাআরিফুল কুরআনের সূরা মায়েদার এই আয়াতগুলোর তাফসীরের পর ‘মাআরিফ ও মাসায়িল’-এ বলেন-

    এখানে যেভাবে তাহরিফকারী (বিকৃতিকারী) এবং আল্লাহ ও. তার রাসূলের বিধানাবলীতে গলত জিনিস মিশ্রনকারীদের জন্য ধমকি রয়েছে, তেমনিভাবে সেসব ব্যক্তিদেরকেও কঠিন অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে, যারা এমন লোকদেরকে ইমাম (নেতা) বানিয়ে বিষয় ও গলত রেওয়ায়াত শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে । এতে মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উসুলি হিদায়াত হল, যদিও জাহেল আওয়ামের জন্য দ্বীনের উপর আমল করার পথ শুধু এটাই যে, তারা কেবল ওলামায়ে কেরামের ফতওয়া এবং তলিমের উপর আমল করবে ।

    কিন্তু এই যিম্মাদারী থেকে সাধারণ মানুষও মুক্ত নয় যে, ফতওয়া গ্রহণ এবং আমল করার পূর্বে স্বীয় নেতাদের সম্পর্কে এতটুকু খোজ-খবর এবং নিশ্চিত অবশ্যই হবে, যতটুকু একজন অসুস্থ ব্যক্তি ডাক্তার ও চিকিৎসকের নিকট যাওয়ার পূর্বে হয়ে থাকে কোন ডাক্তার ভালো, তার ডিগ্রী কি কি, যার তার নিকট চিকিৎসা নিয়েছে তারা কেমন উপকার পেয়েছে... সম্ভাব্য খোঁজ-খবর নেয়ার পরও যদি সে কোনো ভূয়া বা অনভিজ্ঞ ডাক্তারের ফাদে পড়ে অথবা সে কোনো ভুল করে, তবে জ্ঞানীদের নিকট সে তিরস্কারযোগ্য বিবেচিত হবে না। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি খোজ-খবর নেয়া ছাড়া কোনো ( আতায়ী ) এর ফাঁদে গিয়ে পড়ে এবং বিপদ গ্রস্ত হয়, বুদ্ধিমানদের নিকট সে নিজেই নিজের আত্মহননের জন্য দায়ী একই অবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য ধর্মীয় বিষয়েও ।


    [1] العمل الاسلامي بين دواعي الاجتماع ودعاة النزاع. اعداد مركزالدراسات والبحث الاسلامية في باكستان مع تقديم الشيخ أسامه بن لادن رحمه الله62


    আরও পড়ুন
    দ্বাবিংশ পর্ব
Working...
X