না জেনে কথা বলা - পীর সাহেব ঢালকা নগরের জিহাদ বিষয়ক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কিছু কথা ০১
পীর সাহেব ঢালকা নগর হযরত আব্দুল মতীন বিন হুসাইন সাহেবের একটি বয়ান হাতে পেয়েছি। জিহাদ, চুক্তি, যিম্মি বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। বয়ানটির প্রায় প্রত্যেকটি পয়েন্টেই সমস্যা দেখতে পাচ্ছি। ভালো হতো, যদি হযরত এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত অধ্যয়নের পর কথা বলতেন। হযরতের একটা ফেস ও গ্রহণযোগ্যতা আছে। উনাদের ছোট কথাও বড় প্রভাব ফেলে। আমাদের মতো ছোটদেরকে কিছু কথা তাই বলতে হচ্ছে যাতে উনাদের গ্রহণযোগ্যতার সুবাদে ভুল ছড়িয়ে না পড়ে এবং শত্রুদের উপকার ও উম্মাহর ক্ষতি না হয়।
হযরতের বয়ানের খোলাসা:
শুরুতে বলেছেন: যুদ্ধ একটি বৈধ বিষয়। প্রয়োজনে যুদ্ধ করা যাবে। তবে শরীয়ত এ বিষয়ে শক্ত শর্ত দিয়ে রেখেছে, সেগুলো পূরণ সাপেক্ষে, অন্যথায় নয়।
এরপর তিনি কাফেরদের সাথে কৃত চুক্তি রক্ষা করা এবং কাফেরদের বিভিন্ন শ্রেণী (যিম্মি, মুআহিদ, মুস্তামিন) নিয়ে কথা বলেছেন। তারপর ইতি টেনেছেন এভাবে: “এরপরে আর কোথায় কি আছে সুযোগ?”
অর্থাৎ জিহাদ করা বৈধ হতে পারে এরকম কাফের বর্তমান বিশ্বে কোথায়? জিহাদ কার সাথে করবেন?
মন্তব্য:
আলোচনার ধাঁচে মনে হচ্ছে তিনি বলতে চাচ্ছেন: জিহাদ একটি স্বতন্ত্র ও উৎসাহব্যঞ্জক কোনো বিধান নয়, একান্ত দরকার যদি পড়েই যায় তাহলে তো আর না করে উপায় নেই, তখন করতে হবে।
যদি হযরতের উদ্দেশ্য এমন হয়, তাহলে এটি কুরআন, সুন্নাহ, উম্মাহর আইম্মায়ে কেরামের মতামত ও ইসলামের ইতিহাস পরিপন্থী। জিহাদ একটি ফরয বিধান, এটি কোনো জরুরত নয় যে, কেবল জরুরত পড়লেই করা যাবে, অন্যথায় নয়। কুরআন সুন্নাহয় জিহাদ ও শাহাদাতের প্রতি যে পরিমাণ উৎসাহ দেয়া হয়েছে তা অন্য কোনো আমলের ব্যাপারে দেয়া হয়নি। আর এ ব্যাপারে মাসআলা হলো: কাফেররা আমাদের উপর আক্রমণ না করলেও আগে বেড়ে জিহাদ করা ফরয।
শত্রুরা জানে, এই ইকদামি জিহাদই তাদের ক্ষমতার ভিত ধ্বংস করবে। তাই তারা ইকদামি জিহাদ বিষয়ে সর্বপ্রকার প্রোপাগাণ্ডা ছড়ায় এবং একে সন্ত্রাস ও শান্তির পরিপন্থী আখ্যা দেয়ার চেষ্টা করে। পীর মাশায়েখদের উচিত: শত্রুর এই প্রোপাগাণ্ডার খপ্পরে পড়ে –জেনে না জেনে – শত্রুর পক্ষে কথা বলা থেকে সতর্ক থাকা।
আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন: আইম্মায়ে কেরাম সব সময় বলে থাকেন, পীর মাশায়েখগণ সরল মনের হয়ে থাকেন এবং সহজে সব কিছু বিশ্বাস করে বসেন। ফলে অনেক সময় তারা অসত্যকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন এবং প্রচার করেন।
যেহেতু বিষয়গুলো উম্মাহর রক্তের সাথে সম্পর্কিত, তাই সতর্কতা কাম্য, শত্রুর খপ্পরে যেন না পড়ি।
***
হযরতওয়ালা দ্বিতীয়ত যেটি বলেছেন “এরপরে আর কোথায় কি আছে সুযোগ?” – এ বিষয়টিতে সামনে মন্তব্য দিবো ইনশাআল্লাহ। ***
কাফেরদের বিরুদ্ধে কি চব্বিশ ঘণ্টাই জিহাদ করতে থাকতে হবে?
হযরত বলেন, অনেকে জিহাদের কথা বলে কিন্তু প্রাসঙ্গিক শর্তগুলোর কথা বলে না, অসম্পূর্ণ কথা বলে উত্তেজিত করে। অনেকে এই আয়াতটি দিয়ে জিহাদের কথা বলে,
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ. [الأنفال: 39[[1]
অথচ এই আয়াত আরব জাহানের ব্যাপারে। বাকি পৃথিবীর ব্যাপারে এই আয়াতের নির্দেশ না। হযরত বলেন, আমি অনেক উলামায়ে কেরামের সাথে কথা বলেছি। আমার কথা শুনে তারা বললো, আমরা তো এটি জানতাম না।
হযরত বলেন, এভাবে না জেনে অনেকে কথা বলে। যদি এই আয়াতের বাহ্যিক অর্থই উদ্দেশ্য হতো তাহলে তো রাত দিন চব্বিশ ঘণ্টাই কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকতে হতো। কারণ, আয়াতে ফিতনা দ্বারা শিরক উদ্দেশ্য। পৃথিবীতে শিরক আছে না? কাফের মুশরিক আছে না?
মন্তব্য:
আয়াতে কারিমার বিষয়ে হযরতের সংশয় দুই জায়গায়:
সংশয় ১: আয়াতে যে কাফের মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বলা হয়েছে তা শুধু আরবের মুশরিকদের বেলায় প্রযোজ্য, বাকি দুনিয়ার কাফের মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করার কথা এখানে বলা হয়নি। তাই এ আয়াত দিয়ে এ বিষয়ে কথা বলা সহীহ না।
উত্তর: একই আয়াত দুই সূরায় এসেছে। দুই আয়াতে শুধু كُلُّهُ শব্দের ব্যবধান।
সূরা বাকারায় এসেছে كُلُّهُ শব্দ ছাড়া:
{وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ فَإِنِ انْتَهَوْا فَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ (193)} [البقرة: 193]
সূরা আনফালে এসেছে كُلُّهُ শব্দ সহ:
{وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ فَإِنِ انْتَهَوْا فَإِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ بَصِيرٌ (39) وَإِنْ تَوَلَّوْا فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَوْلَاكُمْ نِعْمَ الْمَوْلَى وَنِعْمَ النَّصِيرُ (40)} [الأنفال: 39، 40]
এক জায়গায় كُلُّهُ শব্দটি থাকা আরেক জায়গায় না থাকার হেকমত সম্পর্কে আলুসি রহ. রুহুল মাআনিতে বলেন,
ولم يجىء هنا كلمة- كله- كما في آية الأنفال لأن ما هنا في مشركي العرب، وما هناك في الكفار عموما فناسب العموم هناك وتركه هنا. -تفسير الألوسي = روح المعاني (1/ 472)
“সূরা আনফালে كُلُّهُ শব্দটি এসেছে, কিন্তু এখানে (সূরা বাকারায়) আসেনি, কারণ: বাকারার আলোচনা আরব জাহানের মুশরিকদের নিয়ে আর আনফালের আলোচনা সকল শ্রেণির কাফের নিয়ে।” –রুহুল মাআনি: ১/৪৭২
অর্থাৎ আনফালের আয়াতটি যেটিতে كُلُّهُ শব্দ এসেছে (হযরতওয়ালা এই আয়াতটিই তেলাওয়াত করেছেন) তাতে সকল কাফেরের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
অতএব, এই আয়াত দিয়ে বাকি দুনিয়ার কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথা বলা ও উৎসাহ দেয়া সহীহ।
অধিকন্তু যত আয়াত ও হাদিসে জিহাদ করার কথা বলা হয়েছে, তার সবগুলোতে সব কাফেরের বিরুদ্ধে জিহাদ করার কথা বলা হয়নি। কোনোটিতে বলা হয়েছে আগ্রাসী কাফেরের বিরুদ্ধে জিহাদ করো, কোনোটাতে মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করো, কোনোটাতে আহলে কিতাবের বিরুদ্ধ জিহাদ করো, কোনোটাতে সকল কাফের মুশরিকের বিরুদ্ধে জিহাদ করো। কোনো একটা আয়াতে বিশেষ কোনো শ্রেণির কাফেরের বিরুদ্ধে জিহাদ করার কথা বলার অর্থ এই না যে, অন্যান্য কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার কথা অন্য কোনো আয়াত হাদিসে নাই। এক আয়াত দিয়ে দলীল দেয়া সহীহ না হলে যে জিহাদের বিষয়টি সম্পূর্ণ উড়ে গেল তা নয়।
সংশয় ২: দ্বিতীয় যে সংশয়টির কথা হযরতওয়ালা বলেছেন: ‘ফিতনা তথা শিরক নির্মূল হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করো’ আয়াতের এই সরল তরজমাটিই যদি উদ্দেশ্য হয় তাহলে তো দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টাই জিহাদে লেগে থাকতে হবে। কারণ, শিরক ও মুশরিক সারা পৃথিবী জুড়ে আছে এবং সব সময়ই আছে।
উত্তর: বুঝে ধরে না বলে শরীয়তের নুসুসকে ব্যাখ্যা করে ঘুরিয়ে নিজেদের বুঝের অনুকূল বানানো আহলুস সুন্নাহর মাযহাব নয়, মু’তাজিলাদের মাযহাব। এই আলোচনা বিস্তারিত উসূলে ফিকহের কিতাবাদিতে বিদ্যমান। তাই কোনো নসের স্বাভাবিক ভাষ্য পরিত্যাগ করার আগে এই বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার যে, আমি শুধু নিজে বুঝছি না বলেই ঘুরিয়ে অর্থ করছি? নাকি শরীয়তে এ বিষয়ে দলীল আছে?
আয়াতের সরল অর্থ তো এটাই যে, শিরক যতদিন আছে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে যতক্ষণ না শিরক নির্মূল হয়। এই সরল অর্থই আইম্মায়ে কেরাম বুঝেছেন এবং এটি উদ্দেশ্য হতে কোনো সমস্যা নেই। আলুসি রহ. বলেন,
قيل: لم يجىء تأويل هذه الآية بعد وسيتحقق مضمونها إذا ظهر المهدي فإنه لا يبقى على ظهر الأرض مشرك أصلا على ما روي عن أبي عبد الله رضي الله عنه. -تفسير الألوسي = روح المعاني (5/ 194)
“বলা হয়, এই আয়াতের সর্বশেষ ফল এখনও আসেনি। যখন ইমাম মাহদির আত্মপ্রকাশ ঘটবে তখন আয়াতের পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে। দুনিয়ার বুকে তখন কোনো মুশরিক থাকবে না।” –রুহুল মাআনি: ৫/১৯৪
অর্থাৎ সেই সময়টি আসার আগ পর্যন্ত জিহাদ চালিয়ে যেতে হবে। যখন সারা দুনিয়া ইসলামের অধীনে চলে আসবে এবং সকল কাফের হয় মুসলমান হবে, না হয় মারা যাবে- তখন আর জিহাদ করার প্রয়োজন পড়বে না। হাদিসে এর বিবরণ এসেছে:
عن أبي هريرة، أن النبيَّ -صلَّى الله عليه وسلم- قال: ليس بيني وبينه نبيٌّ -يعني عيسى ابن مريم- وإنه نازلٌ ... فيُقاتِلُ الناسَ على الإِسلامِ، فيدُقُ الصَّلِيبَ، ويقتُلُ الخِنزيرَ، ويضَعُ الجزيةَ، ويُهلِكُ اللهُ في زمانه المِلل كلَّها إلا الإِسلامَ. -مسند أحمد: 9270، سنن أبي داود: 4324، قال المحققون: حديث صحيح. اهـ
“হযরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার এবং তাঁর – অর্থাৎ ঈসা ইবনে মারয়াম আলাইহিস সালামের- মাঝখানে কোনো নবী নেই। অচিরেই তিনি যমিনে অবতরণ করবেন। ... অবতরণ করে ইসলাম গ্রহণের জন্য সকলের বিরুদ্ধে কিতাল করবেন। ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন। শুকর হত্যা করে ফেলবেন। জিযিয়ার বিধান উঠিয়ে দেবেন (ফলে মুসলমান না হলে হত্যা ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো রাস্তা থাকবে না)। তার যামানায় আল্লাহ তাআলা একমাত্র ইসলাম ব্যতীত সকল ধর্ম নিঃশেষ করে দেবেন।” -মুসনাদে আহমাদ: ৯২৭০, সুনানে আবু দাউদ: ৪৩২৪অন্য হাদিসে এসেছে,
« لا تزال طائفة من أمتى يقاتلون على الحق ظاهرين على من ناوأهم حتى يقاتل آخرهم المسيح الدجال ». –سنن أبي داود: 2486
“আমার উম্মতের একটা দল কেয়ামত পর্যন্ত কিতাল করতে থাকবে। তারা হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তাদের বিরোধীদের উপর হবে প্রতাপশালী। (এ ধারাবাহিকতা চলতে চলতে) তাদের সর্বশেষ দলটি মাসিহে দাজ্জালের সাথে কিতাল করবে।” – সুনানে আবু দাউদ, বাবু: ফি দাওয়ামিল জিহাদ, হাদিস নং ২৪৮৬অতএব, দাজ্জাল ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত, শিরক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত জিহাদ চলবে। এটি আয়াতের সরল অর্থ এবং এটি অন্যান্য নুসুস দ্বারা সমর্থিত, এটি উদ্দেশ্য হতে কোনো সমস্যা নেই।
এখন রইলো, তাহলে কি দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা জিহাদে লেগে থাকতে হবে?
উত্তর হচ্ছে: না। শিরক নির্মূল করা জিহাদের উদ্দেশ্য। তাই বলে একদিনে শিরক নির্মূল করে ফেলতে হবে তা নয়। শিরক নির্মূলের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জিহাদ চলতে থাকবে সামর্থ্যানুযায়ী। ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, বছরে অন্তত একবার বা দুইবার অভিযান চালানো ফরয। সামর্থ্য থাকলে এর বেশিও চলতে পারে, তবে জরুরী না। কোনো বছর যদি পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন না হয় তাহলে সে বছর বাদ গেলেও সমস্যা নাই। এভাবে ধীরে ধীরে ইসলাম প্রসার হতে থাকবে এবং কুফর সংকোচিত হয়ে আসতে থাকবে। অবশেষে একদিন কুফর সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে।
ইবনু আবিদিন শামি রহ. বলেন,
قَالَ فِي الدُّرِّ الْمُنْتَقَى ... يَجِبُ عَلَى الْإِمَامِ أَنْ يَبْعَثَ سَرِيَّةً إلَى دَارِ الْحَرْبِ كُلَّ سَنَةٍ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ. –الدر المختار وحاشية ابن عابدين (رد المحتار) (4/ 122)
“বছরে অন্তত একবার বা দুইবার দারুল হারবে অভিযান চালানো ইমামের জন্য আবশ্যক।” –রদ্দুল মুহতার: ৪/১২২
ইবনু কুদামা রহ. বলেন,
وَأَقَلُّ مَا يُفْعَلُ مَرَّةً فِي كُلِّ عَامٍ؛ ... فَيَجِبُ فِي كُلِّ عَامٍ مَرَّةً، إلَّا مِنْ عُذْرٍ، مِثْلَ أَنْ يَكُونَ بِالْمُسْلِمِينَ ضَعْفٌ فِي عَدَدٍ أَوْ عُدَّةٍ، أَوْ يَكُونَ يَنْتَظِرُ الْمَدَدَ يَسْتَعِينُ بِهِ، أَوْ يَكُونَ الطَّرِيقُ إلَيْهِمْ فِيهَا مَانِعٌ أَوْ لَيْسَ فِيهَا عَلَفٌ أَوْ مَاءٌ، أَوْ يَعْلَمَ مِنْ عَدُوِّهِ حُسْنَ الرَّأْيِ فِي الْإِسْلَامِ، فَيَطْمَعَ فِي إسْلَامِهِمْ إنْ أَخَّرَ قِتَالَهُمْ، وَنَحْوَ ذَلِكَ مِمَّا يَرَى الْمَصْلَحَةَ مَعَهُ فِي تَرْكِ الْقِتَالِ، فَيَجُوزُ تَرْكُهُ بِهُدْنَةٍ فَإِنَّ النَّبِيَّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – قَدْ صَالِحَ قُرَيْشًا عَشْرَ سِنِينَ، وَأَخَّرَ قِتَالَهُمْ حَتَّى نَقَضُوا عَهْدَهُ، وَأَخَّرَ قِتَالَ قَبَائِلَ مِنْ الْعَرَبِ بِغَيْرِ هُدْنَةٍ. وَإِنْ دَعَتْ الْحَاجَةُ إلَى الْقِتَالِ فِي عَامٍ أَكْثَرَ مِنْ مَرَّةٍ وَجَبَ ذَلِكَ؛ لِأَنَّهُ فَرْضُ كِفَايَةٍ، فَوَجَبَ مِنْهُ مَا دَعَتْ الْحَاجَةُ إلَيْهِ. المغني لابن قدامة (9/ 198)
“বছরে অন্তত একবার জিহাদি অভিযান চালাতে হবে। বিশেষ কোনো অপারগতা থাকলে ভিন্ন কথা। … কোনো বছর যদি একাধিকবার অভিযান চালানোর প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে একাধিকবার চালাতে হবে।” –মুগনি: ৯/১৯৮আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে: এই রকম প্রশ্নের উত্তর আইম্মায়ে কেরাম কিতাবুল জিহাদের শুরুতেই দিয়েছেন। যেমন, কেউ কেউ বলেছেন, জিহাদ যদি ফরযে আইন হতো তাহলে আমরা ধ্বংস হয়ে যেতাম, কারণ, তখন সব সময় সবাইকে জিহাদেই লেগে থাকতে হতো, এ কারণে ফরযে আইন করা হয়নি, ফরযে কেফায়া করা হয়েছে।
আইম্মায়ে কেরাম বলেন, এই বক্তব্য ভুল। কারণ, ফরযে আইন হলে সবাইকে জিহাদ করতে হবে ঠিক, তবে সবাইকে একসাথে করতে হবে না, ভাগ ভাগ করে করবে।
يَلْزَمُ كُلَّ وَاحِدٍ أَنْ يَخْرُجَ، فَفِي مَرَّةٍ طَائِفَةٌ، وَفِي مَرَّةٍ طَائِفَةٌ أُخْرَى، وَهَكَذَا. وَهَذَا لَا يَسْتَلْزِمُ تَعَطُّلَ الْمَعَاشِ. - مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح (6/ 2453)
“ফরযে আইন হলে সর্বোচ্চ যেটা হতো, সবাইকে জিহাদে বের হতে হতো। এক অভিযানে একদল যাবে, আরেক অভিযানে আরেক দল যাবে। এভাবে চলতে থাকবে। এভাবে হলে ফরযে আইন হলেও আমাদের ধ্বংস হওয়ার প্রশ্ন আসবে না।” –মিরকাত, মোল্লা আলী কারি: ২৪৫৩অতএব, আয়াতে শিরক নির্মূল হওয়া পর্যন্ত সকল শ্রেণির কাফেরের বিরুদ্ধে জিহাদ করে যেতে হবে উদ্দেশ্য হতে সমস্যার কিছু নেই। সবার বিরুদ্ধে জিহাদ ফরয। তবে আমরা ভাগ ভাগ করে সামর্থ্যানুযায়ী করতে থাকবো। কেউ সশরীরে জিহাদ করবো, কেউ মুজাহিদদের অর্থ ও অস্ত্র যোগাবো, তাদের পরিবারের দেখাশুনার দায়িত্ব নিবো।
এটি কোনো সমস্যা নয়। সমস্যাটি নিছক একটি সন্দেহ। হযরতওয়ালা যদি এ বিষয়ে কিছু পড়াশুনা করতেন কিংবা আরও গভীরভাবে ভাবতেন, তাহলে আশাকরি এই সংশয়ের সমাধান হয়ে যেতো। আর নিছক একটি সংশয়ের উপর ভিত্তি করে অন্যদের ‘না জেনে কথা বলে’ তুহমত দেয়াটা আরও বেশি অসমীচিন।
সারমর্ম
# জিহাদ কোনো জরুরত নয়, এটি একটি মহান ইবাদত এবং স্বতন্ত্র ফরয। কাফেররা আক্রমণ না করলেও তাদের বিরুদ্ধে আগে বেড়ে জিহাদ করা ফরয।
# সকল শ্রেণির কাফেরের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরয। وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّهِ - এই আয়াতে শুধু আরব জাহানের মুশরিক নয়, বরং পৃথিবীর সকল শ্রেণির কাফেরের বিরুদ্ধে কিতাল করার কথা উদ্দেশ্য হতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই। অধিকন্ত কিছু আয়াতে আরব জাহানের মুশরিকদের কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে, অন্যান্য আয়াত হাদিসে অন্যান্য কাফেরের বিরুদ্ধে কিতালের কথা বলা হয়েছে। অতএব, দুই প্রকার নসের মাঝে কোনো বিরোধ নাই।
# ‘শিরক’ নির্মূল করার উদ্দেশ্যে জিহাদ চলবে। ঈসা আলাইহিস সালামের সময় শিরক সম্পূর্ণ নির্মূল হবে। এর আগ পর্যন্ত জিহাদ ফরয থাকবে।
# বিশেষ অপারগতা না থাকলে বছরে এক/দুইবার অন্তত জিহাদি অভিযান চালাতে হবে। প্রয়োজন পড়লে এর বেশিও চালাতে হবে। অপারগতা থাকলে প্রস্তুতি সম্পন্ন করার নিমিত্তে কোনো বছর বাদ গেলেও সমস্যা নাই।
# সকলকে একযোগে জিহাদে বের হতে হবে না, ভাগ ভাগ করে জিহাদ হবে। কেউ সশরীরে জিহাদ করবে, কেউ অর্থ দিয়ে অস্ত্র দিয়ে এবং অন্যান্য উপায়ে সহযোগিতা করবে। এভাবে উম্মাহর পারস্পরিক ও সামষ্টিক সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কেয়ামত পর্যন্ত জিহাদ চলতে থাকবে।
(আগামী পর্বে সমাপ্ত ইনশাআল্লাহ)
[1] “তোমরা তাদের বিরুদ্ধে কিতাল করতে থাকো, যতোক্ষণ না যাবতীয় ফিতনার অবসান হয় এবং দ্বীন পূর্ণাঙ্গরূপে আল্লাহর হয়ে যায়।” –সূরা আনফাল : ৩৯
Comment