শ্রবণ পর্যালোচনা |
নব্য খারিজিদের ভ্রান্ত অভিযোগ: কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে একটি তাত্ত্বিক খণ্ডন
-মুনশি আব্দুর রহমান
নব্য খারিজিদের ভ্রান্ত অভিযোগ: কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে একটি তাত্ত্বিক খণ্ডন
-মুনশি আব্দুর রহমান
সাম্প্রতিক কালে ‘ইসলামিক স্টেট’ (আইএস) বা দায়েশের মুখপাত্র আবু হুজাইফা আল-আনসারি "قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ" বা ‘সত্য পথ ভ্রান্তি থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ অডিও বার্তা প্রকাশ করেছে। এই বার্তার মূল উদ্দেশ্য মূলত দুটি—নিজেদের একমাত্র সত্যপন্থী দল হিসেবে দাবি করা এবং সিরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন রণাঙ্গনে সক্রিয় অন্যান্য মুজাহিদ গোষ্ঠী, বিশেষ করে আল-কায়েদা ও তাদের সমমনা দলগুলোর প্রতি চরম বিষোদ্গার করা।
এই বার্তায় আইএস মুখপাত্র নিজেদের বৈশ্বিক হামলার স্তুতি গাওয়ার পাশাপাশি দাবি করেছে যে, অন্যান্য দলগুলো ইসলামি খিলাফতের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, এসব দল এখন জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে আপস করে ‘ক্রুসেডার’ বা পশ্চিমাদের হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামি ফিকহের আলোকে এই বক্তব্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এর পরতে পরতে ঐতিহাসিক খারিজি মতাদর্শেরই নগ্ন প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। নিম্নে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি-
১. আকিদা ও ইজতিহাদি বিষয়ের মধ্যে বিভ্রান্তি এবং ঢালাও তাকফির
সিরিয়ার রণাঙ্গনে জাবহাহ ও হাইয়াহর (এইচটিএস) মতো ইসলামি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর সাথে দায়েশের পুরনো দ্বন্দ্ব রয়েছে। এই দ্বন্দ্বের জের ধরেই তারা আকিদা ও ইজতিহাদি বিষয়ের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি করে ঢালাও তাকফিরের পথ বেছে নিয়েছে। অন্যান্য মুজাহিদ দল নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের জানমাল সুরক্ষায় যেসব কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আইএস তাকে সরাসরি কুফরি বা শিরক বলে আখ্যায়িত করেছে। তাদের মুখপাত্রের দম্ভোক্তি—
"أن خلافنا مع الجبهات والهيئات قبل سنوات كان في العقائد لا في السياسات، بين التوحيد والشرك، بين دولة الشريعة ودولة القانون"
অর্থাৎ, কয়েক বছর আগে জাবহাহ ও হাইয়াহর সাথে তাদের বিরোধটি রাজনৈতিক ছিল না, বরং তা ছিল আকিদাগত; তাওহিদ ও শিরকের মাঝে এবং শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র ও মানবসৃষ্ট আইনের রাষ্ট্রের মাঝে।
পাঠকের এটাও জানা থাকা জরুরী, ২০২১ সাল পর্যন্ত হাইআতু তাহরিরিশ শামের অফিশিয়াল নথিপত্রে সুস্পষ্টভাবে লেখা ছিল, ইসলামী শরিয়াই হল বিধি-বিধানের একমাত্র উৎস। সুস্পষ্ট ভাষায় তারা তখনো মানবরচিত আইন-কানুন থেকে বারাআত ও সম্পর্কচ্ছেদ ঘোষণা করছিলেন। সুতরাং অন্যান্য যে সকল মুজাহিদগণ তাদের সাথে তখন দ্বিমত করেছেন, সেগুলো তাদের কিছু ভুল পদক্ষেপ এবং জুলুমের কারণে। কুফর কিংবা শিরকের কারণে নয়। কিন্তু দায়েশ বরাবরের মতই ভিত্তিহীন তাকফির করছে, একেবারে শুরু থেকেই তাদের সঙ্গে অন্যান্য জামাআতের দ্বন্দ ঈমান বনাম কুফরের দ্বন্দ ছিল বলে দাবী করছে।
অথচ ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় রাজনৈতিক বা কৌশলগত বিষয়গুলোকে 'সিয়াসাতে শারইয়্যাহ' বলা হয়, যেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ইজতিহাদী বিষয় হয়ে থাকে। একে কোনোভাবেই 'তাওহিদ ও শিরক' কিংবা আকিদাগত বিরোধ হিসেবে আখ্যায়িত করার সুযোগ নেই। আল-কায়েদা বা অন্যান্য মুজাহিদ দলগুলো মূলত সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিজয়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন কৌশলগত চুক্তি গ্রহণ করে থাকে। হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কাফিরদের আরোপিত এমন অনেক বাহ্যিক শর্ত মেনে নিয়েছিলেন, যা দেখে হযরত উমর (রা.)-এর মতো মহান সাহাবিও সাময়িকভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। অথচ খারিজিরা মুজাহিদদের এই কৌশলগত নমনীয়তাকে ধর্মত্যাগের সমতুল্য বলে মনে করে, যা মহান সুন্নাহর চরম অবমাননা।
রাজনৈতিক কৌশল ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাকে যদি কুফরি বলে সাব্যস্ত করা হয়, তবে ইসলামে রাজনীতি ও প্রজ্ঞার কোনো স্থানই অবশিষ্ট থাকে না। খারিজিদের একটি পুরনো স্লোগান ছিল— "لا حكم إلا لله" (বিধান কেবল আল্লাহর)। আইএস-এর এই দাবি সেই স্লোগানেরই নবতর বিকৃতি, যার জবাবে হযরত আলী (রা.) বলেছিলেন, "কথাটি সত্য, কিন্তু এর উদ্দেশ্য বাতিল।"
২. স্থানীয় ইমারতের অপব্যাখ্যা এবং মুজাহিদদের বিরুদ্ধে জাতীয়িতাবাদের মিথ্যা অপবাদ
অন্যদিকে সিরিয়া, মালি বা সোমালিয়ার মতো অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় মুজাহিদ দলগুলো পর্যায়ক্রমে একটি স্থানীয় ইসলামি সরকার বা ইমারত গঠনের যে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, আইএস তাকেও ধর্মনিরপেক্ষতা ও পশ্চিমাদের দালালির চরম পরিণতি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের অভিযোগ—
"لا تهدروها في سراب الوطنية، ولا تذروها في رياح الديمقراطية... أفرزت مسوخًا جاهلية بأصباغ جهادية كالإدارة العلمانية والإمارة الوطنية"
অর্থাৎ, মুজাহিদরা যেন তাদের আত্মত্যাগ জাতীয়তাবাদের মরীচিকা ও গণতন্ত্রের বাতাসে উড়িয়ে না দেয়, যা জিহাদি মোড়কে ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন ও জাতীয় ইমারতের মতো জাহেলি বিকৃতির জন্ম দিয়েছে।
ইসলামে অন্ধ জাতীয়তাবাদ বা আসাবিয়্যাহ সন্দেহাতীতভাবে হারাম হলেও নিজ মাতৃভূমিকে কাফিরদের দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করে সেখানে 'ইসলামিক ইমারত' প্রতিষ্ঠা করা শরিয়তসম্মত جهاد الدفع তথা প্রতিরক্ষামূলক জিহাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে গুলিয়ে ফেলা চরম মূর্খতার পরিচায়ক।
ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায় থেকে ক্রমান্বয়ে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করা বা 'তাদাররুজ' একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত পদ্ধতি। এখানে আমরা মদীনার উদাহরণ দেখতে পারি। মক্কাও আশেপাশে অনেক মুসলিম থাকলেও রাষ্ট্র শুধু মদীনা কেন্দ্রিক ছিলো। আইএস এর ফাতওয়া অনুযায়ী তাহলে এই রাষ্ট্রও কি আসাবিয়াতে আক্রান্ত ছিলো? নাউজুবিল্লাহ!
এছাড়া বিভিন্ন যুদ্ধে বিভিন্ন গোত্র নিজেদের পতাকা নিয়ে শরিক হতো, এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো মক্কা বিজয়ের সময়। তাহলে কি আইএস-এর মতে সাহাবারাও আসাবিয়াহ আক্রান্ত ছিলেন? মায়াজাল্লাহ। বরং এই ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হওয়ার বদলে একযোগে সমগ্র বিশ্বের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করে মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া সরাসরি শরিয়তের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার ভেতর শাসনকাজ পরিচালনা করার অর্থই ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যাওয়া নয়। তালেবান- আল-কায়েদা ও তাদের মিত্ররা স্থানীয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন নিয়ে ইসলামি সমাজ বিনির্মাণে বিশ্বাস করে, যা শাসনব্যবস্থায় স্থায়িত্ব নিয়ে আসে। এর বিপরীতে, কোনো ভূমিতে তামকিন প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াই আইএস কর্তৃক 'বৈশ্বিক খিলাফত'-এর মিথ্যা দাবি করে সবার কাছে বাইআত চাওয়া, বাইআত না দিলে যুদ্ধ করা, একযোগে সবার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার মত কর্মকাণ্ডগুলো মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে কেবল ধ্বংসযজ্ঞ ও বিপর্যয়ই ডেকে এনেছে।
৩. হিকমাহ ও প্রজ্ঞাকে 'পথচ্যুতি' হিসেবে চিত্রিত করা
দাওয়াত ও জিহাদের ময়দানে সাধারণ মানুষের প্রতি নমনীয়তা এবং শরিয়ত বাস্তবায়নে সক্ষমতা-ভিত্তিক পর্যায়ক্রমিক নীতি অনুসরণ করাকে আইএস 'আদর্শিক বিচ্যুতি' বলে তীব্র ব্যঙ্গ করেছে। তারা একে "الجماعات الهلامية والمناهج المطاطية" বা আকারবিহীন জেলি-সদৃশ দল ও স্থিতিস্থাপক পদ্ধতি বলে কটাক্ষ করেছে, যেখানে প্রবৃত্তি ও বিভ্রান্তির মিশ্রণ রয়েছে বলে তাদের দাবি। মূলত এখানে 'স্থিতিস্থাপক পদ্ধতি' শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে অন্যান্য দলগুলোর 'হিকমাহ' বা দাওয়াতি প্রজ্ঞাকেই বিদ্রূপ করা হয়েছে।
অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-
الْمُؤْمِنُ غِرٌّ كَرِيمٌ، وَالْفَاجِرُ خِبٌّ لَئِيمٌ
"মুমিন হয় সহজ-সরল ও ভদ্র (দয়ালু); আর পাপিষ্ঠ হয় ধূর্ত ও নীচ প্রকৃতির।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৯০ এবং সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৬৪)
সাধারণ মুসলিমদের ভুল-ভ্রান্তিগুলোকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা এবং ধীরে ধীরে সমাজে শরিয়ত বাস্তবায়ন করা নববি মানহাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামি ফিকহে 'উসুল' (মৌলিক নীতি) এবং 'ফুরু' (শাখা-প্রশাখা)-এর মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করা রয়েছে। অথচ দায়েশ এই শাখা-প্রশাখাগত বিষয়গুলো নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপ করে এবং দ্বিমত পোষণকারীদের রক্ত হালাল বলে মনে করে। এটি হলো 'গুলু' বা দ্বীনের মধ্যে চরমপন্থা, যা থেকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। নমনীয়তা কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং এটি একটি অসীম শক্তির জায়গা, যা ইসলামি আন্দোলনগুলোকে সাধারণ মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত রাখে। আইএস-এর অনমনীয় ও রূঢ় নীতির কারণেই তারা আজ সর্বত্র সাধারণ মুসলিমদের সমর্থন পুরোপুরি হারিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, এই বক্তব্যটির প্রতিটি ছত্রে খারিজিদের সেই ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যেরই সুস্পষ্ট ছাপ বিদ্যমান। তাদের জিহ্বা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং তারা কথায় কথায় কুরআনের আয়াত আওড়ায়; কিন্তু তাদের নিক্ষিপ্ত তীর গিয়ে বিদ্ধ হয় সাধারণ মুসলিম ও নিরপরাধ মুজাহিদদের বুকেই। বিশুদ্ধ ইসলামি জ্ঞান ও ফিকহের আলোকে তাদের এই দাবিগুলো সম্পূর্ণ অন্তঃসারশূন্য এবং তা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য এক চরম হুমকিস্বরূপ।
*****