গণতন্ত্র নয় পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব
।। মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম– ।।
–।।থেকে- প্রথম পর্ব
।। মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম– ।।
–।।থেকে- প্রথম পর্ব
সম্পাদকের কথা
গণতন্ত্র বর্তমান দুনিয়ার একটি বহুল আলোচিত মতবাদ । দুনিয়ার এক বিপুল সংখ্যক মানুষ গণতন্ত্রের প্রতি প্রচণ্ডভাবে শ্রদ্ধাশীল । তাদের কাছে গণতন্ত্র হচ্ছে আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা; এ ব্যবস্থার মাধ্যমেই মানুষ অর্জন করতে পারে তার কাংক্ষিত সুখ ও শাস্তি । কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার কি তাই? পৃথিবীর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মানুষ কি সুখ ও শান্তির দরিয়ায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত? এ প্রশ্নটি সম্ভবতঃ গণতন্ত্র-প্রেমীরা আদৌ খতিয়ে, দেখেন না। তাই গণতন্ত্রের নামে দুনিয়ায় যত শোরগোল উঠছে, মানুষের জীবনে দুঃখ ও দৈন্য ততই বাড়ছে । এমন কি সত্য কথা এই যে, গনতন্ত্রের হোতারাই মানুষকে দুঃখ ও দৈন্যের মুখে ঠেলে দিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।
এটাই স্বাভাবিক। কারণ, গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব বিস্তারের এক সর্বনাশা প্রক্রিয়া এ প্রক্রিয়ায় মুষ্টিমেয় ধূর্ত ও শঠ প্রকৃতির মানুষ খুব সুকৌশলে বৃহত্তর জন-সমাজের উপর প্রভু হয়ে বসে। তারা নানা মুখরোচক বুলির আড়ালে সাধারণ মানুষকে দাসানুদাসে পরিণত করে এবং তাদের ভাগ্য নিয়ে ইচ্ছামত ছিনিমিনি খেলে । আর হতভাগ্য মানুষ একেই স্বাধীনতা ও স্বাধিকার ভেবে গণতন্ত্রের জন্যে প্রাণপাত করে এবং ধূর্ত-ও শঠ লোকদের খেলার পুতুলে পরিণত হয়। অথচ কাংক্ষিত সুখ ও শান্তির মুখ তারা কোনদিনই দেখে না; তা চিরকাল শুধু সোনার হরিণ রূপে ধরা-ছোয়ার বাইরেই থেকে যায়।
এ ভূখণ্ডে ইসলামী আন্দোলনের মহান স্থপতি এবং ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারম্যান হযরত মওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম (রহ) গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত এই ভ্রান্তি ও বিচ্যুতিরই.বিশদ আলোচনা করেছেন আলোচ্য পুস্তিকায় । তিনি গণতন্ত্রের উৎস, ইতিহাস ও প্রয়োগ-পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, পশ্চিমের এই ভ্রান্ত মতবাদটি দ্বারা মানুষের উপর মানুষের ভুত বিস্তার ছাড়া প্রকৃতপক্ষে তার কোন কল্যাণই সাধিত হতে পারে না। সেটা হতে পারে কেবল ইসলামী আদর্শ-ভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ গণ-বিপ্রব দ্বারা। অতএব, সেই কাংক্ষিত বিপ্লবের লক্ষ্যেই সংগঠিত হওয়া উচিত এদেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত গণ-মানুষের।
পুস্তিকাটি ১৯৮৫ সালের প্রথমভাগে রচিত ও প্রকাশিত ইলেও দেশের জনমনে বিপুলভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে । ইতিমধ্যেই এর পাচটি সংস্করণ নিঃশেষিত হয়েছে। এজন্যে আমরা মহান আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করছি।
মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান
চেয়ারম্যান, মওলানা আবদুর রহীম ফাউন্ডেশন
بسم الله الرّحمن الرحيم
শুরু কথা
এমন একটি দেশের কথা কল্পনা করা যায়, যেখানকার শতকরা নব্বই ভাগেরও বেশী লোক নিজেদেরকে 'মুসলিম' বলে দাবী করে, যদিও তারা ইসলামের যাবতীয় হুকুম-আহকাম জীবনের সকল ক্ষেত্রে পালন করছে না বা পালন করতে পারছে না। এই পালন না করার কারণ হতে পারে-তারা প্রায় দু'শ বছর পর্যন্ত ইংরেজদের গোলাম হয়ে জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য হয়েছিল। আর ইংরেজরা এই দেশ দখল করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এখানকার মুসলমানদের পূর্ণমাত্রায় অমুসলিম না হলেও 'প্রায় অমুসলিম বানাবার জন্য ক্রমাগত ও সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করেছে। মুসলমানদের ইসলামী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে তাদের নিজস্ব পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে এখানকার জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে চালু করেছে এবং সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে দেশের শিক্ষার্থীরা সেই সব প্রতিষ্ঠানে ভীড় জমিয়েছে শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে। তার আরও বিশেষ কারণ থাকতে পারে। ইংরেজ শাসকরা নানা কৌশলে মুসলমানদের আর্থিক সচ্ছলতা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং অতপর জীবিকার্জনের সুযোগ লাভ কেবল তখনই সম্ভব বলে মনে করা হল, যদি ইংরেজ শাসকদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তাদেরই প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থাধীন পাঠ্যতালিকা অনুযায়ী শিক্ষা লাভ করে এবং কোন না কোন পর্যায়ের সনদ লাভ করতে সক্ষম হয়। উপরন্তু তারা স্বাধীনভাবে ব্যবসায়-বাণিজ্য করে জীবিকার্জনও মুসলমানদের জন্য প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিল। তা সম্ভব করে রাখা হয়েছিল শুধু তাদের জন্য, যারা ইংরেজদের শিক্ষা ব্যবস্থার অধীন শিক্ষা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। এক কথায় ইংরেজ শাসকরা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরজায় জীবিকার চাৰি ঝুলিয়ে রেখেছিল। যার ইচ্ছা সেখান থেকে ডিগ্রী লাভ করার পর সে চাবি হস্তগত করতে পারে; জীবিকার বন্ধ দুয়ার খুলে সুখী-সচ্ছল জীবন যাপনের সুযোগ পেতে পারে।
ইংরেজরা এ শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন এক শ্রেণীর লোক তৈরী করার ব্যবস্থা করেছিল, যাৱা বর্ণে-বংশে এদেশীয় হলেও চিন্তা-বিশ্বাস, নৈতিক চরিত্র, দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যমান ইত্যাদি সকল দিক দিয়েই হয়েছিল পুরোপুরি ইংরেজ। ইংরেজের মতই তারা মনিবসুলভ আচরণ গ্রহণ করেছিল। সাধারণ মানুষকে তার ঘৃণা করত, তাদেরকে ইংরেজদের মতই গোলাম বানিয়ে রাখতে শুরু করেছিল।
ইংরেজ শাসকরা পূর্বের সব আইন বাতিল করে গোলাম উপযোগী আইন তৈরী করে এদেশে চালু করে দিল। সে আইন-শিক্ষার উচ্চতর ব্যবস্থা এদেশে এবং তাদের নিজেদের দেশে চালু করল। আইন শিক্ষার্থীদের মনে-মগজে বদ্ধমূল করে দিল যে, আইন বলতে কেবল ইংরেজদের প্রবর্তিত আইন-ই বোঝায়। কেবল এই আইনই একালে দেশ শাসনের জন্য একমাত্র উপযুক্ত আইন। এ আইন ছাড়া অন্য সব আইন-এমন কি মুসলমানদের নিজেদের আইনও সেকেলে; একালে অচল। এ আইন যাৱা শিখবে তারাই আইনের ব্যবসায় করে একদিকে বিপুল অর্থ রোজগার করতে পারবে, অপর দিকে জনগণের নেতাও হতে পারবে। কেননা তারাই শাসকদের ভাষা জানে, শাসকদের মন-মেজাজ বোঝে এবং তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। ইংরেজদের দয়ার দান রাজনীতি করার যোগ্যতা কেবল এ আইনের 'জীবী' হলেই লাভ করা যেতে পারে।
ইংরেজরা এদেশে এমন এক অর্থ ব্যবস্থা চালু করল, যার ভিত্তি স্থাপিত ছিল সূদের উপর। অথচ মুসলমানদের ঈমান, সূদ হচ্ছে কঠিন হারাম এবং সর্বতোভাবে পরিত্যজ্য। ফলে মুসলমানরা দেশে প্রচলিত অর্থনীতির সুযোগ-সুবিধা লাভ করা থেকে হয় বঞ্চিত থাকল, না হয় সূদের মত হারাম ব্যবস্থায় রোজগার করতে বাধ্য হল। আর সূদী কারবারে যে জীবিকা অর্জিত হল, তদ্দরুন একদিকে যেমন হারাম খেয়ে ও পরিবারবর্গকে হারাম খাইয়ে তারা হালাল রিজিক খাওয়ার প্রয়োজনবোধটুকুও নিঃশেষে হারিয়ে ফেলল, অপরদিকে গরীব ও নিঃস্ব লোকদের শোষণ করে নিজেদের বিলাসী জীবন যাপনে তাদের একবিন্দু সংকোচ বা লজ্জাবোধও অবশিষ্ট থাকল না। দরিদ্র জনতার প্রতি থাকল না কোন দরদ বা সহানুভূতি। তারা নিজেরা যেমন হারাম উপায়-উপকরণের মধ্যে জীবন যাপনে অভ্যস্ত হল, তেমনি নিজেদের বংশধরদেরও সেই হারাম জীবিকায় অভ্যন্ত বানিয়ে দিয়ে গেল। ফলে গোটা বংশই সম্পূর্ণ ইসলাম-বিরোধী পরিমণ্ডলে লালিত-পালিত হতে থাকল।
ইংরেজদের সাংস্কৃতিক জীবনে মদ্যপান এবং নারী-পুরুষের মিলিত অনুষ্ঠান, নৃত্য-সঙ্গীত এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা এসব অনুষ্ঠানে এদেশের ইংরেজী শিক্ষিত ও ইংরেজভক্ত মুসলমানদের শরীক করে মদ্যপানে অভ্যস্ত করে তুলল; ভিন্ নারী-পুরুষকে অবাধ মেলামেশায় এবং জেনা-ব্যভিচারে লিপ্ত করে দিল। ফলে তাদের নিকট ইসলামের হালাল-হারাম মূল্যহীন, বরং ঠাট্টা-বিদ্রুপের বস্তুতে পরিণত হল; মাহরাম-গাইরে মাহরামের মধ্যে কোন পার্থক্য বোধও থাকল না, যার পরিণতিতে তারা ইসলাম-বিরোধী একটি শ্রেণীতে পরিণত হল।
শিক্ষা ব্যবস্থায় যুবক-যুবতীদের সহশিক্ষার প্রবর্তন করে ইংরেজ শাসকরা মুসলমান বংশধরদের মন-মগজে পর্দা ব্যবস্থাকে উন্নতি ও প্রগতির পরিপন্থী বা তার পথে প্রচণ্ড বাধা হওয়ার ধারণাকে বদ্ধমূল করে দিল। তারা একই শ্রেণীকক্ষে পাশাপাশি বা সামনা-সামনি বসে পাঠ গ্রহণ করেই ক্ষান্ত থাকেনি-পরস্পর প্রেম-প্রণয় ও যৌন মিলনের অবাধসুযোগপেয়ে চরম সীমায় পৌঁছে যেতেও দ্বিধা বোধ করল না। ফলে এই শিক্ষিত লোকদের পক্ষে ইসলামের নৈতিক বিধান দুঃসহ ও অননুসরণীয় এবং প্রগতি-পরিপন্থী হয়ে দাঁড়াল।
এভাবে ইংরেজ শাসকরা মুসলমানদের মধ্য থেকে যে লোকদেরকে নিজেদের চিন্তা-চরিত্রের প্রতিভূ বানাতে সক্ষম হয়েছিল, তাদেরকে মুসলিম সমাজের নেতৃস্থানীয় বানিয়ে দেবার জন্য নানা বাস্তব প্রক্রিয়ার প্রবর্তন করল।
এদেশবাসীর পরাধীনতার সময়কাল যতই অগ্রসর হতে থাকল, ততই এদেশে স্বাধীনতার আন্দোলন জোরদার হতে লাগল। বালাকোট ট্রাজেডীর পরও সারা উপমহাদেশ জুড়ে সাইয়্যদ আহমদ শহীদ ও শাহ ইসমাঈল শহীদের শিখ ও ইংরেজ বিরোধী জিহাদের জের চলছিল। বিশেষ করে এদেশের আলেম সমাজ ইংরেজ শাসনের অধীন ইসলামের প্রভাব দ্রুত বিলীন হতে দেখে এবং ইসলামের মৌল স্বাধীন বিপ্লবী ভাবধারার চাপে ইংরেজ-বিরোধী আন্দোলনে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করতে শুরু করলেন। ইংরেজ বিরোধী তথা স্বাধীনতার এই আন্দোলনে উত্তরকালে ইংরেজী শিক্ষিত লোকেরাও অগ্রসর হয়ে এল এবং পরবর্তীতে আলেম সমাজের তুলনায় তারাই অধিক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে শুরু করল। এক পর্যায়ে তারাই, নেতা হয়ে বসল গোটা মুসলিম সমাজের।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে ইংরেজরা এদেশীয় লোকদের মাঝে ইংরেজ-বিরোধী আন্দোলন প্রবল হতে দেখে নিজেরাই আঁচ করতে পারল যে, এদেশকে আর বেশীদিন পদানত করে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এতদঞ্চল ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় জন্য তাদের উপর আন্তর্জাতিক চাপও প্রবল হয়ে দাঁড়াল। ফলে তারা এদেশ ত্যাগ করে চলে যাওয়ার এবং এদেশীয় লোকদের হাতে গোটা শাসন কর্তৃত্ব সোপর্দ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। আর সে জন্য ইংরেজদেরই রচিত ১৯৩৫ সনের স্বায়ত্তশাসন আইনের অধীন চালু করা প্রক্রিয়াকেই পন্থা হিসাবে অবলম্বন করা হল।
১৯৩৫ সনে ইংরেজরা এদেশে প্রবর্তিত স্বায়ত্তশাসন আইনের অধীন ইউরোপে প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশেষ পরিমাণ করদাতাদের ভোটার বানিয়ে তাদের ভোট নির্বাচিত লোকদের দ্বারা প্রাদেশিক পরিষদ গঠন করে। এর ফলে এদেশে রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে এবং তার পুরোভাগে বা নেতৃত্বে ইংরেজী শিক্ষিত লোকেরা সাধারণভাবে এবং ইংরেজ-প্রবর্তিত আইনজীবীরা বিশেষভাবে অগ্রসর হয়ে আসে। আর ইংরেজরাও অতি সুকৌশলে এই শ্রেণীর লোকদেরকেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। ফলে তারাই হয় মুসলামনদের রাজনৈতিক নেতা।
স্বায়ত্তশাসন আইনের অধীন ১৯৩৬ সনে প্রথম প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে এই ইংরেজী শিক্ষিত লোকেরা ইংরেজদের এদেশীয় সাগরিদৱাই-নির্বাচিত হয়। ফলে মুসলিম জনগণের মনে এই ধারণাই বদ্ধমূল হয়ে দাঁড়ায় যে, আলেম সমাজ মুসলমানদের ধর্মীয় নেতা মাত্র, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারা নেতৃত্ব দেয়ার উপযুক্ত নয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম কেবল ইংরেজী শিক্ষিত লোকেরাই। কেননা তারাই শাসক ইংরেজদের ভাষা ও আইন-কানুন জানে এবং তারাই ইংরেজ প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সুপরিচিত।
ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর
১৯৪৬ সনে প্রাদেশিক পরিষদভিত্তিক আর একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনের ফলেই দেশ স্বাধীন হয় এবং নির্বাচিত ব্যক্তিদের হাতে দেশ শাসনের সর্বময় কর্তৃত্ব তুলে দিয়ে '৪৭ সনে ইংরেজরা এদেশ ছেড়ে চলে যায়।
ইংরেজ-পরবর্তীকালে অবস্থা এই দাঁড়ায় যে, দেশ বাহ্যত 'স্বাধীন' হলেও দেশবাসী প্রকৃত স্বাধীনতা থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত।
কেননা একটি স্বাধীন দেশের মৌলিক বৈশিষ্ট্য প্রধানতঃ দুটি। একটি তার নিজস্ব জাতীয় আদর্শ এবং অপরটি তার নিজস্ব জাতীয় আদর্শে বিশ্বাসী, অনুসারী ও বাস্তবায়নকারী নেতৃত্ব-সম্বলিত একটি প্রশাসন।
কিন্তু এ উভয় দিক দিয়ে দেশটি নামে স্বাধীন হলেও কার্যতঃ ইংরেজ আমলের মতই পরাধীন থেকে গেল।
ইংরেজদের চলে যাওয়ার পরও এই দেশটিকে সর্বাত্মকভাবে গ্রাস করে রাখল ইংরেজ-চালিত শিক্ষাব্যবস্থা, আইন-কানুন এবং প্রশাসন পদ্ধতি। আর সেই সাথে চেপে বসল ইংরেজদেরই মানস সন্তান ইংরেজী শিক্ষিত, ইংরেজদেরই মন-মানস ও চরিত্রের ধারক-বাহক এবং ইংরেজদেরই অন্ধ গোলাম শ্রেণীর লোকেরা। তারা ইংরেজদেরই তৈরী করা আইন ব্যবস্থার দ্বারা ইংরেজদেরই মনমানস ও চরিত্র নিয়ে শাসন করতে লাগল এ দেশের নয় কোটি মুসলমানকে। ফলে ইংরেজ আমলে মুসলিম জনগণ এবং তাদের জাতীয় আদর্শ দ্বীন-ইসলাম যেরূপ উপেক্ষিত অবস্থায় ছিল, ইংরেজদের এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার, অন্য কথায় স্বাধীনতার পরও ঠিক তেমনিভাবে উপেক্ষিতই হয়ে থাকল। মুসলিম জনতা দ্বীন-ইসলামকে জাতীয় আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং নেতৃত্ব থেকে ইংরেজদের মানসপুত্রদের হটিয়ে ইসলামী আদর্শের অনুসারীদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বারবার চেষ্টা করেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে থাকল।
দেশটির স্বাধীনতার পর
এ দেশটি ইংরেজদের চলে যাওয়ার পর প্রচলিত অর্থে এবার স্বাধীন হল। কিন্তু সে স্বাধীনতা জনজীবনে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে দেখা দিল না; বরং তখন ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও ইংরেজদের আইন প্রতিষ্ঠিত থাকার দরুন যেসব জীবন সমস্যা প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিল, সে সবের সমাধানের জন্য, দেশবাসীকে আবার স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হল এবং দীর্ঘ নয় মাস ব্যাপী সশস্ত্র যুদ্ধের দ্বারা ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে ভেঙে ফেলা হল। তখন দেশ আর একবার স্বাধীন হল। কিন্তু নয় মাসব্যাপী যুদ্ধে এক সাগর রক্ত দেয়ার পর যে স্বাধীনতা অর্জিত হল, সে স্বাধীনতাও সাধারণভাবে দেশবাসীর ভাগ্যে এবং বিশেষভাবে মুসলিম জনগণের জীবনে গোলামী জীবনেরই পুনরাবৃত্তি ঘটাল। এক কথায়, যথা পূর্বং তথা পরং-ই হয়ে থাকল।
দ্বিতীয় বারে অর্জিত স্বাধীনতার পরও নিতান্ত গোলামিজীবন যাপনে বাধ্য হওয়া নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। কিন্তু বাস্তব অবস্থা এই যে, এবারেও যেমন ইংরেজ প্রবর্তিত প্রশাসন ব্যবস্থা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি-কোন কিছু থেকেই নিষ্কৃতি পাওয়া গেল না, তেমনি ইংরেজদের মানসপুত্রদের নেতৃত্ব ও দেশ শাসনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকার দরুন স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছে যে, দেশবাসী এখনও সেই ইংরেজদেরই গোলামি করছে। স্বাধীনতা তাদের ভাগ্যে এখনও জোটেনি।
একথা সত্য যে, সেই ‘সাত সমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে আসা সাদা চামড়ার লোকেরা এখন আর সশরীরে উপস্থিত থেকে এদেশ শাসন করছে না। এখন দেশ শাসন করছে যাৱা, 'তারা গাত্রবর্ণ ও জন্মসূত্রে এদেশীয় হলেও অন্য কোন দিক দিয়েই তাদেরকে দেশীয় মনে হয় না-মনে হয় না এসব লোক এদেশের মুসলিম জনসমাজ থেকে বের হয়ে এসেছে। কেননা চিন্তা-বিশ্বাস, নৈতিক চরিত্র ইত্যাদি কোন একটি দিক দিয়েও এদেশের সাধারণ মুসলমানদের সঙ্গে এদের কোন মিল নেই। অথচ এরা যে এদেশের মুসলিম পরিবারেরই সন্তান, তাতে কোনই সন্দেহ নেই। বস্তুতঃ মুসলিম পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও সেই মুসলিম সমাজের সঙ্গে মন-মানস, চিন্তা-বিশ্বাস ও নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে কোনরূপ মিল না থাকা ইংরেজদের দীর্ঘকালীন গোলামির একটা মারাত্মক অভিশাপ। এ দেশের মুসলমানদের বর্তমান সার্বিক দুর্গতি এই অভিশাপেরই স্বাভাবিক পরিণাম। সাধারণভাবে মুসলমানদের পক্ষে পূর্ণ দ্বীন-ইসলাম পালন করতে না পারার মূলেও এ কারণই নিহিত।
এদেশের শাসক-প্রশাসকরা দেশের বর্তমান আইন-কানুন, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রশাসন পদ্ধতিতে একবিন্দু পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত নয়। কেননা তারা বর্তমান পদ্ধতিতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভ করেই দেশের প্রশাসক হয়ে বসবার সুযোগ পেয়েছে, যার দরুণ তারা ভোগ করতে পারছে বিচিত্র ধরনের সুযোগ-সুবিধা। কাজেই বর্তমান শিক্ষা ও প্রশাসন পদ্ধতি পরিবর্তিত হলে তারা যে তাতে নিজেদের অনিবার্য মৃত্যু ও ধ্বংস দেখতে পাবে, তাতে আর সন্দেহ কি। আর কোন ব্যক্তি যেমন নিজের হাতে নিজের মৃত্যু ঘটতে দিতে চায় না, তেমনি ইংরেজদের বদৌলতে দেশের উপর চেপে বসা বর্তমান শাসক-শাসকরাও ইংরেজ আমলের স্থিতাবস্থায় কোন রদ-বদলে রাশী হতে পারে না-কস্মিনকালেও রাজী হবে না, তা জোর দিয়েই বলা যায়।
অথচ এদেশের মুসলিম জনতা শুধু মানচিত্র বদলই নয়, ইংরেজ আমলের যাবতীয় অভিশাপ থেকেই মুক্তি চায়। তারা চায় ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষা-সংস্কৃতি, শাসন-পদ্ধতি ও আইন-কানুনের গোলামি থেকে সম্পূর্ণরূপে আজাদি লাভ করতে। এ দ্বন্দ্বই এ দেশের জনগণ ও শাসক-প্রশাসকদের মধ্যে বিরাজমান। সন্দেহ নেই, এ এক কঠিনতম স্বন্দ্ব। এর নিরসন না হওয়া পর্যন্ত এদেশের কিছুমাত্র অগ্রগতি সম্ভব নয়—সম্ভব নয়, স্বাধীনতার একবিন্দু সুফল লাভ করা।
Comment