আত-তিবইয়ান পাবলিকেশন্স পরিবেশিত
ইসলামের দৃষ্টিতে – গণতন্ত্রের সংশয় সমূহ
।। শাইখ আবু মুহাম্মাদ আসিম আল মাকদিসি হাফিজাহুল্লাহ–।।
থেকে- শেষ পর্ব
ইসলামের দৃষ্টিতে – গণতন্ত্রের সংশয় সমূহ
।। শাইখ আবু মুহাম্মাদ আসিম আল মাকদিসি হাফিজাহুল্লাহ–।।
থেকে- শেষ পর্ব
৭. নীতিমালাঃ জোর জবরদস্তি বা নিপীড়নের ক্ষেত্রে কুফরি ক্ষমারযোগ্য
এর আগের (৬ নং) পয়েন্টে আমরা এ ব্যাপারে প্রমাণ দিয়েছি যে প্রয়োজনে কুফর বা শিরক করার কোন অনুমতি নেই। আমরা এখন যে নীতিটি আলোচনা করবো তা হচ্ছে নির্বাচনের পক্ষ অবলম্বনকারীদের শেষ অস্ত্র। তারা যেকোনো উপায়ে বলতে চায় যে, এটি একটি ইকরাহ (জোরজবরদস্তি) সংক্রান্ত বিষয়। হ্যাঁ, আমরাও বলছি যে, যদি কোন ব্যক্তি সত্যিকার অর্থেই জোরজবরদস্তি নিপীড়নের স্বীকার হয়, তাহলে তার জন্য এটি ক্ষমাযোগ্য। কিন্তু, আমরা যেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি এই ক্ষেত্রে ইকরাহর সংজ্ঞা ও শর্তাবলীর সাথে কোন সামঞ্জস্য নেই। প্রথম কথা হলো, এই নীতিমালা সেই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য নয় যে স্বেচ্ছায় কোন কাজ করে। এক্ষেত্রে যে তাকে জোর করানো হয়েছে, সেই প্রমাণ থাকতে হবে।
‘আলা আদ্-দ্বীন আল-বুখারীর সংজ্ঞা অনুযায়ী জবরদস্তি হলোঃ করো ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে কোন ব্যাপারে ভয় দেখিয়ে কোন কাজ করতে বাধ্য করা হয় যা সে করতেও সক্ষম। তাই অন্য ব্যক্তি সন্ত্রস্ত হয় এবং জবরদস্তির বাস্তবায়নে তার সন্তুষ্টি দূরীভূত হয়।
ডঃ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আল ওয়াহাবী বলেন, “এটা সেই প্রকারের যেখানে শুধুমাত্র ঐ নিপীড়িত ব্যক্তিকেই জোর করা হচ্ছে এবং তার আর কোন উপায় বা ক্ষমতা নেই।” [39]
সুতরাং, যারা এই যুক্তি দিয়ে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকে বৈধ করে তারা কখনোই এই দাবী করতে পারে না যে তাদেরকে এই কাজ করার জন্য বাধ্য করা হয়েছে। কারণ, এখানে মুসলিমদেরকে বলা হয় ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটে অংশগ্রহণ করুন’।
‘ইকরাহ’-এর শর্তের ব্যাপারে ইবনে হাযার (রহঃ) বলেন: “ইকরাহ’র ৪টি শর্ত রয়েছে:
- প্রথমতঃ যে জোর করছে তার ঐ হুমকি বাস্তবায়নের ক্ষমতা রয়েছে সেই সাথে যাকে জোর করা হচ্ছে সে এটি ঠেকাতে এমনকি এর থেকে পালাতেও অক্ষম।
- দ্বিতীয়ত: এ ব্যাপারে তার সুস্পষ্ট ধারণা আছে যে, সে যদি অসম্মতি প্রকাশ করে তাহলে ঐ হুমকি তার ওপর পড়বে।
- তৃতীয়ত: তাকে যে হুমকি দেয়া হচ্ছে তা অতি নিকটে অর্থাৎ যদি বলা হয়, “তুমি যদি এটা না কর, তোমাকে আগামীকাল মারব”, তাহলে তাকে নিপীড়িত বলা যাবে না। এক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম রয়েছে, তাহলো যদি নিপীড়নকারী একটি সময় নির্ধারণ করে দেয় যা অতি অল্প এবং সাধারণত সে এই সময় পরিবর্তন করে না।
- চতুর্থত: যাকে জোর করা হয়েছে তার থেকে এমন কিছু প্রকাশ হবে না যা দ্বারা বোঝা যায় যে সে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করছে। [40]
সুতরাং এই নীতিটি সঠিক যে, সত্যিকার অর্থেই যদি কাউকে বাধ্য করা হয় তবে তার নির্বাচনে অংশগ্রহণ ক্ষমা যোগ্য। তবে আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, তারা যেটাকে এখন ইকরাহ যা জোর-জবরদস্তি বলছেন তা আসলে ইকরাহ-র শর্তাবলী পূর্ণ করে না।
জোর জবরদস্তি সংক্রান্ত একটি উল্লেখ্য বিষয়
বর্তমানে ইরাক ও অন্যান্য স্থানে আমাদের ভাই-বোনদের ওপর যে অত্যাচার নিপীড়ন চলছে, তাতে তারা অনেকেই ‘ইকরাহ’-এর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অবস্থা ইকরাহ-র সংজ্ঞা ও শর্তাবলীর আওতায় পড়ে। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহই নেই যে আল্লাহর শত্রুরা (আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন) আমাদের ভাইবোনদের নির্যাতন করেছে, ধর্ষণ করেছে, হত্যা করেছে এবং এখনও করছে। এসব অত্যাচারের বিশদ বর্ণনা কেউ পড়লে সে অবশ্যই বলবে যে, তাদেরকে ঐসব অবস্থায় শিরক ও কুফর করতে বাধ্য করলে তাদের কিছুই করার ছিল না।
কিন্তু, বাস্তবতা হলো যে, ইরাকের ঐসব নির্যাতিত ভাইবোনরা নয় বরং সেই সব মানুষ নির্বাচনের দিকে ডাকছে যারা মোটামুটি আরামেই আছেন। আর একারণেই এসব মানুষের ক্ষেত্রে ইকরাহ’র এই নীতি প্রয়োগ করা যায় না। পৃথিবীর এক অংশের মুসলিমদের উপর অত্যাচার হচ্ছে সেটিকে তারা নিজেদের কুফর বা শিরকের জন্য অজুহাত করতে পারেন না। এদেরকে কোন অবস্থাতেই নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে না, আর এ অবস্থাকে নিপীড়ন বলা যাবে না।
গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের ব্যাপারে রায়:
যারা এই শিরকী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে তারা যে কুফরিতে লিপ্ত এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কিছু সন্দেহ-সংশয় ও ভুল ধারণার অজুহাতে তাদের এসব কাজ অনুমোদন যোগ্য নয়, যা আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি। তবে এটাও সমানভাবে নিশ্চিত যে অনেক মুসলমান ব্যাপারটির আসল রূপ পুরোপুরি অনুধাবন না করে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণে সকলের প্রতি আহবান জানায়। এটা হলো একটি দিক। তা ছাড়াও এটা স্পষ্ট যে তারা গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে সমাজে কিছু ভাল আনয়েনের উদ্দেশ্য। যদিও আমরা বলি না যে ভাল নিয়তে কোন কাজ করলেই তা শিরক ও কুফরি থেকে অব্যাহতি পাওয়া যাবে। আসলে সঠিক ব্যাপার হল শিরক ও কুফরি করার ব্যাপারে অজ্ঞতা তাদের ভাল নিয়তের কারণে তাদের কুফরির বাইরে নিয়ে আসে না।
অতএব, ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে কোন শিরক বা কুফর করলেই সেটা ক্ষমা করা হবে এমন কথা আমরা বলতে পারি না। তবে যেহেতু অনেকেই এই বিশেষ (গণতন্ত্র) বিষয়ে অজ্ঞ আর তাছাড়া বিষয়টি আরও জটিল হয় যখন এটি জায়েজ করার লক্ষ্যে আলেমগণ ফিকহের সেই সব নীতির ভিত্তিতে নানান ফাতওয়া দেন, যেগুলো আমরা এই প্রবন্ধে ইতিমধ্যে ব্যাখ্যা করেছি। সুতরাং এরকম অবস্থায় যে কাউকে তৎক্ষণাৎ কাফির বলাটা বাড়াবাড়ি বা উগ্রতা। যতক্ষণ না তার কাছে এ বিষয়টি পরিষ্কার তুলে ধরা হচ্ছে এবং এসকল বিভ্রান্তি অপসারণ করা হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তাকে তাকফির করতে পারি না।
যারা তড়িঘড়ি করে সকল ভোটদানকারীকে তাকফির করে এবং এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে আবু মুহাম্মাদ আসিম আল মাকদিসী বলেন: “এর মাঝে কিছু মানুষ আছে, যাদেরকে ডেকে আনা হয় ঐসব ব্যানার বা পোস্টারের সামনে যেখানে লেখা থাকে, “ইসলামই একমাত্র সমাধান” (অর্থাৎ ইসলামী দলে ভোট দিন) অথবা এ ধরণেরই কোন শ্লোগান যা দ্বারা মুশরিক শাসকরা জনগণকে বিভ্রান্ত করে থাকে। অতঃপর তারা তাদেরকে ভোট দেয় এবং নির্বাচিত করে। কারণ তারা ইসলামকে ভালোবাসে এবং শরীয়তের অনুগত থাকতে চায়; তাছাড়া এই শিরকের ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞান নেই বা শিরকের গভীরে প্রবেশ করার ঐরূপ ইচ্ছাও তাদের নেই। যেরূপ রয়েছে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের, যারা ইসলামের বেশ কিছু আইন নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেয়। সুতরাং যারা সরাসরি আইন প্রণয়নের অধিকার নেয়নি বা কুফরি আইনের সম্মানে শপথ বাক্য পাঠ করেনি বা এর কাছে বিচার প্রার্থনা করেনি অথবা কথা ও কাজে এমন কোন কুফর করেনি যা নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ করে থাকে; তাদের (তাকফির করার) ক্ষেত্রে এসকল বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে। কারণ, এ কথা সবারই জানা যে একজন ভোটার কখনও সরাসরি এসব কাজ করে না। বরং সে শুধু তার পছন্দের ব্যক্তিকে নির্বাচিত করে।”
তিনি আরও বলেন: “আর একারণেই আইন প্রণয়নকারী প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডের বাস্তবতা এবং এর মধ্যে যেসব কাজ কুফর এবং তাওহীদ ও ইসলাম বিনষ্টকারী, সেগুলো ব্যাখ্যা করে স্পষ্ট করার আগে এমন কাউকে (ভোটার) তাকফির করার জন্য ব্যস্ত হওয়া জায়েজ নয়। এর পরও যদি সে ভোট দান করে তবে সে কুফরি করল। সুতরাং ভোটারদের ক্ষেত্রে পার্থক্যসমূহ অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে, সবাই আইন প্রণেতা তৈরির উদ্দেশ্যে ভোট দেয় না । তাদের (অজ্ঞতার কারণে) অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। সুতরাং এক্ষেত্রে তার কাছে সত্য প্রকাশ করার আগে তাকে তাকফির করা যাবে না, যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে, যে তার নিয়ত জানে না তার কাছে মনে হবে যে, ঐ ব্যক্তি কুফরি কাজে লিপ্ত আছে। কারণ, গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে অনেক ভুল বোঝাবুঝি, অপব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে; আর তাছাড়া ‘গণতন্ত্র’, ’পার্লামেন্ট’ গুলো সবই বিদেশী শব্দ, তাই অনেকেই বাস্তবতা না বুঝে এর কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এর উদাহরণ হলো ঐ ব্যক্তির মত যে এমন কিছু কথা মুখ দিয়ে বলেছে যার অর্থ সে নিজেই জানে না।
সুতরাং যারা গণতন্ত্র ও এতে ভোট দানের ব্যাপারে ইসলামের সিদ্ধান্ত জানে; তাদের একান্ত দায়িত্ব হলো মানুষের কাছে এ বিষয়টি স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা এবং এ বিষয়ক বিভ্রান্তিসমূহ দূর করা।
উপসংহার:
হে পাঠক! কোন সন্দেহ নাই মুসলিমরা আজ ভয়াবহ অত্যাচারের শিকার হচ্ছে। আজ আমাদেরই ভাই-বোনদের উপর সংঘটিত হয়ে চলছে পৃথিবীর নৃশংস নির্যাতন, গণহত্যা; যা দেখে চোখের পানি ঝরছে আর হৃদয়ে আগুন জ্বলছে। এই বর্তমান অবস্থা দেখেও যদি কারো অন্তর নাড়া না দেয় তাহলে সে যেন তার ঈমানের ব্যাপারে নিজেকে প্রশ্ন করে আর তার মৃত অন্তরকে পরীক্ষা করে দেখে।
একই সাথে, আমরা আমাদের ভাইবোনদের সাবধান করে দিতে চাই শয়তানের চক্রান্ত থেকে যে সর্বাত্তকভাবে আমাদের পথভ্রষ্ট করতে চায়। উত্তম আমলের নামে, ইসলামের প্রতি আমাদের ভালোবাসাকে কৌশলে কাজে লাগিয়ে তারা আমাদের শিরকের মাঝে প্রবেশ করাতে সদাতৎপর। আর একথাও মনে রাখা দরকার যে, সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই নিষিদ্ধ নয়। যদি এগুলো শিরক বা কুফরের আওতায় না পড়ে এবং রাসূলের ﷺ সুন্নত অনুযায়ী পালন করা হয় তাহলে কোন বাধা নেই। যেমন, আলোচনা সভা, সমাবেশ, প্রচারণা, ইত্যাদি কিছু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেগুলো শরীয়তের কোন নিষেধ নেই।
পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের প্রয়াসটি ছিল সাম্প্রতিক কালে উত্থিত এই বিতর্ককে ঘিরে যা বেশ কিছু লেখকের প্রবন্ধকে ঘিরে বেশ জমে উঠেছে। আমরা শুধু চেয়েছি, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করতে এবং তাদের কিছু সংশয়ের জবাব দিতে এবং তাদের যুক্তি তর্কাদীগুলো খণ্ডন করতে।
আমাদের এই প্রয়াসের মাঝে যদি সঠিক কিছু থাকে, তাহলে তা নিশ্চয় আল্লাহ (ﷻ)-এর তরফ থেকে আর এর ভেতর যদি কোন ভুল বা সীমাবদ্ধতা থাকে তাহলে তা আমাদের এবং শয়তানের থেকে, আমরা তার থেকে আল্লাহ (ﷻ)-এর কাছে আশ্রয় চাই। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর, তাঁর পরিবার, তাঁর সাহাবা এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর অনুসারীদের উপর।
আরও পড়ুন
তৃতীয় পর্ব