গণতন্ত্র ও নির্বাচন : একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ
পর্ব ১
দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে বেশ আগেই। সেই চাঞ্চল্যের ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে মসজিদ—সবখানে এখন একই কথা, একই আলোচনা—‘কে জিতবে নির্বাচনে? এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হলে, দেশের মানুষের ভাগ্য ফিরবে। মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।’
ঠিক যেন গল্পের মতো। একদেশে এক রানি ছিল। সে ছিল ভীষণ অত্যাচারী। তার অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। তারপর কী হলো? একদল মানুষ জেগে উঠল, প্রতিবাদ করল, প্রতিরোধ করল। তাদের দেখে সবাই রানির মুখোমুখি দাঁড়াল। রানি তার দলবল নিয়ে পালিয়ে গেল পাশের রাজ্যে। তারপর সে দেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগল। মানুষ ভাবছে, আমাদের দেশেও সেই গল্পের পুনরাবৃত্তি হবে। মানুষ ভোট দেবে, জনগণের নির্বাচিত সরকার আসবে। তারপর সবাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে। আসলেই কি তা হবে? বিশেষ করে, আমরা যারা মুসলিম, আমাদের জন্য কি আসলেই এই নির্বাচন ও গণতন্ত্র কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও সমৃদ্ধি আনতে পারবে?
গ্রামে-গঞ্জের একেবারে সাধারণ মানুষগুলো পর্যন্ত মনে করে এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এবং মানুষ ভোট দিয়ে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। যারা একটু ধার্মিক, তারা মনে করে, এবারের নির্বাচনে ইসলামী দলগুলো ক্ষমতায় গিয়ে ইসলাম কায়েম করে ফেলবে। তাই, অনেকেরই মতামত হলো, এবার ইসলামী দলগুলোকে তারা ভোট দেবে। অধিকাংশ মানুষ মনে করে, বিগত ১৭ বছরে সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ায় দেশে শান্তি ছিল না, ইনসাফ ছিল না। মানুষের এই ধারণাগুলো কি আসলেই সঠিক? আসলেই কি নির্বাচনে ইসলামী দল ক্ষমতায় গেলে ইসলাম কায়েম করতে পারবে? মানুষের ভোটাধিকার ফিরে আসলে কি দেশে শান্তি ও ইনসাফ কায়েম হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এই লেখায় দেওয়ার চেষ্টা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
বোঝার সুবিধার্থে আমরা লেখাটিকে চার ভাগে ভাগ করেছি—
১. গণতন্ত্রের মাধ্যমে কি শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা সম্ভব?
২. নির্বাচনের হাকিকত
৩. গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা: সমস্যা, সম্ভাবনা ও বাঁধা-বিপত্তি
৪. ইসলাম প্রতিষ্ঠার বাস্তবসম্মত ও শরীয়তসম্মত পথ
১. গণতন্ত্রের মাধ্যমে কি ‘শান্তি ও ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠা সম্ভব?
গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি না—সে আলোচনায় যাওয়ার আগে আমরা এই প্রশ্নটির উত্তর জানার চেষ্টা করব যে, গণতন্ত্রের মাধ্যমে শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি-না? গণতন্ত্রকে আমরা ভেতর থেকে বাস্তবতার নিরিখে পরখ করে দেখব, এর মধ্যে যে উপাদানগুলো আছে, সেগুলো সমাজে শান্তি, ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করতে সক্ষম কি-না?
গণতন্ত্র ও শব্দের মারপ্যাঁচ
গণতন্ত্রের মাধ্যমে শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি-না তা বোঝার জন্য গণতন্ত্রকে বুঝতে হবে। গণতন্ত্র কী–মোটামুটি আমরা সকলেই জানি। গণতন্ত্রের ধ্বজাদারীদের মতে গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসন। গণ+তন্ত্র অর্থাৎ জনগণের তন্ত্র বা শাসন। দাবি করা হয়, এই ব্যবস্থা পরিচালিত হয় জনগণের ইচ্ছা দ্বারা। প্রকৃতপক্ষে এই দাবি হলো শুভংকরের ফাঁকি। বিষয়টি বোঝা জটিল কিছু নয়। ‘প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র’ বা পরিভাষায় যাকে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র (Direct Democracy) বলা হয়, পৃথিবীর কোথাও তা নেই, থাকা সম্ভবও না। কারণ, দেশের যে-কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সারাদেশের মানুষের মতামত নেওয়া অসম্ভব একটি ব্যাপার। কোনো দেশে যদি বাস্তবেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো যে, যে-কোনো সিদ্ধান্তই নেওয়া হয় সারাদেশের মানুষের মতামত নিয়ে, তাহলে তাকে প্রকৃত অর্থেই গণতন্ত্র বলা যেত। যেহেতু তা বাস্তবিক অর্থেই জনগণের ইচ্ছা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীতে এ ধরনের গণতন্ত্রের কোনো অস্তিত্ব নেই।
প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র বা Direct Democracy একটি অসম্ভব ও অবাস্তব ব্যাপার। এ কারণেই বর্তমান পৃথিবীতে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের বিপরীতে পরোক্ষ গণতন্ত্র বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র (Representative Democracy)-ই প্রচলিত। কিন্তু এই প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রকে গণতন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়াই হলো সবচেয়ে বড় ধোঁকা। কারণ, এই গণতন্ত্রে মানুষের ইচ্ছার মূল্য কেবল একবারই দেওয়া হয়, নির্বাচনের সময়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে কিছু মানুষ সংসদে যায় এবং ৫ বছর ক্ষমতাচর্চা করে। এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ৫ বছরে যত সিদ্ধান্ত নেয়, সব সিদ্ধান্ত কি জনগণের ইচ্ছানুযায়ী নেয়? যদি সব সিদ্ধান্ত জনগণের ইচ্ছানুয়াযীই নেওয়া হতো, তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক দেশেও কেন বিক্ষোভ, আন্দোলন ও ধর্মঘট হয়? বিক্ষোভ ও আন্দোলন হওয়াই প্রমাণ করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের ইচ্ছানুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। তাহলে এই ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলে কেন প্রচার করা হয়? এর উত্তর স্পষ্ট—মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য। গণতন্ত্র প্রত্যক্ষ হোক বা পরোক্ষ—কোনোটা দিয়েই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না কেন—এবার সে আলোচনায় যাওয়া যাক।
১.১ জনগণের ইচ্ছাকে চূড়ান্ত নীতিনির্ধারণী শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া
মানুষ কীভাবে পরিচালিত হবে—সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মানুষের হাতে তুলে দেওয়া এবং জনগণের ইচ্ছাকে চূড়ান্ত নীতিনির্ধারণীর মর্যাদা দেওয়াই শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার অন্যতম কারণ। ডিরেক্ট ডেমোক্রেসি হোক বা রিপ্রেজেন্টেটিভ ডেমোক্রেসি—কোনোটি দিয়েই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। কারণ, দুই ব্যবস্থাতেই জনগণের ভাগ্য জনগণের হাতেই তুলে দেওয়া হয়; ডিরেক্ট ডেমোক্রেসিতে সকল জনগণের হাতে আর রিপ্রেজেন্টেটিভ ডেমোক্রেসিতে গুটিকয়েক মানুষের হাতে। মানুষের ভাগ্য মানুষের হাতে তুলে দেওয়াই শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার অন্যতম ও সবচেয়ে বড় বাঁধা। মানুষের ভাগ্য মানুষের হাতে তুলে দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক একটি বিষয়। জনতাই বৈধতা বা জনগণ ক্ষমতার উৎস–এ ধরনের চটকদার স্লোগান শুনতে ভালো শোনালেও বাস্তবে গণতন্ত্র শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ এটিই। জনগণের ভাগ্য জনগণের হাতে তুলে দেওয়া কেন শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বাঁধা—তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ নিচে আলোচনা করা হচ্ছে।
ক. ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার ভিন্নতা (Diversity of Preferences)
মানুষের ইচ্ছা, অনুভূতি, চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা ভিন্ন ভিন্ন। পরস্পরবিরোধী ইচ্ছা ও আগ্রহের অধিকারী মানুষ যদি কোনো সুপ্রিম পাওয়ার বা ডিভাইন এন্টিটির অধীনতা না মেনে নেয়, তাহলে তাদের নিজেদের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। মদ্যপের জন্য মদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া স্বার্থবিরোধী, সুদখোরের জন্য সুদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া স্বার্থবিরোধী, চোরাকারবারির জন্য চোরাকারবারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া স্বার্থের বিরোধী, দুর্নীতিবাজের জন্য দুর্নীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া স্বার্থবিরোধী। এমন চরিত্রের মানুষগুলো যখন একসাথে হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যাবে, তখন স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠবে। আর যেখানেই স্বার্থের সংঘাত দেখা দেবে, সেখানেই দেখা দেবে অশান্তি। সুতরাং গণতন্ত্রের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। গণতন্ত্র সব সময়ই সংঘাত ও অশান্তির দরজা খুলে রাখবে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, মানুষের চাহিদা ও ইচ্ছার ভিন্নতার কারণে একটি দেশ-পরিচালনার মতো গুরুদায়িত্ব মানুষের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। মানুষকেই সকল দণ্ডমুণ্ডের মালিক বানিয়ে দেওয়ার অর্থ চির অশান্তির দুয়ার খুলে দেওয়া। এই ব্যবস্থায় প্রত্যেকেই চাইবে নিজ নিজ সুবিধা বাগিয়ে নিতে। ফলে শুরু হবে এক নিরন্তর যুদ্ধ। শাসিতরা নিপীড়িত হতে থাকবে, অন্যদিকে শাসকরা সকল ক্ষমতা ও সুবিধা ভোগ করবে।
খ. জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা (Epistemic Limitation)
মানুষের ইচ্ছাকে ক্ষমতার উৎস হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অন্যতম একটি বাঁধা হলো মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। মানবজাতির জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ, কোনটা ক্ষতিকর আর কোনটা উপকারী—তা নির্ধারণ করার জন্য পর্যাপ্ত জ্ঞান মানুষের নেই। এই অপর্যাপ্ত জ্ঞান নিয়ে মানুষ যখন নিজেদের ভালোমন্দ নির্ধারণ করতে শুরু করে, তখন বিপর্যয় ডেকে আনে। আপাতদৃষ্টিতে যেটিকে ভালো মনে হচ্ছে, বাস্তবে সেটি খারাপ হতে পারে। আজ যেটিকে উপকারী মনে হচ্ছে, সেটাই আগামীতে ক্ষতিকর হিসেবে হাজির হতে পারে। পরিস্থিতি ও ব্যক্তিভেদে ভালো-মন্দের এই তফাত এবং মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার ফলে মানুষের সিদ্ধান্ত কখনোই শতভাগ উপকারী হয় না। এ জন্যই আমরা দেখব, ইতিহাসের সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যও অনেক সময় নিরীক্ষণ ও গবেষণার দ্বারা ভুল প্রমাণিত হয়। নিজ যুগের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে সংবিধান লেখানোর পরেও বছরখানের যেতে না যেতেই সে সংবিধানে সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ সবই মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার প্রমাণ। এমন সীমাবদ্ধ জ্ঞান নিয়ে মানুষের ভালোমন্দ ঠিক করার ক্ষমতা কীভাবের মানুষের হাতে দেওয়া যেতে পারে?
গ. পক্ষপাতিত্ব (Cognitive Bias)
মানুষ সাধারণভাবেই বায়াসড বা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে থাকে। প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না কিছু পক্ষপাতিত্ব থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যখন নির্বাচিত কিছু প্রতিনিধি পুরো জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নির্ধারণ করে, তখন সে সিদ্ধান্তেও পক্ষপাত থাকে। নিজের ক্ষতি করে কেউ কোনো আইন তৈরি করবে না। ফলে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পক্ষপাত থেকে পরিপূর্ণ মুক্ত হয়ে জনগণের জন্য কাজ করবে এমন আশা করা বোকামি বই কিছু নয়।
যাদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বিস্তর তফাত আছে, যাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে, যাদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব আছে—এমন দুর্বল মানুষের হাতে কীভাবে দেশ পরিচালনার মতো দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে? কীভাবে তাদের ইচ্ছাকেই ক্ষমতার উৎস হিসেবে মেনে নেওয়া যেতে পারে? আর যে ব্যবস্থা জনগণের ইচ্ছাকে ক্ষমতার উৎস ও বৈধতা বলে মেনে নেয়, সে ব্যবস্থা দিয়ে কীভাবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে? সে সমাজে তো বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ, মারামারি আর নৈরাজ্যই হবে একমাত্র বাস্তবতা। সবাই চাইবে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে। নিরন্তর চলা এই লড়াইয়ে ক্ষমতাবানরা ক্ষমতা ভোগ করবে আর অক্ষমরা আরও অক্ষম হতে থাকবে। তাদের ওপর নিপীড়ন চলতেই থাকবে। শান্তির দেখা সে সমাজে পাওয়া আদৌ সম্ভব হবে না। তাই, গণতন্ত্র দিয়ে কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
ঘ. দূরদর্শিতার অভাব (Strategic Myopia)
গণতন্ত্রের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার জন্য শাসক নির্বাচন সম্পূর্ণ অযৌক্তিক একটি বিষয়। দেশ পরিচালনার উপযুক্ত কে—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও জ্ঞান সাধারণ মানুষের সাধারণত থাকে না। বিষয়টি একেবারেই সহজ। কারও যদি জ্বর হয়, সে চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে যাবে। কোন ডাক্তারের কাছে যাবে, সেটা ঠিক করার জন্য সে কি এলাকাবাসীর ভোট নেবে? কোন ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে আপনার বাড়ি বানাবেন, কোন আর্কিটেক্ট দিয়ে আপনার বাড়ির ডিজাইন করাবেন—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অবশ্যই আপনি এমন ব্যক্তিদের শরণাপন্ন হবেন, যাদের এ ব্যাপারে জানাশোনা আছে, অভিজ্ঞতা আছে। যাদের এ বিষয়ে কোনো জানাশোনাই নেই, তাদের থেকে ভোট নিয়ে অধিকাংশ মানুষ যার কথা বলবে, তার কাছে যাবেন এমন চিন্তা নিঃসন্দেহে ভুল।
অনভিজ্ঞ ১ লাখ মানুষ যদি একজনকে রেকমেন্ড করে আর অভিজ্ঞ ১ জন মানুষ যদি অন্য একজনকে রেকমেন্ড করে, স্বাভাবিকভাবেই সেই অভিজ্ঞ একজনের কথাই গ্রহণযোগ্য হবে। সংখ্যায় বেশি দেখে সেই ১ লাখের কথাকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না। গণতন্ত্রে ঠিক এ কাজটিই হয়। একটি দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে, কোন নেতার হাতে দেশ নিরাপদ থাকবে, কে দেশকে সঠিক পথে নিতে পারবে, কে আমানতদারিতার পরিচয় দেবে—তা ঠিক করার জন্য জানাশোনা লোকের প্রয়োজন। আধিপত্যবাদী ও পরাশক্তির সামনে কীভাবে কৌশলে একটি দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া যাবে, কীভাবে দেশের সম্পদ পরাশক্তির হাতে তুলে না দিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা যাবে—এ বিষয়গুলো একজন সাধারণ মানুষের বোঝার কথা না। এই ধরনের সাধারণ মানুষের কথায় আমরা ব্যক্তিগত জীবনে, পারিবারিক জীবনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিই না। তাহলে কেন দেশ পরিচালনার মতো এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলেম-জাহেল, মূর্খ-শিক্ষিত, সৎ-অসৎ সকলের ভোট নিয়ে শাসক নির্বাচন করতে হবে? কীভাবে দেশ পরিচালিত হবে, সেটাই যারা জানেন না, তারা কীভাবে নিজেদের জন্য যোগ্য শাসক নির্বাচন করবে? ব্যাপারটি অনেকটা এমন হয়ে গেল যে, আপনি নতুন কম্পিউটার কিনেছেন, এখন কম্পিউটারে কোন অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করবেন উইন্ডোজ না লিনাক্স—তা ঠিক করার জন্য আপনার মহল্লার মানুষকে ডেকে বললেন, ভাইসব, আমি নতুন কম্পিউটার কিনেছি, এই কম্পিউটারে কোন অপারেটিং সিস্টেম রান করব তা আপনাদের ভোটের মাধ্যমে ঠিক করব। আপনাদের সামনে দুটি অপশন আছে। উইন্ডোজ ও লিনাক্স। আপনারা ভোট দিন। অথচ এই মানুষগুলো অপারেটিং সিস্টেম কী, কীভাবে কাজ করে, উইন্ডোজ কি আর লিনাক্স কী, এগুলোর সুবিধা-অসুবিধাগুলো কী, আপনার চাহিদা কী, কী ধরনের কাজ আপনি করবেন, আপনার প্রয়োজন কী—তার কিছুই তারা জানেন না। এই কাজ যে করবে, নিঃসন্দেহে সে পাগল বা মূর্খ। গণতন্ত্রের বিষয়টিও হুবহু একই রকম।
এর অর্থ কি তাহলে জনগণের সম্মতির কোনো মূল্যই নেই? না, এর অর্থ এটা না। জনগণের সম্মতির অবশ্যই মূল্য আছে। কিন্তু তার মানে এটা না যে, জনগণের সম্মতিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা ও চূড়ান্ত নীতিনির্ধারণী শক্তি হিসেবে মেনে নিতে হবে। জনগণের সম্মতির অবস্থান হলো দ্বিতীয় স্তরে। যোগ্য, অভিজ্ঞ, আমানতদার ব্যক্তিবর্গ (ইসলামী শাসনব্যবস্থায় যাদেরকে আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ বলা হয়, তারা) উপযুক্ত শাসক নির্বাচন করবেন, তারপর জনগণ সে শাসকের প্রতি সম্মতি জানাবে। যদি জনগণ তার আনুগত্য মেনে নিতে অস্বীকার করে, সে ক্ষেত্রে শাসক নির্বাচনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নিজেদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন। কিন্তু জনগণের ইচ্ছাকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা বানিয়ে দেওয়া যাবে না। আবার কোনো শাসকের প্রতি যদি তীব্র জন-অসন্তোষ ও ঘৃণা দেখা দেয়, তখন জন-আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়েই আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ বা শাসক নির্বাচন কমিটি সে শাসককে বরখাস্ত করবেন। জনগণের ইচ্ছার গুরুত্ব এতটুকুই। এর বেশি না।
উল্লিখিত চারটি কারণে আইনপ্রণয়নের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা জনগণের হাতে দেওয়া এবং জনগণের ইচ্ছাকে ক্ষমতার একমাত্র উৎস হিসেবে গ্রহণ কিছুতেই উচিত না। কারণ, এতে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যই তৈরি হবে, যা আমরা তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দেখছি। যে ব্যবস্থা জনগণের ইচ্ছাকেই ক্ষমতার উৎস হিসেবে বিবেচনা করে, সে ব্যবস্থা দিয়ে আর যা-ই হোক, শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। কেন গণতন্ত্র দিয়ে শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না, তার প্রথম কারণটি এ পর্বে আলোচনা করা হলো। আগামী পর্বে আমরা এমন আরও কয়েকটি কারণ নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
[চলবে ইনশাআল্লাহ...]
Comment